আমাদের ৫২তম স্বাধীনতা দিবসে প্রথম আলোর অনলাইনে প্রচারিত একটি প্রতিবেদন নিয়ে দেশ জুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়। প্রতিবেদনটি করেছিলেন প্রথম আলোর সাভারের নিজস্ব প্রতিবেদক শামসুজ্জামান। প্রতিবেদনে একজন দিনমজুরের বক্তব্য ছিল ‘পেটে ভাত না জুটলে স্বাধীনতা দিয়া কী করুম। বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়। আমাগো মাছ, মাংস আর চাইলের স্বাধীনতা লাগব’। এই প্রতিবেদনে একটি শিশুর ছবিও ছিল, শিশুটি ফুল হাতে জাতীয় স্মৃতিসৌধের ফটকে দাঁড়িয়ে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে স্মৃতিসৌধের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ২৬শে মার্চে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার ১৭ মিনিটের মাথায় প্রথম আলো খবরটি সংশোধন করে উল্লেখ করে যে, প্রথমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম এবং প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবির মধ্যে অসঙ্গতি থাকায় ছবিটি তুলে নেয়া হয়েছে এবং শিরোনাম সংশোধন করা হয়েছে। প্রতিবেদনের প্রতিবেদক শামসুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় সৈয়দ মো. গোলাম কিবরিয়া নামের এক ব্যক্তি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন, এই মামলার প্রেক্ষিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। মামলা হলেই কেন গ্রেফতার করা হয় তা বুঝি না, প্রাথমিক তদন্ত করেও তো গ্রেফতার করা বা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। আরেকটি নিপীড়নমূলক আইন হচ্ছে, অভিযুক্তকে গ্রেফতার করলেই চাকরিজীবীকে সাময়িক বরখাস্ত করা। এই অবস্থা হলে তো শত্রুতাবশত যে কোন লোক যে কোন ব্যক্তিকে বিনা অপরাধে ফাঁসিয়ে দিতে পারে, হেনস্তা করাতে পারে। মামলায় লড়ে নিরপরাধ হওয়ার সাথে প্রচুর অর্থের সংশ্লেষ থাকে, থাকে আমৃত্যু অপেক্ষার পালা। শামসুজ্জামান এখন জামিনে আছেন।
প্রথম আলোর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই প্রতিবেদনে মিথ্যা পরিচয় ও মিথ্যা উদ্ধৃতি পরিবেশন করায় মহান স্বাধীনতা দিবসে দেশের গৌরবোজ্জ্বল ভাবমূর্তি নিয়ে জনগণসহ বহির্বিশ্বে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে মর্মে দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম আলোর বক্তব্য হচ্ছে প্রতিবেদনের বক্তব্যটি জাকির হোসেন নামক এক দিনমজুরের, ভুলে শিশুটির ছবিটি ছাপা হয়ে গেছে। এই প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর একাত্তর টিভি এবং আরেক ব্যক্তি সাভারে গিয়ে সবুজ ও তাদের মা’র সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। সাক্ষাৎকারে মা স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন যে, সবুজ স্কুলে পড় এবং স্কুল শেষে ফুল বিক্রি করে; সবুজের বাবা রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন, না খেয়ে উপবাস করে থাকার মতো অভাব তাদের নেই, তারা মাঝে মাঝে মাছ-মাংসও খান। সবুজের বক্তব্য হচ্ছে, প্রথম আলোর প্রতিবেদক তাকে ১০ টাকা দিয়ে ফটো তুলেছে।
প্রকাশিত বক্তব্য এবং পরিবেশিত ছবির মধ্যে অসঙ্গতি থাকতে পারে— ভুল প্রথম আলো স্বীকারও করেছে। তবে প্রথম আলো যে জাকির হোসেনের কথা এখন বলছে তার ছবি বা ঠিকানা পেলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসত। কিন্তু এখনো প্রথম আলো জাকির হোসেনের ঠিকানা দিয়েছে বলে শোনা যায়নি। এখন আমাদের বিবেচ্য বিষয় সবুজ বা জাকির হোসেন নয়, স্বাধীনতা নিয়ে প্রদত্ত বক্তব্য; বক্তব্য কিন্তু প্রথম আলো পরিবর্তন করেনি। প্রথম আলোর প্রতিবেদনটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় বাজারে নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যে বেড়েছে তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। করোনা-উত্তর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সারা বিশ্বের অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলেছে। পৃথিবীতে এমন একটি দেশও খুঁজে পাওয়া যাবে না যে দেশে পণ্যের দাম বাড়েনি। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। যে দেশগুলো তেল বিক্রি করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে সেই সকল দেশেও মূল্যস্ফীতি হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন উন্নত দেশেও দশ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। এই দেশগুলো অঢেল সম্পদের মালিক, মুক্তবাজার অর্থনীতির এই দেশগুলো ভর্তুকি দিয়েও জিনিসপত্রের দাম কমাতে পারছে না। যতদিন রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ থাকবে, যতদিন চীনকে কোণঠাসা করার নীতি অনুসৃত হতে থাকবে ততদিন জিনিসপত্রের দাম কমবে বলে মনে হয় না।
বিভিন্ন মিডিয়া প্রতিদিন আমাদের বাজারের অবস্থার পর্যালোচনা করে থাকে, কোন দিন কোন ক্রেতা বাজারমূল্যের উপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেনি এবং এটাই স্বাভাবিক। তবে আমাদের দেশে অনেক পণ্যের দাম ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে বাড়িয়েছে, রোজার মাসে একটু বেশি বাড়িয়েছে। করোনার কারণে বিশ্বের দেশগুলো পরস্পর পরস্পর থেকে একটি বছর বিচ্ছিন্ন ছিল। করোনা-উত্তর ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চেপে ধরেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। দেশে দেশে মানুষ অধিক সংখ্যায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে, অভাব বেড়েছে, না খেয়েও মানুষ উপোস থাকছে। পৃথিবীর কয়েকটি দেশ দেউলিয়া হয়ে গেছে, গৃহীত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না, তেল কেনার পয়সা নেই, বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে বাতি জ্বলে না, কাগজের অভাবে ছাত্র-ছাত্রীর লেখাপড়া বন্ধ। বাংলাদেশেরও দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন অনেকে, কিন্তু এখনো হয়নি। যুদ্ধ এবং অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে স্বল্পোন্নত বা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল বহু দেশের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যাদের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা হয়েছে তারা ইতোমধ্যে দেউলিয়া হয়ে গেছে, স্বাধীন না হলে ওদের সাথে আমাদেরও দেউলিয়া হয়ে যেতে হতো।
বাংলাদেশ দেউলিয়া না হলেও অভাব রয়েছে, করোনা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাস্তায় ভিখারির সংখ্যা বেড়েছে, তিন বেলা খাবার জোগাড় করতে পারে না এমন পরিবারের সংখ্যাও অগণিত, কাজ নেই বলে চুরি বেড়েছে, ছিনতাই থামানো সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতির সামাল দেওয়া সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ সরকারের হাতে চীন, কানাডা, আমেরিকা বা ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো অফুরন্ত উদ্বৃত্ত টাকা নেই, উদ্বৃত্ত টাকা না থাকায় সব ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। ভর্তুকি হচ্ছে বেশি দামে কেনা জিনিস কম দামে বিক্রি করা। উদ্বৃত্ত টাকা না থাকা সত্ত্বেও সরকার বেশি দামে চাল-ডাল-তেল কিনে প্রায় এক কোটি গরিব জনগণের নিকট কম দামে বিক্রি করছে, সরকার সার, কৃষিসরঞ্জাম, বিদ্যুৎ প্রভৃতি ক্ষেত্রেও ভর্তুকি দিচ্ছে। সব মানুষ মাছ-মাংস খেতে না পারলেও না খেয়ে মরছে না। তবে বিশ্বমন্দা ১৯৩০ সনের মতো চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলে মানুষ না খেয়েও মরার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রী কৃষি উৎপাদনের উপর সমধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ভাত থাকলে নুন দিয়ে উদর ভর্তি করা যাবে, মাছ-মাংস বাদ।
প্রথম আলো পরিশীলিত ও উচ্চমার্গের ভাষায় যে প্রতিবেদন করেছে, যে ভাষায় স্কুলছাত্র সবুজ বা দিনমজুর জাকির হোসেন কথা বলেছে তা আয়ত্ত করা উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তির পক্ষেও সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। দিনমজুর যদি এমন গুছিয়ে কথা বলতে পারে তাহলে আমাদের অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, বাংলাদেশ অন্তত বাংলা ভাষায় অনেক সমৃদ্ধি লাভ
করেছে। কিন্তু স্বাধীনতাকে তুল্য করার স্বাধীনতা বা স্বাধীনতার বিনিময়ে মাছ-মাংস খাওয়ার বাসনা গরীবদের সত্যি রয়েছে কি না জানি না, থাকলেও স্বাধীনতা বিক্রির বস্তু নয়। জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিএনপি’র মহাসচিবও নাকি বলেছেন, পাকিস্তানি জমানা এর চেয়ে ভালো ছিল। কিছুটা সত্য বলেছেন, কারণ একাত্তরের পূর্ব পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানের লোকেরা বাঙালির চেয়ে অনেক বেশি ভালো ছিল। ১৯৭০ সন পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৬০০০ অফিসারের মধ্যে বাঙালি ছিল মাত্র ৩০০ জন, চাকরির ক্ষেত্রে এমনকি বিহারীদের যে অবস্থান ছিল তা বাঙালিদের ছিল না। বাঙালির হাতে ব্যাংক ছিল না, বীমা ছিল না, শিল্প ছিল না, ব্যবসা ছিল না, ছিল না নিজেদের শাসন করার অধিকারও। ২০০৯ সন পর্যন্তও বিভিন্ন সূচকে পাকিস্তানের অর্থনীতির অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ভালো ছিল। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের প্রায় দ্বিগুণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ছয় গুণ বেশি, দারিদ্র্যের হার অর্ধেক, গড় আয়ু বেশি, জিডিপি বেশি, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার ৮.৭৮ শতাংশের তুলনায় পাকিস্তানের ২৭ শতাংশ, পাকিস্তানে এক কেজি আটার দাম ১৬০ রুপি, ১ ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ১৪ হাজার রুপি। এক ডলার দিয়ে এখন পাকিস্তানের ২২৭ রুপি পাওয়া যায়, বাংলাদেশের এক টাকার সমান এখন পাকিস্তানের ২.৭৭
রুপি। বাংলাদেশে ধনী লোকের সংখ্যা পাকিস্তানের তুলনায় ৪৫% বেশি। স্বাধীন না হলে বাঙালিদের অবস্থা তো পাকিস্তানিদের মতো হয়ে যেত; তারপরও কি পাকিস্তান ভালো বলা যথার্থ?
বিশ্বের এমন একটি অসহনীয় দুর্যোগে একজন শিশু বা দিনমজুরের মুখ দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক হয়নি, কারণ অর্থনীতির এই দুর্যোগ বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি। স্বাধীনতা দিবসে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মাহুতির গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিচিহ্ন স্মৃতিসৌধের ফটকে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা অর্জনকে অর্থহীন করে তোলার মধ্যে কোন কৃতিত্ব নেই, আছে স্বাধীনতাকে অস্বীকার করার হীনমন্যতা। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই কেন মাছ-মাংস খেতে পারছে না সেজন্য স্বাধীনতাকে দায়ী করা, অভিযুক্ত করা বা খোঁচা দেওয়া প্রতিবেদন তাই প্রশ্নবিদ্ধ হবেই, প্রথম আলো জবাবদিহি করবে লিখে, মামলা মোকাবিলা করে নয়। কারণ মামলা, গ্রেফতার কোন বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান নয়।
ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর কমিউনিস্ট পার্টির স্লোগান ছিল, ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’। এই স্বাধীনতার জন্য হাজার হাজার ভারতবাসী প্রাণ দিল, ফাঁসির রজ্জুতে ঝুলিয়ে স্বাধীনতাসংগ্রামীদের মারা হলো— তাই স্বাধীনতা লাভের পর কমিউনিস্ট পার্টির এই স্লোগানের ভ্রান্ত রণকৌশল মার খেল, পাকিস্তানে পার্টি নিষিদ্ধ হলো, কমিউনিস্টরা জেলে গিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরল। সত্তর দশকে ভারতের নকশালপন্থীরা এই স্লোগান দিত, তারাও শেষ। এই স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান বানানোর প্রস্তুতি বাঙালি এখনো নেয়নি; কারণ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কাছে পাকিস্তানিরা পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ বানিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছিল। তাই একজন মজুরের মুখে নাটকীয় ভাষা বসিয়ে দিয়ে স্বাধীনতাকে বিষাক্ত তীরে বিদ্ধ না করে স্বাধীনতাকে আরও উপভোগ্য করে তোলার প্রচেষ্টা নেওয়াই শ্রেয়তর। সত্য প্রকাশে সাংবাদিকের কলম রুদ্ধ হোক এটা কারো কাম্য নয়, কিন্তু মিথ্যার জালে মানসিক প্রতিবন্ধী বাসন্তীর আব্রু রক্ষা করার মতো কোন অপচেষ্টা সমর্থনযোগ্য নয়।