পহেলা বৈশাখে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। রেজিস্ট্রি ডাকে এই নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান। নোটিশ পাওয়ার পর অবিলম্বে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধের ব্যবস্থা নিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঢাকার জেলা প্রশাসক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিনকে অনুরোধ করা হয়েছে, নতুবা হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হবে। আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, হাজার বছর ধরে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালি তা উদযাপন করে আসছে, কিন্তু হঠাৎ করে উদ্ভাবিত এই মঙ্গল শোভাযাত্রার সাথে পহেলা বৈশাখের কোন সম্পর্ক নেই। নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সকল ধর্মের মানুষ তাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে মঙ্গল প্রার্থনা করতে পারে, কিন্তু মঙ্গল শোভাযাত্রায় বহন করা বিভিন্ন ধরনের পশু, পাখি, মাছসহ বিভিন্ন প্রাণীর ভাস্কর্য মুসলিম জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলা নতুন বছর ১৪৩০ বরণ করে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মঙ্গল শোভাযাত্রার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল চারুকলা অনুষদ। ১৯৮৯ সনের পয়লা বৈশাখে শুরু হওয়া ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ পরবর্তীকালে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হিসেবে নামকরণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ এই আনন্দ বা মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্গাতা। তাদের কাজই হচ্ছে অঙ্কন করা, ভাস্কর্য তৈরি করা। ২০১৬ সনে বাংলাদেশের এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ জাতিসংঘের ইউনেস্কোর মানবতার অধরা বা অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান লাভ করেছে। পাকিস্তান আমল থেকেই রমনা পার্কের বটমূলে ছায়ানট আয়োজিত প্রাত্যুষিক সঙ্গীতানুষ্ঠানে দলে দলে বাঙালি যোগ দিয়ে আসছে, বোমা ফাটিয়ে লোক মেরে ভয়-ভীতির আতঙ্ক ছড়িয়েও বাঙালিকে ঘরে আবদ্ধ করে রাখা যায়নি। কারণ পহেলা বৈশাখের উৎসব বাঙালির প্রাণের উৎসব। ১৯৮৯ সনে প্রবর্তিত মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রবর্তনে সর্বজনীন পহেলা বৈশাখ উদযাপনে নতুন মাত্রা যোগ হয়।

বাংলাদেশে মূর্তি ও ভাস্কর্য নিয়ে অনেক আলোড়ন হয়েছে। কোরআনে মূর্তি পরিহারের নির্দেশনা রয়েছে, কারণ মূর্তি মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। হাদিস অনুযায়ীও কোন প্রাণীর ছবি অঙ্কন করলে পরকালে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। কিছু আলেম মনে করেন মূর্তি আর ভাস্কর্যে কোন পার্থক্য নেই। তারা আরও উল্লেখ করেন, পূজার উদ্দেশ্য থাকুক বা নাই থাকুক কোন প্রাণীর ভাস্কর্য নির্মাণ বা স্থাপন করা শরিয়তসম্মত নয়। অন্যদিকে বিপক্ষের অভিমত হচ্ছে, কোরআনে মূর্তি বলতে শুধু পূজার উদ্দেশ্যে নির্মিত অবয়বকে বোঝানো হয়েছে। তাদের আরও অভিমত হচ্ছে, মূর্তি আর ভাস্কর্য এক হলে নবীজীর পর মুসলমান শাসকদের অধিকৃত দেশসমূহের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হতো, কিন্তু খেলাফত ও সাহাবীদের অভিযানে অধিকৃত কোনো ভূখণ্ডে সেখানকার ভাস্কর্য বা মূর্তি ভাঙার উল্লেখযোগ্য কোন নজির পাওয়া যায় না।

হাদিসে প্রাণীর ছবির উপর নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে বিধায় প্রাণী ব্যতীত অন্য যে কোনো গাছ, লতা-পাতা, নদী-সাগর, পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গলসহ বিভিন্ন বস্তুর ছবি, ভাস্কর্য, মূর্তি ইত্যাদি অঙ্কন, নির্মাণ, স্থাপন ও প্রদর্শন করা যাবে বলে অনেক আলেম অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এই অভিমতের অসারত্ব প্রমাণিত হয়ে যায় আশ্চর্য জগদীশ চন্দ্র বসুর আবিষ্কারের পর— তিনি বলেন ‘গাছেরও প্রাণ আছে’। আবার আরেকটি বুখারী হাদিস অনুযায়ী আল্লাহর সৃষ্ট প্রাণী-জড় নির্বিশেষে কোন কিছুরই প্রতিকৃতি করা যাবে না; কারণ মানুষের পক্ষে একটি কণা, একটি শস্য কিংবা একটি যবও সৃজন করা সম্ভব নয়। কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন আযাবে ঐ সকল লোক পতিত হবে যারা আল্লাহর সৃষ্টির কোন প্রতিকৃতি তৈরি করে। প্রাণীসহ প্রকৃতিজগতের সব কিছুই আল্লাহর সৃষ্টি; এই নির্দেশানুযায়ী গাছপালার ছবিও তোলা বা অঙ্কন করা যাবে না।

পৃথিবীর মুসলিম-অধ্যুষিত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুসলমান বাস করেন ইন্দোনেশিয়ায়। হিন্দুদেবতা বিষ্ণুর বাহন গরুড় ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় প্রতীক। ইন্দোনেশিয়ার এককালের প্রেসিডেন্ট মেঘবতী সুকর্ণপুত্রী একজন সাচ্চা মুসলমান। হিন্দু পুরাণের একটি চরিত্রের নাম সুকর্ণ। তাদের জাতীয় গ্রন্থ হিন্দুদের রামায়ণ। তাদের টাকা বা ব্যাংকনোটের মধ্যে হিন্দু দেবতা গণেশের মূর্তি। শুধু ইন্দোনেশিয়ায় নয়, সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান, কিরগিজস্তান, কুয়েত, কাতার, দুবাই, তুর্কমেনিস্তান প্রভৃতি দেশে অসংখ্য ভাস্কর্য ও ভাস্কর্যের মিউজিয়াম রয়েছে। আলবেরুনি, ইবনে বতুতা, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, বেনজীর ভুট্টো, কামাল আতাতুর্ক, রফিক হারিরি, খোমেনি, জিয়াউর রহমান— এমন আরও শত শত ব্যক্তির ভাস্কর্য মুসলিম দেশসমূহে রয়েছে। পারস্যের কবি শেখ সাদীর নাত ‘বালাগাল উলা বি কামালিহি, কাশাফাদ্দুজা বি জামালিহি’ ছাড়া আমাদের দেশে কোন মিলাদ হয়েছে বলে মনে হয় না, শেখ সাদীর মাজারের সামনেই তার একটি মর্মরপাথরের ভাস্কর্য রয়েছে। সুফিসাধক জালালুদ্দীন রুমির আবক্ষমূর্তি রয়েছে ইরানে। মিসরে প্রাক-ইসলাম যুগের মূর্তিপূজকদের স্ফিংস আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

আমাদের ধর্মেও এমন কিছুর উদাহরণ আছে। পরবর্তী মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে ফেরাউনের মমিকে বিনষ্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখার কথা কোরআনে উল্লেখ রয়েছে। স্ত্রী আয়েশার (রা.) ঘোড়ার পুতুলের ডানা দেখে নবী মুহাম্মদ (স.) হেসে উঠেছিলেন, প্রাণীর পুতুল নিয়ে খেলতে নিষেধ করেনি। মক্কা বিজয়ের পর নবী করিম (স.)-এর নির্দেশে কাবাঘরের ৩৬০টি মূর্তি ধ্বংস এবং অপরাপর সকল ছবি মুছে ফেলা হলেও হযরত ঈসা (আ.) ও মাতা মেরির ছবি রেখে দেওয়া হয়। আল আজহারের গ্র্যান্ড শায়েখ জাদুল হক, প্রখ্যাত আলেম মুহাম্মদ ইমারাহ, ইউরোপিয়ান ফতোয়া কাউন্সিলের শেখ ফয়সালসহ অনেক ইসলামী ব্যক্তিত্ব ভাস্কর্য ও ছবির পক্ষে ফতোয়া দিয়েছেন। এদের অভিমত হচ্ছে, ভাস্কর্য নিয়ে কেউ উপাসনা করে না, উপাসনার উদ্দেশ্যে কিছু আঁকা বা ভাস্কর্য তৈরি করা যাবে না।

আমার এই স্বল্প হায়াতেও ধর্মের ক্ষেত্রে অনেক আপস দেখেছি; টিভি দেখা যাবে না, ডাইনিং টেবিলে বসে খাওয়া যাবে না, গান শোনা যাবে না, নাচ দেখা যাবে না, নাটক-সিনেমা নিষিদ্ধ, ফুটবল খেলা নিষিদ্ধ, পুরস্কার সম্বলিত প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধ, ছবি তোলা নাজায়েজ ইত্যাদি। আফগানিস্তান ছাড়া পৃথিবীতে আর একটি দেশও নেই যেখানে নাচ, গান, নাটক, সিনেমা হয় না। সুদের সঙ্গে জড়িত নয় এমন মুসলমান পৃথিবীতে খুবই কম। ছবি না থাকলে জাতীয় পরিচয়পত্র হবে না, পাসপোর্ট হবে না। এখন পোস্টারে যত্রতত্র আলেমদের বিরাট বিরাট ছবিও দেখা যায়। ছবির অপরিহার্যতা অস্বীকার করা সম্ভব হচ্ছে না বিধায় এখন কিছু আলেম বলছেন, ক্যামেরায় ছবি তোলা জায়েজ, কিন্তু সেই ছবি হাতে অঙ্কন করা যাবে না। এই মতের সাথে অনেক আলেম একমত নন, বিশেষ করে দেওবন্দের আলেমদের মতে, পেইন্টিং ও ডিজিটাল ছবি উভয়ই হারাম; কারণ প্রাণীর ছবি হারাম হলে তা যেভাবেই তৈরি করা হোক না কেন তা হারামই। আঁকা প্রাণীর ছবি হারাম হলে প্রায় সকল মুসলিম দেশের ব্যাংকনোট ও ধাতব মুদ্রা হারাম। কারণ প্রায় প্রত্যেকটি দেশের ধাতব মুদ্রা ও কাগজের নোটে রাজা, বাদশাহ, জাতির পিতা, বিখ্যাত ব্যক্তি, গাছ, ফুল, ফলের ছবি রয়েছে— এই ছবিগুলো ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা ছবি নয়, এই ছবিগুলো ভাস্কর্যের মতো খোদাই করা। ভাস্কর্যও খোদাইবিদ্যা। ছবি সম্বলিত ডলার, পাউন্ড, সৌদি রিয়ালের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ হলে এগুলো পকেটে নিয়ে আমাদের নামাজ পড়তে হতো না।

মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধের জন্য আইনি নোটিশ না দিয়ে ধর্মের কঠোর নিরানন্দ জীবনে বাঙালিকে একটু দম ফেলার সুযোগ করে দিন। নোটিশ পাঠানো জরুরি হলে সেই নোটিশ পাঠান ধর্ষকদের বিরুদ্ধে, বলাৎকারে ওস্তাদ মাদ্রাসার কিছু শিক্ষকদের বিরুদ্ধে, অর্থপাচারকারীর বিরুদ্ধে, ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে। আইনি নোটিশ পাঠান পাকিস্তানের মরহুম প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে যিনি ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম বউয়ের অনুমতি নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করে পুরুষদের ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন করেছেন, বাবার ইন্তিকাল সত্ত্বেও দাদার সম্পত্তির উপর নাতির হক প্রতিষ্ঠা করেছেন।