৬ ফেব্রুয়ারির সাত দশমিক আট মাত্রার ভূমিকম্পের আঘাতে তুরস্ক ও সিরিয়ায় ৪৫ হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছে, এর মধ্যে তুরস্কের ৩৮ হাজার। ভূমিকম্প এক মিনিটেও কম সময় স্থায়ী ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে আরও অসংখ্যবার ঝাঁকুনি ছিল, এর মধ্যে একটি কম্পন ছিল মূল ভূমিকম্পের মতোই শক্তিশালী। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৮ কিলোমিটার গভীরে এই ভূমিকম্পের উদ্ভব। ঘুমন্ত মানুষের উপর এমন দুর্যোগ নেমে আসায় মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমান্বয় বাড়তে থাকবে। আরও বহু লোক ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। যারা চাপা পড়ে আছে তাদের আর জীবিত থাকার সম্ভাবনা না থাকলেও এই সকল ক্ষেত্রে অলৌকিক ঘটনারও নজির রয়েছে; ভয়াবহ ভূমিকম্পের ১১ দিন পরেও তুরস্কে ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও ৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তুরস্কে প্রায় ৬ হাজার ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ১০ লক্ষ লোক গৃহহারা হয়েছে। তুরস্ক সরকার প্রায় দেড় লক্ষ লোককে দুর্গত এলাকা থেকে নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নিলেও অনেক লোক দুর্গত এলাকা ছেড়ে যেতে রাজী নয়, তারা রাতদিন নিজেদের বাসস্থানের আশেপাশে ঘুরঘুর করছে, যদি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আপনজন কারো শব্দ ভেসে আসে। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়াদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসায় এখন জোর দেওয়া হচ্ছে দুর্গত এলাকার জীবিতদের বাঁচিয়ে রাখার উপর। তুরস্ক সরকারের শর্ত ছিল চাপা পড়া লোকদের উদ্ধার করার সময় কোনভাবেই ক্ষতবিক্ষত করা যাবে না; চাপা পড়া লোকদের আত্মীয়-স্বজনদের সেটাই ইচ্ছে। জীবিত ও লাশ উদ্ধারে এমন শর্ত থাকায় উদ্ধারকর্মীদের সতর্কতার সাথে কাজ করতে হয়েছে, এতে উদ্ধারকাজে কিছুটা বিলম্বিতও হয়েছে। এছাড়াও তুরস্ক ও সিরিয়ায় তীব্র শীত; কোথাও কোথাও তুষারও পড়ছে। প্রকৃতির এমন বিরূপ পরিবেশের মধ্যে শত শত মানুষকে খোলা আকাশের নিচে বাস করতে হচ্ছে।
বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশ তুরস্ক ও সিরিয়ায় উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছে, বাংলাদেশও উদ্ধারকর্মী ও ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত তুরস্ক ও সিরিয়ার নাগরিকদের সাময়িক ভিসা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জার্মানি; ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে জার্মানি খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নেবে। উদ্ধারকাজে সহায়ক আট হাজার বর্গমিটার এলাকা আলোকিত করতে সক্ষম এমন ড্রোন চীন তুরস্ককে দিয়েছে। সময় যত যাচ্ছে ত্রাণ ও সাহায্য সরঞ্জামের চাহিদা তত বাড়ছে। সিরিয়ায় ত্রাণসামগ্রী নিয়ে খুব বেশি দেশ সাড়া দেয়নি, কারণ সিরিয়ার যে অঞ্চলে ভূমিকম্প হয়েছে সেই অঞ্চলটি বিদ্রোহী গ্রুপের দখলে। সরকারের সাথে বিদ্রোহী গ্রুপের সংঘাত চলা অবস্থায় ত্রাণসামগ্রী নিয়ে সিরিয়ান সরকার বা বিদেশিদের পক্ষে কাজ করা সহজ ছিল না। হোয়াইট হেলমেটস নামের একটি সংগঠন এবং রাশিয়ার উদ্ধারকারী দল সিরিয়া এবং তুরস্ক উভয় দেশে উদ্ধারকাজ শেষ করে এখন কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। সিরিয়ার সরকারও তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত এলাকায় মানবিক সহায়তা বিতরণের অনুমোদন দিয়েছে। এখন ত্রাণসামগ্রী তুরস্কের সীমান্ত দিয়ে সিরিয়ার দুর্গত এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে সিরিয়া ও তুরস্কের দুর্গত অঞ্চলে তত নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে। স্যানিটেশন রাতারাতি গড়ে তোলা সম্ভব না হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া লাশ থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে এবং বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করেছে।
পৃথিবীর অবস্থান ১৫টি বড় টেকটনিক পাতের উপর; এই পাতগুলি একে অপরকে ধাক্কা দিলে বা সংঘর্ষ বাঁধালে ঘটে ভূমিকম্প। এই পাতগুলো স্থির থাকে না, ওগুলো চলনশীল, চলনশীল বলে ধাক্কা লাগে, সংঘর্ষ হয়। চারটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে তুরস্কের অবস্থান। সংযোগস্থল হওয়ায় দুইটি টেকটনিকের মাঝখানে চ্যুতি বা ফাটল থাকে, ফাটল থাকায় পাতগুলো অনবরত সরতে চেষ্টা করে, কিন্তু পার্শ্ববর্তী পাতের সাথে বাধা পায়। তুরস্কের ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে আরবীয় প্লেট বা পাত উত্তর দিকে ক্রমাগত সরার সময় আনাতোলিয়ান প্লেটের সঙ্গে ঘর্ষণ হচ্ছিল। দুটি পাত বা খণ্ডের মাঝখানে দূরত্ব তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই ধাক্কাধাক্কি চলতেই থাকে। কিন্তু আরবীয় পাতের চাপ এত তীব্র ছিল যে আনাতোলিয়ান প্লেটে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি তৈরি হয়েছিল। বিশ্বের যেসব এলাকা ভূমিকম্পপ্রবণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, তুরস্কের এই এলাকাটি তার অন্যতম।
১৯৩৯ সনের আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে তুরস্কে মারা যায় ৩৩ হাজার মানুষ। ১৯৯৯ সনে দুইটি প্রবল ভূমিকম্প হয়েছিল তুরস্কে, রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৭.৪ এবং ৭.০। ওই দুই ভূমিকম্পে মারা গিয়েছিল ১৮ হাজার মানুষ, জখম হয়েছিল ৪৫ হাজার লোক। ২০১১ সনে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্পে তুরস্কে মারা গিয়েছিল ৫০০ জন। তুরস্কে ৩৩ হাজার বার ভূমিকম্প হয়েছিল ২০২০ সনে; রিখটার স্কেলে মাত্রা সর্বোচ্চ চারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে পৃথিবীর যে কোনো দেশের চেয়ে বেশি ভূমিকম্প অনুভূত হয় জাপানে; দেশটিতে প্রতি বছর গড়ে দুই হাজারের মতো ভূমিকম্প সংঘটিত হয়ে থাকে। ২০১১ সনে ৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল জাপানে। ১৯৬০ সনে ৯.৫ মাত্রার সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পটি রেকর্ড করা হয়েছে চিলিতে। কয়েকদিন পূর্বে ৬.১ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠছে নিউজিল্যাণ্ড ও ফিলিপিন্স। ২০১৫ সনে ইন্ডিয়ান প্লেট ও তিব্বত প্লেটের সংঘর্ষে নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। ২০০৩ সনে ইরানের বাম শহরের কাছাকাছি ৬.৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে ২৬ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে চীন, ইন্দোনেশিয়া। ২০০৮ সনে চীনের ওয়েনচুয়ান ভূমিকম্পে ৯০ হাজার মানুষ হতাহত হয়েছিল এবং ২০১৪ সনে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রার পশ্চিম উপকূলে ৯.১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
মাটির অনেক নিচে ভূকম্পনের সৃষ্টি হয় বিধায় তা দৃষ্টিগোচর হয় না, আমরা দেখি ভূপৃষ্ঠের ধ্বংসলীলা। ভূকম্পন প্রতিনিয়তই হচ্ছে, কিন্তু ২.৫ বা তার কম মাত্রার কম্পন সাধারণত অনুভূত হয় না। ভূমিকম্পের কারণে ভূপৃষ্ঠের বিদ্যমান রূপের পরিবর্তন ঘটতে পারে। ভূমিকম্পের ফলে নদীর সৃষ্টি হতে পারে, নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে, নতুন পর্বত সৃষ্টি হতে পারে, পুরাতন দ্বীপ বিলীন হয়ে যেতে পারে বা নতুন দ্বীপের সৃষ্টি হতে পারে। সমুদ্রতলদেশে সৃষ্ট ভূমিকম্পকে সুনামি বলে। প্রবল সুনামিতে সমুদ্রের পানি বিধ্বংসী তরঙ্গের আকারে উপকূলে আঘাত হানে। ২০০৪ সনে ভারত মহাসাগরে এইরূপ একটি বিধ্বংসী সুনামি সংঘটিত হয়েছিল। ২০১১ সনের এক ভূমিকম্পে জাপান প্রায় আট ফুট সরে গেছে।
বাংলাদেশে নাকি ৮টি ভূতাত্ত্বিক চ্যুতি এলাকা সচল অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশের অবস্থান ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং মায়ানমারের টেকটনিক প্লেটের মধ্যে। বাংলাদেশে ১৮২২ ও ১৯১৮ সনে মধুপুর ফল্টে বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৮৮৫ সনে ঢাকার কাছে মানিকগঞ্জে ৭.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে। ১৯১৮ সনে বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয় এবং ২০০৭ সনে হয় ৬.০ মাত্রার। এছাড়াও ২০০৭ সন থেকে ২০০৮ সন পর্যন্ত ৯০টি ভূকম্পন নথিভুক্ত করা হয়েছে যার মধ্যে ৯টি ভূমিকম্পের মাত্রা ছিলো ৫-এর উপরে। মতানৈক্য থাকলেও অনেক ভূতাত্ত্বিক ছোট ছোট ভূমিকম্প সংঘটন বড় ধরনের ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বলে উল্লেখ করেন। অতীতের এসব রেকর্ডকে প্রাধান্য দিয়ে গবেষকরা বলছেন, যে কোনও সময় বাংলাদেশে রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে এবং এজন্য এখন থেকেই আমাদের পূর্বপ্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। ঠিক কোথায় ও কখন ভূমিকম্প হবে তার আগাম খবর দেওয়া অসম্ভব।
ভূমিকম্প মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। ২০১৩ সনে সাভারের শুধু একটি নয়তলা ভবন রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর আমাদের অসহায়ত্ব সারা বিশ্ব দেখেছে। বিল্ডিং কোড মেনে কেউ ভবন তৈরি করে না—এমন অভিযোগ অহর্নিশ শোনা যায়। কেন বিল্ডিং কোড মানা হয় না, না মানার অপরাধে কাউকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে কি না, সরকারের দপ্তরে যারা মনিটরিং-এর দায়িত্বে তাদের জবাবদিহিতা কেন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হচ্ছে না ইত্যাদির কোন উত্তর নেই। ভূমিকম্প মোকাবিলায় আমাদের যে প্রস্তুতির অভাব রয়েছে তা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে। তুরস্কের বিশাল ধ্বংসযজ্ঞের জন্য এখন ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণকাঠামোকে দায়ী করা হচ্ছে এবং কর্তৃপক্ষ ধসে পড়া ভবনের সঙ্গে জড়িত কন্ট্রাক্টরদের শনাক্ত করে বহুজনকে ইতোমধ্যে আটক করেছে। এছাড়া ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর মান নিরূপণে এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের নমুনাও সংগ্রহ করা হচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং রাজউকের কেউ জীবিত থাকলে ভূমিকম্পের পর বাড়ির জীবিত মালিকদের শাস্তি দেওয়ার জন্য খোঁজা হবে, তা সম্ভব হবে তখন, যখন পর্যাপ্ত পুলিশ ভূমিকম্পের আঘাত থেকে রক্ষা পাবে। See less