কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ছাত্রী মোসাম্মৎ ফুলপরী খাতুন সম্প্রতি তার সিনিয়র ছাত্রীদের দ্বারা র‍্যাগিংয়ের শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ছাড়াও তাকে বিবস্ত্র করে গায়ে সেফটিপিন ফোটানোর দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে রাখা হয়। এই র‍্যাগিংয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সানজিদা চৌধুরী অন্তরা। ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ছাত্রী তাবাচ্ছুম দেখা করতে সংবাদ পাঠানোর পরও ফুলপরী খাতুন দেখা না করায় তাবাচ্ছুমের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টায় তারা ৭-৮ জন মিলে ফুলপরী খাতুনকে গণকক্ষে নিয়ে চড়-থাপ্পড় মারতে থাকে, পা দিয়ে লাথি মারে, গামছা দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে ধরে রাখে এবং একটা ময়লা গ্লাস চেটে পরিষ্কার করিয়ে নেয়। তারপর রাত ৩টায় তাকে ছেড়ে দিয়ে ঘটনা প্রকাশ করতে নিষেধ করে দেয়। ঘটনা প্রকাশ করলে তাকে আরো কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে মর্মে ফুলপরীকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার উপর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ছাত্রলীগ তদন্ত করে, তদন্ত প্রতিবেদন মোতাবেক ফুলপরী খাতুনকে নির্যাতনের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের পাঁচ নেতা-কর্মীকে ছাত্রলীগ সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই পাঁচ শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করার নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালতও। এছাড়াও দায়িত্বে অবহেলার জন্য দেশরত্ন শেখ হাসিনা হলের প্রাধ্যক্ষকে অব্যাহতি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

নতুন শিক্ষার্থীদের সাথে পুরনো শিক্ষার্থীদের পরিচয় গড়ে তোলার একটি নিষ্ঠুর পদ্ধতির নাম র‍্যাগিং। র‍্যাগিং মানে বিভিন্ন ধরনের রসিকতা ও জ্বালাতন করে মজা করা। জুনিয়রদের আদব-কায়দা, নিয়মকানুন শেখানোর নামে রসিকতা করতে করতে কাউকে জ্বালাতন করাই হচ্ছে র‍্যাগিং। সিনিয়রকে দেখলেই সালাম দিতে হবে, হাতে থাকা সিগারেট লুকাতে হবে, সিনিয়রদের সম্মুখ দিয়ে যাওয়ার সময় মাথা নিচু করে হাঁটতে হবে, সিনিয়রকে দেখার সাথে সাথে দাঁড়িয়ে সমীহ করতে হবে ইত্যাদি আদব-কায়দা শিখাতে গিয়ে ব্যত্যয়ের কারণে সিনিয়র ছাত্র-ছাত্রীরা জুনিয়রদের নানা কলাকৌশলে শাস্তি দিয়ে থাকে। শাস্তির মধ্যে রয়েছে কান ধরে দাঁড়িয়ে রাখা, কান ধরে উঠবস করানো, নাকে খত দেওয়া, এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা, ম্যাচের কাঠি দিয়ে একটি রুমের ক্ষেত্রফল বের করতে বাধ্য করা, স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করানো ইত্যাদি।

আদব-কায়দা শেখাতে গিয়ে প্রভাবশালী ছাত্র-ছাত্রীরা অমানুষিক নিষ্ঠুর আচরণও করে থাকে। নিষ্ঠুর আচরণের মধ্যে রয়েছে রড দিয়ে পেটানো, শীতের দিনে বাথরুমে ঝর্ণার নিচে বসিয়ে রাখা, সিগারেটের আগুন দিয়ে স্যাঁক দেওয়া, উলঙ্গ করে গানের তালে তালে নাচতে বাধ্য করা ইত্যাদি। আদব-কায়দা শেখানোর এমন অদ্ভুত ও ভয়ঙ্কর রীতি নতুন ও নিরীহ ছাত্র-ছাত্রীর জন্য আতঙ্কের ও ভীতিজনক। র‍্যাগাররা ভর্তি হওয়া নতুন শিক্ষার্থীদের ভীতির এই সুযোগ নিয়ে নিজেদের বিকৃত মানসিক চাহিদা পূরণ করে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীনদের র‍্যাগিং বা নাজেহাল করার ঘটনা নতুন কিছু নয়। শুধু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন র‍্যাগিং হয়। যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের ছাত্রসংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজত্ব কায়েম করে। হলে থাকতে হলে নতুনদের মিছিলে যোগ দিয়ে স্লোগান দেওয়ার শর্ত পূরণ করতে হয়। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন ও হতাশ করে।

দেশে এত উন্নয়ন হচ্ছে, অথচ দেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্র-ছাত্রীর জন্য প্রয়োজনীয় আবাসিক হল নেই, বিষয়টি দেশের জন্য, জাতির জন্য লজ্জার। আমরা সাবমেরিন কিনেছি, আমরা মহাশূন্যে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছি, আমরা খরস্রোতা নদী পদ্মার উপর দোতলা সেতু বানিয়েছি, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শীঘ্র উদ্বোধন করতে যাচ্ছি, মেট্রোরেল উদ্বোধন হয়েছে, কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে যোগাযোগের টানেল নির্মাণ করেছি, গাজীপুর থেকে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত এক্সপ্রেস ওয়ে হচ্ছে, আমরা গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করছি, কোটি কোটি টাকা খরচ করে দুইটি করে সুইমিংপুল সম্বলিত দুটি বাড়ি দুইজন সচিবের জন্য নির্মাণ করার সাহস দেখাতে পেরেছি, শুধু পারি না শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করতে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ২১ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য আসন রয়েছে।

যারা গ্রাম থেকে এসেছে, শহরে থাকার কোন ব্যবস্থা নেই, তারা থাকে গণরুমে। গণরুম হলো বিশাল হলঘরের মত একটা রুম, যেখানের নোংরা পরিবেশে ফ্লোরিং করে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীকে থাকতে হয়। গণরুমে শিক্ষার্থীদের অবস্থা হচ্ছে রেলস্টেশন বা স্টিমারঘাটে শুয়ে রাত কাটানো ছিন্নমূল মানুষের মতো। ২০০৯ সনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকগুলো আবাসিক হল নির্মাণ করা হয়েছে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ৪টি হল নির্মাণাধীন রয়েছে, যে হলে ফুলপরীকে র‍্যাগিং করা হয়েছে সেই হলটিও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মাণ করা। কিন্তু এতেও আবাসিক সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, আরও আবাসিক হলের নির্মাণ জরুরি।

পৃথিবীর অন্য কোন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গিনায় এত পুলিশের অবস্থান আছে কি না সন্দেহ। পুলিশের অবস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অপমানজনক। পুলিশ থাকে চোর-ডাকাত-বাটপারের জন্য, বিশ্বকে নিয়ে যারা পড়াশুনা করে তাদের জন্য পুলিশের পাহারার প্রয়োজন জরুরি হওয়ার কথা নয়। শুধু পাকিস্তান আমলে নয়, দেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরেও সমাজে ছাত্র-ছাত্রীদের মান-ইজ্জত ছিল, বাসে-ট্রেনে-স্টিমারে সবাই ছাত্র-ছাত্রীদের সম্মান করত। এখন দুর্বিষহ অবস্থা, কোথাও তাদের আগের সেই ইমেজ নেই।

র‍্যাগিং করে মজা বা রসিকতা করা ফৌজদারি অপরাধ। কাউকে কষ্ট দিয়ে, ছোট করে বা ভয় দেখিয়ে আনন্দ খোঁজা বিকৃত মানসিকতার পরিচায়ক। র‍্যাগিং-এর কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী আত্মহত্যা করে বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেয়। কেন্দ্রের ছাত্রনেতারা র‍্যাগিং নির্মূলে তৎপর না হলে আজ্ঞাবহ হল প্রশাসনের পক্ষে তা করা সম্ভব হবে না। ছাত্রলীগ ক্ষমতা হারালে বিএনপি'র ছাত্রদল ক্ষমতায় আসবে এবং একইভাবে র‍্যাগিং করবে। ছাত্রলীগের নতুন কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ফুলপরীকে ফোন করে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি র‍্যাগিংয়ের জন্য শুধু ছাত্রসমাজকে নয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসনকেও দায়ী করেছেন। দলীয় রাজনীতি আর তোষামোদী আচরণে অভ্যস্ত প্রশাসন নৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে।

দেশের ছাত্রসমাজকে ভদ্রতা শেখানোর নামে হেনস্তা করার বাহাদুরি থেকে সরিয়ে আনতে হলে প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণে সক্রিয় হতে হবে, দোষীকে শাস্তি দেওয়ার সাহস দেখাতে হবে। ছাত্রলীগের পেশীশক্তি দেখে আওয়ামী লীগের তুষ্ট হওয়ার কিছু নেই; কারণ খালেদা জিয়াও বিএনপি’র ছাত্রদলের পেশীশক্তি নিয়ে এক সময় অহংকার করতেন, তিনি বলতেন, আওয়ামী লীগকে দমানোর জন্য তার ছাত্রদলই যথেষ্ট। সেই ছাত্রদল এখন কই? এখন বিএনপি’র ছাত্রদল নীরব-নিস্তব্ধ, বিএনপি ক্ষমতায় এলে ছাত্রলীগও এমন নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে যাবে, অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রকৃতপক্ষে ছাত্রদের নিজস্ব কোন শক্তি নেই, এরা সরকারের ক্ষমতায় বলীয়ান, সরকারের পতন হলে এদেরও পতন হয়। তাই দলীয় সরকারকেও ছাত্রসমাজের অপকর্মের দায় নিতে হবে।