দেশের পাঠ্যপুস্তক নিয়ে যেভাবে গুজব ছড়ানো হয়েছে তা রোধ করতে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ। ওয়াজ মাহফিল, ফেইসবুক আর ইউটিউবে পাঠ্যপুস্তক নিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন গুজব ছড়ানো হচ্ছে; গুজবে বলা হচ্ছে, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ইসলাম ধর্মকে বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের নাস্তিক বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এই সকল গুজবে বলা হচ্ছে—সরকার পরিকল্পনা করে দেশকে মুসলিমবিরোধী রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা করছে। পাঠ্যপুস্তকে বিধৃত ডারউইনের তত্ত্বে নাকি মানুষের উৎপত্তি বানর থেকে হয়েছে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি ডাহা মিথ্যা কথা; বানর থেকে মানুষের উৎপত্তির কথা ডারউইনের তত্ত্ব বা পাঠ্যবইয়ের কোথাও উল্লেখ নেই। বেগম রোকেয়ার লেখা ‘অবরোধবাসিনী’ পাঠ্যবইতে অন্তর্ভুক্ত করায় কিছু লোক ক্ষেপে উঠেছেন। মনে হচ্ছে বেগম রোকেয়ার আমলের চেয়েও বর্তমান আমল অনেক বেশি কঠোর। বেগম রোকেয়ার লেখা ‘অবরোধবাসিনী’ ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানো যাবে না; কারণ এই বইতে তিনি মেয়েদের অবরোধ প্রথার বিরুদ্ধে বলেছেন। তখনকার মুসলিম সমাজ আজকের মতো এত কঠোর হলে ১৯৩১ সনে এই বইটির প্রকাশ করা সম্ভব হতো না। বিএনপি-জামায়াত, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি—সব সরকারের আমলেই বেগম রোকেয়ার বন্দনা করা হয়েছে; বেগম রোকেয়ার বন্দনা তো তার লেখার কারণে। তাহলে হঠাৎ বেগম রোকেয়ার লেখা অপাঙ্তেয় হয়ে গেল কেন? তার এই বই নিষিদ্ধ করার জন্য আজ পর্যন্ত কেউ দাবিও করেনি।

প্রচারিত গুজবে বলা হচ্ছে, দ্বিতীয় শ্রেণির বই থেকে আমাদের নবীজীর জীবনী, তৃতীয় শ্রেণির বই থেকে খলিফা আবু বকর (রা.)-এর জীবনী, চতুর্থ শ্রেণির বই থেকে খলিফা ওমর (রা.)-এর জীবনী এবং পঞ্চম শ্রেণির বই থেকে নবীজির বিদায় হজের বাণী বাদ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু বাদ দেওয়ার এই সকল তথ্য সত্য নয়, নবীজীসহ উল্লেখিত খলিফাদের জীবনী এবং বিদায় হজের বাণী বহাল তবিয়তে পাঠ্যবইতে রয়েছে। ধর্মান্ধ ও গুজব রটনাকারীদের আরও অভিযোগ হচ্ছে,

‘বই’ নামের একটি কবিতা পঞ্চম শ্রেণির বইতে সংযোজন করা হয়েছে যা কোরআনবিরোধী; ষষ্ঠ শ্রেণির বইতে সংযুক্ত করেছে ‘লাল গরু’ নামের একটি গল্প যার মাধ্যমে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের গরুকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করতে বাধ্য করা হয়েছে; সপ্তম শ্রেণির বইতে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘লালো’ নামের একটি গল্প আনা হয়েছে, যেখানে কালীপূজা এবং পাঁঠা বলির গল্প রয়েছে; অষ্টম শ্রেণির বইতে সংযুক্ত করা হয়েছে হিন্দুদের রামায়ণের কাহিনী যা মুসলিমদের হিন্দু ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে ফেলবে। কিন্তু হিন্দুধর্ম সম্পর্কিত গল্প-প্রবন্ধ-কবিতা যোগ করার দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা, উল্লেখিত কোন গল্প-প্রবন্ধ-কবিতা বর্তমান পাঠ্যবইতে নেই।

ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, সরকার সম্পর্কে মুখরোচক গল্প, খবর ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অহর্নিশ প্রচার করা হচ্ছে, ফটোশপে বিভিন্ন ছবি, ভিডিও তৈরি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এই কাজগুলো এত সুনিপুণ হাতে সম্পাদিত যে, জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ লোকেরাও তা দেখে-শুনে-পড়ে বিভ্রান্ত হচ্ছেন। আরও কিছু লোক আছেন যারা এই জাতীয় মিথ্যা খবর আর ভিডিও’র জন্য মুখিয়ে থাকেন, পাওয়া মাত্রই তা প্রচার করেন। আরও কিছু লোক আছেন যাদের বাছবিচারের ক্ষমতা নেই, গ্রহণ-বর্জনের সামর্থ্য নেই—এরা যা কিছু শুনেন তাই হুবহু বিশ্বাস করেন। শোনা কথার, দেখা ছবির সঠিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার গরজও তাদের নেই। মিথ্যাকে সব পাপের জননী বলা হয়, যে মিথ্যা বলতে পারে সে সব রকমের অপরাধও করতে পারে। মিথ্যাকে শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই ঘৃণা করা হয় না, মিথ্যুকও মিথ্যাকে ঘৃণা করে। মহাপাপ হওয়া সত্ত্বেও সজ্ঞানে, সযত্নে মিথ্যা বলা হচ্ছে, মিথ্যা প্রচার করা হচ্ছে, মিথ্যা বিশ্বাস করা হচ্ছে। রাজনৈতিক কারণে কিছু লোক অহরহ মিথ্যা বলে যাচ্ছে—মিথ্যা বলছে হিংসাপরায়ণ হয়ে, মিথ্যা বলছে ভুল ধারণা থেকে, বিদ্বেষী মনোভাব থেকে।

পাঠ্যপুস্তক নিয়ে যেভাবে সর্বত্র প্রচার-প্রচারণা চলছে তাতে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কিছু বইয়ের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিশুদের বর্ণমালা পরিচয়ের জন্য ইসকনের প্রকাশিত বইয়ের একটি পৃষ্ঠা হুবহু ফেসবুকে তুলে দিয়ে ভিন্ন ধর্মের প্রতি বিষোদগার করা হচ্ছে, কারণ ঐ বইয়ের স্বরবর্ণ দিয়ে দেবদেবীকে পরিচয় করে দেওয়া হয়েছে। গুজব রটনাকারীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারতের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে বের করে। পাঠ্যবই নিয়ে মিথ্যা পোস্টগুলো শেয়ার করার সময় তাদের মনে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্বের উদয় হয় না, কারণ তারা সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে হিন্দু এবং ভারতবিরোধী প্রচারে তৃপ্তি পান। তাদের রাজনীতি সম্প্রদায়কেন্দ্রিক—সবকিছুকে হিন্দু-মুসলমান বা ধর্মীয় নিক্তিতে বিচার করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সহানুভূতি আদায় করার চেষ্টা করেন। মিথ্যা ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও হারাম গোনাহগুলোর অন্যতম। মিথ্যা সর্বাবস্থায় হারাম। ঠাট্টা বা হাসানোর জন্যও মিথ্যা বলা পাপ। তাই তো আফগানিস্তানে তালেবানেরা কৌতুক অভিনেতা নজর মোহাম্মদকে নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে।

পাঠ্যপুস্তক নিয়ে যে লঙ্কাকাণ্ড ঘটানো হলো তার পেছনে কাজ করছে রাজনৈতিক বিরুদ্ধাচরণ। সরকার ও আওয়ামী লীগ বিরোধী লোকজন পাঠ্যপুস্তক নিয়ে এবার যেভাবে কোমর বেঁধে নেমেছে তা আগে কখনো দেখা যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সহজলভ্য হওয়ায় মিথ্যা এখন এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে, আস্তে আস্তে সততা ও সত্য জীবন থেকে তিরোহিত হয়ে যাচ্ছে। ধর্মমতে গুজব আর মিথ্যে বলার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সমাজে প্রচলিত প্রবাদ চিলে কান নেওয়ার মতো গুজবে বিশ্বাস স্থাপনকারীদেরও গুনাহ হবে। কানে হাত না দিয়ে চিলের পেছনে যারা ছুটেন তাদের হাদিসে মিথ্যেবাদী বলা হয়েছে; রাসুল (স.) বলেন, ‘কারো কাছে কোন কথা শোনা মাত্রই তা বলে বেড়ানো মিথ্যেবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট’ (মুসলিম ৯৯৬)। ওয়াজি হুজুর ও কিছু শিক্ষিত লোক এই হাদিস জানেন, মিথ্যা প্রচার করা যে মহাপাপ তা গুজব রটনাকারীরাও বোঝেন; কিন্তু রাজনীতি তাদের অন্ধ করে দিয়েছে, যার জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধ মার খাচ্ছে রাজনীতির অন্ধত্বের কাছে। বর্তমান সরকার এবং আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে গিয়ে ক্ষোভে-দুঃখে ধর্মের নীতি-নৈতিকতার বিসর্জন দিচ্ছে কিছু লোক।

গুজব রটনা যখন স্তিমিত হয়ে আসছিল ঠিক তখনি শিক্ষামন্ত্রীর বোধোদয় হয়েছে; দীর্ঘদিন পর তার মনে হয়েছে ধর্মান্ধ, সরকারবিরোধীরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পাঠ্যবই নিয়ে নানা অপবাদ ছড়াচ্ছে। এতদিনে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে, এখন জনে জনে বললেও বিভ্রান্তি দূর হবে না। দুইজন সাংসদও পাঠ্যবই নিয়ে সংসদে গুজব পাঠ করেছেন। ইতোমধ্যে একজন সাংসদ স্পিকারের কাছে আবেদন করে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। না পড়ে, না জেনে কোন সাংসদে এভাবে অসত্য তথ্য সংসদে দেওয়া ঠিক হয়নি। যাদের সত্যতা যাচাইয়ের সময় থাকে না, চর্বিতচর্বণ করেন তাদের গণতান্ত্রিক ভোটের প্রয়োজন নেই, এমন প্রতিনিধির জন্য দিনের ভোট রাতে হওয়াই ভালো।

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও এই সকল অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার হয়নি; হবে কী করে, কারণ তাদের লেখাপড়া করার অভ্যেস নেই। ধর্মের অপপ্রচারে আওয়ামী লীগের কিছু লোক অন্য যে কোন দলের লোকের চেয়ে বেশি জেহাদি হয়ে উঠে।

বাংলাদেশে গুজব বাড়ছে, গুজব রটনাকারী বাড়ছে; এই গুজবের জন্য অনেক নিরপরাধ লোককে উন্মত্ত জনতার রোষানলে জীবনও দিতে হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকের ইস্যু তৈরি করে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানো হচ্ছে। অপপ্রচারে নটরডেম কলেজের ছাত্ররাও বিভ্রান্ত হয়েছে। ধর্মশিক্ষাবহির্ভূত বইগুলোতেও ইসলাম ধর্মশিক্ষার দাবি করা হচ্ছে। তাহলে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থাকার দরকার কী, সব মাদ্রাসা করে দিলেই হয়। বাইরের দেশের বিজাতীয় তুর্কি, আফগান, মোগল শাসনকে গৌরবান্বিত কেন করা হয়নি সেজন্য বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। ইংরেজদের মতো এরাও কিন্তু ভিন্ন দেশ থেকে এসে আমাদের ভারতবর্ষ শাসন করেছে, কোন কোন মুসলমান শাসক ইংরেজদের মতো লুটও করেছে। ইংরেজ ভালো, না ভিন দেশের মুসলমান শাসক ভালো তা ভিন্ন বিষয়।

বাক্‌স্বাধীনতা মানে মিথ্যা বলা নয়, এমন বাক্‌স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই। ইচ্ছে করে মিথ্যা বলার বাক্‌স্বাধীনতা কণ্ঠ টিপে রোধ করা দরকার। ডিজিটাল আইনের অপপ্রয়োগ হয়, কিন্তু মিথ্যা ও গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হয় না। তাহলে এই আইন রেখে লাভটা কী? ডিজিটাল আইন বাতিল করা হোক, মিথ্যা ও গুজব রটনাকারীদের জন্য সর্বোত্তম আইন হচ্ছে শরিয়া আইন, শরিয়া আইনের প্রয়োগ থাকলে অনেক ইমাম, আলেম ও ইউটিউবারের কর্মকাণ্ড আপনা-আপনি সীমিত ও সংযত হয়ে যাবে।