রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। তিনি ভোট পেয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৮ ভোট। তিনি সরকারদলীয় প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়ার চেয়ে বেশি পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৫৯ ভোট। অ্যাডভোকেট ডালিয়া ২২ হাজার ৩০৯ ভোট পেয়ে হয়েছেন চতুর্থ। মোস্তাফিজার রহমানের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আমিরুজ্জামান পিয়াল, তিনি পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৮৯২ ভোট। ৩৩ হাজার ৮৮৩ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী লতিফুর রহমান হয়েছেন তৃতীয়। রংপুর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মোট ভোটার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৪৭০ জন। ভোট কাস্টিং হয়েছে ৬৫.৮৮ শতাংশ।

ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোট দিতে গিয়ে ভোটারদের কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে এই নির্বাচনেও। উদ্ভূত বিভিন্ন সমস্যার কারণে রাত আটটা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ করতে হয়েছে। ইভিএম মেশিনে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ভোটগ্রহণ বিলম্বিত হয়েছে। তবে কয়েকটি কেন্দ্রে ইভিএম মেশিনে ত্রুটি দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে তা সারিয়ে তোলা হয়। আরেকটি কমন সমস্যা হচ্ছে আঙুলের ছাপ না মেলা। আঙুল পরিষ্কার না থাকলে, আঙুলের রেখা অস্পষ্ট হলে, শীতে আঙুল সংকুচিত হয়ে গেলে সমস্যা হয়, ইভিএম একই ভোটারের আগে গৃহীত আঙুলের রেখার সাথে সঙ্গতি খুঁজে পায় না। বিদেশভ্রমণের সময়ও অনেক সময় যাত্রীদের এমন বিভ্রাটের সম্মুখীন হতে হয়। এই বিভ্রাট থেকে মুক্তি পেতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে আঙুল পরিষ্কার করার পেট্রোলিয়াম জেলি, লেবু, সাবান ও টিস্যু রাখা ছিল। আরেকটি কমন সমস্যা হচ্ছে ভোট প্রদানের মেশিনে বাটনে চাপ দিতে না পারার অজ্ঞতা। মেয়রের সাথে আরও ৩ জন কাউন্সিলর প্রার্থীকে বাটন চেপে ভোটারদের ভোট দিতে হয়েছে বিধায় এই সমস্যা অনেকের কাছে জটিল আকার ধারণ করে। তবে এই সমস্যা এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ নির্মূল সম্ভব নয়, ব্যাপক প্রচার এবং ভোট দিতে দিতে ভোটারদের শিখতে হবে। শুধু ইভিএম-এর জটিলতার দোষ দিয়ে লাভ নেই, অনেকে ব্যালট পেপারেও ঠিকমতো ভোট দিতে পারে না, শত শত ভোট বাতিল হয়। ভোটের ধীরগতির প্রধান কারণ হচ্ছে ইভিএম-এ ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া-পদ্ধতি সম্পর্কে অধিকাংশ ভোটারকে প্রায় প্রতিটি বুথে বুঝিয়ে দিতে হয়েছে। অবশ্য ইভিএম এখন আর আন্দোলনের কোন ইস্যু নয়, কারণ ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণে আপত্তি নেই মর্মে আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে।

রংপুর সিটি করপোরেশন গঠনের পর ২০১২ সনে প্রথম মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু ১ লাখের বেশি ভোট পেয়ে প্রায় ২৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঝন্টু এক সময় জাতীয় পার্টি করতেন, আর মোস্তাফিজার এরশাদ সাহেবের নির্দেশ না মেনে ঝন্টুর সঙ্গে ভোটযুদ্ধে নেমেছিলেন। ২০১৭ সনে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে দ্বিতীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান আওয়ামী লীগের ঝন্টুকে ৯৮ হাজার ভোটে হারিয়ে মেয়র হন। প্রথমবারের মেয়র শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু পরের বার পেয়েছিলেন মাত্র ৬৪ হাজার ভোট। মোস্তাফিজারের আমলে রংপুর এখনো ময়লা-আবর্জনায় ভর্তি একটি অপরিচ্ছন্ন শহর। ফেসবুকে অনেকে রাজশাহী শহরের সাথে তুলনা করে রংপুরের মেয়র-কাউন্সিলরদের রাজশাহী শহর ঘুরে আসার পরামর্শ দিয়েছে। রংপুরকে পরিচ্ছন্ন করার কোন উদ্যোগ না নেওয়া সত্ত্বেও বিপুল ভোটের ব্যবধানে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ, রংপুর হচ্ছে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের এলাকা।

রংপুরে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জনপ্রিয়তা নিয়ে একটি সত্য ঘটনা নির্বাচন প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার। ১৯৯২ সনে রংপুর বাস স্ট্যাণ্ড থেকে রিক্সা যোগে রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যাওয়ার পথে রিক্সাচালক আমাকে শুনে এরশাদ সাহেবের প্রশংসা করছিলেন; ‘এরশাদ সাহেবের বাসায় মদের বোতল পাওয়া গেছে’—আমার মুখ থেকে কথাটি বের হওয়ার সাথে সাথে রিক্সাওয়ালা আমাকে পথিমধ্যে তার রিক্সা থেকে নামিয়ে দেয়। এই আবেগ এখনো আছে এবং আছে বলেই ভোটের ব্যবধান এত বেশি। ১৯৯০ সনে গণবিক্ষোভের চাপে এরশাদ সাহেবের পতনে রংপুরবাসীর মনে সৃষ্ট আবেগ এত প্রবল ছিল যে, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারাগার থেকে অংশগ্রহণ করে তিনি পরপর দুইবার রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। তখন শুধু এরশাদ সাহেব জিতেননি, তার দলের প্রায় সকল প্রার্থীই রংপুর বিভাগ থেকে জয়লাভ করেছিল। ১৯৯১ সনে বিএনপি সরকার গঠন করলেও রংপুর বিভাগে ৩৩টি আসনের মধ্যে তারা কেবল পঞ্চগড়ের ১টি আসন থেকে জয়লাভ করেছিল। অপরদিকে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১০টি। ১৯৯৬ সনে বিএনপি পায় ৩টি আসন এবং ২০০১ সনে জামায়াত ও বিএনপি জোট গঠন করলে বিএনপি পায় ৯টি আসন। ২০০৮ সনের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি মহাজোটে অংশ নিলে রংপুর বিভাগে ভোটের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়—আওয়ামী লীগ পায় ২১টি আসন এবং জাতীয় পার্টি পায় ১২টি আসন; বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০৮ সনের নির্বাচনে রংপুর বিভাগে একটি আসনও পায়নি।

এবারের মেয়র নির্বাচনে দলের ভেতর স্থানীয় রাজনীতির অন্তর্কোন্দল ও নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার কারণে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জামানত হারিয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। দলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে যিনি প্রার্থী হয়েছিলেন তিনিও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগের দুইজন প্রার্থীর ভোট যোগ করলেও বিজয়ী প্রার্থীর অর্ধেক ভোট হয় না। অন্যদিকে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের দ্বন্দ্বের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে এই নির্বাচনে। উপরন্তু মেয়র পদে স্থানীয় আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন ছয়জন। মনোনয়নবঞ্চিত নেতারা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ডালিয়াকে একেবারেই সহযোগিতা করেননি। ডালিয়াও বিভক্ত নেতাকর্মীদের একতাবদ্ধ করার চেষ্টা করেননি, দলের নেতাকর্মীদের ন্যূনতম ব্যয়নির্বাহের ব্যবস্থাও নেননি। নিজ দলের নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা না থাকায় ২২৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ১৫০টিতে ডালিয়ার কোন পোলিং এজেন্ট ছিল না এবং যে সকল কেন্দ্রে এজেন্ট ছিল তাদের অনেকে ভোট চলাকালীন ভোটকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে গেছেন। প্রকৃতপক্ষে ডালিয়া নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না; প্রস্তুত থাকলে নির্বাচনের আগেই তিনি গণসংযোগ শুরু করতেন। সম্ভবত তিনি মনোনয়ন পাবেন এমন প্রত্যাশাও করেননি। ডালিয়ার জনসম্পৃক্ততা যে ছিল না তা বিজয়ী প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমানও উল্লেখ করেছেন।

যোগ্যতা বিচারে হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া দুর্বল প্রার্থী নন। তিনি ২০১৪ সনে সংরক্ষিত মহিলা আসনের একজন সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি পেশায় একজন আইনজীবী, একজন সুবক্তা ও সংগঠক। তিনি রংপুর নাট্যচক্রের সভাপতি ছিলেন এবং রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। তিনি বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। তবে তিনি মহিলা বলেই সম্ভবত অনুপযুক্ত বিবেচিত হয়েছেন। রাজনীতির অঙ্গনে শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, মতিয়া চৌধুরী, সাজেদা চৌধুরীর ব্যতিক্রমী ইমেজ রয়েছে; কিন্তু অন্য কোন নারীর পক্ষে পুরুষদের সঙ্গে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করা আমাদের সমাজে কঠিন। আমাদের ইসলাম ধর্মে নারী নেতৃত্ব স্বীকার্য নয় বলে অনেক কট্টর মুসলমান কোন নারীকে ভোট দেয় না। ১৯৯১ সনে ৫টি আসনে বিজয়ী খালেদা জিয়াকে শুধু নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কারণে তখনকার সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য দায়ী করে বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ায় অনেক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। আকাশে মেঘ দেখলে তখন বলা হতো ‘খালেদা জিয়া’ আসছে। তাই সম্ভবত প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ পদ নারী দ্বারা পূরণের যে সময়সীমা নির্বাচন কমিশন বেঁধে দিয়েছিল তা পরবর্তীকালে আর রাখা হয়নি; কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল এই শর্ত পূরণ করা আমাদের এই সমাজব্যবস্থায় কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষে সম্ভব নয়।

প্রার্থী যতই দুর্বল হোক না কেন বা প্রার্থীর জনসম্পৃক্ততা না থাকলেও উন্নয়নের প্রতীক ‘নৌকা’ জামানত হারাবে কেন? অতীতে অনেক অপরিচিত প্রার্থী ‘নৌকা’ এবং ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের কল্যাণে বিজয়ী হয়েছেন। তাই এই ক্ষেত্রে মনে হয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল। অবশ্য এই দুর্বলতা দেশের সর্বত্র। ক্ষমতায় থাকার কারণে তা ধরা এখন পড়ছে না। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে ছোট-বড় সব নেতা-কর্মীকে ক্ষমতার মোহ গ্রাস করেছে। বিভিন্ন কমিটিতে প্রায় প্রকাশ্যে পদ বিক্রির খবর চাউর হচ্ছে। নবাগতদের ‘কাউয়্যা’, ‘হাইব্রিড’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইত্যাদি অমার্জিত, অশোভনীয় কথা বলে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধী দলে সত্য-মিথ্যা প্রচারের ব্যাপকতা জনমনে প্রভাব ফেলেছে। অপরদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধী দলের ব্যাপক অপপ্রচারের বিপক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে স্তুতি আর তোষামোদের প্রতিযোগিতা করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে। আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাদের ভাষণ জনমনে কোন আকর্ষণ তৈরি করতে পারে না; কারণ বিরোধী দলকে ব্যঙ্গ করে, খোঁচা দিয়ে তাদের কথা বলা জনগণের কাছে সমাদৃত নয়। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি মনে করে আওয়ামী লীগ তাদের অবহেলা করছে। কর্মীরা সব পর্যবেক্ষণ করে থাকে।

নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশনকে বিরোধী দলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার অভিপ্রায়ে আওয়ামী লীগ দুর্বল প্রার্থীর মনোনয়ন দিয়েছে বলে অনেকে মনে করে। তবে তা যুক্তিগ্রাহ্য নয়, কারণ জামানত বাজেয়াপ্তের এই পরাজয়ে সারাদেশে আওয়ামী লীগের ইমেজ নষ্ট হয়েছে। বিএনপি মেয়র পদের এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি, অংশগ্রহণ করলে বিএনপি’র অবস্থা হয়ত আওয়ামী লীগের চেয়েও বেশি শোচনীয় হতো। দেশের যে এলাকায় জাতীয় পার্টি সবল সেখানে বিএনপি দুর্বল। এই মেয়র নির্বাচনে ভোটার ভোট দিতে পেরেছে, ভোট প্রদানের এই পরিবেশ অবচ্ছিন্ন থাকুক—এই প্রত্যাশা জনগণের। খুশীর আরেকটি খবর হচ্ছে, এই নির্বাচনে একমাত্র ট্রান্সজেন্ডার ভোটার ৩০ বছর বয়সী আনোয়ারা ইসলাম রানীও ভোট দিয়েছে।