আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়েছে গত ৪ জানুয়ারি, ২০১৩ তারিখে। তিনি সৎ ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে সবার নিকট পরিচিত। ২০১৪ সনে গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যে বক্তব্য রাখেন তার ভিডিও পাঠিয়েছেন শেরে বাংলা ফজলুল হকের নাতি এ কে ফাইয়াজুল হক রাজু। তার সাথে আমার দীর্ঘদিনের পরিচয়। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কথা ছিল, জাতীয় পার্টির সাথে আসন ভাগাভাগিতে সম্ভবত তিনি মনোনয়ন পাননি। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সচরাচর কম কথা বলতেন, তিনি ঐ দিনও কথা বলতে চাননি, কিন্তু শেখ হাসিনা তাকে ঐ দিন কথা বলতে বাধ্য করেন। ২০১৪ সনে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তার ভাষণে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য সরব থাকতে অনুরোধ করেন, নতুবা তার বক্তব্য অনুযায়ী এই মাধ্যমটি ধর্মব্যবসায়ী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের দখলে চলে যাবে। আওয়ামী লীগ তার পরামর্শ শোনেনি, অবশ্য শোনার মতো জ্ঞান-বুদ্ধি এবং সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নেই। আওয়ামী লীগের কিছু কর্মীর কাজ হচ্ছে বড় বড় নেতাদের সাথে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে নিজের ক্ষমতা জাহির করা, এরা দলের আদর্শ-উদ্দেশ্য, কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুটি লাইন লেখে না, বিপক্ষ মতের জবাবও দেয় না। অবশ্য বিরোধী দলের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সামর্থ্য আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী বা সমর্থকদের আছে বলে মনে হয় না।

জনমত গঠন ও সচেতনতা সৃষ্টিতে ফেসবুকের প্রভাব অনস্বীকার্য। গ্রামে চায়ের আড্ডার মানুষগুলোও এখন তথ্যের জন্য আর রেডিও, টিভি’র উপর নির্ভর করে না বা পত্রিকার পাতা ঘাঁটাঘাঁটি করে না। দেশে-বিদেশে যে সকল ঘটনা ঘটে তা তৎক্ষণাৎ চলে আসে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, গুগলসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সারা বিশ্বে ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংযুক্ত রয়েছে। অবশ্য তরুণদের মধ্যে এই হার আরও বেশি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী যেকোনো ব্যক্তি তার পছন্দ অনুযায়ী তথ্য আপলোড করতে পারছে; মতামত, ছবি, ভিডিও ইত্যাদির আদান-প্রদান করতে পারছে। যারা পড়তে পারে না, লিখতে জানে না তারাও অতি সহজে ইউটিউবের মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি করতে পারছে। কিন্তু এমন সহজ যোগাযোগব্যবস্থায় ভুল বার্তা পরিবেশনে সহজ-সরল মানুষগুলো প্রতারিতও হচ্ছে, মানুষ অসত্য তথ্যে বিভ্রান্ত হচ্ছে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পলিটিক্যাল একটিভিস্টদের অপপ্রচারের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

প্রমাণের বিশ্বাস আর অন্ধ বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। শুধু হাজার হাজার লাইক, শেয়ার বা মন্তব্যের কারণে ফেইসবুক বা অনলাইন পোর্টালে বর্ণিত কোনো ঘটনা যুক্তিবাদী ব্যক্তির কাছে কখনো সংবাদ হয়ে উঠে না। কিন্তু কিছু মানুষ সবকিছু যুক্তির নিরিখে বিচার করে না। ধর্মের ফেইথ বা বিশ্বাস এখন রাজনৈতিক অঙ্গনেও ঢুকে পড়েছে। মুক্তচিন্তায় জারিত যুক্তি দ্বারা কোনো তথ্যই এখন আর যাচাই করার গরজ কারো নেই। সত্যতা যাচাইয়ের গরজ না থাকায় গুজব এবং অসত্য ঘটনা পাঠক ও দর্শকের কাছে হয়ে উঠছে গ্রহণযোগ্য। ধর্মীয় অনুভূতির মতো রাজনৈতিক আবেগও এখন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে; বিশ্বাসে চিড় ধরলে বা আঘাত পেলে রাজনৈতিক কর্মীরা হয়ে উঠছে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য ভয়ঙ্কর দানব। নিজের মতের পক্ষের ভুল তথ্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে দিচ্ছে হাজার হাজার লাইক, শেয়ার; আর অন্যের মতকে অবদমন করতে দিচ্ছে হুমকি, ব্যবহার করছে গালাগাল ও শ্রুতিকটু ভাষা।

সংবাদপত্র, রেডিও, টিভি—এই সকল গণমাধ্যমও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়; নিরপেক্ষ নয় বলেই কোনো সরকারের আমলে ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’ দর্শকপ্রিয় হয়নি। কিন্তু প্রাইভেট চ্যানেলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক না কেন, ঢালাওভাবে কারও সাফাই গাওয়ার সুযোগ তাদের নেই। কারণ খবরের জন্য মানুষ শুধু একটা পত্রিকা কিংবা একক টিভি চ্যানেলের উপর নির্ভর করে না। পত্রিকা বা টিভির ক্ষেত্রে খবর পরিবেশনে সম্পাদনার অনুষঙ্গ জড়িত।

কিন্তু সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলের মতো ফেসবুকে কোনো দায়িত্বশীল সম্পাদক থাকে না। ফেইসবুক সংবাদের প্রাথমিক উৎস হিসেবে আবির্ভূত হলেও প্রাপ্ত সংবাদ বা তথ্যের সত্যাসত্য বা বস্তুনিষ্ঠতা পরিমাপের কোনো বাটখারা নেই। গুজব আর অসত্যের কৌশলী বিন্যাস এবং তার ছড়াছড়ির কারণে ফেইসবুকের পাঠক, দর্শক ও শ্রোতারা স্বাভাবিক বিচার, বিবেচনাবোধ হারাচ্ছে, যুক্তিগ্রাহ্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অবান্তর তথ্যের প্রতি যুক্তি-প্রতিবন্ধী মানুষদের বিশ্বাসী করে তুলছে এবং বাছবিচার ছাড়াই তারা তা প্রতিনিয়ত গলাধঃকরণ করে চলছে।

ডিজিটাল দুনিয়া এখন আওয়ামী লীগের বিরোধী শিবিরের হাতে। সরকারবিরোধী দল এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা ইউটিউব ও ফেইসবুক মোটামুটি দখল করে নিয়েছে। এরা সংঘবদ্ধভাবে সক্রিয় হয়ে কাজ করছে, এদের যে কোনো স্ট্যাটাসে মুহূর্তে হাজার হাজার লাইক ও শেয়ার হয়ে যায়। এদের সাধারণত ফেসবুকে কোন পোস্ট থাকে না, এরা মেসেঞ্জারে অনবরত মেসেজ পাঠাতে থাকে। আরেকটি সংঘবদ্ধ অ্যাকটিভিস্ট আছে যাদের প্রচারের প্রধান হাতিয়ার ধর্ম। এদের অধিকাংশ ধর্মের কথা বলে প্রথমে আবির্ভূত হয়, ধর্ম প্রচারের মাধ্যমে এরা সব দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে একটা নিষ্কলুষ ভাবমূর্তি গড়ে তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত হওয়ার পর তারা নিজেদের গোপন এজেন্ডা নিয়ে হাজির হয়। এরা ১০টি ধর্মবিষয়ক পোস্ট দিয়ে ১টি দেবে এজেন্ডা সম্পর্কিত। এরা প্রচুর লেখাপড়া করে, জ্ঞান-গরিমায় এরা সমৃদ্ধ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে তারা পারদর্শী। এরা আজগুবি আজগুবি ছবি ও খবর বিশ্বাসযোগ্য কৌশলে তৈরি করে প্রচার করে; আবেগপ্রবণ এবং অন্ধ বিশ্বাসীরা তা বিনা দ্বিধায় মেনে নেয়। আওয়ামী লীগের কর্মীরাও এদের ফেইসবুক বন্ধু, আওয়ামী লীগের এই বন্ধুরা এক সময় তাদের দলীয় আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ওদের মতাদর্শে বিলীন হয়ে যায়, আস্তে আস্তে আওয়ামী লীগের রাজনীতি তাদের কাছে গৌণ হয়ে যায়। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিক্ষোভের সময় আমাদের ফেনীর জিএমহাট এলাকার এক যুবক লিখেছে, ‘আমি আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা, ধর্ম আমার কাছে প্রথম, ধর্মের জন্য আওয়ামী লীগ ছাড়তে এক মুহূর্তও বিলম্ব করবো না’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাহদী হাসান রাকিবের একটি লেখায় দেখলাম, ভারতে উগ্রবাদী হিন্দুদের আচরণের প্রতিবাদে হবিগঞ্জ পৌর ছাত্রলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক হেলান উদ্দিন জনি পদত্যাগ করে দলের ঊর্ধ্বে ঈমানী চেতনা জাগ্রত করেছেন।

ফেইসবুক এবং ইউটিউব অবাধ ব্যবহার করার সুযোগ পেয়ে উগ্রবাদের সমর্থকেরা পরস্পরের নিকটে আসতে পেরেছে, তাদের সমর্থনের মাত্রা এবং শক্তি সম্পর্কে অবহিত হতে পেরেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীরা এখন ধর্মীয় উগ্রবাদ আশ্রয় করে সংঘবদ্ধ হচ্ছে। যারা ঘুষ খায়, সুদের লেনদেন করে তারাও ধর্মীয় মূল্যবোধের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করে। আফগানিস্তানের তালেবানেরা তাদের যুদ্ধের খরচ বহন করার জন্য এক সময় মাদকের ব্যবসা করেছে, ক্ষমতায় এসে তারা এখন শরিয়া আইন চালু করেছে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষগুলোকে আবেগ আর অন্ধ ধর্মানুভূতি দ্বারা প্ররোচিত করা অপেক্ষাকৃত সহজ এবং সহজ বলে রাজনৈতিক দলগুলো ফেইসবুক আর ইউটিউবের মাধ্যমে এই সুযোগটি কাজে লাগায়।

ফেসবুকে আওয়ামী লীগের কর্মীরা সংঘবদ্ধ নয়, বিচ্ছিন্ন, পরস্পর পরস্পরকে খুঁজে পায় না। অবশ্য আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকদের খুব বেশী তাৎপর্যপূর্ণ লেখা দেখাও যায় না। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ছাত্র ইউনিয়নের কিছু কর্মী ভালো লিখেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কর্মীরা চব্বিশ ঘণ্টা ফেসবুকে বড় বড় নেতাদের তাবেদারি করে সময় কাটায়। অবশ্য না কাটিয়েও উপায় নেই; নেতাদের তাবেদারি না করলে কর্মীদের বিপদে পড়তে হয়। কোনো অপরাধের সাথে আওয়ামী লীগের কোনো কর্মীর সংশ্লিষ্টতা উদঘাটিত হলেই নেতাদের কমন বিবৃতি হচ্ছে, ‘ও আওয়ামী লীগের কেউ না, কর্মী বা নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগের কোথাও তার নাম নেই’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এভাবে একটি অপরাধের জন্য আওয়ামী লীগের পেছনে কর্মীর দীর্ঘদিনের শ্রমকে অস্বীকার করা হয়। কিন্তু ভুল বা অপরাধ করলে কর্মীকে অস্বীকার করতে হবে কেন? এই নেতারা কেন বিশ্বাস করেন না যে, আওয়ামী লীগের লোকেরাও অপরাধ করতে পারে। দেশের লক্ষ লক্ষ লোক আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে, সকলের নাম আওয়ামী লীগের তালিকায় থাকার কথা নয়।

লক্ষ লক্ষ লোক আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে বলেই মারাত্মক ঝড়-ঝাপটায়ও এই সংগঠনটি টিকে ছিল এবং এখনো টিকে আছে। কিন্তু মেধাবী সৃজনশীল কেউ আওয়ামী লীগে আসতে চাইলেও তাদের পাত্তা দেওয়া হয় না—‘কাওয়্যা’, ‘হাইব্রিড’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইত্যাদি অমার্জিত, অশোভনীয় কথা বলে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাই আওয়ামী লীগ লাটিমের মতো ঘুরছে, এগুচ্ছে না। জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে লাটিমের এই বৃত্তাবদ্ধ ঘোরাকে তারা দলের অগ্রগতি মনে করছেন। বিএনপি’র মেজর আক্তারুজ্জামান এক টকশোতে বলেছিলেন, ‘আমি কখনো আওয়ামী লীগ করবো না, কারণ আওয়ামী লীগ রক্ষণশীল; বিএনপি আমাকে বহুবার বহিষ্কার করেও আবার টেনে নিয়েছে, আওয়ামী লীগ হলে নিতো না’। এই একটি কারণে কোনো রাজাকারের ছেলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আসতে ভয় পায়, কারণ তাকে ‘রাজাকারের পোলা’ বলে দূরে সরিয়ে রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নেয়া হয়। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের কিন্তু এত শুচিবায়ু নেই; তারা কাউকে তাদের আদর্শে আনতে তার চৌদ্দগোষ্ঠীর হিসাব নেয় না। তাই রাজাকারের সন্তান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আসার সুযোগ না পেলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী সন্তানেরা মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের দলে অনবরত ভিড়ছে। অন্যদিকে যারা মুক্তবুদ্ধির, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির তারা ক্রমশ নিষ্ক্রিয় ও হতোদ্যম হয়ে পড়ছেন।