আফগান সরকার সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের পড়ালেখা বন্ধ ঘোষণা করেছে।
তালেবানদের ক্ষমতা দখলের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের পড়ালেখা করার সুযোগ রাখা হয়েছিল, কিন্তু সেই শিক্ষাব্যবস্থায় ছিল লিঙ্গভিত্তিক আলাদা শ্রেণীকক্ষ এবং প্রবেশপথ। নারী শিক্ষার্থীদের শুধু নারী শিক্ষক বা বয়স্ক পুরুষ শিক্ষক পড়াতে পারতেন। এছাড়াও মেয়েরা কোন্ সাবজেক্ট নিয়ে লেখাপড়া করবে তাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া ছিল। বিধিনিষেধের ঘেরাটোপে আবদ্ধ এই শিক্ষাব্যবস্থাটিও এখন আর থাকল না। অবশ্য মেয়েদের উচ্চশিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আগেই কৌশলে রহিত করা হয়েছে। কারণ মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক স্কুল বহু পূর্ব থেকেই বন্ধ, এই বছরের মার্চ মাস থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় মেয়েদের জন্য খুলে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি তালেবান সরকার দিয়েছিল তা রক্ষা করা হয়নি। মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ থাকায় মেয়েদের উচ্চশিক্ষা নেওয়ার সুযোগ এক সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যেত। তালেবানেরা ইতোমধ্যে আফগানিস্তানে শরিয়া আইন চালু করেছে। শরিয়া আইন নিয়ে নানাবিধ ব্যাখ্যা থাকলেও সব ব্যাখ্যাই নারীসমাজের প্রতি কঠোর।
তালেবান শাসনামলে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হচ্ছে আফগান মেয়েরা। ১৯৯৬-২০০১ সন পর্যন্ত প্রথম দফায় ক্ষমতায় ছিল তালেবান; তখন দেশটির নারীরা পড়ালেখা করতে পারত না, পারত না চাকরি করতে। ১৯৯৬ সনে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে তালেবান সরকার তাদের সকল নীতি-আদর্শের বাস্তবায়ন করেছিল মেয়েদের উপর। শুধু নেইলপলিশ পরার জন্য প্রকাশ্যে সন্তানের সম্মুখে বেত্রাঘাত করা হয়েছে মা’কে। তালেবানেরা কাবুল দখল করেই মেয়েদের স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দেয়; মেয়েদের স্কুল-কলেজ গমনকে মনে করা হতো আধুনিক সমাজের বেহায়াপনা, নির্লজ্জতা ও নাপাক কাজ। মেয়েদের ঘরে আবদ্ধ থাকাটাকে সর্বোত্তম ধর্মীয় পন্থা বলে তালেবানেরা মনে করত এবং এখনো করে। তাদের মতে মেয়েরা বাইরে গিয়ে লেখাপড়া করলে পুরুষ তাদের চোখ, কান ও শারীরিক যিনা থেকে মুক্তি পাবে না। পুরুষদের পবিত্র কর্ম ছিলো বেগানা নারীদের কাছ থেকে পুরুষদের দূরে রাখা। তালেবানদের প্রথম শাসনামলে মেয়ে রোগীর চিকিৎসা পুরুষ চিকিৎসকের কাছ থেকে নেয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিলো। নারীদের জন্য স্কুল-কলেজ নিষিদ্ধ হলে নারী চিকিৎসক যে সৃষ্টি হবে না তা বোঝার ক্ষমতা তালেবানদের আছে; দুয়েকজন নারী রোগী চিকিৎসার অভাবে মারা গেলে কিচ্ছু যায় আসে না, তাদের কাছে আধুনিক চিকিৎসার চেয়ে নারীদের ঘরে আবদ্ধ রাখাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। তাদের কাছে ধর্মের অনুশাসনই মুখ্য, চিকিৎসা নয়। শরিয়া আইনের সামান্যতম শিথিলতাও তালেবানেরা মানতে নারাজ।
মেয়েদের প্রতি কঠোর অনুশাসনে বিশ্বাসী তালেবানদের আফগান নারীরা যমের মতো ভয় করে। মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে পুরুষের সমকক্ষ হয়ে উঠুক—এটা তালেবান পুরুষেরা চায় না। স্কুল-কলেজে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করায় আফগানিস্তানে অনেক সন্তানকে মা-বাবার হাতে, অনেক বোনকে ভাইয়ের হাতে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছে। পাকিস্তানের মতো আফগানিস্তানেও এই সকল হত্যার অভিযোগ হয় না, পুলিশ নিজ থেকে খোঁজ নেয়ার গরজ বোধও করে না। সমাজ মনে করে, মেয়েটি খারাপ বলেই হত্যা করা হয়েছে। আফগানিস্তানে সেই নারীই আদর্শ নারী যার কণ্ঠ বাইরের কেউ শুনেনি এবং যার চেহারা চন্দ্র-সূর্য কখনো দেখেনি। যে পুরুষ যত বেশি নারীদের কঠোর শাসনে রাখে সেই পুরুষ সমাজে তত বেশি সম্মানিত। গত বছরের আগস্টে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় বসে তালেবান সরকার বলেছিল, তারা এবার আর আগেরবারের মতো কট্টর পন্থায় দেশ শাসন করবে না, তারা নারী অধিকারকে সম্মান দেখাবে। তালেবান সমর্থক বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবীদেরও ধারণা ছিল, তালেবানেরা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে প্রথমবারের মতো তত বেশি কঠোর ও রক্ষণশীল হবে না। এই বুদ্ধিজীবীরা বাহ্যিকভাবে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হলেও মানসিকভাবে ধর্মান্ধ। ধর্ম কোথাও আপস করে না, করতে পারেও না। আধুনিক বিশ্বে অধিকাংশ মুসলমান নানাবিধ ব্যাখ্যার বদৌলতে ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের সমন্বয় করে চলার চেষ্টা করলেও তালেবানেরা সেই আপস করেনি, কারণ তারা বিজ্ঞানশিক্ষায় শিক্ষিত নয়, ধর্মগ্রন্থই তাদের জীবনযাপনের একমাত্র পাথেয়। ধর্মগ্রন্থ যা বলেছে তাই তারা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিফলনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
বর্তমানে আফগানিস্তানের অর্থনীতি মূলত বিদেশি সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। তালেবান সরকার মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রবেশের অনুমতি তুলে নেয়ার পর থেকে দাতা সংস্থাগুলো নাখোশ ছিল, এখন বিশ্ববিদ্যালয় মেয়েদের জন্য নিষিদ্ধ হওয়ায় পশ্চিমা বিশ্ব ক্ষেপে উঠেছে। এরই মধ্যে আফগান সরকার এনজিও-তে আফগান নারীদের চাকরি নিষিদ্ধ করেছে, এতে অনেকগুলো এনজিও তাদের কার্যক্রম আফগানিস্তান থেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। তালেবানদের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আফগানিস্তানে দুর্বিষহ দুর্ভিক্ষ চলছে, মানুষ না খেয়ে মরছে, খাবারের টাকা যোগাড় করতে অক্ষম মা-বাবা তাদের সন্তান বিক্রি করছে, কোলের শিশুর দুধ সংগ্রহে ব্যর্থ মা তার দেহ বিক্রি করছে, যাদের বিক্রি করার জন্য সন্তান আর সুশ্রী দেহ নেই তারা রক্ত আর কিডনি বিক্রি করছে। একদিকে ক্ষুধার্ত মানুষ, অন্যদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অনুশাসন—এই দুটির পারস্পরিক দ্বন্দ্বে জয়লাভ করেছে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অনুশাসন। তালেবান সরকারের কাছে অনাহারি মানুষের চেয়ে ইসলামিক অনুশাসনের বাস্তবায়ন অধিক গুরুত্ব বহন করে। তারা বহির্বিশ্বের স্বীকৃতির প্রত্যাশাও করে না। আফগানিস্তানের সাথে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধক হচ্ছে নারীশিক্ষা নিয়ে তালেবানদের রক্ষণশীল নীতি। জার্মানি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, তালেবানেরা তাদের অনুসৃত ভুল পথ থেকে সরে না এলে স্বাভাবিক সম্পর্ক হবে না এবং তালেবান সরকারকে স্বীকৃতিও দেওয়া যাবে না। কিন্তু ইরান আর আফগানিস্তান ইহুদি-খ্রিস্টান অধ্যুষিত দেশগুলোর হুমকিতে কাবু হয় না। হিজাব নিয়ে সৃষ্ট আন্দোলনে ইরানকে নত করতে পারেনি পশ্চিমের দেশগুলো, পশ্চিমাদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দিচ্ছে ইরান।
মুসলিম জগতে এক সময় জ্ঞান-বিজ্ঞানের ঈর্ষণীয় বিকাশ ঘটেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানেরা গ্রীক এবং ভারতীয় দর্শনের চর্চার মাধ্যমে জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে উৎকর্ষের দ্বারে পৌঁছে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়ের ধর্মান্ধ মুসলিম আলেম ও শাসকদের চোখে তারা হয়ে উঠেন কাফের-নাস্তিক-মুরতাদ। ধর্মান্ধ আলেমদের ফতোয়ায় ক্ষমতালিপ্সু শাসকেরা সেই সকল জ্ঞানী-গুণীদের হত্যা করে, দেশছাড়া করে অন্ধকার যুগের সূচনা করেছিল, যা এখনো চলছে। আমোদজনক বিষয় হচ্ছে, ঐ সকল কাফের-নাস্তিক-মুরতাদ জ্ঞানীদের নিয়ে বর্তমানে কিছু মুসলমান আবার গর্বও করে। কারণ তারা বুঝতে পারছে, চলমান বিশ্বকে উপেক্ষা করে টিকে থাকা কঠিন। তাই নতুন ব্যাখ্যায় ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের সমন্বয় করা হচ্ছে। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার না মানলেও যুগের প্রয়োজনে মুসলিম সমাজে এখন নাজায়েজ ছবি তোলা হচ্ছে, শয়তানের বাক্স বলে টেলিভিশনকে কেউ এখন আর ফেলে দিচ্ছে না। কেউ এখন আর বলছে না মাইকে আযান দেওয়া হারাম, মোবাইল ব্যবহার করা হারাম, গণতন্ত্র হারাম, নারী নেতৃত্ব হারাম, ডাইনিং টেবিল হারাম, জন্মদিন পালন হারাম, নববর্ষের উৎসব হারাম, রক্ত সঞ্চালন হারাম, গায়ে হলুদ হারাম। পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হলে অনেক আলেম ইসলামের নামে কোরআন ও হাদিস দিয়া প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন যে, পাকিস্তান দাবি করা আর কোরানের খেলাফ করা একই কথা।
বিশ্বের অন্যতম গ্রহণযোগ্য গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী জ্ঞান-বিজ্ঞানে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জাতি হচ্ছে মুসলিম জাতি। তাই বোধ হয় মাত্র দেড় কোটি ইহুদির সাথে ২০০ কোটি মানুষের গোটা মুসলিম বিশ্ব পেরে উঠছে না। কোয়ানটিটির চেয়ে কোয়ালিটি যে শক্তিশালী তা মুসলমান জাতি মানতে নারাজ, তাই শিক্ষার চেয়ে জনসংখ্যায় এক নম্বর হওয়ার বাসনা পূরণে সন্তান উৎপাদনে মুসলমানদের গরজ বেশি। দেড় কোটি ইহুদির মধ্যে প্রায় ৩০০ বিজ্ঞানী এ পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, আর ২০০ কোটি মুসলিমদের মধ্যে নোবেল পাওয়া মানুষ মাত্র ১০ জন, বিজ্ঞানে কেবল ৩ জন। এদের মধ্যে নাগীব মাহফুজ ধর্ম মানেন না, অজ্ঞেয়বাদী। অন্যদিকে আরেক নোবেলবিজয়ী পাকিস্তানের প্রফেসর আবদুস সালাম আহমদিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ায় তাকে ‘কাফের’ বলে গণ্য করা হয়। মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে সৈয়দ আহমদ আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তখনকার আলেম সমাজ থেকে ‘কাফের’ ফতোয়া পেয়েছিলেন।
আফগানিস্তানের মতো আমাদের দেশেও নারীশিক্ষাবিরোধী ফতোয়া আছে, ক্ষমতায় গেলে বাস্তবায়ন হবে। ইসলামে নারী-পুরুষ উভয়ের উপর জ্ঞানার্জন ফরয করলেও এক্ষেত্রে আল্লামা শফি হুজুরের মতো কট্টরপন্থীদের অভিমত হলো, নারীদের জন্য এই জ্ঞান অর্জনের বিধেয় হচ্ছে নামায, রোযা, হজ, যাকাত ইত্যাদি মৌলিক বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা, এর বাইরে অন্য কোন শিক্ষা নয়। শফি হুজুর প্রচুর লেখাপড়া করেছে, তিনি শায়খুল হাদিসও, তাই তিনি ইসলামের কথাই বলেছেন। ইসলাম ধর্মে একজন মায়ের সম্মানজনক অবস্থান শীর্ষে হলেও সামগ্রিকভাবে নারীকে সেই সম্মান দেওয়া হয়নি; বিভিন্ন হাদিসে কুকুর আর গাধার সাথে নারীকে তুলনা করা হয়েছে। মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণ বন্ধ হয়ে গেলে ২০০ কোটি মুসলমানের মধ্যে ১০০ কোটি মুসলমান অন্ধকার জগতে নিমজ্জিত হবে, আর সেই জগত হচ্ছে এমন একটি জগত যে জগতে মেয়ে সন্তানদের জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। নারী শিক্ষালয়ে গেলে পুরুষের যৌনকামনা জাগ্রত হবে, এমন ধারণায় লালিত সমাজকে সভ্য সমাজ বলা যায় না। নগ্নতার জন্য পাশ্চাত্যকে দোষারোপ করা হলেও ওখানে একজন নগ্ন বেশ্যাকেও জোর করে স্পর্শ করা হয় না। মেয়ে দেখার পর পুরুষের লালা ঝরলে তার জন্য মেয়ে দায়ী নয়, দায়ী পুরুষের স্বভাব, তার চিকিৎসা প্রয়োজন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা.) তাঁর ব্যবসা নিজেই পরিচালনা করতেন। হযরত আয়েশা (রা.) নিজেই যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। ধর্মের এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হোক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।