তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না হলে বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। কিন্তু এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপি এক সময় মানতো না, অবাস্তব ও অসাংবিধানিক বলে বিরোধী দলের দাবি নাকচ করে দিয়েছিল। খালেদা জিয়া তো বলেই দিয়েছিলেন, শিশু এবং পাগল ছাড়া কোন নিরপেক্ষ ব্যক্তি নেই। খালেদা জিয়ার এই কথাটির মধ্যে সত্যতা আছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষিত বিবেচনায়। শুধু সাধারণ জনতার মধ্যে নয়, প্রতিটি পেশার লোকজন দলীয় আদর্শের ভিত্তিতে বিভাজিত। আইনজীবী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিক্ষকসহ প্রায় সকল পেশার লোক দলীয় রাজনীতির ধারক-বাহক। এই চারটি পেশার লোক মূল দলের নেতাদের চেয়েও রাজনৈতিক দলের প্রতি বেশী অনুগত। দলের প্রতি উচ্চশিক্ষিত লোকদের অন্ধ আনুগত্য মাঝে মাঝে হতাশা ও হাসির উদ্রেক করে। জাতিসংঘে ভাষণ দিতে গিয়ে খালেদা জিয়া একবার ফারাক্কার কথা উল্লেখ করেছিলেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন উপাচার্য জাতিসংঘে ফারাক্কার ইস্যুটি ‘উত্থাপন’ করায় উৎফুল্ল হয়ে অভিনন্দন জানাতে খালেদা জিয়ার সাথে দেখা করেন। ভাষণে উল্লেখ করা আর উত্থাপন করার মধ্যে যে বিরাট ফারাক রয়েছে তা চারজন ভিসি জানতেন না—এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাই দলনিরপেক্ষ লোক ‘পাগল’ ছাড়া পাওয়া মুশকিল; জেনেশুনে একজন পাগলকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা যায় না। কিন্তু বিএনপি এখন পাগলের তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাচ্ছে।
নিরপেক্ষতার জন্য যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতিষ্ঠা করা হল সেই সরকার যে নিরপেক্ষ নয় তা প্রমাণিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে চারটি নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু প্রতিটি নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। যারাই নির্বাচনে হেরেছে তারাই নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ১৯৯০ সনের ডিসেম্বরে এরশাদ সাহেবের পতনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হয়। ১৯৯১ সনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রত্যাশা ছিল তারা জিতবে এবং বড় ব্যবধানে জিতবে। কিন্তু সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন বিএনপি বা আওয়ামী লীগ কোন দলই পেল না, বিএনপি পেল ১৪০ আসন। জামায়াতে ইসলামের সহায়তা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করল। আওয়ামী লীগ ক্ষোভে-দুঃখে বলল, নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাংসদের মৃত্যুর কারণে ১৯৯৪ সনে অনুষ্ঠিত মাগুরার একটি আসনের উপনির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থীর পক্ষে কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভোটের এই অরাজকতা লক্ষ্য করে মাগুরা সার্কিট হাউজ থেকে ভোট চলাকালীন পালিয়ে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল বিএনপি সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে।
এমন উলঙ্গ নির্বাচন জিয়াউর রহমানের হাঁ-না ভোটে এবং এরশাদ সাহেবের আমলেও হয়েছে। ১৯৭৩ সনের নির্বাচনেও কয়েকজন প্রার্থীকে জোর করে হারিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। ১৯৭৭ সনে অনুষ্ঠিত জিয়াউর রহমানের হাঁ-না ভোটে অবৈধ সিল মারার কোন কর্মীও ছিল না, সারা দিনে ২ জনও ভোট দিতে কেন্দ্রে যায়নি, কারণ এই আস্থাভোটে জিয়াউর রহমানের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না। নিজেদের চাকরি রক্ষার্থে দিন শেষে প্রিসাইডিং এবং পোলিং কর্মকর্তারা ব্যালটে সিল দিয়ে বাক্স ভর্তি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই ভোটে ভোটারের হাজিরা দেখানো হয় ৮৮.১ শতাংশ এবং জিয়াউর রহমানের পক্ষে হাঁ ভোট দেখানো হয় ৯৮.৯ শতাংশ। এরশাদ সাহেব ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমানের মতো রাজনৈতিক দল গঠন করে ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সনে দুটি সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন এবং একনাগাড়ে ৭ বছর ক্ষমতায় থাকেন। এরশাদ সাহেবের আমলে যতবার জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়েছে ততবারই সকাল ১০-১১টার মধ্যে অবৈধ সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভর্তি করার অনিয়ম নিয়মে পরিণত হয়েছিল। তবে এরশাদ সাহেব আওয়ামী লীগের মতো বোকা ছিলেন না, টার্গেট করে নিজের দলের কোনো কোনো প্রার্থীকে হারতে বাধ্য করেছেন। নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে তিনি তার প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের ছেলে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমান খানের পরাজয় নিশ্চিত করেছিলেন। এরশাদ সাহেবের নির্বাচনী কৌশলে আতাউর রহমান খান প্রধানমন্ত্রী হয়েও তার ছেলের পরাজয় ঠেকাতে পারেননি। ২০১৮ সনের নির্বাচনে এরশাদ সাহেবের ‘নীতি’ প্রয়োগ করলে আওয়ামী লীগ সরকার এত বিতর্কিত হতো না।
১৯৯৪ সনের মাগুরা নির্বাচনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি তুলল আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলাম। এমন উদ্ভট সরকারের অস্তিত্ব পৃথিবীর কোন দেশে অনুসৃত হয় না বিধায় বিএনপি তাদের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করল। অনেক আন্দোলন, অনেক জীবনহানি। ১৯৯৬ সনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের চাপে অনীহা সত্ত্বেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান রেখে সংবিধান সংশোধনপূর্বক খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হল, প্রধান উপদেষ্টা হলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান। নির্বাচনে কোন দল সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন পেল না। আওয়ামী লীগ পেল ১৪৬ আসন। জাতীয় পার্টির সহায়তায় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করল। বিএনপি বলল, নির্বাচনে ডাকাতি হয়েছে। ২০০১ সনের নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন বিচারপতি লতিফুর রহমান। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগ থেকে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ উঠতে থাকে। জিতল বিএনপি। আওয়ামী লীগ বলল, এই নির্বাচন মানি না, ব্যাপক স্থূল কারচুপি হয়েছে।
অতীতে ক্ষমতাসীন সরকার নানা পন্থায় তাদের অনুগত ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার কূটকৌশল অবলম্বন করেছে। বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদের চাণক্যনীতিতে বিচারপতিদের চাকরির মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সংবিধান অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার বিধান ছিল। মওদুদ আহমেদ দেখলেন, বিচারপতিদের চাকরির মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো হলে তাদের পছন্দের লোক বিচারপতি কে এম হাসান অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারবেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলো কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নিতে রাজি ছিল না। বিরোধী দলগুলোর গণআন্দোলনে অনেক ক্ষয়ক্ষতি ও জীবনহানির পর অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টা হতে অস্বীকার করেন। দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ অপশনের আওতায় প্রধান উপদেষ্টার খোঁজ আর করা হলো না; পঞ্চম ও শেষ অপশনের আওতায় রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে শপথ নেন। এমন পরিবেশে তীব্র গণআন্দোলন এবং সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে ড. ইয়াজউদ্দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং ড. ফখরুদ্দীন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোট জিতল। নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বলে বিএনপি অভিযোগ উত্থাপন করে।
যে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আইনগত ভিত্তি পেয়েছিল সেই সংশোধনী সংবিধানের মূল চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে ২০১১ সনে সুপ্রিম কোর্ট তা বাতিল করে। ত্রয়োদশ সংশোধনী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তিনজন অ্যাডভোকেট ২০০৪ সনে রিট আবেদন করেছিলেন। তবে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা না করে আরও দুটি সাধারণ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারে মর্মে আদালত অভিমত ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু এই অভিমত আদালতের রায়ের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়; কারণ আদালত কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আরও দুটি নির্বাচনও অবৈধ হওয়ার কথা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানের মূল চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, সংবিধান অনুযায়ী শুধু নির্বাচিত সংসদ এবং সরকারই দেশ পরিচালনা করবে, কোন অনির্বাচিত সরকার নয়। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কেউ নির্বাচিত নয় বিধায় এই সরকার ছিল অগণতান্ত্রিক এবং অসাংবিধানিক। সংবিধানের মূলনীতির সাথে অসামঞ্জস্য যে কোন আইন বা আইনের অংশ সংবিধানের অভিভাবক হিসাবে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল ঘোষণা করতে পারে। এই ক্ষমতাবলে জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ সাহেবের সামরিক শাসনামলে জারি করা আদেশ-নির্দেশ অন্তর্ভুক্ত করে সংবিধানের যে পঞ্চম ও অষ্টম সংশোধনী সংসদে পাস হয়েছিল তা সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেছে। অষ্টম সংশোধনীতে ঢাকার বাইরে হাইকোর্টের বেঞ্চ গঠনের বিষয়টিও বাতিল করে দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদকে ফিরিয়ে দেওয়ার ষোড়শ সংশোধনীও সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গ্রহণযোগ্যতা নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের কোন নির্বাচনই পরাজিত দলের নিকট সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হিসেবে প্রতিপন্ন হয়নি। দ্বিতীয়ত, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার বিধান থাকায় বিচার বিভাগ শুধু দলীয়করণ নয়, কলুষিতও হতে থাকে। তৃতীয়ত, বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী ভূমিকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। চতুর্থত, রাষ্ট্রপতির পদে থাকা অবস্থাতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করে ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকারব্যবস্থাটিকে চরমভাবে বিতর্কিত করে রেখে গেছেন। পঞ্চমত, বিচারপতি ফজলুল হকের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিরাও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়ায় এই ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। ষষ্ঠত, ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার টানা দুই বছর ক্ষমতায় থাকায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সপ্তমত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ছিল বলেই বিরোধী দল সংসদে অনুপস্থিত থাকত।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে উচ্চ আদালতের রায়ের পর তদনুযায়ী সংসদে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানের মূলনীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে বাতিল করা হয়েছে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনরায় গঠন করার আদৌ কি সুযোগ আছে? সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও বিএনপি অনবরত দলনিরপেক্ষ সরকার গঠনের দাবি করে যাচ্ছে। দলীয় সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না বলছে। কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার পর আওয়ামী লীগ সরকারও প্রমাণ করতে সমর্থ হয়নি যে, দলীয় সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন করার ক্ষেত্রে সফল। ২০১৪ সনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার প্রবল আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। এমন একটি ভোটারবিহীন নির্বাচন ১৯৯৬ সনে বিএনপিও করেছিল। আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপি’র কৌশলী অংশগ্রহণ থাকায় স্থানীয় নির্বাচনেও ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী এবং সমর্থকরাও ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে; কারণ তাদের মধ্যে এমন প্রতীতির জন্ম নেয় যে, ভোটকেন্দ্রে না গেলেও তাদের দলের প্রার্থীর জয় হবে। অন্যদিকে বিএনপি ভোটে অংশগ্রহণ করেও ভোটের দিন মাঠে থাকেনি, দুপুরের আগেই ভোট বর্জনের ঘোষণা বারবার দিয়েছে।
মাগুরা নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ মনে করত, খালেদা জিয়া সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে না। এখন বিএনপি মনে করে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া অসম্ভব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রথম চালু করার সময় বিএনপি ঘোর বিরোধিতা করলেও এখন তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতির পক্ষে। অন্যদিকে যে আওয়ামী লীগ প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবি তুলেছিল সেই আওয়ামী লীগই এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিপক্ষে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই দুইটি দল শুধু পারস্পরিক প্রতিপক্ষ নয়, পারস্পরিক শত্রুও; তাই এই ক্ষেত্রে একমত হওয়ার প্রত্যাশা কেউ করে না। এক্ষেত্রে একটি আইনসম্মত সমাধান সম্ভব, বিভিন্ন দলের নির্বাচিত সাংসদদের নিয়ে নির্বাচনকালীন একটি সরকার গঠন করা যেত। কিন্তু বিএনপি’র সাংসদদের পদত্যাগে সেই সম্ভাবনারও কবর হলো। তবে এক্ষেত্রে গঠিত সরকারে দশ শতাংশ মন্ত্রী অনির্বাচিত টেকনোক্রেট হিসেবে বিএনপি’র অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক নিয়ে কাড়াকাড়ি হবে। আওয়ামী লীগ প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাখতে চাইবে, সংসদে বিরোধী দল হলো জাতীয় পার্টি, নির্বাচনকালীন সরকারে তারা তাদের অংশীদারিত্ব বিএনপি’র চেয়ে বেশী চাইবে। তবে আমি সংবিধানবিশেষজ্ঞও নই, আইনজ্ঞও নই। সাধারণ জনতা অভিধায় অপেক্ষা করছি, বিভিন্ন অসঙ্গতির মিল কীভাবে আসবে তা দেখার জন্য।