জামানত ছাড়া ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড নামসর্বস্ব কয়েকটি ভুয়া কোম্পানিকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রদানের অভিযোগ নিয়ে শোরগোল তুলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মিডিয়া। অনেক গ্রাহক আতঙ্কিত হয়ে মেয়াদি আমানতের টাকা ম্যাচিউর হওয়ার আগেই ইসলামী ব্যাংক থেকে তুলে নিচ্ছেন। যে তিনটি কোম্পানিকে ৯০০ কোটি টাকা করে ২৭০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে সেই তিনটি কোম্পানি হচ্ছে, মেডিগ্রিন, এসএস স্ট্রেইট লাইন এবং মার্টস বিজনেস। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ৩টি কোম্পানি রেজিস্ট্রার অফ জয়েন্ট স্টক কোম্পানির সঙ্গে নিবন্ধিত হওয়ার দুয়েক মাসের মধ্যে আবেদন করে ঋণ পেয়ে যায়। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তিনটি কোম্পানির প্রত্যেকটিই ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করেছে এবং এতে প্রমাণিত হয় যে, গৃহীত ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী বেনামীতে অন্য কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি। কিছু মিডিয়া স্পষ্ট করে বলছে যে, এই ঋণ দেওয়া হয়েছে ব্যাংকের মালিক এসআলম গ্রুপকে। অভিযোগকারীদের ধারণা ২০২০ সনের মার্চে ইসলামী ব্যাংক থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পর্যবেক্ষক সরিয়ে না নিলে ইসলামী ব্যাংক এভাবে অনিয়ম করে ঋণ দিতে পারতো না, এসআলম গ্রুপকে নিয়মবহির্ভূতভাবে সুবিধা দেওয়ার জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক এই দুরভিসন্ধিমূলক কাজ করেছে।
অপেক্ষাকৃত দুর্বল তপশিলী ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে থাকে। শ্রেণিকৃত ঋণের মাত্রা ও স্বরূপ, মূলধনের পর্যাপ্ততা, ঋণ-আমানত অনুপাত ও প্রভিশনিং বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির পরিমাণ ইত্যাদি পর্যালোচনাপূর্বক প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে একটি ব্যাংককে সবল বা দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। দুর্বল বা সমস্যাকবলিত ব্যাংকগুলোকে পুনরায় শক্তিশালী করে তোলার অভিপ্রায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে, একই লক্ষ্যে একটি সমঝোতা চুক্তিও দুর্বল ব্যাংকের সাথে স্বাক্ষর করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকনির্দেশনা পরিপালন হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করাই পর্যবেক্ষকদের মুখ্য কাজ। এই পর্যবেক্ষকেরা তপশিলী ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের সভায় উপস্থিত হয়ে বোর্ডের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন, পর্যবেক্ষণে অনিয়ম কিছু প্রতিভাত হলে তা তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে থাকেন। বর্তমানে পর্যবেক্ষকদের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, এখন পরিচালক পর্ষদের আলোচনায় তারা অংশগ্রহণও করতে পারেন। ব্যাংকের দুর্বলতা কেটে গেলে পর্যবেক্ষক তুলে নেয়া হয়। ইসলামী ব্যাংক কোন বিচারেই কখনো দুর্বল ব্যাংক ছিল বলে মনে হয় না; তাই কোন্ প্রেক্ষিতে বা কী বিবেচনায় ২০১০ সনে ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তা আমার জানা নেই। তপশিলী ব্যাংকের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে খবরদারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ নয়, তাই প্রয়োজন না থাকায় সম্ভবত বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামি ব্যাংক থেকে ২০২০ সনে পর্যবেক্ষক তুলে নিয়েছে।
পর্যবেক্ষক থাকলেই যে ব্যাংকের অপকর্ম রোধ করা যায় তা সব সময় সঠিক নাও হতে পারে। বেসিক ব্যাংকে পর্যবেক্ষক থাকা অবস্থায় বেসিক ব্যাংক দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে পর্যবেক্ষক রেখেও কোন উন্নতি হয়েছে বলে শোনা যায়নি। বর্তমানে ১০টি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক রয়েছে। পর্যবেক্ষক শুধু পরিচালক পর্ষদের সিদ্ধান্তসমূহ পর্যবেক্ষণ করে থাকে, কিন্তু ব্যাংকের অগণিত কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করা তো একজন পর্যবেক্ষকের পক্ষে সম্ভব হয় না। ভুল-ত্রুটি আর অপকর্ম শনাক্ত করার জন্য প্রত্যেকটি ব্যাংকের নিজস্ব নিরীক্ষা বিভাগ রয়েছে, এই বিভাগ নিয়ম-নীতি অনুযায়ী ব্যাংকের প্রতিটি কাজের মূল্যায়ন ও নিরীক্ষা করে থাকে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকও তপশিলী ব্যাংকগুলো পরিদর্শন করে থাকে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন পুলিশের চোর ধরার মতো, ঘটনোত্তর পরিদর্শন। এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক তপশিলী ব্যাংক থেকে আমানত ও ঋণের তথ্য নিয়ে ব্যাংকগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়মিত মনিটরিং করে থাকে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যাংকগুলোকে তত্ত্বাবধান করে থাকে। এত কড়াকড়ি তদারকি থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে।
১৯৮৩ সনে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-এর প্রতিষ্ঠাকালীন মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ১৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ; এই সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আইডিবি, কুয়েত ফাইন্যান্স হাউজ ও সৌদি আরবের ইসলামী ব্যাংক আল-রাজি। ২০১৪ সন থেকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করে এবং আমাদের কিছু দেশীয় প্রতিষ্ঠান শেয়ারগুলো কিনে নেয়। ফলশ্রুতিতে ২০১৭ সনে ব্যাংকটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসে। ২০১৭ সনে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আসার আগে ইবনে সিনা ট্রাস্টের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন মুস্তাফা আনোয়ার। ইবনে সিনার মাধ্যমেই জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ইসলামী ব্যাংক চালাতেন। ২০১৮ সনে ইবনে সিনা ট্রাস্টও তাদের সকল শেয়ার বিক্রি করে দেয়।
ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামের নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল। যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হওয়া মীর কাসেম আলী ছিলেন ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম উদ্যোক্তা। অভিযোগ রয়েছে যে, ব্যাংকটির সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল ও জাকাতের জন্য আদায়কৃত অর্থের সুবিধাভোগী ছিল জামায়াতে ইসলামীর সদস্য ও সমর্থকেরাই। অবশ্য ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন হওয়ার পূর্ব ২০১১ সন থেকেই ব্যাংকটির উপর জামায়াতে ইসলামের কর্তৃত্ব কমতে থাকে; ২০১১ সনে ইস্যু করা নীতি অনুযায়ী ব্যাংকের পরিচালক হতে কমপক্ষে ২ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলে জামায়াতে ইসলামের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব হ্রাস পেতে থাকে। তখন থেকে বাজার থেকে ক্রমাগত শেয়ার কিনে ২০১৭ সনে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। ইসলামী ব্যাংকের এই পরিবর্তন অস্বাভাবিক মনে হলেও তাতে আইনের কোন ব্যত্যয় হয়নি।
ইসলামী ব্যাংকসহ তাদের মালিকানাধীন অন্যান্য ব্যাংকগুলো থেকে বিভিন্ন নামে এক লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এসআলম গ্রুপের বিরুদ্ধে। নিজের মালিকানাধীন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে নানাবিধ বাধানিষেধ আরোপ করা সত্ত্বেও তা রোধ করা যাচ্ছে না। বিধিনিষেধ থাকায় মালিকেরা ভুয়া নামে ঋণ নিয়ে থাকে; মালিকের ঋণ গ্রহণের নিয়মনীতি উল্লেখ করে বাধা সৃষ্টি করার ক্ষমতা কোন বেতনধারী ব্যাংক কর্মকর্তার থাকার কথা নয়। এমন অতীতেও হয়েছে, ভুয়া নামের ঋণ শনাক্ত হওয়ার পর ব্যাংকের মালিককে তা নিজের বলে স্বীকার করে নিতে বাধ্য করা হয়েছে।
এটাও সত্য যে, বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোকে ঋণ প্রদানে সব ব্যাংকই উৎসাহী। তাই বলে বৃহৎ সব ব্যবসায়ী গ্রুপ খারাপ তা কিন্তু ঠিক নয়। বড় বড় গ্রুপগুলো সম্পর্কে আমাদের সমাজে ঢালাওভাবে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা হয়েছে, অনেকের ধারণা তারা টাকা নিলে আর ফেরত দেয় না। কিন্তু কথাটি সত্য নয়। যথাসময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা না হলেই ঋণগ্রহীতাকে ঋণখেলাপি হিসেবে গণ্য করা হয়; কিন্তু ঋণখেলাপি হলেই অপরাধী হয়ে যায় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দুর্যোগে ব্যবসায় ক্রমাগত লোকসান হলে যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। বিদেশি ব্যাংকসহ কিছু প্রাইভেট ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম, কারণ তারা কৃষি, ক্ষুদ্র, মাঝারি বা বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগ করে না; তারা বিনিয়োগ করে আমদানি-রপ্তানি এবং ওয়ার্কিং ক্যাপিটালে। এই ব্যাংকগুলোর পারফরমেন্স দিয়ে তাই সোনালী, জনতা, অগ্রণী, ইসলামী ব্যাংক বা কৃষি ব্যাংকের বিচার করা সঠিক হবে না।
বিশ্বে বিরাজমান আর্থিক দুর্যোগের মধ্যে ব্যাংকের আমানত পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে যখন নানা গুজব ও অপপ্রচার চলছে ঠিক তখনই ইসলামী ব্যাংকের ঋণ প্রদানের অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর প্রচার হলো; এতে জনগণ মনে করছে ইসলামী ব্যাংক বোধ হয় দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। অথচ ইসলামী ব্যাংক থেকে বলা হচ্ছে, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংক নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক, অসত্য ও উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে। ব্যাংক বলছে, যাদের ঋণ দেওয়া হয়েছে তারা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়াও আমদানি পণ্য জামানত রেখে ঋণ দেওয়ার প্রচলন নতুন কিছু নয়। এখনো ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার সূচকগুলো অনেক সবল, কোন একটি গ্রুপকে বেশী ঋণ দেওয়াতে নিয়মের ব্যত্যয় হতে পারে, ঋণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নাও থাকতে পারে। কিছু মিডিয়া ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা বদলকে সব অনিয়মের উৎস বলে বর্ণনা করছে, মনে হচ্ছে সকল ক্ষোভ এই ইস্যু নিয়েই। আরেকটি ইস্যু হতে পারে সরকারকে বেকায়দায় ফেলা। কিন্তু মালিকানা বদল হওয়ার পর ব্যাংকটির আমানত এবং ঋণ দুটোই বেড়েছে। ২০২০ সনের জুনে আমানত ১ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করে, এখন এই আমানত বেড়ে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশী হয়েছে। এই ব্যাংকের মাধ্যমে আগের মতোই প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানো অব্যাহত আছে; ব্যাংকের মালিকানা বদল হওয়ার পরও বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড ২০১৯ ও ২০২০ পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।
মিডিয়া থেকে বলা হচ্ছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড থেকে এসআলম গ্রুপকে ৩০ হাজার কোটি টাকার লোন দেওয়া হয়েছে এবং এসআলম গ্রুপ তাদের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো থেকে মোট এক লক্ষ কোটি টাকা লোন নিয়েছে। এই উপাত্ত সঠিক হলে তা উদ্বেগজনক। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের মোট ঋণ ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ২২ শতাংশ ঋণ একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের কাছে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাওয়াটা সুস্থ ব্যাংকিং নয়। নানা অপকর্মের কারণে বিগত বছরগুলোতে ব্যাংকিং জগতের ইমেজ এমনিতেই তলানিতে নেমেছে, এতে সরকারের ভাবমূর্তিও নষ্ট হয়েছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার একটি সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা সক্রিয়। তপশিলী ব্যাংকগুলোর কর্মকাণ্ড তদারকির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে এখন অসংখ্য যোগ্য ও দক্ষ কর্মী রয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ম্যানেজমেন্টেও পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যাংকসংশ্লিষ্ট অপপ্রচার প্রজ্ঞার সাথে হ্যাণ্ডল করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দক্ষ ও প্রজ্ঞাবান কর্মীর বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্তে ব্যাংকের উপর জনগণের আস্থা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে—এই প্রত্যাশা দেশবাসীর।