বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র বিভাগীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতি ছিল উত্তপ্ত। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় বিএনপি’র কর্মীদের মধ্যে যে হতাশার জন্ম নিয়েছিল তা আপাতত কেটে গেছে, তারা এখন অনেক বেশী সংঘবদ্ধ ও সোচ্চার, যা পল্টনে বিএনপি অফিসের সম্মুখে তাদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। একজন বিএনপি কর্মী হেলমেট পরে যেভাবে পুলিশের সাথে লাঠি নিয়ে লড়াই করেছে তাতে বিএনপির কর্মীদের আক্রমণাত্মক ও বেপরোয়া মনে হয়েছে। ১০ ডিসেম্বর থেকে দেশ খালেদা জিয়ার কথায় চলবে বলে যে হুঙ্কার বিএনপি নেতা আমান উল্লাহ আমান দিয়েছিলেন তা বিএনপি’র জন্য বুমেরাং হয়েছে। দলটির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীও এই মর্মে ঘোষণা করেন যে, তারেক রহমান খুব শিগগিরই বৃটেন থেকে দেশে ফিরে আসবেন। খালেদা জিয়ার কথায় দেশ চললে, তারেক রহমান নির্বিবাদে দেশে আসার সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে বিএনপি’র ১০ দফা দাবীর উত্থাপন সঙ্গতিপূর্ণ মনে হচ্ছে না।
নেতারা যতটুকু বলেন তার চেয়ে বেশী বলা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউবে। বিএনপি’র নেতাদের বক্তব্যে কিছুটা রং ঢেলে দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমনসব বেপরোয়া গুজব ছড়াতে থাকে যে, জনগণ ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। একদিকে সরকার পতনের দিন-তারিখ ঘোষণা, অন্যদিকে সরকারের কঠোর অবস্থান—এতে দেশ সংঘাতের দিকে যাচ্ছে বলে অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন। তবে নেতাদের আত্মবিশ্বাসী কথাবার্তায় বিএনপি’র কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এমন একটি প্রতীতির জন্ম নিয়েছিল যে, ১০ ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু গর্জন অনুযায়ী বর্ষণ হলো না। বিএনপি পেছনে হাঁটল, ঢাকা শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক মাঠ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসমাবেশ না করে সরকারের দেওয়া শর্তে সমাবেশ করলো শহরের এক প্রান্তে অখ্যাত গোলাপবাগ মাঠে। পল্টন অফিসের সম্মুখে তাদের গণসমাবেশ করার জেদ বহাল না থাকায় সরকার হটানোর ব্যাপারে বিএনপি’র শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে এখন কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। উপায়ন্তর না দেখে কর্মীদের চাঙ্গা করতে এই সমাবেশে বিএনপি’র সাংসদগণ পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু সংসদ পরিচালনার জন্য বিএনপি’র সাত জন সাংসদ খুব বেশী অপরিহার্য বলে মনে হয় না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচিত বিরোধীদলীয় সাংসদগণও সংসদে যেতেন না এবং তাতে সংসদ পরিচালনায় কোন সমস্যা হয়েছে বলে মনে হয়নি। সংসদে বিরোধী দল আওয়ামী লীগ না থাকায় বিএনপি’র স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার তার স্বস্তিতে সংসদ পরিচালনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে জাতীয় পার্টির সাথে বৈঠক করে তাদের সংসদে থাকাটা আপাতত নিশ্চিত করেছে।
বিএনপি’র গোলাপবাগ সমাবেশ থেকে ঘোষিত ১০ দফা নিয়ে মিডিয়ার চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে। প্রথম দফায় বলা হয়েছে বর্তমান জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করে ক্ষমতাসীন সরকারকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে, আর দ্বিতীয় দফায় বলা হয়েছে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রভিশন রাখতে হবে। বিএনপি’র প্রথম দফাটি দশম দফা হলে সঙ্গতিপূর্ণ হতো। কারণ প্রথম দফা মেনে নিয়ে সংসদ বিলুপ্ত করা হলে সংবিধান সংশোধন বা অন্যান্য দফাগুলো পরিপালন এবং বাস্তবায়নের কোন কর্তৃপক্ষ থাকবে না। সংবিধান যদি সংশোধন করতেই হয় তাহলে বিএনপি’র সাংসদগণ পদত্যাগ করলেন কেন? মনে হচ্ছে, সংশোধনের দায়িত্ব বিএনপি নিতে চায়নি, এই দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির উপর। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত, সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা কি আদৌ সম্ভব? এই ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করতে হলে রিভিউ করার আবেদন করতে হবে সুপ্রিম কোর্টে, এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের কিছু করার আছে বলে মনে হয় না।
তৃতীয় দফায় নতুন করে নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবী করা হয়েছে; তবে তা আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে নয়, তাদের প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে। চতুর্থ দফায় দলীয় নেতা-কর্মীদের বিনা শর্তে মুক্তি চাওয়া হয়েছে। পঞ্চম দাবী হচ্ছে ডিজিটাল আইন বাতিল করা। কিন্তু বিএনপি’র সন্ত্রাসমূলক অপরাধ দমন আইন ডিজিটাল আইনের চেয়েও কঠোর ছিল এবং এই আইন বাতিলের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের দাবী আমলে নেওয়া হয়নি। সব বিরোধী দলেই নিপীড়নমূলক আইন বাতিলের দাবী করে থাকে, কিন্তু সরকারে গেলে তা ভুলে যায়। ১৯৭৪ সনে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রণীত বিশেষ ক্ষমতা আইনের বিরুদ্ধে বিএনপি, জামায়াতে ইসলাম, জাতীয় পার্টি সোচ্চার ছিল, কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে কোন দল এই আইন বাতিল করেনি। ষষ্ঠ দফায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস ও পানির মূল্যবৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। সপ্তম দফায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার দাবী করা হয়েছে। বিশ্বের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করা হলে বিএনপি এই মুহূর্তে ক্ষমতায় গিয়েও জিনিসপত্রের দাম কমাতে পারবে বলে মনে হয় না। অষ্টম দফায় দুর্নীতি চিহ্নিত করতে একটি কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে; অথচ বিএনপি খালেদা জিয়া ও তার সন্তানদের বিরুদ্ধে প্রমাণিত দুর্নীতি স্বীকার করে না। নবম দফায় গুমের সাথে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনতে দাবী করা হয়েছে। দশম দফায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে সরকারি হস্তক্ষেপ পরিহার করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পুলিশ এবং প্রশাসনকে সব দলীয় সরকারই নিজেদের আজ্ঞাবহ করে রাখে—বিএনপিও অতীতে করেছে, ক্ষমতায় গেলে ভবিষ্যতেও তারা আবার তাই করবে।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি শুধু পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি রাজনৈতিক দল নয়, এদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে বৈরিতা বেশী। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, তর্ক-বিতর্ক, হুমকি-পাল্টা হুমকি, সরকার পতনের ডেডলাইন—কত কিছুই না ঘটে চলেছে। এমন বৈরিতা সৃষ্টির কারণও রয়েছে। একদিকে আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকার করে না, অন্যদিকে বিএনপি ষষ্ঠ সংসদে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনি কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদকে বিরোধীদলীয় নেতা বানিয়েছে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছিলো তার সাথে জিয়াউর রহমানের সংশ্লিষ্টতার কথা প্রমাণিত, বিএনপি স্বাধীনতাবিরোধীদের মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী করেছে, তাদের বাড়ি-গাড়িতে উড়েছে স্বাধীন দেশের পতাকা। জেনারেল জিয়া-পর্বে সামরিক আদালতে উল্লেখযোগ্য সেনাসদস্যের ফাঁসি হওয়ায় একটি বিরাট অভিঘাত মুক্তিযুদ্ধের উপর পড়েছে; সামরিক অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সেনাবাহিনীতে কর্মরত অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধাকে জিয়াউর রহমানের আমলে মেরে ফেলা হয়েছে। মুফতি হান্নানের নেতৃত্বে পরিচালিত ২১শে অগাস্টের গ্রেনেড হামলায় বিএনপি নেতার সংশ্লিষ্টতা আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিএনপি এই গ্রেনেড হামলার সুবিচারের পথ নানাভাবে বাধাগ্রস্তও করেছে। আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করার এমন দৃশ্যমান ঘটনায় বিএনপি’র সম্পৃক্ততা থাকায় দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিদ্বেষ আর প্রতিহিংসা এখন স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে।
মুক্তিযুদ্ধ থেকে জিয়াউর রহমানকে যত বেশী সরানোর চেষ্টা করা হয়েছে তত বেশী লাভবান হয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা। মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমাণ্ডারকে নেতৃত্বের শীর্ষে রেখে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। দুই দলের এই বৈরিতা সরকারের কর্মকাণ্ডেও প্রতিফলিত হতে থাকে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরটি আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদ এম এ হান্নানের নামে নামকরণ করা হয়েছিল। বিএনপি ক্ষমতায় এসে ২০০৫ সনে এম এ হান্নানের নাম বাতিল করে ১৮ শতাব্দীর আওলিয়া শাহ আমানতের নামে নামকরণ করে। অথচ জিয়াউর রহমানের পূর্বে এই এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণা কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে পাঠ করেছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বিএনপি’র এই অপকর্মের প্রতিশোধ নিলো, রাজধানী ঢাকার কুর্মিটোলায় অবস্থিত ‘জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ হয়ে গেল ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’। এই ক্ষেত্রে উভয় রাজনৈতিক দলই নামকরণে ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়েছে, দুই দলই দুই জন সর্বজনশ্রদ্ধেয় আওলিয়াকে বেছে নিয়েছেন যাতে জনমনে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি না হয়, সরকার পরিবর্তন হলেও নতুন নামকরণ অক্ষুণ্ণ থাকে। এভাবে আস্তে আস্তে রাজনীতি থেকে সৌজন্য ও সহনশীলতা বিলীন হয়ে গেছে।
মনে হচ্ছে প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে দা-কুমড়োর সম্পর্ক অব্যাহতভাবে আরো অবনতিশীল হতে থাকবে এবং এর ফলে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলও পরাজিত বিএনপি বা আওয়ামী লীগ কখনো মেনে নেয়নি এবং মেনে নেয়নি বলেই বিরোধী দলের সাংসদগণ সংসদে যোগ দিতেন না। নির্বাচনে অনিয়ম, জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ দিয়ে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে নামিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিরোধীপক্ষ অতীতেও আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, এখনো করছে, ভবিষ্যতেও করবে। দেশের সংবিধান অনুযায়ী রাজনীতির লক্ষ্য গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং জনকল্যাণ। কিন্তু ভোটারের ভোট দেওয়ার অধিকার কোন সরকারের আমলেই নিশ্চিত করা হয়নি। ২০১৮ সনের নির্বাচনে কারচুপি না হলে সম্ভবত আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন হতো না। অবশ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে বিএনপি এবং রাজনীতির খপ্পরে পড়ে এই ব্যবস্থাটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। বিএনপি’র সাংসদদের পদত্যাগের ঘোষণায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সুযোগও আর থাকল না। উদ্ভূত সমস্যার সমাধানের সহজ পথ দেখা যাচ্ছে না, এক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করার একটি পথ এখনো খোলা আছে, যে সরকারে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীরা বিএনপি’র প্রতিনিধিত্ব করবেন।