তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবির পক্ষে বিএনপি জনমত গঠনের লক্ষ্যে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে জনসভার আয়োজন করে চলছে। প্রথম জনসভার আয়োজন করেছিল চট্টগ্রামে। ঐ জনসভায় প্রচুর লোকের সমাগম হয়। পরবর্তীকালে বিএনপি যে সকল বিভাগীয় শহরে জনসভা আহ্বান করেছে সেই সকল বিভাগে পরিবহণ মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো বাস চলাচল বন্ধ রেখেছে। সরকার বলছে, বাস বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে তাদের কোন হাত নেই। বাসমালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, তাদের পূর্বের কতগুলো দাবী এখনো পূরণ করা হয়নি বিধায় তারা পরিবহণ ধর্মঘট ডাকতে বাধ্য হচ্ছে। পরিবহণ শ্রমিকদের যে সকল দাবী এখনো পূরণ করা হয়নি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, আন্তঃজেলা সড়কগুলোতে কম গতির ছোট ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধ করা। কমগতির এই পরিবহণ চলাচল করলে দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। শ্রমিক-মালিক সমিতির দাবী যুক্তিসঙ্গত। এই সকল ধীরগতির যানবাহন বন্ধ রাখার পক্ষে সড়ক ও যোগাযোগমন্ত্রীও এক সময় অবস্থান নিয়েছিলেন। কিছুদিন এই সকল যানবাহনের চলাচল বন্ধও ছিল, কিন্তু সরকারের শিথিলতায় এখন আবার পুরোদমে চলছে।

বাসমালিক ও শ্রমিকদের এই ধর্মঘটের পেছনে সরকারের ইন্ধন রয়েছে বলে জনগণ বিশ্বাস করে। জনসভায় জনগণের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সঙ্গে একেবারেই বেমানান। আগে বিএনপি’র সমাবেশ মিডিয়ায় যতটুকু গুরুত্ব পেতো, সমাবেশস্থলে নেতা-কর্মীদের আসতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ বর্তমানে তার চেয়ে বেশী গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে আওয়ামী লীগ এবং সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, লাভবান হচ্ছে বিএনপি। অন্যদিকে পরিবহণ ধর্মঘট করে বিএনপি’র কর্মী এবং সমর্থকদের জনসভায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখাও সম্ভব হচ্ছে না। বিএনপি’র নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা রিক্সা, ইজিবাইক কিংবা পায়ে হেঁটে যে যেভাবে পারছেন জনসভা অভিমুখে ছুটছেন। বিএনপি বহু বছর ক্ষমতার বাইরে, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে, যে কোন ত্যাগ স্বীকারে তারা এখন প্রস্তুত। এক্ষেত্রে শুধু ক্ষমতার মোহ নয়, বিভিন্ন মামলা থেকে কর্মীদের মুক্তি দিতে হলেও বিএনপি’র ক্ষমতায় যেতে হবে। তাই সামনের দিনগুলোতে রাজনীতির গতিপথ উত্তেজনাপূর্ণ হবে।

বিভিন্ন জনসভায় বিএনপি খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি চাচ্ছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবী করছে, জ্বালানি তেল ও জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতির নিয়ন্ত্রণ এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও পুলিশি হয়রানি বন্ধ করতে বলছে। পুলিশি হয়রানি বন্ধ হবে বলে মনে হয় না; আন্দোলন যত ঘনীভূত হবে পুলিশি হয়রানি তত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করার যে দাবী বিএনপি করছে তা নিয়ে আরেকটি কলাম লেখার ইচ্ছে আছে। জ্বালানি তেল ও জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণ করার দাবী নিয়ে পৃথিবীর বহু দেশের বিরোধী দল আন্দোলন করছে। বিএনপিও করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি রোধ করতে না পারার কারণে গত কয়েক মাসে বৃটেনে তিনবার প্রধানমন্ত্রীর বদল হয়েছে। জিনিসপত্রের দাম কমাতে না পারার কারণে প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস মাত্র ৪৫ দিন ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন। জার্মানির অবস্থা আরও খারাপ। সমগ্র ইউরোপে অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। তাই আন্দোলন করে জিনিসপত্রের দাম কমানো যাবে না। বিএনপি এবং জাতীয় পার্টিও আগে দেশ শাসন করেছে। বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি যে আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি দক্ষতার সঙ্গে দেশ চালিয়েছিল তা কিন্তু নয়। বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি যে সকল অভিযোগ এখন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপন করছে, তার প্রায় সবগুলো অভিযোগ বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির সরকারের বিরুদ্ধেও উঠেছিল। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ হচ্ছে দুর্নীতি; বিএনপি’র আমলেও দেশ কয়েকবার দুর্নীতিতে সারা বিশ্বে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

খালেদা জিয়ার মামলা প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ১৯৯১ সনে সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায় ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল’ নামে একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলার পর তাতে একজন সৌদি দাতার কাছ থেকে ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকার অনুদান আসে। দুই বছর পর খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান তার ফুপাতো ভাই মমিনুর রহমানকে নিয়ে ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ গঠন করে তা যথারীতি নিবন্ধন করান। মমিনুর রহমান হচ্ছেন ট্রাস্টের ট্রাস্টি। ১৯৯৩ সনে সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখার উক্ত সঞ্চয়ী হিসাব থেকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা একই ব্যাংকের গুলশানের আরেকটি শাখার একটি এসটিডি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। একই বছর অ্যাকাউন্ট থেকে ৪ লাখ টাকা তুলে তা দিয়ে বগুড়ায় জমিও কেনা হয়। তারপর তারেক রহমান এবং ট্রাস্টি মমিনুর রহমানের যৌথ স্বাক্ষরে ২০০৬ সনে কয়েকটি চেকের মাধ্যমে সর্বমোট ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় স্থানান্তরপূর্বক বিএনপি’র সাবেক এমপি কাজী সলিমুল হক এবং ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদের ছেলে সৈয়দ আহমেদের নামে এফডিআর করা হয়। এই এফডিআর আবার গিয়াস উদ্দিন আহমদের নামে স্থানান্তর হয়। এরপর আবার এফডিআর ভেঙে শরফুদ্দিনের অ্যাকাউন্টে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা জমা করা হয়। এই সকল স্থানান্তরকে দুদক কর্তৃক অর্থ আত্মসাৎ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; কারণ ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল’ হচ্ছে সরকারি অ্যাকাউন্ট, এই সরকারি অ্যাকাউন্ট থেকে পরবর্তীতে নানা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তরিত হয়েছে। এই স্থানান্তরের অভিযোগে দায়ের করা হয় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা। এই মামলায় খালেদা জিয়ার ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। আরেকটি মামলায়ও খালেদা জিয়ার ৭ বছর জেল হয়েছে। কারণ ‘জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’-এর নামে আরেকটি অ্যাকাউন্টে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়; কিন্তু কে এই টাকা দিয়েছে বা কোথা থেকে এই টাকা এসেছে তার কোন উৎস খুঁজে না পেয়ে দুদক এই মামলা দায়ের করেছিল।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা মোতাবেক সাজা স্থগিত রেখে খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে তার নিজ বাড়িতে থাকার অনুমতি দিয়েছে সরকার। শর্তভঙ্গ করলে যে কোনো সময় স্থগিতাদেশ বাতিল করে খালেদা জিয়াকে আবার জেলে পাঠাতে পারে। ৪০১ ধারার অধীনে সরকার দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির আবেদনক্রমে শাস্তি মওকুফও করতে পারে, কিন্তু সরকারের দেওয়া মওকুফ দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নির্দোষ করে না। তাই ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় খালেদা জিয়া মুক্তি পেলেও কিছু নাগরিক অধিকার হারাবেন; যেমন তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না, তার নামে কোন পাসপোর্ট ইস্যু করা হবে না ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, সরকার কর্তৃক ৪০১ ধারায় মুক্তি দেওয়া হলে আদালতের প্রশ্ন উত্থাপনেরও সুযোগ থাকে। নির্দোষ হতে হলে খালেদা জিয়াকে আপিল আদালত থেকে মুক্তি পেতে হবে অথবা তাকে আদালতের রায় মেনে নিয়ে সংবিধানের ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতির নিকট মার্সি পিটিশন করে মওকুফ পেতে হবে। আমাদের সংবিধানের ৪৯ ধারা মোতাবেক রাষ্ট্রপতি কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করার এখতিয়ার ও ক্ষমতা রাখেন। রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ মোতাবেক ক্ষমতা প্রয়োগ করে মুক্তি দিলে আদালতের প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ থাকে না।

শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নির্বাহী ক্ষমতার আওতায় দণ্ড হ্রাস ও মওকুফ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৩৭ জনকে কারামুক্তির আদেশ দিয়েছিলেন। তিনি ক্ষমতা ত্যাগের এক দিন আগে ১১ জন দণ্ডিত ব্যক্তির দণ্ড মওকুফ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে শুধু ট্রাম্পের আমলে নয়, সব প্রেসিডেন্টের আমলেই নির্বাহী ক্ষমতাবলে কমবেশি দণ্ডিত ব্যক্তিকে মুক্ত করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির ক্ষমতায় থাকাকালীন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংবিধানপ্রদত্ত ক্ষমতার প্রয়োগ হয়েছে। ১৯৮৭ সনে রাষ্ট্রপতির মওকুফসংক্রান্ত সাংবিধানিক ক্ষমতাটি সর্বপ্রথম প্রয়োগ করেন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। আদালতের রায় নির্বাহী ক্ষমতাবলে হ্রাস বা সম্পূর্ণ পাল্টানো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অবশ্য নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। অনেকের অভিমত হচ্ছে, নির্বাহী ক্ষমতায় শাস্তি মওকুফ করা হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়। আবার অনেকের অভিমত হচ্ছে, রাজনৈতিক কারণে শাস্তি মওকুফে নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োগ হলে তা ন্যায়সঙ্গত বলে বিবেচনা করা যায় না। তবে করুণা বা অনুকম্পা প্রদর্শনে ন্যায়-অন্যায় কখনো বিচার্য হয় না। রাষ্ট্র যেমন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে, তেমনি ক্ষমা করার সিদ্ধান্তও নিতে পারে। সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন এবং সংবিধানের স্থান অন্য সব আইনের ঊর্ধ্বে। দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট পার্ক জিউন হাইকে ক্ষমা করেছেন পরবর্তীকালের প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি একাধিকবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তিনি বিরোধী দলের নেত্রীও ছিলেন। দেশের অন্যতম বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের তিনি প্রধানও। তাই খালেদা জিয়া মার্সি পিটিশন করতে রাজী হলে তা হয়ত রাষ্ট্রপতি বিবেচনা করতেও পারেন।

প্রতিটি সরকারের আমলে একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ফলে দেশ বৃত্তবদ্ধ লাটিমের মতো ঘুরতে ঘুরতে স্থবির হয়ে যাচ্ছে। জনগণ উত্তরণ চায়। বিশ্বের অর্থনৈতিক দুরবস্থায় বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের হাঁকডাকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি গরম হতে শুরু করেছে। হানাহানি চরম আকার ধারণ করতে পারে, কারণ আওয়ামী লীগের কথিত ‘কোমরভাঙ্গা’ বিএনপি উঠে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি’র আন্দোলনকে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে সরকার এবং আওয়ামী লীগকে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। কারণ এক হাসিনাকে দিয়ে আওয়ামী লীগের ইমেজ অক্ষুণ্ণ রাখা যাবে না। আওয়ামী নেতারা যতই হম্বিতম্বি করুন না কেন, তৃণমূলে বিএনপির নেতা-কর্মীরা এখন আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশী সরব ও সক্রিয়। ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন নেতারা কর্মীদের তোষামোদী আচরণে আওয়ামী লীগের নেতারা অকর্মক হয়ে উঠেছেন। জাতীয় সংসদের বিগত নির্বাচনে সংঘটিত কারচুপি আওয়ামী লীগকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে রেখেছে। বিএনপি প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। পরিস্থিতি হানাহানির দিকে যাচ্ছে। হানাহানি যত চরম আকারই ধারণ করুক না কেন, সমস্যার সমাধান করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেই; কারণ রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত একটি দ্বিমুখী সমাজে চরম অস্থিরতায় তৃতীয় পক্ষের নাক গলানোর সম্ভাবনা এবার খুব কম।