আহসানউল্লাহ মাস্টার ১৯৯৬ এবং ২০০১ সনে জাতীয় সংসদের নির্বাচনে গাজীপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সনে ডিগ্রি পাস করার পর তিনি টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি একই বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব আমৃত্যু পালন করেন। রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি হিসেবে তিনি তার ছাত্রজীবনে ছেষট্টির ৬ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। জাতীয় সংসদে জনপ্রতিনিধিত্ব করা ছাড়াও তিনি ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচনেও অংশ নিয়েছেন; ১৯৮৩ ও ১৯৮৮ সনে পুবাইল ইউনিয়নে দুইবার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন এবং ১৯৯০ সনে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি এত জনপ্রিয় ছিলেন যে, প্রার্থী হয়ে কোন নির্বাচনে তিনি হারেননি, প্রতিটি নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন বিপুল ভোটের ব্যবধানে। আহসানউল্লাহ মাস্টার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি টঙ্গির শিক্ষক সমিতির সভাপতিও ছিলেন।
২০০৪ সনের ৭ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য একটি বিষাদময় দিন, এই দিনে গাজীপুর-২ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ আহসানউল্লাহ মাস্টারকে সন্ত্রাসীরা ব্রাশফায়ার করে খুন করে। টঙ্গীস্থ নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্বেচ্ছাসেবক লীগের একটি কর্মীসভায় প্রকাশ্য দিবালোকে আহসান উল্লাহ মাস্টারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামাত জোট সরকার। মৃত্যুসংবাদ প্রচার হওয়ার পর জয়দেবপুর-টঙ্গির জনতা রাস্তায় নেমে আসেন, জনতার শোকবিহ্বল হৃদয়ে যে বহ্নিশিখা জ্বলছিলো তা একটি বিরাট দাবদাহ তৈরি করে, পুলিশের গুলিতে শোকসন্তপ্ত দুইজন ভক্তের জীবনাবসান হয়।
২০০৫ সনে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার রায়ে প্রধান আসামি বিএনপি নেতা নূরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ছয় জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৬ সনে হাইকোর্ট ডিভিশন ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ৮ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে ১১ জনকে খালাস দেয়। এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান সাক্ষীকেও বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এখনো মামলাটি আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে।
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ছাড়াও এই উপমহাদেশে আরও বহু হত্যাকাণ্ড হয়েছে। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। জাতীয় চার নেতাকে সুপরিকল্পিতভাবে জেলের ভেতর হত্যা করা হয়। জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনীর লোক হত্যা করে। মহাত্মা গান্ধীকে ১৯৪৮ সনে হিন্দু মৌলবাদী যুবক নাথুরাম গডসে গান্ধীর রাত্রিকালীন পথসভায় গুলি করে হত্যা করে। পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে ১৯৫১ সনে রাওয়ালপিণ্ডির এক জনসভায় বক্তৃতাকালে গুলি করে খুন করা হয়। ১৯৮৪ সনে ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করে তারই শিখ দেহরক্ষী। রাজীব গান্ধীকে হত্যা করে তামিল টাইগার্সের এক নারী সদস্য। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ২০০৭ সনে রাওয়ালপিণ্ডিতে আত্মঘাতী এক বোমা হামলায় নিহত হন। ১৯৫৯ সনে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী সলোমান বন্দরনায়েক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর হাতে খুন নিহত হন। ১৯৮৮ সনে শ্রীলঙ্কার বিখ্যাত রাজনীতিবিদ কুমারাতুঙ্গাকে তার বাড়ির বাইরে মাথায় গুলি করে হত্যা করেছিল লিওনেল রানাসিংহ ওরফে গামিনী। ১৯৯৩ সনে মে দিবসের শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি রানাসিংহে প্রেমাদাসা এলটিটিই পরিচালিত আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন। ১৯৬৪ সনে হত্যা করা হয় ভুটানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জিগমে পালদেন দোরজিকে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কালিদাসপুরে ১৯৯৯ সনে একটি স্কুল মাঠে আয়োজিত এক সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় প্রথম প্রকাশ্য দিবালোকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জাসদের প্রতিষ্ঠাতা কাজী আরেফ আহমেদকে। শহীদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’র সক্রিয় সদস্য ছিলেন কাজী আরেফ। হত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট তিন জনের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। ১৯৯২ সনে ওয়ার্কার্স পার্টির তোপখানা কার্যালয়ের সম্মুখে রাশেদ খান মেননকে হত্যার জন্য গুলি করা হয়, গুরুতর আহত মেননকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সিএমএইচ, লণ্ডনের কিংস কলেজ হাসপাতাল এবং ব্যাংককের একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা করা হয়। মামলা এখনো চলছে। হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক জনসভায় বক্তৃতা দিয়ে স্কুল গেট দিয়ে বের হয়ে আসার সময় দুটি আর্জেস গ্রেনেড নিক্ষেপ করে অর্থনীতিবিদ, কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শাহ এ এম এস কিবরিয়াকে হত্যা করা হয়। অভিযোগ থেকে জানা যায়, বিএনপি সরকারের কাছে প্রাণ থাকতে তাকে দ্রুত ঢাকায় আনার জন্য হেলিকপ্টার চেয়েও পাওয়া যায়নি, হেলিকপ্টার দেওয়া হলে হয়ত তিনি বেঁচে যেতেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা শাহ এএমএস কিবরিয়ার হত্যাকাণ্ডের বিচার ১৭ বছর পার হলেও এখনো শেষ হয়নি, সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। বিএনপি সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং খালেদা জিয়ার সাবেক উপদেষ্টা সদ্য প্রয়াত হারিছ চৌধুরী অন্যতম অভিযুক্ত আসামি।
ভাওয়াল বীর আহসানুল্লাহ মাস্টার ছিলেন একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, শ্রমিকনেতা, রাজনীতিবিদ ও আইনপ্রণেতা। একাত্তরে তিনি অস্ত্র হাতে জীবন বাজি রেখে সম্মুখসমরে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। পাকিস্তানি সেনারা একাত্তরের পঁচিশে মার্চ ট্যাঙ্ক ও গোলাবারুদ নিয়ে বাঙালি জাতির উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই রাতেই বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু এর পূর্বেও বাঙালিরা পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রতিরোধ করার সাহস দেখিয়েছে। জয়দেবপুর সেনানিবাসের বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে উনিশে মার্চ পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকা থেকে রওনা দিলে টঙ্গিতে এসে নানা বাধার সম্মুখীন হয়, গাজীপুরের সাধারণ জনতা পথে পথে ব্যারিকেড তৈরি করে তাদের সহজ গতিপথ রুদ্ধ করে দেয়। সাধারণ জনতার এই প্রতিরোধ সংগ্রামে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আহসানউল্লাহ মাস্টার। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার আগেই পাকিস্তানি সেনারা তাকে আটক করে নির্দয়ভাবে নির্যাতন করে; পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনে আহত অবস্থায় তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতে পালিয়ে যান।
আহসানউল্লাহ মাস্টার বেশি পরিচিত ছিলেন শ্রমিকনেতা হিসেবেই। জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ সনে তিনি শ্রমিকদের নামে ৯টি বস্ত্রকল শ্রমিকদের পয়সায় ক্রয় করে সমবায় পদ্ধতিতে পরিচালনা করে সফল হয়েছিলেন। শ্রমিক লীগের সভাপতি থাকাকালীন তার সাথে আমার দেখা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিবিএ’র সাথে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সম্পর্কের অবনতি হলে শ্রমিক লীগের সভাপতি আহসানউল্লাহ মাস্টারের সাথে বৈঠক হয়। তিনি সিবিএ’কে প্রশ্রয় না দিয়েও তাদের রক্ষা করেছিলেন। শ্রমিকদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে নেতাকে অনেক বেশি ধৈর্যশীল ও কৌশলী হতে হয়, আহসানউল্লাহ মাস্টারের ক্ষেত্রে সেই নেতৃত্বগুণ ছিল। শ্রমিকদের অন্যায় আবদারের প্রশ্রয় না দিয়েও তিনি শ্রমিকস্বার্থ রক্ষায় একনিষ্ঠ ছিলেন। কোন প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় তিনি কখনো অযাচিত হস্তক্ষেপ করেননি। এতদসত্ত্বেও শ্রমিকেরা ছিল তার প্রতি অন্তঃপ্রাণ। যেদিন তাকে প্রকাশ্য জনসভায় হত্যা করা হয় সেদিন সারা বাংলাদেশ বিশেষ করে গাজীপুরের শ্রমিকেরা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করেছিল তা ছিল অভূতপূর্ব।
আহসানউল্লাহ মাস্টারের ছেলে জাহিদ আহসান রাসেল এখন গাজীপুর-২ আসনের সাংসদ এবং বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য। গাজীপুরে এখনো আহসানউল্লাহ মাস্টারকে স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। আমি যখন সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন বা টাকশালের নির্বাহী প্রধান ছিলাম তখন আহসানউল্লাহ মাস্টারের নামে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন প্রভৃতি টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হতো, সেই সকল আয়োজনে দলমত নির্বিশেষে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতেন। তার নাম অনুসারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ছাত্র হল এবং ডুয়েট অডিটোরিয়ামের নামকরণ করা হয়েছে, টঙ্গিতে তার নামে একটি স্টেডিয়াম, একটি উড়ালসেতু এবং জয়দেবপুরে একটি হাসপাতাল নির্মিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ অবদানের জন্য তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। আমার বাবা আবদুর রশীদ মাস্টারও ছিলেন ফেনী জেলার জিএমহাট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক, ১৯২৬ সনে তিনি স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। আমার বাবার মতো শিক্ষক আহসান উল্লাহর নামের সাথেও ‘মাস্টার’ শব্দটি জড়িয়ে গেছে, আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ সব শিক্ষা সার্টিফিকেটে লেখা আছে ‘আবদুর রশীদ মাস্টার’। তদ্রূপ আহসান উল্লাহ এমপি হলেও তিনি ছিলেন শিক্ষক, ‘মাস্টার’ না বললে দেশবরেণ্য এই রাজনীতিবিদকে কেউ চিনে না। এরা কর্মজীবনে শিক্ষক হিসেবেই পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন।
টাকশালের নির্বাহী প্রধান হয়ে আমি আমার কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে এই মহান শিক্ষকের বাড়ি দেখতে গিয়েছিলাম; স্কুলের সাথে লাগানো একটি সাধারণ ঘর। আহসান উল্লাহ মাস্টার ছিলেন সৎ, নির্লোভ, নিরহঙ্কারী একজন নীতিবান মানুষ। তিনি সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে অহর্নিশ সোচ্চার ছিলেন। টঙ্গি থেকে মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলে তার কঠোর অবস্থানের কারণে তাকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন বলে তিনি কখনোই অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির কাছে মাথা নত করেননি। আদর্শিক কারণে কারো নিকট শত্রু হিসেবে গণ্য হলেও হত্যাকাণ্ডের শিকার হবেন—এই কথাটি তিনি বিশ্বাস করতেন না। গণমানুষের নেতাদের শারীরিক মৃত্যু হলেও তারা বেঁচে থাকেন মানুষের হৃদয়ে, এখানে গুলি চলে না, এখানে সন্ত্রাসীর ব্রাশফায়ার অচল। আহসানউল্লাহ মাস্টারের জন্ম ১৯৫০ সনের ৯ নভেম্বর। আসছে জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা রইল।