সম্প্রতি এক সচিবসহ পাঁচ সরকারি কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। আনুষ্ঠানিকভাবে এর কারণ জানানো হয়নি বলে বিশ্লেষকরা নানা বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন। অনেকের ধারণা, বিরোধী দলের সাথে যোগাযোগ থাকার সন্দেহ থেকে হয়তো তাদের অবসরে পাঠানো হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মো. মকবুল হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর কারণ তার মন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদও জানেন না। কিন্তু সচিব মকবুল হোসেন ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করতেন এবং তিনি বঙ্গবন্ধুর ভক্ত। দুই দিন পর পুলিশ সুপার পদমর্যাদার তিন কর্মকর্তাকে পুনরায় বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী এদের দেশের প্রতি মমত্ববোধ নেই। সরকারি আদেশে বলা হয়েছে, চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর জনস্বার্থে তাদের অবসরে পাঠানো হলো। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সহিদুল ইসলামের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও দুই মাস পূর্বে বাতিল করা হয়েছে। তার রাষ্ট্রদূত থাকা অবস্থায় র‍্যাব এবং এর সাবেক ও কর্মরত সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধের কারণে সহিদুল ইসলামের উপর ক্ষুব্ধ সরকার।

বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর একটি কাহিনী আমাদের পরিবারেও ঘটেছে। সদ্য প্রয়াত আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদকে বিএনপি’র আমলে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। তিনি ১৯৬৭ সনে পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগদান করেন, তার ব্যাচমেটদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন, মিজানুর রহমান শেলী, ড. আকবর আলী খান এবং ড. তওফিক এলাহী চৌধুরী বীর বিক্রম। একাত্তরের পহেলা আগস্ট আমার ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ সরকারের আনুগত্য স্বীকার করেন; সমগ্র ইউরোপে তিনিই প্রথম কূটনৈতিক যিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন। তিনি আরও একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাহাত্তরের ৮ জানুয়ারি লণ্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। বিমান অবতরণের মাত্র এক ঘণ্টা পূর্বে বৃটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুর বিমানে থাকার বিষয়টি অবহিত করে। আমার মেজো ভাই ছুটে যান হিথ্রো বিমানবন্দরে এবং বঙ্গবন্ধুকে রিসিভ করেন। আমরা বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছি ১০ জানুয়ারি, আমাদের পাওয়ার দুইদিন আগে আমার মেজো ভাই বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পেয়েছিলেন। তখনো তাঁর পরিবারের কেউ বঙ্গবন্ধুর লন্ডনে আগমনের কথা জানেন না, তাদের জানানো হয় হোটেলে গমনের পর।

আমার এই ভাইকে এরশাদ সাহেবের আমলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে বদলি করে দেওয়া হয়। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাত আটটায় হঠাৎ আমার ভাইকে ডেকে পাঠান; সেই মুহূর্তে আমার ভাই তার দুইজন বিদেশি মেহমান নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে ডিনার করছিলেন, আমার ভাই ছিলেন হোস্ট। মেজো ভাই ডিনার শেষ করে যাওয়ার অনুমতি চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তা নাকচ করে দিয়ে তক্ষুনি যেতে আদেশ করেন। ‘সরি স্যার, আমার অতিথিকে রেখে চলে গেলে তাদের অপমান করা হবে, কারণ তাদের আমি দাওয়াত দিয়ে এনেছি’—মেজো ভাইয়ের এই উত্তরের পর তাকে পরদিন কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ে বদলি হন এবং সেখানে কর্মরত অবস্থায় বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে জাতিসংঘের উপস্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিউইয়র্কে প্রেরণ করেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই নোয়াখালীর জিয়াউল হক জিয়াসহ বিএনপি’র কয়েকজন সাংসদ নিউইয়র্কে বেড়াতে যান; তারা মেজো ভাইয়ের অফিসে গিয়ে দুইটি ফটো দেখতে পান—একটি নূর হোসেনের এবং অন্যটি বিচারপতি শাহাবুদ্দিন, খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার বিশেষ ভঙ্গির একটি ছবি, ছবিতে দেখা যাচ্ছে খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা ঘোমটা দিচ্ছেন। এই দুইটি ছবি রাখার অভিযোগে চাকরির ২৫ বছর পূর্তির পর আমার ভাই মহিউদ্দিন আহমেদকে খালেদা জিয়া অবসরে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু মামলা করে আমার ভাই পুনরায় চাকরিতে যোগ দিতে পেরেছিলেন।

বিএনপি সরকার তখন অসংখ্য কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছিল। সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হলে কোন কারণ দর্শানো ছাড়াই যে কোন কর্মচারীকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাতে পারে সরকার। তখন শফিক রেহমানের ‘যায়যায়দিন’ সাপ্তাহিকে এই বাধ্যতামূলক অবসর নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। শফিক রেহমান বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার পক্ষে বলতে গিয়ে আমেরিকার উদাহরণ দিয়েছিলেন; তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, আমেরিকায় নির্বাচনে যে দল ক্ষমতায় আসে তারা পূর্বের সকল আমলাকে বিদায় দিয়ে তাদের সমর্থক আমলা নিয়ে প্রশাসন সাজায় যাতে তাদের কর্মসূচীর বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত না হয়। একইভাবে বিএনপি’র কর্মসূচী বাস্তবায়নে বিএনপি’র আমলা ব্যতীত বাকি সকল আমলাকে ছাঁটাই করা দরকার বলে শফিক রেহমান তার লেখায় উল্লেখ করেছিলেন। এই মতামত দিয়েও একই লেখায় তিনি কিন্তু আমার ভাই মহিউদ্দিন আহমেদকে অবসরে পাঠানোকে সমর্থন করেননি। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, মহিউদ্দিন আহমেদের মতো মেধাবী, দুর্নীতিমুক্ত এবং নীতিবান কর্মকর্তা তিনি খুব কম দেখেছেন।

বিরোধী দল থেকে মাঝে মাঝে সরকারি কর্মকর্তা এবং পুলিশদের প্রতি হুমকি দেওয়া হয়—সরকারের কথা শুনে বিরোধী দলের প্রতি সহনশীল ও নমনীয় আচরণ না করলে ক্ষমতায় এসে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যে দল ক্ষমতায় থাকে তারা মনে করে সকল কর্মচারী সরকারের আজ্ঞাবহ, সরকারের আদেশ-নির্দেশ পরিপালন করাই তাদের মুখ্য কাজ। আর যারা বিরোধী দলে থাকে তারা মনে করে, সকল কর্মচারী প্রজাতন্ত্রের, সরকারের নয়। মধ্যখানে বিপদে পড়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। কোন দলীয় সরকারের আমলে এসপি বা ডিসি হলে পরবর্তীকালে ভিন্ন দলীয় সরকারের নিপীড়নের শিকার হতে হয় তাদের। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমার এক ক্লাসমেটের উপজেলা নির্বাহী অফিসার পদে পোস্টিং হয়েছিল টুঙ্গিপাড়ায়, বিএনপি’র আমলে তাকে নাজেহাল করা হয়। পুলিশদের দায়-দায়িত্ব নিয়ে রাজনীতিবিদ অলি আহাদ তার লেখা ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫’ বইটিতে পুলিশের লাঠিপেটার একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন; সম্ভবত পাকিস্তান আমলে তার দলের কোন একটি মিছিলে পুলিশ লাঠিপেটা করে এবং অলি আহাদ আহত হন। যে পুলিশ তাকে পিটিয়েছে তাকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় গেলে আমি তোমাকে দেখে নেব’। প্রত্যুত্তরে উক্ত পুলিশ বলেছিল, ‘আপনি ক্ষমতায় গেলে আপনার নির্দেশে আপনার বিরোধী পক্ষের নেতা-কর্মীদের ঠিক এভাবে পেটাবো’।

সরকারের কর্মচারীদের নিরপেক্ষতা বলে প্রকৃতপক্ষে কিছুই নেই। সরকারের আদেশ-নির্দেশ পালন এবং কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করার জন্য বেতন দেওয়া হয়, বিরোধী দলের কথা শোনার জন্য নয়। এই নীতি সকল দলীয় সরকারের আমলেই পালনযোগ্য। সরকার ভুল নির্দেশ দিলেও তা অমান্য করার ক্ষমতা অধস্তন কর্মচারীর কখনোই ছিল না, এখনো নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না। দলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা কোন সাংসদও করতে পারে না; দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে একজন সাংসদ আর সাংসদ থাকতে পারেন না। সংসদে একজন জনপ্রতিনিধির মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেখানে নেই সেখানে সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাকে নিরপেক্ষ থাকার সবক দেওয়া অর্থহীন। তারপরও সব সরকারের আমলে আমলাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, ওএসডি করা হয়েছে। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ১৯৭৩ সনের বিসিএস অফিসারদের গণহারে ওএসডি এবং অবসরে পাঠিয়েছিল। অনেক মেধাবী ছাত্রও তাদের শিক্ষাজীবনে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে, অনেক ছাত্রনেতা মেধার বদৌলতে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। চাকরিরত অবস্থায় তাদের কর্মকাণ্ড নিরপেক্ষ হলেও ভিন্ন দলীয় সরকারের আমলে তাদের হেনস্তার শিকার হতে হয়। অবশ্য এটাও ঠিক দলীয় পরিচয় নিয়ে অনেকে অন্যায্য সুবিধাও ভোগ করে থাকেন। সব সরকারের আমলেই ৪০০-৫০০ কর্মকর্তাকে ওএসডি করে বসিয়ে রেখে বেতন-ভাতাদি দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। এই মন্দ সংস্কৃতি থেকে আজ পর্যন্ত কোন সরকার বেরিয়ে আসতে পারল না।

প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ আইনানুযায়ী সরকারের প্রতি অনুগত থাকেন, নিরপেক্ষ থাকা প্রায় অসম্ভব। এদের নিরপেক্ষ রাখার জন্য নাগরিক অধিকার হরণ করে এই মর্মে আইন করা যেতে পারে যে, যারা ছাত্ররাজনীতি করবেন তারা সরকারি চাকরি পাবেন না, যারা সরকারি চাকরি করবেন তারা অবসরের পর জনপ্রতিনিধি হতে পারবেন না। অবসরের পর আমলাদের এমপি-মন্ত্রী বানানো থেকে সব দল বিরত থাকলে তারা চাকরিরত অবস্থায় সরকারের অনুগত থাকলেও তাদের দলীয় আনুগত্য কমে যাবে। অফিসে অফিসে শ্রমিকদের দলীয় রাজনীতিও বন্ধ করা জরুরি। এদের বেশিরভাগ কোন কাজ করে না, ঘুরে বেড়ায় আর অফিসে সংঘটিত দুর্নীতির সহায়তা করে। দলীয় পরিচয় না থাকলে দুর্নীতি কমবে, দাপট কমবে, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো বা ওএসডি করাও হ্রাস পাবে। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো একটি কালো আইন। কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উত্থাপন না করে, তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগ না দিয়ে অবসরে পাঠানো অবিচার ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে রাজনৈতিক কারণে অবসরে না পাঠিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অকর্মক কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠালে দেশ উপকৃত হবে এবং জনগণ খুশী হবে।