সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং নীলফামারী ও লালমনিরহাটের ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারাজ ও তিস্তার অববাহিকা পরিদর্শনে গিয়ে উপস্থিত স্থানীয় জনতাকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত আলোর মুখ দেখবে। চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না পাওয়ার ও চায়না রিভার ইয়েলো গত দুই বছর ধরে মাঠ পর্যায়ে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনার ড্রইং ডিজাইন সম্পন্ন করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। এই মহাপরিকল্পনার মুখ্য কাজ হচ্ছে নদী খনন, বাঁধ মেরামত, বাঁধ নির্মাণ এবং জমি পুনরুদ্ধার। নদীর দুই পাড়ে ২২০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করে রিভার ড্রাইভ তৈরি করা হবে। তিস্তার উভয় তীরে বনায়নের পরিকল্পনা ছাড়াও স্থাপন করা হবে ১৫০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প-কারখানা, ইপিজেড, ইকোনমিক জোন। মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিস্তার দুই পাড়ে স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার কথাও ভাবা হচ্ছে, যেখানে থাকবে হোটেল-মোটেল-রেস্তরাঁ ও পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটক এবং স্থানীয় লোকের চলাচল এবং ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহণের সুবিধার্থে চিলমারী বন্দর থেকে ডালিয়ায় তিস্তা বাঁধ অংশে তিনটি নৌ-টার্মিনালও তৈরি করা হবে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ভাটি থেকে তিস্তা-যমুনার মিলনস্থল পর্যন্ত নদীর বর্তমান প্রস্থ কমিয়ে ৭০০-১০০০ মিটারে সীমাবদ্ধ করা হবে এবং নদীর গভীরতা বাড়িয়ে ১০ মিটার করা হবে। তিস্তার বর্তমান প্রস্থ স্থানভেদে পাঁচ হাজার মিটারেরও অধিক। শুকনো মওসুমে পানির প্রবাহ অক্ষুণ্ণ রাখতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ভাটিতে জলাধার নির্মাণ করা হবে। এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্ভব হলে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে এবং তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনমান কিছুটা হলেও সমৃদ্ধ হবে।

ভারত এবং নেপাল থেকে উৎপন্ন যে নদীগুলো বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে সেই অভিন্ন নদীসমূহের উপর ভারত বাঁধ নির্মাণ করায় শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভারত শুষ্ক মওসুমে পানি আটকে রাখে বিধায় নদীর বাংলাদেশ অংশে স্রোতের তীব্রতা থাকে না, স্রোতের তীব্রতা না থাকায় তলদেশে পলি জমতে জমতে অসংখ্য ছোট নদী ইতোমধ্যে প্রকৃতিতে বিলীন হয়ে গেছে, বড় নদীগুলো অনেকটা ভরাট হয়ে গেছে। ফলশ্রুতিতে বৃষ্টি বা উজান দেশ ভারতের পানি নিজস্ব গতিপথে বহন করে সাগরে ফেলার সামর্থ্য নদীগুলোর আর নেই, শুধু বাংলাদেশ অংশে নয়, বাঁধ নির্মাণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বিঘ্ন ঘটায় ভারতের অংশেও নদীতে একই অবস্থার উদ্ভব হয়েছে। এই অবস্থায় বৃষ্টির সাথে বরফগলা পানি যুক্ত হওয়ায় সাম্প্রতিককালে ভারত এবং বাংলাদেশে বারবার ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানছে। আমাদের তিস্তা বাঁধও রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট এলাকার ভাঙ্গন ও বন্যার জন্য দায়ী। বাঁধের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে নিয়মিত ড্রেজিং করেও নদীর আদি অবস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় না। উপরন্তু সাম্প্রতিককালের বন্যার কারণ পর্যালোচনায় পরিলক্ষিত হয়েছে যে, মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে প্রকৃতি এখন আর স্বাভাবিক আচরণ করছে না, এজন্য এখন মরুভূমিতেও অসময়ে ভয়াবহ বন্যা হচ্ছে। এ বছর পৃথিবীর বহু দেশ, বিশেষ করে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও চীনকে ভয়াবহ বন্যার মোকাবিলা করতে হয়েছে। এবারের বন্যা মোকাবিলায় আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছিল।

হিমালয়ের ৭,২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চিতামু হ্রদ থেকে এই তিস্তা নদীর উদ্ভব। হিমালয়ের এই অংশটি ভারতের সিকিমে অবস্থিত। পার্বত্য এলাকা পার হয়ে এই নদী দার্জিলিং হয়ে পশ্চিমবঙ্গের সমভূমিতে প্রবেশ করেছে। এই নদীটিই নীলফামারী জেলার কালীগঞ্জ সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তিস্তা নদী প্রাথমিক অবস্থায় জলপাইগুড়ির দক্ষিণে করতোয়া, পুনর্ভবা, আত্রাই এই তিনটি ধারায় প্রবাহিত হতো। করতোয়ার একটি শাখানদী লালমনিরহাট-কুড়িগ্রামের মধ্য দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশত, সে ছোট্ট নদীটির নাম ছিল তিস্তা। ১৭৮৭ সনের ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্র তার গতিপথ পরিবর্তন করে ময়মনসিংহ থেকে গোয়ালন্দের দিকে সরে এলো, আর করতোয়া, পুনর্ভবা, আত্রাইয়ের ত্রিস্রোতা এক হয়ে তাদের সকল জলরাশি নিয়ে তিস্তা নামের সেই ছোট খাল দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিলমারী বন্দরের কাছে ব্রহ্মপুত্রে গিয়ে মিশতে গেল। এর ফলে করতোয়া, আত্রাই এবং পুনর্ভবা আস্তে আস্তে ছোট ছোট নদীতে পরিণত হয়ে গেল, আর তিস্তা হয়ে গেল অন্যতম প্রধান নদী। তিস্তা নদীর সর্বমোট দৈর্ঘ্য ৩১৫ কিলোমিটার এবং এর মধ্যে ১১৫ কিলোমিটার বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অবস্থিত।

১৯৭৯ সনে লালমনিরহাটের দোয়ানী-ডালিয়াতে একটি ব্যারেজ নির্মাণ ও অনেকগুলো খাল খননের কাজ শুরু করা হয় এবং ১৯৯৮ সনে প্রকল্পটির প্রথম ফেজের কাজ শেষ হয়। বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর এবং বগুড়ার ৭টি জেলায় কৃষিতে পানিসেচ দেওয়ার লক্ষ্যে এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়। শুষ্ক মওসুমে উজানে এই নদীর পানিপ্রবাহ একেবারেই থাকে না। এই অবস্থায় ভারত তাদের সেচের জন্য তিস্তা থেকে পানি ভিন্ন পথে প্রবাহিত করায় শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশের অংশে বলতে গেলে কোন পানিই থাকে না। তাই আমাদের তিস্তা-বাঁধ মূলত বর্ষাকালের বাঁধ। এই বাঁধের বদৌলতে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের কৃষকদের এখন আর বৃষ্টির জন্য প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার উপর নির্ভর করে থাকতে হয় না। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ৬০ কিলোমিটার উজানে ভারত সরকার ১৯৯৬ সনে তিস্তা নদীর উপর গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করে। এই বাঁধের মাধ্যমে তিস্তার পানি মহানন্দা নদী দিয়ে প্রবাহিত করে অসংখ্য খালের মাধ্যমে জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহার ও মালদহ জেলায় পানি সরবরাহ করে কৃষি উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিস্তার উপর ভারতের গজলডোবা বাঁধটিও বর্ষাকালেরই বাঁধ। কারণ তিস্তার পানি ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদনের যে ব্যাপক ও বিস্তৃত ব্যবস্থাদি পশ্চিমবঙ্গ করে রেখেছে, শুকনো মওসুমে তার সকল সুবিধাদির সদ্ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় পানি তিস্তা নদীতে থাকে না। বাংলাদেশকে এক ফোঁটা পানি না দিয়ে সব পানি পশ্চিমবঙ্গ নিলেও তাদের চাহিদা পূরণ হবে না। তারপরও মমতা ব্যানার্জি নির্বাচনী শ্লোগান দিয়ে জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর, পশ্চিম দিনাজপুর, মালদা ও মুর্শিদাবাদের মানুষের সামনে শুষ্ক মওসুমেও পানি সরবরাহের এক মেগা প্রকল্পের মুলা ঝুলিয়ে রেখে তিনি এই সকল এলাকার মানুষের বিপুল ভোটে প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন এবং এখনো সেই মেগা প্রকল্পের মুলা ঝুলানো আছে। তাই তিস্তার নদীর পানি বাংলাদেশের সাথে ভাগাভাগিতে সম্মত হলেই তার ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা দেখা দেবে।

নদীর ভাটিতে অবস্থিত কোনো রাষ্ট্রের উজানের প্রতিবেশীর সঙ্গে নদীর পানির ব্যবহার এবং প্রাপ্ত পানির অংশ নিয়ে নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বের অনেক অঞ্চলেই এ সমস্যা আছে। বিভিন্ন দেশের অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানও হচ্ছে। এটা সত্য, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যে নদী কমপক্ষে দুইটি দেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত সেই নদীর উজানে কোন দেশ কোন ধরনের বাঁধ নির্মাণ করতে পারে না। উজানের কোন দেশ নিজের প্রয়োজনে তার নদীপ্রবাহকে এমনভাবে পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করতে পারে না যাতে তার দেশের বাহিরের কোন দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু আইন থাকলেও আন্তর্জাতিক নদীতে পৃথিবীর অনেক দেশে উজানে বাঁধ দিয়েছে। উজানে ভারতের বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে জাতিসংঘে ফারাক্কা ইস্যুটি উত্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু জাতিসংঘ ইস্যুটি ফেরত দিয়ে ভারতের সাথে আলাপ-আলোচনা করে মীমাংসা করতে পরামর্শ দিয়েছিল। আমাদের মনে রাখতে হবে, শুধু তিস্তা নয়, ৫৪টি নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং সব নদীতে তিস্তার মতো পরিকল্পনা নিয়ে পানি বণ্টন চুক্তি পরিহার করা ঠিক হবে না। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ভাটিতে প্রতিটি নদীর প্রবাহে জলাধার নির্মাণ, আর নদীর দুই পাড় মজবুত ও টেকসই করে গড়ে তোলার মতো এত বিপুল সম্পদ বাংলাদেশের নেই।

তিস্তা চুক্তি আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য মর্যাদার লড়াই এবং বিরোধী দলের জন্য একটি রাজনৈতিক ইস্যু। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির কথা অহরহ উচ্চারিত হচ্ছে। ২০১১ সনে ভারতের কংগ্রেস যখন ক্ষমতায় তখন তিস্তা চুক্তি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাধার জন্য হয়নি। ভারতের আইন অনুযায়ী যে নদী ভারতের কোন রাজ্যের উপর দিয়ে প্রবাহিত সেই নদী নিয়ে আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতে হলে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের অনুমোদন লাগে। তাই ভারত শীঘ্র চুক্তি করবে বলে মনে হচ্ছে না। ভারতের এমন গড়িমসি স্বভাব আগেও দেখা গেছে। তাছাড়া পানি চুক্তি করেও শুকনো মওসুমে তিস্তায় চাহিদা অনুযায়ী পানি পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। এই অবস্থায় চীন সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে সহজ শর্তে অর্থের জোগান দিতে বলেছে বাংলাদেশ সরকার। এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হলে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি করার গুরুত্ব আর থাকবে না। তবে ভয় হচ্ছে, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর তিস্তা প্রকল্প টেকসই হবে তো? কারণ বাংলাদেশে দৃষ্টিনন্দন ব্যয়বহুল কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর সরকারের কোন বিভাগ তার আর খোঁজ-খবর রাখে না। রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান উদাসীন। ব্যতিক্রম ছাড়া কোন অফিস ভবনের সিঁড়ি, টয়লেট, মেঝে, জানালা, দরজা, চেয়ার, টেবিল ইত্যাদি দেখেই উপলব্ধি করা যায়, অফিসটি সরকারি, না প্রাইভেট।