যুক্তরাজ্যের ৫৭তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেলেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ঋষি সুনাক। ২০১৫ সনে তিনি ইয়র্ক অঞ্চলের রিচমণ্ড এলাকা থেকে এমপি নির্বাচিত হন। বরিস জনসন সরকারের অর্থমন্ত্রী ভারতীয় বংশোদ্ভূত ৪২ বছর বয়সী ঋষি সুনাক ব্রিটেনের বিগত ২০০ বছরের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হলেন। বরিস জনসনের পদত্যাগের পর প্রধানমন্ত্রী হন লিজ ট্রাস, তিনি মাত্র ৪৫ দিন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বরিস জনসন পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ঋষি সুনাকের সাথে নেতৃত্বের দৌড়ে হেরে গেলেন। ঋষি সুনাক প্রচুর ধনসম্পদের মালিক, তার পারিবারিক সম্পত্তির পরিমাণ বর্তমানে ৭৩০ মিলিয়ন পাউণ্ড। এই সম্পদ বৃটেনের বর্তমান রাজা তৃতীয় চার্লসের সম্পদের দ্বিগুণের চেয়েও বেশী। চলতি বছরের শুরুতে সানডে টাইমস সবচেয়ে ধনী ব্রিটিশ নাগরিকদের যে তালিকা তৈরি করে সেই তালিকায় ঋষি সুনাকের নাম রয়েছে। শ্বশুর বিপুল সম্পত্তির মালিক, উত্তরাধিকারসূত্রে ঋষি সুনাক হয়ে গেলেন ধনাঢ্য ব্যক্তি। বৃটেনও ধনী রাষ্ট্র, কিন্তু বৃটেনের অর্থনৈতিক অবস্থা বর্তমানে খুবই খারাপ। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে ঢুকেই তাকে বৃটেনের অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনে মনোনিবেশ করতে হবে।
করোনা-উত্তর বৃটেনের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হলো না রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে। যুদ্ধ এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক অবরোধ বৃটেনের অর্থনীতিতে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। ইউরোপের জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস করেও উদ্ভূত সংকট থেকে ইউরোপ মুক্তি পাচ্ছে না। ইউরোপের বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত গরম রাখতে প্রচুর গ্যাস পোড়ানো হয়। এছাড়াও শিল্প-কারখানা ও পরিবহণে ব্যবহৃত তেল-গ্যাসের বেশীরভাগ আসত রাশিয়া থেকে। নিজেদের স্বার্থ বিবেচনা না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফাঁদে পড়ে ইউরোপ রাশিয়ার বিরুদ্ধে নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করেছে। রাশিয়া জ্বালানি সরবরাহের চুক্তিভঙ্গ না করেও বিবিধ অজুহাতে ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। রাশিয়া থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস ও তেল না আসায় এনার্জি সঙ্কটে পড়েছে গোটা ইউরোপ। ইউরোপের দেশ বৃটেনে বিদ্যুতের দাম বাড়ার সাথে সাথে জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে হু হু করে। মূল্যস্ফীতিতে দিশেহারা বৃটেনবাসী। এই সংকট মোকাবিলা করতে পারেননি বলেই ৪৫ দিন পরেই প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে লিজ ট্রাসকে।
কঠিন সময়ের মোকাবিলা করতে হবে ঋষি সুনাককে। শুধু দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে ঋষি সুনাক প্রধানমন্ত্রীত্ব ধরে রাখতে পারবেন বলে মনে হয় না, তাকে তার দল রক্ষণশীল পার্টির মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। রক্ষণশীল পার্টি ঐক্যবদ্ধ হলে দেশের জনগণ কিছুটা স্বস্তি পাবে। বৃটেনে পরবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা ২০২৫ সনের জানুয়ারিতে। সব কিছু ঠিকঠাক চললে ঋষি সুনাক ২০২৫ সনের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। কিন্তু রক্ষণশীল পার্টির নেতৃত্বের ঘন ঘন রদবদল বৃটেনের মানুষকে হতাশ করে তুলেছে, ইতোমধ্যে জনগণ রক্ষণশীল পার্টির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পরিবর্তে আগাম নির্বাচন দাবী করা শুরু করেছে। করোনার সময় ঋষি সুনাক অর্থমন্ত্রী ছিলেন। এখন বৃটেনের জনগণ গভীর আগ্রহ নিয়ে তার সিদ্ধান্তসমূহ অবলোকন ও পর্যালোচনা করবে।
বৃটেন প্রায় দুই শত বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করেছে, অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম করে তাদের তাড়াতে হয়েছে। সশস্ত্র বিপ্লবীদের ইংরেজ শাসকেরা সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে হয় হত্যা করেছে, নতুবা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ভয়ঙ্কর কারাবাসে পাঠিয়েছে। নির্জন, নিঃসঙ্গতায় অসহনীয় শারীরিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে দিন কাটত বন্দীদের। তাদের তাড়াতে গিয়ে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন, অগণিত ভারতবাসীকে ফাঁসীর রজ্জুতে ঝুলতে হয়েছে, গুলির আঘাতে অসংখ্য মানুষের বুক ঝাঁজরা হয়েছে, প্রাণ দিয়েছেন ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, উল্লাসকর দত্ত, চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, সূর্যসেন, তারকেশ্বর দস্তিদার, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, তিতুমীর। বৃটেনে বর্তমানে ভারত উপমহাদেশের লক্ষ লক্ষ লোক স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছে, তারা এখন বৃটেনের নাগরিক। ভারত উপমহাদেশের অভিবাসীরা এখন বৃটেনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত।
ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত প্রজন্মের অনেকে এখন বৃটেনের মূলধারার ব্যবসা-বাণিজ্য ও রাজনীতিতে তাদের জায়গা করে নিয়েছে। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সাদিক আমান খান ২০১৬ সন থেকে লণ্ডনের মেয়র। ২০১৬ সনে মেয়র নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি কনজারভেটিভ পার্টির মেয়র বরিস জনসনের স্থলাভিষিক্ত হন। পাশ্চাত্যের ইতিহাসে তিনিই প্রথম সংখ্যালঘু মুসলিম ব্যক্তি যিনি লণ্ডনের মতো একটি বৃহৎ রাজধানীর মেয়র পদে নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের সিলেটিরা বৃটেনে বহু পূর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত। সত্তরের দশকের শেষভাগে ব্রিক লেন একটি বাংলাদেশী-অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত হয়। ২০১০ সনে লেবার পার্টি থেকে রুশনারা আলী প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশী এমপি হিসেবে নির্বাচিত হন এবং সর্বশেষ ২০১৯ সনের নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে তিনি টানা চার দফা এমপি হলেন। টানা তৃতীয়বারের মতো ব্রিটিশ এমপি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক। লেবার নেতা রূপা হক এবং আফসানা বেগমও বর্তমানে এমপি। হাউজ অব লর্ডসে প্রবেশকারী প্রথম বাংলাদেশী হলেন মানজিলা পলা উদ্দিন। আনোয়ার চৌধুরী প্রথম বাংলাদেশী যিনি ২০০৪ সনে বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনার ছিলেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে-বিপক্ষে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল সেই আন্দোলন থেকেই বৃটেনের রাজনীতিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ২০১৬ সনে অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেন, কারণ তিনি ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে। ব্রেক্সিটের পক্ষে নেতৃত্বদানকারী টেরেসা মে হন প্রধানমন্ত্রী। ব্রেক্সিট জটিলতায় টেরেসা মে পদত্যাগ করলে ২০১৯ সনে বরিস জনসন হন প্রধানমন্ত্রী। করোনার সময় লকডাউনের বিধিনিষেধ অমান্য করে কয়েকজন বন্ধু একত্রিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে মদের পার্টি করায় তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হন বরিস জনসন, তার এই পার্টি করার কারণে ৬০টিরও বেশি সরকারি পদ থেকে মন্ত্রী, সংসদীয় ব্যক্তিগত সচিব, বাণিজ্যদূত এবং পার্টির চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেন। এটি ছিল ব্রিটিশ ইতিহাসে এই ধরনের পদত্যাগের বৃহত্তম সিরিজ। এই সময় ঋষি সুনাকও বরিস জনসনের ঘোর বিরোধিতা করেন। বাধ্য হয়ে বরিস জনসন ২০২২ সনের জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
যে ইংরেজ জাতি প্রায় দুইশত বছর ভারতবর্ষ শাসন করল সেই ইংরেজদের এখন শাসন করবেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষি সুনাক। ১৯৩৫ সনে সুনাকের দাদা পাঞ্জাব থেকে পরিবার নিয়ে আফ্রিকার নাইরোবিতে চলে যান; সুনাকের বাবার জন্ম কেনিয়ায় এবং মা’র জন্ম তানজানিয়ায়। সুনাকের দাদা পুরো পরিবার নিয়ে ১৯৬০ সনে বৃটেনে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ভারতের হিন্দুত্ববাদী লোকগুলো ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রী হওয়াকে ‘দিওয়ালির উপহার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাকে ধর্মীয় লেবাসে আচ্ছাদিত করতে চাচ্ছে। তার পরিবার অবিভক্ত পাঞ্জাবের হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও ঋষি সুনাকের জন্ম ব্রিটেনে। তিনি গ্র্যাজুয়েশন করেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ঋষি সুনাক আদি ভারতীয় হিন্দু ধর্মের অনুসারী হলেও তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সঙ্গে ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রের কোনো সম্পর্ক নেই। ঋষি সুনাকের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো ব্রিটিশ সমাজে ধর্ম কোন মুখ্য বিষয় নয়। আরও প্রমাণিত হলো সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার শিক্ষা, জ্ঞান, অভিজ্ঞতাই তাকে প্রধানমন্ত্রী হতে সহায়তা করেছে। কিন্তু বরিস জনসনের অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন ঋষি সুনাকের কয়েকটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে লেবার পার্টি ও তার নিজ দলের সদস্যরা সন্তুষ্ট ছিলেন না, সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে। এখন সরকারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তার হাতে। তার নিজ দলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও তার সমর্থকগোষ্ঠী ঋষি সুনাকের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে; বরিস জনসন ঋষি সুনাককে সরিয়ে পুনরায় পার্টির মধ্যে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন। এমন প্রতিকূল পরিবেশে জ্বালানি তেলের সঙ্কটে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়ার দক্ষতা প্রদর্শনে সফল না হলে তাকেও লিজ ট্রাসের মতো নীরবে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যেতে হবে।