মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের জন্য রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে তিনতলাবিশিষ্ট দুইটি বাসভবন নির্মাণের প্রস্তাব বিবেচনার জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বাড়ি দুটি নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা। ১৮ হাজার বর্গফুটের ভবনে থাকবে দুই সেট করে সুইমিং পুল। এই সুইমিং পুলের জন্য খরচ ধরা হয়েছে ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা। ভবন দুটির অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় খরচ হবে সোয়া ২ কোটি টাকা, কেনা হবে দেড় কোটি টাকার আসবাবপত্র। প্রতিটি ভবনে থাকবে সাতটি করে এলইডি টেলিভিশন। প্রশাসনের শীর্ষ এই দুই পদের কর্মকর্তার জন্য নির্ধারিত কোন বাসভবন বর্তমানে না থাকায় উক্ত দুই পদধারীর জন্য প্রস্তাবিত বাড়ি নির্মাণ করা হবে। বাড়ি নির্মাণের এই প্রকল্পটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এই দুইটি বাড়ির নির্মাণ নিয়ে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয় বিরোধী দলও বেশ সোচ্চার।

রাষ্ট্র এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য পৃথিবীর প্রতিটি দেশে বাসভবন সুনির্দিষ্ট করা থাকে। আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন হচ্ছে বঙ্গভবন। আরও দুইজন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনের কথা মিডিয়ায় অহরহ উচ্চারিত হয়—হোয়াইট হাউস এবং ক্রেমলিন। হোয়াইট হাউস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক বাসভবন। ৫৫ হাজার বর্গফুটের এই ভবনটি নির্মিত হয় ২২২ বছর পূর্বে। আর ক্রেমলিন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক বাসভবন। ২০১৪ সনে প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোয়ানের আমলে নির্মিত এক হাজার রুমবিশিষ্ট হোয়াইট প্যালেস হচ্ছে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় আবাসিক প্রাসাদ হচ্ছে ব্রুনাই রাষ্ট্রের সুলতানের সরকারি বাসভবন ইসতানা নুরুল ইমান; এই ভবনে কক্ষ রয়েছে ১ হাজার ৭৮৮টি এবং সুইমিং পুল রয়েছে ৫টি। তবে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে বাকিংহাম প্যালেস নির্মাণে, এই ভবনটির নির্মাণে খরচ হয় প্রায় ২৯ কোটি মার্কিন ডলার। যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের আবাসস্থল বাকিংহাম প্যালেসের পর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি হিসেবে পরিচিত ভারতীয় ধনকুবের মুকেশ আম্বানীর বাড়ি অ্যান্টিলিয়া যার মূল্য ২২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অ্যান্টিলিয়ার রক্ষণাবেক্ষণের কাজে প্রতি মাসে খরচ হয় ২.৫ কোটি ভারতীয় রুপি।

বঙ্গভবন মূলত ব্রিটিশ ভাইসরয় অব ইণ্ডিয়ার অস্থায়ী বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পাকিস্তান আমলে ভবনটি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তখন নাম ছিল গভর্নর হাউস। স্বাধীনতা লাভের পর এর নামকরণ করা হয় বঙ্গভবন। প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু সব সময় তাঁর ৩২ নম্বর ধানমণ্ডীর বাড়িতেই থাকতেন, তিনি শেরে বাংলানগর গণভবনে কখনো উঠেননি। বঙ্গবন্ধু মিন্টো রোডের প্রেসিডেন্ট হাউসে অফিস করতেন, প্রেসিডেন্ট হাউস তখন গণভবন নামে পরিচিত ছিল, বর্তমান নাম সুগন্ধা। শেরে বাংলা নগরের ৫৭ হাজার বর্গফুট আয়তনবিশিষ্ট গণভবনটির নির্মাণ হয় বঙ্গবন্ধুর আমলে। এরশাদ সরকার এই ভবনের নাম পরিবর্তন করে নামকরণ করেন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন করতোয়া। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী রাজীব গান্ধী বাংলাদেশ সফরে এলে তিনি এই ভবনেই রাতযাপন করেন। মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার লাল বাড়িটি প্রায় ২৬ বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে। বহু বছর পূর্বে হেয়ার রোডে ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বাড়ি কার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল তা এখন আর মনে করতে পারছি না। তখন ১৩ কোটি টাকার কথা শুনে বিস্মিত হয়েছিলাম।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য ‘গণভবন’ ছাড়াও স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীর মতো সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত বাসভবন রয়েছে। বিভাগ, জেলা, উপজেলা পর্যায়েও বিভাগীয় প্রধান, জেলা প্রশাসক এবং টিএনওদের জন্য বিরাট বিরাট এলাকা জুড়ে বিশাল বিশাল প্রাসাদ নির্দিষ্ট করা আছে। উল্লেখিত পদগুলোতে দায়িত্বরত কর্মকর্তাগণের বসবাসের জন্য বাসা খুঁজতে হয় না, বরাদ্দ নিতে হয় না, পদে অধিষ্ঠিত হওয়া মাত্রই পদনামে নামাঙ্কিত বাড়িতে বসবাসের জন্য উঠতে পারেন। অন্যদিকে যে সকল মন্ত্রী, সচিব বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জন্য কোন বাড়ি বা ফ্ল্যাট সুনির্দিষ্ট করা থাকে না তাদের জন্য সরকারের মালিকানাভুক্ত বাড়ি, ফ্ল্যাট থেকে যে কোন বাড়ি বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং মুখ্য সচিবের জন্য মিন্টো রোড ও গুলশানে এমন দুটি বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইস্কাটন গার্ডেনে প্রস্তাবিত বাড়ি দুইটি নির্মিত হলে সব সরকারের আমলে সকল মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিব উক্ত দুইটি বাড়িতেই বসবাস করবেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং মুখ্য সচিব সরকারের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। মন্ত্রিপরিষদ সচিব হচ্ছেন সচিবদের সচিব। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদের প্রধান হলেও মন্ত্রিপরিষদের প্রধান নির্বাহী হচ্ছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তার মুখ্য কাজ হচ্ছে সরকারের মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় করা। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর চিন্তাভাবনা বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা পালন করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মুখ্য সচিব বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের সমন্বয় সাধন করে থাকেন। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আমলার জন্য সুনির্দিষ্ট বাড়ি বরাদ্দ থাকায় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এই দুই আমলার জন্য নির্ধারিত বাড়ি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু

সরকারি আমলাদের জন্য আলাদা আলাদা বাড়ি নির্মাণের উপযোগিতা আছে বলে মনে হয় না। ২০১৫ সনে বেইলি রোডে মন্ত্রীদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে অ্যাপার্টমেন্ট এবং প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টের আয়তন ২২৪৮ বর্গফুট; তাই একজন সচিবের জন্য হাজার হাজার বর্গফুটের তিনতলা বাড়ি এবং তাতে দুইটি সুইমিং পুলের সংযোজন সঙ্গতিপূর্ণ নয়। অন্যদিকে এমপি, মন্ত্রীদের মতো সচিবদের আবাসস্থলে রাজনৈতিক কর্মীর আগমন ঘটে না। তাই আমলাদের জন্য বিরাট এলাকা জুড়ে স্বতন্ত্র বাড়ি থাকার অপরিহার্যতা স্বীকার করতে কষ্ট হয়। আরও বোঝা গেল না বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য ১৮ লক্ষ টাকা খরচ করতে হবে কেন? এই পানির কী কাজ তাও জানা গেল না। ধর্মীয় সংস্কারে অন্ধ না হলে আজকাল কোন পরিবারে দুইটির বেশী সন্তান থাকে না। তাহলে সাতটি এলইডি টেলিভিশন দেখবে কে?

করোনা-উত্তর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে একটি মহামন্দার দিকে আস্তে আস্তে ঠেলে দিচ্ছে। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় সরকার কৃচ্ছ্রতা সাধন করছে, বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে তেল-গ্যাস কিনছে না; এর ফলে জনগণ ভয়াবহ লোডশেডিং-এর কবলে পড়েছে। বিদ্যুতের অভাবে দুর্বিষহ গরমে সিদ্ধ হলেও জনগণ সরকারের আপদকালীন সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। পৃথিবীর বহু দেশকে আগামী বছর দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করতে হবে মর্মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, তিনি দেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি জনগণকে সঞ্চয়ী হতে উপদেশ দিয়েছেন। দেশের অর্থনীতির এমন অস্থিরতার মাঝে তাই দুইজন মর্যাদাবান সচিবের জন্য বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণের প্রস্তাব সময়োপযোগী হয়নি।

সচিবদের জন্য আলাদা আলাদা বাড়ি না করে মিন্টো রোডের সকল ভবন ভেঙে আমলাদের জন্য মানানসই ফ্ল্যাট তৈরি করা সমীচীন হবে। অসঙ্গতি শুধু আমলাদের বাসভবনের ক্ষেত্রে নয়, কয়েকটি প্রাইভেট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতনের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়। কোন কোন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন লক্ষ লক্ষ টাকা, দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত বিবেচনায় এমন বেতন গরীবদের অসহায়ত্ব বাড়িয়ে দেয়। দেশ যেভাবে ক্রমান্বয়ে তহবিল সংকটের দিকে এগুচ্ছে তাতে হয়ত অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ব্যয়ও কাটছাঁট করতে হতে পারে। দেশের হাজার হাজার মানুষ এখনো ফুটপাতে ঘুমায়, ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খায়, অভাবের তাড়নায় দেহ বিক্রি করে। অবশ বাড়ি নির্মাণের জন্য প্রাক্কলিত ৪৩ কোটি টাকা দিয়ে এই সকল সমস্যার সমাধান করা যাবে না, এই সকল সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন হাজার হাজার কোটি টাকা। তবুও গণপূর্ত বিভাগের বোকামির জন্য সরকার সম্পর্কে ভুল বার্তা পরিবেশিত হল, সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ণ হল।