গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। রাত সাড়ে ৯টার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী তার বন্ধুর সঙ্গে গোপালগঞ্জ সদরের নবীনবাগ হেলিপ্যাডের সামনে থেকে হেঁটে যাচ্ছিলেন, এই সময় ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে কয়েকজন এসে ওই ছাত্রী এবং তার বন্ধুকে গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নির্মাণাধীন ভবনে তুলে নিয়ে যায়; সেখানেই বন্ধুকে আটকে রেখে মারধর করা হয় এবং ওই ছাত্রীকে সকলে মিলে ধর্ষণ করে। এই ধর্ষণের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার সন্দেহে পুলিশ তিনজন এবং র‍্যাব ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে। তারা একেকজন এক এক পেশায় জড়িত। এদের মধ্যে দুইজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, একজন স্থানীয় একটি মাদ্রাসা হতে দাখিল ও আলিম পাস করে একটি ক্লিনিকে রিসেপশনিস্ট হিসেবে চাকরি করে, একজন গোপালগঞ্জের একটি পাওয়ার হাউজে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করে, আরেকজন এসি ও ফ্রিজ মেরামতের কাজ করে, দুইজন কলেজের ছাত্র, আরেকজন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য বিদেশে গিয়েছিল, এখন গার্মেন্টস পণ্য নিয়ে ব্যবসা করে। মাদ্রাসার আলেম এবং ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের নামে মাদক এবং মারামারির মামলা রয়েছে। ছাত্রীকে ধর্ষণ ও তার বন্ধুকে মারধরের ঘটনায় জড়িতরা সবাই মাদকসেবী ও জুয়াড়ি এবং তাদের কোন রাজনৈতিক পরিচয় নেই বলে র‍্যাব উল্লেখ করেছে।

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ধর্ষণের কারণে মৃত্যুদণ্ড হয় না বলে ধর্ষণ থামানো যাচ্ছে না মর্মে আমরা আক্ষেপ করেছি, কিন্তু ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রেখে আইন করার পরও ধর্ষণ থামছে না। মানবসমাজের কিছু লোক এত বর্বর হয়ে উঠেছে যে, রাষ্ট্র, সমাজ, আইন কিছুরই তোয়াক্কা করছে না। অনেকে এই সকল ধর্ষণের পেছনে মূল্যবোধের অবক্ষয়কে দায়ী করে থাকেন। কিন্তু নৈতিকতা আর মূল্যবোধের সাথে এই সকল ধর্ষণের কোন সম্পর্ক নেই। এরা বেপরোয়া। এছাড়াও মূল্যবোধ ও নৈতিকতা যারা শিক্ষা দেন তাদের অনেকেই ধর্ষক—অনেকের মধ্যে মাদ্রাসার কিছু অধ্যক্ষ ধর্ষক, মাদ্রাসার কিছু শিক্ষক ধর্ষক, মসজিদের কিছু ইমাম ধর্ষক, গির্জার কিছু পাদরি ধর্ষক, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকও ধর্ষক। যে মেয়েটির ধর্ষণ নিয়ে লিখছি সেই মেয়েটির ধর্ষকদের একজন আলিম পাস বলে পুলিশ উল্লেখ করেছে। এই ছেলেটির ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা না থাকার কোন কারণ থাকতে পারে না। ভোলার মনপুরায় মাদ্রাসার ৪ ছাত্রকে বলাৎকার করার কারণে মাদ্রাসা-কমিটি ধর্ষক মাওলানা ইসমাইলকে চিল্লায় পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। তাই মনে হয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সাথে ধর্ষণের কোন সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক থাকলে সৌদি আরবের ঘরে ঘরে গৃহকর্মীরা ধর্ষিত হতো না। সৌদি আরবে প্রতি মাসে গড়পড়তা ৮০ জন অপরাধীর শিরশ্ছেদ হচ্ছে।

ইসলাম ধর্মে ধর্ষণ বা ব্যভিচারের শাস্তি ভয়ঙ্কর; ব্যভিচারী যদি বিবাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, আর যদি অবিবাহিত হয় তাহলে তাকে প্রকাশ্যে একশটি বেত্রাঘাত করা হয়। ইসলাম ব্যভিচারকে সুস্পষ্ট হারাম ও জঘন্য অপরাধ হিসাবে ঘোষণা করেছে। আল্লাহর ভয় ও আখেরাতের জবাবদিহির কথা ভাবলে কেউ ব্যভিচার বা ধর্ষণে লিপ্ত হতে পারে না। তোরাহ এবং ইঞ্জিলেও পাথর ছুঁড়ে হত্যা করার নির্দেশনা রয়েছে বলে আমরা মুসলমানেরা বিশ্বাস করি। ধর্ম মানলে এই তিনটি ধর্মের লোক তো ব্যভিচার বা ধর্ষণে লিপ্ত হওয়ার কথা নয়। আমরা ইহকালের বিচারের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছি, কিন্তু পরকালের জবাবদিহিতার কথা কেউ ভাবছি না, ভাবলে কোন ধার্মিক ধর্ষণ করতে পারে না। তাহলে যারা ধর্ষণ করছে তারা কি সবাই নাস্তিক?

আমরা যারা প্রাচ্যের মুসলমান তাদের ধারণা, পাশ্চাত্যের খৃষ্টান-ইহুদির দেশসমূহে জেনা-ব্যভিচার হরহামেশাই হচ্ছে, কারণ তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ নেই। নৈতিকতাবিবর্জিত খ্রিস্টীয় সমাজের লোকদের পরকালে জবাবদিহিতার ভীতি না থাকায় তারা অবাধ যৌনাচারে লিপ্ত। ধারণাটি অমূলক নয়, কারণ পাশ্চাত্যের সমাজে প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত যুবক-যুবতীর পারস্পরিক সম্মতিতে যৌনকর্ম হয় এবং তা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ নয়। আইনের দৃষ্টিতে আমাদের দেশেও এমন যৌনকর্ম শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। কিন্তু ধর্ম মতে বিবাহবহির্ভূত সব ধরনের যৌনকর্ম ব্যভিচার। বিবাহবহির্ভূত দম্পতি পাশ্চাত্যে প্রচুর, বৃটেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও তার বান্ধবীকে নিয়ে ঘর-সংসার করছেন, কিছুদিন আগে তাদের সন্তান হলে বৃটেনবাসী তাদের অভিনন্দন জানিয়েছে। আমি আরেকজন বিখ্যাত লোকের কথা প্রায়ই উল্লেখ করে থাকি, তিনি হচ্ছেন আর্জেন্টিনার দিয়াগো মেরাডোনা; চারটি সন্তান হওয়ার পর তিনি তার বান্ধবীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু ঐ সকল দেশে পারস্পরিক সম্মতি ছাড়া জোর করে ধর্ষণের ঘটনা খুবই কম। মেয়েরা ছেলেদের মতোই গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করছে, আড্ডা মারছে; এই অবস্থায় দু-একটি ধর্ষণ যে হচ্ছে না তা কিন্তু নয়, কিন্তু একাকী কোন মেয়েকে জোর করে নির্জনে নিয়ে আমাদের দেশের মতো নির্বিচারে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে না।

আমাদের মতো দেশে ধর্ষণের সব দায় মেয়েদের—হাজারো কৈফিয়ত দিতে দিতে ধর্ষিতারা দ্বিতীয়বার ধর্ষণের সম্মুখীন হয়। ছেলেরা গভীর রাত অবধি রাস্তায় থাকলেও কারো কোন মাথাব্যথা নেই, কিন্তু কোন নারী জরুরি প্রয়োজনে রাস্তায় চলাফেরা করে ধর্ষণের শিকার হলে সব দায় ওই নারীর, কারণ সে গভীর রাতে ঘরের বাইরে যাবে কেন? দায় নারীর পোশাক, হিজাব আর বোরকা না থাকলে নারী পুরুষের জন্য উত্তেজক। কুদৃষ্টির জেনার কথাও ধর্মে উল্লেখ করা হয়েছে, তাহলে পুরুষেরা মেয়েদের শরীর ও পোশাকের প্রতি এত তীব্র দৃষ্টিতে তাকায় কেন? গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীটি কেন ছেলে বন্ধুর সাথে রাত সাড়ে নয়টায় রাস্তায় হাঁটার সাহস করলো—এটাই মেয়েটির অপরাধ। বেগম রোকেয়া ‘অবরোধবাসিনী’র কথা বলে নারীদের ঘরের বাইরে আসার সাহস যুগিয়েছিলেন, এখন ধর্ষণের ভয়ে মেয়েরা বের হতে পারছে না। এটা সুকৌশলে আরোপিত অবরোধ। কিন্তু হিজাব পরা ছাত্রীও তো মাদ্রাসার কামুক অধ্যক্ষের লালসার শিকার হয়েছে, অনেক অবোধ শিশু-কিশোর অহরহ ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। পোশাকই যদি পুরুষের উত্তেজনা সৃষ্টির কারণ হয় তাহলে হিজাব পরা মেয়ে এবং শিশু-কিশোরেরা কোন পোশাকের জন্য ধর্ষণের শিকার হচ্ছে? নারীদের যৌনাকাঙ্ক্ষা পুরুষের চেয়ে কম তা কিন্তু কোন শাস্ত্র বলে না—কোন মেয়ে রাস্তা থেকে টেনে নিয়ে পুরুষকে ধর্ষণ করেছে এমন নজির খুবই কম।

ধর্ষণ হচ্ছে নির্লজ্জতা আর বেহায়াপনার চূড়ান্ত রূপ। আদিম যুগে ব্যভিচার বলে কিছুই ছিলো না, উলঙ্গ মানুষগুলো ইচ্ছামতো ডানে-বামে সবার সাথে কামাচারে লিপ্ত হতো, তখন সম্মতি-অসম্মতির ধার ধারতো না। সভ্য জগতে এসেও আমাদের মতো দেশে এর কোন ব্যতিক্রম হচ্ছে না। মাত্র পাঁচশত বছর পূর্বে মুসলমানদের তুরস্কভিত্তিক খিলাফতের বাদশা সুলেমানের নাকি তিনশত উপপত্নী ছিলো, ভারতবর্ষের মোঘল হেরেমে প্রায় সকল সম্রাটের অন্দরমহলে উপপত্নী থাকত। এই ব্যভিচার বাদশাহ-সম্রাট শুধু মুসলমান বলেই এখনো আমরা তাদের শৌর্যবীর্যের বন্দনা করি। এই রাজা-বাদশাহরা তাদের উপপত্নীদের পাহারা দেওয়ার জন্য নপুংসক বা খোজা পুরুষ পাহারাদার রাখতেন। ব্যভিচারে সংশ্লিষ্ট থাকার দায়ে ধৃতা এক নারীকে হযরত ঈসা (আ.)-এর দরবারে এনে হযরত মূসা (আ.)-এর কয়েকজন সমর্থক পণ্ডিত ঈসা (আ.)-এর নিকট জানতে চাইলেন, ‘মূসা (আ.) এমন অপরাধীকে পাথর মেরে হত্যার আদেশ দিতেন, এখন আপনি কী আদেশ দেবেন?’ হযরত ঈসা (আ.) বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কখনো এমন গর্হিত অপকর্মে লিপ্ত হওনি সে তাকে পাথর মারুক’। এই রায় শোনা মাত্র ইয়াহুদি পণ্ডিতগণ একে একে স্থান ত্যাগ করলো। দেখা যাচ্ছে মূল্যবোধের অভাব তখনো ছিলো।

সভ্য সমাজের আইন ও বিচার প্রলম্বিত বলে তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদানের কোন নজির নেই। লক্ষ লক্ষ মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায়, ইচ্ছে করলেই মামলার নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত করা সম্ভব হয় না, প্রক্রিয়া-পদ্ধতি সব পরিপালন করা জরুরি। ধর্মের বিধান মতেও শাস্তি দেওয়া খুব সহজ নয়, ব্যভিচার প্রমাণের জন্য ৪ জন পুরুষ সাক্ষী বা ধর্ষকের স্বীকারোক্তি অপরিহার্য। ৪ জন মুমিন মুসলমানের সম্মুখে কেউ ধর্ষণ করে বলে মনে হয় না। ৪ জন মুমিন মুসলমান ধর্ষণের স্পটে থাকলে ধর্ষণ হয় কী করে, তাদের তখন ধর্ষণে বাধা দেয়াই মুখ্য দায়িত্ব হওয়া বাঞ্ছনীয়। ৪ জন মুমিন মুসলমানের সাক্ষী থাকে না বলে পাকিস্তানে শরিয়া আইনে কোন ব্যভিচারের বিচার সম্ভব হচ্ছে না। রিমাণ্ডে না নিলে কেউ অপরাধ স্বীকার করে বলে মনে হয় না। রিমাণ্ডের অসহনীয় পরিবেশে স্বীকারোক্তি দিয়েও অনেকে আদালতে গিয়ে তা অস্বীকার করে থাকে। ভয় দেখিয়ে, শারীরিক নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায় করা তাগুত আইন ও ধর্মীয় আইন দুটোতেই অপরাধ। আইনের এমন সীমাবদ্ধতায় আজকাল সাক্ষী না পাওয়া গেলে ডিএনএ টেস্ট, সিসি ক্যামেরা, ভিডিও, ধর্ষিতার বক্তব্যও বিবেচনায় নেয়া হয়—কিন্তু ব্যভিচার নিরূপণে বিজ্ঞানের নব আবিষ্কৃত এইসব উপকরণ বিবেচনায় নেয়া কতটুকু শাস্ত্রসম্মত তা নিয়ে মতভেদ আছে। ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের গভর্নর ড. মাওলা গোলাম খন্দকারের অভিমত অনুযায়ী নবীজীর আমলের পর নতুন উদ্ভাবিত কিছুর সংযোজনই বেদাআত, যদিও অনেক আলেমের মতে, শুধু ইবাদতে নতুন কিছুর সংযোজনই বেদাআত। সাধারণ আইনে বিচারপ্রক্রিয়া যেমন দীর্ঘ, তেমনি শরিয়া আইনেও সাক্ষী এবং স্বীকারোক্তির অভাবে ব্যভিচারের ত্বরিত বিচার সম্ভব হয় না। আইনের প্রতি যখন মানুষের বিশ্বাস হারায় তখন সকল অনিয়ম নিয়মে পর্যবসিত হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রসফায়ারের প্রতি জনগণের আস্থা বেড়ে যায়। মেয়েদের স্বাধীন চলাফেরায় ধর্ষণ ধর্মের বিধিনিষেধের পরিপূরক হয়ে কাজ করছে, তাই অবিলম্বে ধর্ষকদের জেলে ভরে রাখা জরুরি ও অপরিহার্য।