কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে কক্সবাজারমুখী একটি মিনিট্রাকের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই ৫ সহোদর ভাই মারা যান, পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরেক ভাইও চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরলোকগমন করেন। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে মৃত বাবার শ্রাদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে পূজা করে ফিরছিলেন সাত ভাই ও দুই বোন; সৎকার পরবর্তী ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের লক্ষ্যে ছয় ভাই তাদের মাথা কামিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বাড়ির কাছে রাস্তা পার হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন তারা, এমন সময় কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে কক্সবাজারমুখী তরকারি বোঝাই করা একটি দ্রুতগামী পিকআপ তাদের চাপা দেয়। এদের মধ্যে একজন কাতারপ্রবাসী ছিলেন। বাবার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে অন্যান্য ভাইদের সাথে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করার আগ্রহ নিয়ে প্রবাসী সন্তান দীপক সুশীল ৫ ফেব্রুয়ারি কাতার থেকে দেশে এসে পৌঁছান। পিতার শ্রাদ্ধ করার আগেই দীপক সুশীল পিকআপ ভ্যানের তলায় চাপা পড়ে মারা যান, পিতা সুরেশ চন্দ্র সুশীলের যেখানে শ্রাদ্ধ হয়েছে সেই একই স্থানে ১২ ফেব্রুয়ারি মৃত অপর ৪ ভাইয়ের সাথে তারও শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান হয়। মা আর তিন বোন জীবিত আছেন, ভাইদের পরিবারে কয়েকজন শিশুসন্তানও রয়েছে যাদের বাবার মৃত্যু সম্পর্কে কোন বোধশক্তি নেই।
আমাদের দেশে সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনার মহামারি কিছুতেই থামছে না। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। সড়ক দুর্ঘটনার কোন প্রতিকার আছে বলেও মনে হয় না। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে কার্যকরী কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা আদৌ সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ। রাস্তাঘাট যত প্রশস্ত হচ্ছে গাড়িচালকেরা তত বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গাড়িচালকদের সংগঠন অনেক শক্তিশালী, এরা সরকারের উপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম। গাড়িচালকেরা গাড়ি না চালালে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে যাবে, মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে, পণ্য পরিবহণ না হলে জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠবে, দোকানে মজুত জিনিসপত্র কেনার হিড়িক পড়ে যাবে, আমদানি-রপ্তানি স্থবির হয়ে যাবে, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। গণতন্ত্রে সবার চিৎকার করার অধিকার থাকায় এদের ধর্মঘটে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা সরকারের থাকবে না। এই প্রেসার গ্রুপটি তাদের ক্ষমতা সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত। এরশাদ সাহেবের আমলে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী গাড়িচালকদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রেখে আইন করা হয়েছিল, কিন্তু তাদের গর্জনে এমন কঠোর আইন রদ করতে সরকার বাধ্য হয়েছিল। অবশ্য মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে তাদের যুক্তিও ফেলনা ছিল না।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের করা আন্দোলনের ফলেই সরকার দ্রুতগতিতে সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়েছিলো; কিন্তু তার যথাযথ বাস্তবায়ন সহজ নয়। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ যানবাহনের অতিরিক্ত গতি এবং চালকের ওভারটেক করার বেপরোয়া মনোভাব। অতিরিক্ত গতি এবং বেপরোয়া ওভারটেকের কারণে রাজধানী ঢাকার ভরা সড়কেও প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে; অন্যদিকে মহাসড়কে পেছনের গাড়ি সামনের গাড়িটিকে ওভারটেক না করা পর্যন্ত স্বস্তি পায় না, এটা আমাদের দেশের চালকদের একটা দুরারোগ্য ব্যাধি। আমাদের রাস্তায় কোথায় ওভারটেক করা যাবে, কোথায় যাবে না তার চিহ্ন নেই, ড্রাইভারেরা নিষিদ্ধ বাঁকে ওভারটেক করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে থাকেন। রাস্তায় বের হলেই যানবাহনের মধ্যে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়, প্রায় সব বাসচালকের মধ্যে পাল্লা দিয়ে ওভারটেক করার প্রবণতা আছে। ওভারটেক করার সুনির্দিষ্ট নিয়ম-পদ্ধতি রয়েছে, আমাদের দেশে অধিকাংশ চালক তা মানেন না।
মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হওয়া পথচারী অদক্ষ ড্রাইভারদের মতোই উদাসীন। কিছু যুবক ও কিশোরের অনিয়ন্ত্রিত মোটরবাইক চালানোই সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ। অনেকই স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে মোটরসাইকেলে ভ্রমণ করেন, স্ত্রীর কোলে শিশুসন্তানটির বয়স হয়তো ছয় মাস যা মোটেই নিরাপদ নয়। বিদেশে গাড়িতে একটি বাচ্চাকে কখনো কোলে বসানো হয় না, আইনে আছে একটি বাচ্চাসহ গাড়িতে চলাচল করলে গাড়িতে বাচ্চাদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষভাবে বানানো চেয়ার ব্যবহার করতে হয়। মহাসড়কে তৈরি করা অপরিকল্পিত গতিরোধকগুলোও দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। অস্বাভাবিক উঁচু গতিরোধকগুলো দুর্ঘটনার মূল কারণ, মহাসড়কে এই সকল গতিরোধকে সাদা চুনের চিহ্ন থাকে না। মহাসড়কে গতিরোধক থাকার বিষয়টি অদ্ভুত, অবিমৃষ্যকারীদের চিন্তাপ্রসূত হাস্যকর বিষয়। গতিরোধক সাধারণত থাকে আবাসিক এলাকায় গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। উন্নত দেশগুলোতে মহাসড়কে যান চলাচলের সর্বোচ্চ গতি বেঁধে দেওয়া হয় এবং স্থানে স্থানে গাড়ির গতিপরিমাপক যন্ত্র বসানো থাকে; আমাদের দেশে এমন কোন ব্যবস্থা নেই। আন্তঃজেলার যোগাযোগ স্থাপনকারী মহাসড়কগুলোর কয়েকটি প্রশস্ত ও মসৃণ করা হলেও বেশিরভাগ নির্বিঘ্নে গাড়ি চালানোর জন্য উপযোগী নয়। মহাসড়কের উপরে বাজার বসে, নসিমন-করিমন-ইজিবাইক-ভটভটি-থ্রি-হুইলার ইত্যাদি ধীরগতির গাড়িগুলোর বেপরোয়া চলাচলে দ্রুতগতির গাড়িগুলো অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, কম গতির ছোট যানবাহনগুলোর সাথে দ্রুতগতির বড় যানবাহনের প্রায়ই সংঘর্ষ ঘটে। রাস্তায় কোন কারণে গর্ত হলে দুর্ঘটনা না হওয়া পর্যন্ত তা আর মেরামত হয় না। চলাচলের অনুপযুক্ত গাড়িও রাস্তায় দেখা যায়, চলন্ত অবস্থায় কোন গাড়ি বিকল হলে তা তাৎক্ষণিক সরানোর কোন ব্যবস্থা নেই। মহাসড়কে পথচারীর যত্রতত্র রাস্তা পারাপার দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। মাঝে মাঝে গরু-ছাগলও মহাসড়কে দেখা যায়। সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের বিশৃঙ্খল অবস্থা ঠিক করা না গেলে দুর্ঘটনা রোধ করা প্রায় অসম্ভব।
অনুন্নত সড়ক অবকাঠামো, অদক্ষ গাড়িচালক, গাড়ির বেপরোয়া গতি, সনদহীন যানবাহনের ভিড়, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নানামুখী দুর্নীতি, জনগণের অসচেতনতা, ঘন কুয়াশা, সড়ক-মহাসড়কের ভঙ্গুর অবস্থা, বাসের রেষারেষি, দীর্ঘক্ষণ বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানো সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ। সমস্যাগুলো সমাধানে যেসব দেশে কর্তৃপক্ষ বেশি উদাসীন, সেখানে মৃত্যুর মিছিলও বাড়ছে। জনসংখ্যার আধিক্য সড়ক দুর্ঘটনার জন্য কম দায়ী নয়। বাস, ট্রেন, স্টিমার, লঞ্চের ছাদে উঠে যাত্রীদের চলাচল থামানো যায় না জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে। জনসংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে যানবাহনের আধিক্যও চোখে পড়ার মতো। ফুটপাত, রাস্তার মধ্যে ব্যবসা। গাড়ি চালানোর দক্ষতার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে অনেক ক্ষেত্রে ড্রাইভিং-লাইসেন্স দেওয়া হয় না, এই ক্ষেত্রে ঘুষ এবং দুর্নীতির ব্যাপকতা সর্বজনবিদিত। বাংলাদেশ থেকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকদের ভিন্ন দেশে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে লাইসেন্স নিতে হয়। আমার এক আত্মীয় অস্ট্রেলিয়ায় ড্রাইভিং আসনে বসে গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার পর সিটবেল্ট বাঁধার কারণে প্রায়োগিক পরীক্ষায় অযোগ্য বিবেচিত হয়। অযোগ্য বিবেচিত হওয়ার পর তাকে আর তার নিজের গাড়ি চালিয়ে আসতে দেওয়া হয়নি, ভিন্ন চালক গাড়ি চালিয়ে তাকে বাসায় পৌঁছে দেয়। আমাদের দেশে অসংখ্য দক্ষ ড্রাইভার আছেন, কিন্তু বিরামহীন গাড়ি চালিয়ে তারাও অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমের আমেজে স্টিয়ারিং-এর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
অহরহ দুর্ঘটনার বলি হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। কেউ আহত হচ্ছে, কেউ পঙ্গু হচ্ছে, কেউ অকালে মৃত্যুবরণ করছে। বাস-ট্রাক এখন ঘাতক দৈত্য। রাস্তার পাশে ফুটপাতে চলাচল করেও দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, উল্লেখিত ৬ ভাইয়ের মৃত্যু তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় গরিব দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার কয়েক গুণ বেশি। পৃথিবীতে কমপক্ষে ৭৭টি দেশে আমাদের দেশের চেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা হয়। সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে জিম্বাবুয়ে এবং সবচেয়ে কম সড়ক দুর্ঘটনা হয় সুইডেনে। থাইল্যাণ্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, চীন, রাশিয়া, ভারত, কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পেরু প্রভৃতি দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। দুর্ঘটনা বন্ধ করার কোন কৌশল নেই, কিন্তু হ্রাস করা সম্ভব; দুর্ঘটনা হ্রাস করতে হলে ট্রাফিক ব্যবস্থা ও সড়কের উন্নয়ন অপরিহার্য, চালকদের দক্ষতা যাচাইপূর্বক লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া ছাড়াও তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে প্রেরণাদায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া অত্যাবশ্যক, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চালকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি, মোটিভেশনাল ট্রেনিং-এর মাধ্যমে। ত্রুটিপূর্ণ গাড়ির চলাচল নিষিদ্ধকরণসহ গণসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া অপরিহার্য। ত্রুটিপূর্ণ গাড়ির চলাচল নিষিদ্ধকরণসহ গণসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া অপরিহার্য। দুর্ঘটনাসংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পন্ন না হলে দুর্ভোগে কবলিত মানুষগুলো আইনের প্রতি শ্রদ্ধা হারাবে।
‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামে একটি আন্দোলন গড়ে উঠেছে বেশ কয়েক বছর ধরে, আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সতীর্থ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান এই আন্দোলনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত; কিন্তু মিছিল-মিটিং আর টকশো করে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যাবে বলে মনে হয় না। বিআরটিএ-এর অসাধু কর্মচারী-কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। আমার সতীর্থ বন্ধু আইয়ুবুর রহমান সৎ অফিসার ছিলো, কিন্তু বিআরটিএ-এর দুর্নীতি কমাতে পেরেছিল বলে মনে হয়নি। গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকা সত্ত্বেও সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না। তবে এটা সত্য যে, কোন ড্রাইভার কাউকে হত্যা করার উদ্দেশ্য বেপরোয়া গাড়ি চালায় বলে মনে হয় না, অনেক ড্রাইভারকে রাস্তার কুকুর রক্ষা করতে গিয়ে নিজের ও যাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নিতে দেখা যায়। রাস্তায় রাস্তায় মনিটরিং করার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা না থাকলে ড্রাইভারের যথেচ্ছাচার প্রমাণ করা কঠিন। একজনের দায় অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা পরিহার করে চালক, মালিক, পথচারী, ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে যত্নবান হতে হবে, যত্নবান না হলে সড়ক দুর্ঘটনা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া সহজ হবে না। আইন কার্যকর করার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে পরিবহণ শ্রমিকেরা হয়রানির শিকার হলে আইন অমান্য করার প্রবণতা বাড়বে, ঘুষ দিয়ে আইন না মানার লাইসেন্স পেয়ে গেলে দুর্ঘটনা তখন আর ড্রাইভারদের কাছে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের কোন বিকল্প নেই।