করোনাসংশ্লিষ্ট সকল বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ইংল্যান্ডও একই কাজ করেছে। সবাই উপলব্ধি করতে পেরেছে, নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে করোনাভাইরাস থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা যাবে না। করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে দুটি অস্ত্র এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত—টিকা আর মাস্ক। করোনার টিকা নেয়া বাধ্যতামূলক করায় ট্রাক-চালকদের ধর্মঘটে কানাডার কিছু এলাকা অচল হয়ে পড়েছিল, জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ট্রাক-চালকদের রাস্তা থেকে সরাতে হয়েছে। আমেরিকায়ও ট্রাম্পের অনেক সমর্থক টিকা নিচ্ছে না। ব্যক্তিস্বাধীনতার গুরুত্ব থাকায় চীনের মতো খাঁচায় ভরে পাশ্চাত্যে লোকদের টিকা দেয়ায় ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ক্ষতির পরিমাণ সীমাহীন; এর প্রভাবে জীবনযাত্রা থেমে গেছে, অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য বিপর্যস্ত। জীবনঘাতী এই মহামারি নিয়ন্ত্রণে এনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখাই বর্তমান বিশ্বজুড়ে বিরাট চ্যালেঞ্জ। করোনার বড় কুফল হলো—সব দেশের অর্থনীতিতে যে ধস নেমেছে তার সামাল দেওয়া সহজ হচ্ছে না। প্রায় সবগুলো দেশের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক স্তরে নেমে গেছে; একদিকে উৎপাদন কমেছে, লোকের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, মানুষের চাহিদা কমেছে, আয় না থাকায় ব্যয় কমেছে; অন্যদিকে বেকার বেড়েছে, অভাব বেড়েছে, অসহায়ত্ব বেড়েছে, মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়েছে। করোনার প্রাদুর্ভাবে পৃথিবীর দেশে দেশে, মানুষে মানুষে আয়-ব্যয়ের বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। করোনার কারণে বেকারত্ব ভয়ংকর রূপ ধারণ করলেও ধনী দেশের কর্মহীন লোকগুলো ঘরে বসে সরকারের তরফ থেকে যে পরিমাণ সহায়তা পাচ্ছে তা গরিব দেশের গরিব লোকগুলোর কল্পনাজগতের বেহেশতসমতুল্য। জন্মস্থানের হেরফেরের কারণেই এই পাহাড়সদৃশ বৈষম্য। করোনাকালে রাস্তাঘাটে লোকজনের চলাচল কমে গেলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভিক্ষুক আর দিনে এনে দিনে খাওয়া লোকগুলো—ভিক্ষুক ভিক্ষা পায় না, ভবঘুরে শ্রমিকেরা কাজ পায় না। এতসব বিপর্যয়ের মধ্যেও করোনা ইতিবাচক অনেক কিছুই শিখিয়েছে।
আমরা করোনা থেকে অনেক কিছু শিখেছি এবং শিখছি। কিছু মানুষ বেশি বেশি ধার্মিক হয়ে উঠেছেন, দুর্বলচিত্তের লোকজন নিজেদের পাপকর্মের কথা স্মরণ করে মৃত্যুর আগে পাপমোচনে ব্রতী হয়েছেন, করোনা থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রত্যাশায় বেশি বেশি প্রার্থনা করছেন। করোনা রোগের চিকিৎসা না থাকায় মৃত্যুর আশঙ্কায় কিছু লোক ঘুষ, দুর্নীতি ছেড়ে দিয়ে ঈমানের সাথে মরার কথা ভাবছেন, কিছু মানুষের আচার-আচরণ, কথাবার্তা, দান-খয়রাতের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। কিছু নারী হিজাব ধরেছেন, কিছু নারী-পুরুষ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজেদের ছবি অপসারণ করছেন, অন্যদের সরাতে নসিহত করে যাচ্ছেন। কিছু মানুষ আবার ধর্মের চেয়ে মরণকে বেশি ভয় করছেন। ছোঁয়াচে রোগে মারা গেলে ‘শহীদ’ হওয়ার সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও কেউ মরতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে না। মরতে চায় না বলেই মা’র মরদেহ জঙ্গলে ফেলে দিয়ে সন্তান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, অথচ মা’র পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। ধর্মে সমর্পিত এবং আস্থাবান মানুষেরাও সর্বরোগের মহৌষধ কালোজিরায় আস্থা স্থাপন করতে পারছেন না। এখন আস্তিক-নাস্তিক সবাই ভ্যাকসিন নিয়ে করোনা থেকে বাঁচতে চায়। উট আর গোমূত্রসহ যারা বিভিন্ন সংস্কারে অন্ধ ছিলেন তারাও ভ্যাকসিনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
করোনার কারণে এখন মানুষ আগের চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যসচেতন; সুস্থ থাকার প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে মনোযোগী হয়েছে। রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে অনেকেই নিয়মিত শরীরচর্চা করছেন। করোনার দাপটে প্রবীণেরাও আগের চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে উঠেছেন। পশ্চিমাদের কিছু সংস্কৃতি বাংলাদেশের জনগণ করোনা আসার পর রপ্ত করতে শুরু করেছে—মানুষের মুখের উপর কেউ এখন আর হাঁচি-কাশি দেয় না, হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় হাত দিয়ে মুখ ঢাকে, হাত ধোয়ার ব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। সুস্থ থাকার জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা যে অপরিহার্য তা করোনা শিখিয়ে দিয়ে গেছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অনেক রোগ-ব্যাধি থেকে মানুষকে মুক্ত রাখে। করোনা প্রতিরোধের স্বাস্থ্যবিধি মানলে শুধু করোনাভাইরাস নয়, অন্য অসুখবিসুখও ঠেকানো সম্ভব। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার এই অভ্যাস অনবচ্ছিন্ন থাকলে ভবিষ্যতে রোগ কম হবে, মানুষ সুস্থ থাকবে, মৃত্যুহার কমে যাবে।
করোনা মানুষকে আগের তুলনায় বেশি মানবিক করে তুলেছে। করোনার কারণে মানুষ একজন আরেকজনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও পরিবারের সদস্যদের সাথে মিলেমিশে অবস্থান করার বিরল সুযোগ পেয়েছে। অনেকে বেশি বেশি বই পড়ার সুযোগ পেয়েছেন, অনেকে একাকিত্বের আনন্দে কাব্য রচনা করেছেন। করোনা সঙ্কটে ফোনে একজন আরেকজনের নিয়মিত খোঁজখবর রেখেছেন, এতে সামাজিক একাত্মতা বেড়েছে। বিত্তবানদের অনেকে বিত্তহীনদের মাঝে খাবার বিতরণ করেছেন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা-রোগীর সেবা করেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেরা মানুষদের সচেতন করার চেষ্টা করেছেন। মৃত মা’কে এক সন্তান বনজঙ্গলে ফেলে গেলেও অন্য মায়ের সন্তান সেই পবিত্র মরদেহ খুঁজে এনে কবর দিয়েছেন। প্রবীণদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য নবীনেরা যেমন একযোগে কাজ করেছেন, ঠিক তেমনি প্রবীণ করোনা-রোগী তার ভেন্টিলেটর যুবক রোগীর জন্য উৎসর্গ করেছেন। মুসলমানের মরদেহ বহন করেছেন হিন্দু অ্যাম্বুল্যান্স ড্রাইভার, আর শুক্রবারের জুমার নামাজ বাদ দিয়ে হিন্দুর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেছেন মুসলমান মুসল্লি। মানুষের প্রতি মানুষের এমন মানবিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে শুরু করেছে করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাবের প্রারম্ভ থেকেই; ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষে মানুষে পারস্পরিক এই নির্ভরশীলতা করোনা পূর্বকালে খুব বেশি পরিলক্ষিত হয়নি।
করোনার কারণে পৃথিবীটা আরো বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে, ধরিত্রীর পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে। করোনা মানবজাতিকে আক্রমণ করায় মানুষের সর্বগ্রাসী আক্রমণ থেকে মুক্তি পেয়েছে পশুপাখি, নদীনালা, খালবিল, সাগর-মহাসাগর, আকাশ-বাতাস, পাহাড়-পর্বত, বনজঙ্গল, গাছপালা। মানবজাতি গৃহবন্দী হওয়ায় পশুপাখিরা প্রকৃতির বুকে নতুন করে স্বাধীনতা পেয়েছে, কিছু প্রাণী মানুষের নিষ্ঠুরতা থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে। মানুষের আনাগোনা না থাকায় সমুদ্রতটে প্রকৃতি নতুন সাজে সজ্জিত হয়েছে, সমুদ্র উপকূলে ডলফিন আসতে শুরু করেছে, সমুদ্রসৈকতে কচ্ছপের শুধু খেলাধুলা বাড়েনি, বেড়েছে তাদের প্রজননক্ষমতাও, সমুদ্রতটে দেখা গেছে অজস্র লাল-কাঁকড়ার বিচরণ, দেখা মিলেছে ফুলে ফুলে সুশোভিত সাগরলতার। বিপন্ন জীববৈচিত্র্য নতুন উদ্যমে জেগে উঠেছে। পরিবেশদূষণ কমেছে, প্রকৃতি তার জরাজীর্ণ দেহ মেরামতের সুযোগ পেয়ে নবসাজে সেজেছে, অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, প্রকৃতি ফিরে পেয়েছে তার নিজের রং। শিল্প-কারখানা এবং যানবাহন চলাচল হ্রাস পাওয়ায় রেকর্ড পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমেছে। বায়ুদূষণ কমে যাওয়ায় ওজোন স্তরে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিলো তা নিরাময়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এখন রাতের আকাশ আরও পরিষ্কার দেখা যায়, দেখা যায় সপ্তর্ষিমণ্ডল। ধরিত্রীকে রক্ষা করার জন্য শিল্পসমৃদ্ধ দেশগুলো সভার পর সভা করে শতাব্দীব্যাপী যা করতে পারেনি, করোনাভাইরাস তা এক বছরে করে দিয়েছে।
করোনা শনাক্ত হওয়ার পর স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘরে বসেই নানা সেবা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশে তথ্য-প্রযুক্তি অবকাঠামো এখন আগের চেয়ে শক্তিশালী। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নে বাংলাদেশ করোনাকালে কিছুটা সুফল পেয়েছে। অনলাইন ব্যবসায় বিরাট পরিবর্তন এসেছে, অনলাইনের মাধ্যমে খাবার-দাবার, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সামগ্রী বেচাকেনা হচ্ছে। অনলাইনে ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যের দোকান খুলে বসেছেন। ঘরে বসে করোনাকালীন অনেকের পক্ষে কাজ করা সম্ভব হয়েছে, অনলাইনে শিক্ষকরা ক্লাস নিয়েছেন, বিভিন্ন অফিসে জরুরি মিটিং-এ নীতি-পদ্ধতি গৃহীত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো অফিসের জন্য ঘর ভাড়া নেয়ার প্রয়োজন হবে না, অফিস-কর্মীদের আনা-নেয়ার জন্য পরিবহণের দরকার হবে না, কাগজ-কলম-টেবিল-চেয়ার ব্যবহারের আবশ্যকতা দেখা দেবে না। ঘরে বসেই করোনাকালে মানুষ ব্যাংকিং করছে, জমির পর্চা ও মিউটেশনের জন্য আবেদন করছে, পাসপোর্ট ফরম পূরণ করছে, পেনশনভাতাসহ নানা সেবা অনলাইনে পেয়ে গেছেন। করোনা না এলে মানুষ এভাবে এত দ্রুত প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহী হতো না।
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে মানুষ শুধু গৃহবন্দী হয়নি, আক্রান্ত হওয়ার পর ইতোমধ্যে ৫০ লক্ষাধিক লোক মারাও গেছে। তবে এই করোনাভাইরাসের জন্য লক্ষ লক্ষ লোক মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচেও গেছে। শিল্পাঞ্চল, বিমান, গাড়ি ইত্যাদি কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকার কারণে কালো ধোঁয়া উঠছে কম, এর ফলে পরিবেশদূষণ কমেছে অভূতপূর্বভাবে। পরিবেশদূষণের কারণে প্রতি বছর কত মানুষ মরছে এবং ভবিষ্যতে মৃত্যুর ক্ষেত্র তৈরি করছে তার হিসাব তাৎক্ষণিক কারো নজরে আসে না। তাই বলে করোনাভাইরাসের দীর্ঘস্থায়িত্ব কেউ কামনা করছে না, কামনা করছে করোনাভাইরাস থেকে লব্ধ অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করে শিল্পপ্রধান দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ কমানোর পদক্ষেপ নিক, ধরিত্রীকে বাঁচাক। তবে করোনা থেকে বাঁচতে হলে, বিশ্বঅর্থনীতির মধ্যে স্বাভাবিক গতি আনতে গেলে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলের ভ্যাকসিন লাগবে; কারণ উট আর গোমূত্র পানের সংস্কার বা অন্য কোন বিশ্বাস রোগমুক্তির ভরসার স্থল হতে পারে না। করোনা আমাদের নতুন করে শিখিয়েছে, রোগমুক্তির জন্য বিজ্ঞানের সফলতার কোন বিকল্প নেই।