এককালের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরবর্তীতে ক্যান্সারে আক্রান্ত আবু মহসিন খান ২রা ফেব্রুয়ারি রাত নয়টার দিকে ফেসবুক লাইভে এসে নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যা করেন। তিনি নিঃস্ব নন, থাকতেন অভিজাত এলাকায়, নিজের ধানমণ্ডির ফ্ল্যাটে। আগের মতো সম্পদের জৌলুস না থাকলেও ঢাকা শহরে তার আরও কয়েকটি ফ্ল্যাট রয়েছে। তিনি বাসায় একা থাকতেন, বিগত কয়েক মাস যাবৎ স্ত্রী ছেলের সাথে অস্ট্রেলিয়ায় আছেন। তার ঢাকাস্থ মেয়ে এবং ভাইয়ের পরিবারের লোকজন তাকে মাঝে মাঝে দেখে যেতেন, তাদের বাসা থেকে প্রায়ই খাবার আসত, তিনিও অনলাইনে অর্ডার দিয়ে তার প্রয়োজনীয় পণ্যাদি সংগ্রহ করে নিতেন। তিনি বহুবার অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ছেলের বাসায় গিয়ে বেড়িয়েও এসেছেন। আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও তিনি কারো বাসায় গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে সম্মত ছিলেন না; কারণ ব্যবসায় প্রতারিত হয়ে তিনি আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন। নিঃসঙ্গতা তাকে কুরে কুরে খেয়েছে, এই নিঃসঙ্গতাই তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছে।
আজকাল উচ্চশিক্ষার জন্য, উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় বা জীবিকার তাগিদে অনেকের সন্তান বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছে। পড়াশোনা বা জীবন-জীবিকার প্রয়োজনেই সন্তানদের মা-বাবার কাছ থেকে দূরে গিয়ে থাকতে হয়, এটা অস্বাভাবিক নয়। দূরে যাওয়া মানে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। ডিজিটাল যুগে দূরে অবস্থান করেও নিয়মিত সাহচর্য পাওয়া সম্ভব। মা-বাবা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিঃসঙ্গতার কথা ভেবে আদরের সন্তানকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ না দিলে সন্তানের প্রতি অবিচার করা হবে; কারণ মা-বাবা আমৃত্যু সন্তানকে পেলেও সন্তান কিন্তু এক সময় নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে, মা-বাবার অবর্তমানে। এই নিঃসঙ্গতায় সন্তান জীবনযুদ্ধে সফল নাও হতে পারে। শুধু জীবন-জীবিকা নয়, সন্তানদেরও আলাদা নিজস্ব জগত রয়েছে, কারণ আগেকার যৌথ পরিবারের মতো এখন সংসারের সকল সদস্য একই চিন্তা-ভাবনায় বৃত্তাবদ্ধ জীবনাচারে আনন্দ পায় না। বৃহত্তর পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে উঠাবসার সংস্কৃতি এখন নিউক্লিয়াস পরিবার সিস্টেমে অপসৃয়মাণ। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে সন্তানের ভালো থাকার সংবাদ মা-বাবার আনন্দের উৎস হওয়া বাঞ্ছনীয়।
আমাদের দেশ থেকে যত বেশি লোক বিদেশে পাড়ি দেবে ততই জাতির জন্য মঙ্গল। উন্নতির চরম পর্যায়ে পৌঁছলেও বাংলাদেশ নামের এই ছোট্ট ভূখণ্ডে এত বিপুল লোকের জায়গা হবে না। গরিব ও নিঃস্ব পরিবারের কোন সন্তান ভিন দেশের পাসপোর্ট পেলে মা-বাবার খুশীর সীমা থাকে না; কারণ এই সন্তানের রোজগারে পরিবারের সকল সদস্য খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারবে। ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে সমুদ্রে ডুবে শত শত বাঙালি যুবক মরছে, তারপরও মা-বাবা সন্তানদের খাবারের অন্বেষণে গতিময় পৃথিবীতে বিচরণ করতে পাঠাচ্ছে। তাই নিঃসঙ্গতার আবেগ মনে হয় শুধু বিত্তবানদের ‘বিলাসিতা’। পরিবারের বৃত্ত অনেক ভেঙ্গেছে, আরও ভাঙবে। আমার বাবা বৃত্ত ভেঙ্গেই দূরবর্তী ফেনী শহরের স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯২৪ সনে এনট্রান্স পাস করে এলাকায় আলোড়ন তুলেছিলেন। বাবা যদি পারিবারিক বন্ধনের গণ্ডি না ভাঙতেন তাহলে তার সন্তান ও পরবর্তী প্রজন্ম ফেনী পার হয়ে ঢাকা, করাচি, জার্মানি, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় পড়ার সাহস পেত না। আজ যারা বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি দিচ্ছে তারা হয়তো মা-বাবা এবং আত্মীয়-স্বজনদের কথা স্মরণ করে দুই ফোঁটা অশ্রু ফেলবে, কিন্তু তাদের বংশধর হয়তো এক সময় বাংলাদেশও ভুলে যাবে। পরিবারের মায়ায় আবদ্ধ হয়ে পড়লে গতিময় পৃথিবীতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে, পৃথিবীর যেখানেই জীবন গড়ার সুযোগ পাওয়া যাবে সেখানেই বসতি গড়ে তুলতে হবে, বংশপ্রীতির আবেগ অর্থনীতির প্রভাবে এখন গৌণ। মানবসভ্যতার শুরুতে অল্প কিছু উপযোগী স্থানে মানুষ দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করত; এই দলবদ্ধ মানুষগুলো থেকে কিছু মানুষ গোত্র ছেড়ে দূরে অন্য স্থানে গিয়ে নতুন বসতি গড়েছে বলেই পৃথিবীব্যাপী সভ্যতার বিকাশ হয়েছে এবং এটা ভবিষ্যতেও হতে থাকবে।
আমাদের সমাজে নিঃসঙ্গ থাকা কঠিন, কারণ বন্ধু তৈরি করা খুব সহজ, পাশ্চাত্যের মতো আনুষ্ঠানিকতার বালাই নেই। আমাদের দেশে অধিকাংশ প্রবীণ আজকাল তাদের পরিবারের সদস্যদের বাইরে গিয়ে বন্ধু-বান্ধবের সরস আড্ডা খুঁজে পেয়েছেন। আজকাল সকালে হাঁটার লোকেরাও দলবেঁধে নিজেদের ফোরাম গড়ে তোলেন, ফোরামের সবাই মিলে হাসিঠাট্টা করেন, পিকনিকে যান, বাসায় গিয়ে ফোনে কুশল বিনিময় করেন। তবে কেউ যদি স্বেচ্ছায় নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখেন তার নিঃসঙ্গতা দূর করা কঠিন। আনন্দ খুঁজে নেয়ার আগ্রহ না থাকলে জীবনের প্রতি বিরক্তি এসে ভর করবেই। প্রবীণদের নিয়ে উন্নত দেশগুলোও চিন্তিত। জাপানের বড় সমস্যা ওই দেশে প্রবীণ বেশি, তাদের গড় আয়ু ৮৩ বছর। সৃষ্টিকর্তা ওদের অঢেল সম্পদ দিয়েছেন, অনেকে নব্বই বছর বয়সেও দেশ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার প্রবীণ পর্যটক শুধু বৃষ্টি দেখার জন্য ভারতের চেরাপুঞ্জিতে প্রতি বছর ভ্রমণ করছেন। নাচ-গানে ভরপুর হিন্দুদের বিয়ের অনুষ্ঠান দেখার জন্য পাশ্চাত্যের বহু লোক প্রতি বছর ভারতে ভিড় করেন। ধনী দেশগুলোতে প্রবীণদের বিনোদনের নানা ব্যবস্থাও রয়েছে। হুইলচেয়ারে বসে তারা গাছ দেখেন, ফুল দেখেন, পাখি দেখেন, সাগর দেখেন, নদী দেখেন। তারা বিশ্বাস করেন, এই জীবন সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব, তাই তারা বৃদ্ধ বয়সেও রঙিন পোশাক পরে খুশী থাকেন।
বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করে ফুটপাতের বাস্তুহীন লোকগুলো এবং পথশিশুরা। কিন্তু জীবন অর্থহীন হলে ক্ষুধার্ত পথশিশুরা হাসতে পারতো না। তারা তাদের অভিযোগ নিয়ে কারো দ্বারে যায় না, কেউ অবশ্য তাদের অভিযোগ শোনেও না। রেলস্টেশনে ঘুমাতে গেলে পুলিশ তাড়ায়, ঝড়-বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য কারো ঘরের দুয়ারে গেলে দারোয়ান পিটায়—মা খোঁজ নেয় না, বাবার খোঁজ থাকে না। কই, তারা তো আত্মহত্যা করে না। কারণ তাদের খাবারের প্রত্যাশা ছাড়া আর কোন প্রত্যাশা নেই, পুলিশ আর দারোয়ানের লাঠির বাড়িতে দেহে যন্ত্রণা হলেও তা নিয়তি মনে করে ভুলে যায়, কারণ স্থায়ী আঘাত লাগার মতো আত্মসম্মান তাদের অচ্ছুত জীবনে থাকতে নেই। অন্ধ-বধির-লেংড়া-অনাথের দুঃখ-হতাশা-বঞ্চনা নিত্যসঙ্গী— এদের নিয়ে সৃষ্টিকর্তার পরীক্ষার শেষ নেই; সারাদিন অন্যের মার খেয়ে এরা মুমূর্ষু, আত্মঘাতী হওয়ার কৌশলটাই জানে না। দোজখ নিশ্চিত জেনেও বেশ্যাপাড়ার মেয়েটা অসহনীয় ক্লান্তি নিয়ে পুরুষ বদল করতে পারলে সুখী হয়। মানুষের ধিক্কার, অপমান সহ্য করেও সে বেঁচে থাকে, আত্মহত্যা করে না। এদের মা নেই, বাবা নেই, আত্মীয় নেই, স্বজন নেই, সন্তান নেই—আছে শুধু খদ্দের।
মানসগঠন আনন্দ উপভোগের অনুকূল হলে রিক্সার টুংটাং শব্দেও আনন্দ খুঁজে নেয়া সম্ভব, তুচ্ছ বস্তুর নড়াচড়ার মধ্যেও উৎফুল্ল হওয়ার উপকরণ খুঁজে পাওয়া যায়। প্রবীণ বয়সে ধর্মগ্রন্থ, উপন্যাস পড়ে, নাটক-সিনেমা দেখে, টেলিভিশনে খেলা দেখে, বাইরে গিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করে সময় কাটানো খুব কঠিন বিষয় নয়। তবে কেউ নিজে থেকে নিঃসঙ্গ থাকতে চাইলে কিছু করার নেই, কিন্তু নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি চাইলে আমাদের দেশেও তা লাভ করা সম্ভব। এ কথা সত্য যে, প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মাঝে অনেক বড় ফারাক থাকলে অপ্রাপ্তির বেদনা থেকে আত্মহত্যার প্রবৃত্তি জন্মায়। কিন্তু এই ফারাক জীবনব্যাপী বিরাজ করতে পারে না, ভালো দিন আসার সম্ভাবনাই বেশি। একদিনের চরম অস্বস্তি একজন মানুষের সমগ্র জীবনকে প্রভাবিত করে না।
আপন নাতি-নাতিনের বাসনা থাকা স্বাভাবিক, তাদের সাথে খেলা করার আগ্রহ থাকাও সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু সন্তান-সন্ততি সবার থাকবে এমন নিশ্চয়তা তো নেই। যাদের সন্তান নেই, নাতি বা নাতিন নেই তারা তো সবাই নিঃসঙ্গ নন। এক প্যাকেট চকোলেট নিয়ে বের হলে বাংলাদেশের রাস্তায় বহু পথশিশু পাওয়া যায়, এক প্যাকেট বিস্কিট নিয়ে বের হলে অসংখ্য ক্ষুধার্ত কুকুরের অকৃত্রিম বন্ধুত্ব পাওয়া সম্ভব। অনেক গৃহকর্মী আছেন যারা আপন মেয়ের মতো প্রবীণদের আদর-যত্ন করে থাকেন। আমাদের দেশে অনেক সেবিকা আছেন যারা রোগের সময় আপন সন্তানের মতো সেবা দিয়ে থাকেন। তাই অভাবের তাড়না ছাড়া আত্মহত্যার ভিন্ন কোন অজুহাত বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের নিকট অগ্রহণযোগ্য।
যমজ সন্তান কম, শিশু একাই পৃথিবীতে আসে এবং একাই মরে। এককালে হিন্দু সমাজে ধর্মের নামে সহমরণের প্রথা ছিলো, একেশ্বরবাদী রাজা রামমোহন রায় ইংরেজদের দিয়ে আইন করে তাও বন্ধ করে দিলেন। তাই মৃত স্বামীর জীবিত স্ত্রীকে নিয়ে আগুনে পোড়ার সুযোগ আর রইল না। ইসলামধর্মেও কারও দায়-দায়িত্ব অন্য কারো উপর অর্পণের সুযোগ নেই। স্বামী তার ভালো আমলনামা দিয়ে বেহেশতে গেলেও স্ত্রীকে নেয়ার ক্ষমতা স্বামীর নেই। তাই পরকালেও স্বামী আর স্ত্রীর বিচ্ছিন্ন থাকার সম্ভাবনা বেশি। এক্ষেত্রে স্বামী ভাগ্যবান, বেহেশতে তাকে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতে হবে না—সুন্দরী হুর আর গেলমানের সঙ্গ পাবে, হুরের সংখ্যা বেশি বলে জীবনে একঘেয়েমিও আসবে না। কিন্তু স্বামী ছাড়া স্ত্রী বেহেশতে গেলে স্ত্রীর নিঃসঙ্গতা কাটানোর কোন ব্যবস্থা ধর্মগ্রন্থে আছে কি না আমার জানা নেই। কারণ ইহকালের স্বামী ছাড়া অন্য কাউকে দিয়ে স্ত্রীদের সঙ্গী করার কোন ব্যবস্থা আমি ধর্মগ্রন্থে এখনো পাইনি। তাই ইহকাল-পরকাল কোথাও নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য নয়।
পৃথিবীতে কয়েকটি দেশে আত্মহত্যা আইন করে সিদ্ধ করা হয়েছে। তাই বলে কেউ চাইলেই আত্মহত্যা করতে পারে না। যে রোগী কোন কঠিন ও জটিল রোগে দীর্ঘদিন কষ্টভোগ করছে, যার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেই রোগী চাইলে ডাক্তারের লিখিত মতামত নিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে। আবার অনেক বয়স্ক ব্যক্তিও স্বেচ্ছায় আত্মহত্যার অনুমতি চাইতে পারে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এমন অনুমতি গ্রহণযোগ্য নয়; কারণ জন্ম-মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার হাতে। বোখারি হাদিসে রয়েছে, ‘আমার বান্দাহ আমার নির্ধারিত সময়ের আগেই নিজের জীবনের ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আমি তার ওপর জান্নাত হারাম করে দিলাম।’ কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন জাগে; তাহলে আত্মহত্যার সময়টি কে নির্ধারণ করে? শয়তান নিশ্চয়ই এত ক্ষমতাবান নয় যে, সৃষ্টিকর্তার পূর্বনির্ধারিত সময় পরিবর্তন করে দিতে পারে। তবে সৃষ্টিকর্তার নির্ধারিত সময়ের আগে মরার সুযোগ না থাকলে আত্মহত্যার সুযোগ তিরোহিত হয়ে যেত।