কর্নাটক রাজ্যে কালো বোরকা আর হিজাব পরা এক মুসলিম কলেজছাত্রীর সম্মুখে এসে 'জয় শ্রীরাম' স্লোগান দিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছে গেরুয়া ওড়নাধারী একদল হিন্দু তরুণ। ছাত্রীটি মোটরসাইকেল থেকে নেমে কলেজের ভেতর হেঁটে যাওয়ার সময় গেরুয়া ওড়না নেড়ে নেড়ে ছেলেগুলো মেয়েটির বোরকা ও হিজাব পরাকে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে ব্যঙ্গ করছিল। ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, এতগুলো অভব্য ও বর্বর ছেলের স্লোগানে মেয়েটি একা ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি তুলে শত শত কণ্ঠের ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিকে ম্লান করে দিয়েছিল। বহিরাগত ছেলেদের জঘন্য আচরণ থেকে মেয়েটিকে রক্ষা করতে ছুটে এসেছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকগণ। কলেজের অধ্যক্ষ মেয়েটিকে তখন হিজাব পরে ক্লাস করার অনুমতিও দিয়েছেন। এই সাহসী মেয়েটির নাম বিবি মুসকান খান। আবার প্রায় একই সময়ে হিজাব না পরার কারণে কাশ্মীরের মেয়ে আরুসা পারভেজের শিরশ্ছেদের হুমকিও দিয়েছে মুসলিম উগ্রপন্থীরা। আরুসা দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় বিজ্ঞান নিয়ে শুধু প্রথম স্থান অধিকার করেনি, ৫০০ নম্বরের মধ্যে পেয়েছে ৪৯৯ নম্বর। শিরশ্ছেদ করার হুমকির জবাবে আরুসার স্পষ্ট উক্তি, নিজেকে একজন ভাল মুসলমান প্রমাণ করার জন্য হিজাব পরার প্রয়োজন নেই। একদিকে হিজাব পরার বিরুদ্ধে গেরুয়া স্কার্ফধারী ধর্মান্ধ উগ্রপন্থী, অন্যদিকে হিজাব না পরার কারণে মুসলমান উগ্রপন্থী—ধর্মান্ধ আর উগ্রপন্থীর হুমকির মুখে মেয়েদের যত শঙ্কা। এই শঙ্কা সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন এবং মাঠেঘাটে ক্রমশই প্রকট হয়ে উঠেছে।
‘হিজাব’ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ ‘ঢেকে রাখা’ বা ‘বন্ধ করে রাখা’। আজকাল বিশেষ করে পশ্চিমের দেশগুলোতে প্রায়ই জিনস, শার্ট, মেকআপসহ হিজাব পরিহিত মুসলমান তরুণী দেখা যায়। মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর জীবনকালে কোন মুসলিম নারী হিজাব ব্যবহার করতেন না। অধিকাংশ বিদ্বজ্জন একমত যে, হিজাব ব্যবহারের অনুশর্ত শুধুমাত্র মহানবী (সা.)-এর স্ত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কেরালার রাজ্যপাল আরিফ খান বলেছেন, ‘হিজাব ইসলামের অংশ নয়। পবিত্র কোরআনে হিজাবের উল্লেখ সাতবার করা হয়েছে। তবে মহিলাদের পোশাক হিসাবে তাকে বর্ণনা করা হয়নি’। মিশরের আল-আযহারের আলেম এবং অস্ট্রেলিয়ান মুফতি মুস্তাফা রাশেদ টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানে দাবি করেছেন, ইসলামের মূলনীতির সাথে হিজাবের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু মিসরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফতোয়া সেন্টার হিজাব মুসলিম নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক বলে উল্লেখ করেছে। সুরা আহজাবে বলা হয়েছে, ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিনদের স্ত্রীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়’। চাদরের কিয়দংশ মাথা থেকে টানার কথা এখানে বলা হয়নি বলে হিজাব নিয়ে মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।
কর্নাটক রাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলিম মেয়েদের হিজাব পরা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে সমস্যা চলছিল। ভারতের এই রাজ্যের কয়েকটি হাইস্কুল ও কলেজে ইউনিফর্মের নীতিবিরুদ্ধ বলে ক্লাসের ভেতর মুসলিম মেয়েদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। মুসলিম মেয়েরা হিজাব পরে ক্লাস করলে হিন্দু ছেলেরাও গেরুয়া স্কার্ফ পরে ক্লাসে আসার হুমকি দিচ্ছিল। আমাদের দেশেও বিভিন্ন স্কুলে নির্ধারিত ইউনিফর্ম থাকে এবং তা পরে আসা বাধ্যতামূলক। আইডিয়াল স্কুলে ছেলেদের টুপি পরা ইউনিফর্মের অংশ, কোন ছাত্র ভুলে টুপি না আনলে তাকে ক্লাসে ঢুকতে দেওয়া হয় না। নটরডেম কলেজে এক সময় ছাত্রদের ইউনিফর্মের কোন বালাই ছিলো না, বহিরাগতদের আগমন রোধ করতে এখন বোধ হয় চালু করেছে। পোশাক-পরিচ্ছদের উপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মানের উপর গুরুত্ব দেওয়া অধিকতর শ্রেয়। ইউনিফর্মের সমতা রাখার প্রয়োজন হলে তা করবে কলেজ কর্তৃপক্ষ, কোন গেরুয়া স্কার্ফ পরা ধর্মান্ধ যুবক নয়।
হিজাবের বিরুদ্ধে যারা মিছিল করছে, ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়েছে তারা বিজ্ঞানশিক্ষায় শিক্ষিত সংস্কারমুক্ত আধুনিক মননের যুবক নয়, তারাও হিন্দুধর্মের গেরুয়া স্কার্ফ গলায় ঝুলিয়েছে। তারা অভিন্ন পোশাকবিধির স্লোগান দেয়নি, তারা দিয়েছে ধর্মীয় স্লোগান। তাদের ধর্মীয় স্লোগানের বিরুদ্ধে মুসকানও ধর্মীয় স্লোগান ‘আল্লাহু আকবর’ বলেছে। ধর্ম দিয়ে ধর্ম ঠেকানোর এমন চেষ্টা নতুন কিছু নয়। পৃথিবীতে ধর্মের ধ্বংস আর ধর্মের রক্ষার জন্য ধার্মিকদের যুদ্ধ ও খুনাখুনি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। পৃথিবীতে বর্তমানে চার হাজারের বেশি ধর্ম রয়েছে, মানুষে মানুষে এখনো অন্যতম প্রধান বিরোধ ধর্ম। অতীতের অনেক প্রভাবশালী ধর্ম যা একসময় অসংখ্য মানুষ পালন করত তা বর্তমানে মিথলজিতে পরিণত হয়েছে; আর সেই সকল ধর্মের অবতারেরা এখন সিনেমা, নাটক, গল্পের চরিত্র হিসেবে স্থান পেয়েছে। নরডিক ধর্মের দেবতা থর এখন মারভেল মুভিতে এবং গ্রিক ধর্মের দেবতাদের প্রধান জিউসকে তো প্রায়শ নানা সিনেমাতে দেখা যায়; অথচ একসময় জিউসের টেম্পলে, যা এখনো গ্রিসে আছে, জিউসকে খুশি করার জন্য মানুষ বলি দেওয়া হত।
জন্মের পর থেকেই ধর্মের রীতিনীতির মধ্যে অধিকাংশ শিশু বড় হতে থাকে, বড় হয়েও এর বাইরে যাওয়ার কোন উপায় থাকে না, এক সময় তারই অধীনস্থ হয়ে পড়ে। বিপদ হচ্ছে, পারিবারিকভাবে লালিত একজনের ধর্মবিশ্বাসের সাথে আরেকজনের ধর্মবিশ্বাসের বৈপরীত্য সীমাহীন। বিভিন্ন পরিবারে শিশুরা বিভিন্ন ধর্মের পারস্পরিক সাংঘর্ষিক রীতিনীতি দ্বারা অভ্যস্ত হয়ে বড় হচ্ছে। এক ধর্ম আরেক ধর্মের সত্যতা স্বীকার করে না। ২০১৯ সনের হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর ৭৭১.৫০ কোটি লোকের মধ্যে ৭৬৯.৮০ কোটি লোক ইহুদিধর্ম মানে না, ৭১১.৫০ কোটি লোক বৌদ্ধধর্ম মানে না, ৬৪১.৫০ কোটি লোক হিন্দুধর্ম মানে না, ৫৭১.৫০ কোটি লোক ইসলামধর্ম মানে না, ৫৩১.৫০ কোটি লোক খ্রিস্টধর্ম মানে না। এই হিসাবে নাস্তিক, সংশয়বাদী ও ধর্মহীনদের ধরা হয়নি, প্রতিটি ধর্মের মধ্যে প্রচুর লোক রয়েছেন যারা কোন ধর্মই মানেন না। তারা একটা ধর্মই মানেন এবং তা হচ্ছে মানবধর্ম।
কার্ল মার্কস ধর্মকে আফিমের সাথে তুলনা করেছিলেন। আফিম খেলে মানুষ যেমন স্বাভাবিক হুঁশে থাকে না, ধর্মান্ধতাও তেমনি মানুষকে একরোখা ও একমুখী করে তোলে। এখানে বিজ্ঞান আর যুক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ধর্মের উপর নিষেধাজ্ঞা আর নিগ্রহ ধর্মীয় মনোভাবকে প্রবলতর করে তোলে। যারা হিজাব পরত না তারাও গেরুয়া-স্কার্ফধারীদের আচরণের প্রতিবাদে এখন হিজাব পরবে, ধর্মের আনুষ্ঠানিকতার প্রতি অধিকতর আকৃষ্ট হবে। যখন হিজাব ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা হয়, তখনই হিজাব ব্যবহারের প্রসার ঘটে। পৃথিবীর অনেক দেশ ফ্রান্স, বেলজিয়াম, চীন, শ্রীলঙ্কা, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, বুলগেরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নে নিরাপত্তার প্রশ্নে এবং তাদের সাংস্কৃতিক সমতা ও জাতীয় ঐক্য সুরক্ষার নিমিত্তে হিজাবের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। দেশগুলোর এমন সিদ্ধান্ত মুসলমান নারীগোষ্ঠীর মধ্যে প্রকাশ্য প্রতিরোধের মানসিকতা সৃষ্টি করেছে, তারা আরও অধিক সংখ্যায় শারীরিক আচ্ছাদন ও হিজাব পরায় উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। ইরানে রেজা শাহ পাহলভী, আফগানিস্তানের বাদশাহ জহির শাহ, তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক তাদের জনগণের জন্য পাশ্চাত্যের শিক্ষাব্যবস্থা এবং পোশাক-পরিচ্ছদ চালু করেছিলেন; তাদের পতনের সাথে সাথে ইরান, আফগানিস্তান ও তুরস্কে ধর্মীয় আচার-আচরণের সঙ্গে হিজাবও প্রত্যাবর্তন করেছে।
ধার্মিকদের মধ্যে অনেকে ধর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণে না গিয়ে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ভদ্র, নম্র ও বিনয়ী হয়ে থাকেন। কিন্তু এই সংখ্যা দিন দিন কমছে। ইসলাম ধর্মে ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের সাথে সুসম্পর্ক গড়তে নিষেধ করা হয়েছে। যারা মাওলানা আবদুর রাজ্জাকের মতো ধর্মের কঠোর নিয়মাচারে বিশ্বাসী তাদের নিকট ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। আপন ধর্মের বিধান নিয়েও প্রতিটি ধর্মের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আপন ধর্মের ধর্মবেত্তাদের মধ্যে যেখানে সমঝোতা হয় না সেখানে অন্য ধর্মের সাথে সহাবস্থান প্রায় অসম্ভব। সৌদি আরবে ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মের অনুসারীদের প্রকাশ্য উপাসনা নিষিদ্ধ। ভারতের গুরগাঁওয়ে খোলা স্থানে জুমার নামাজ আদায়ে বাধা দিচ্ছে হিন্দু ডানপন্থী গোষ্ঠীর একদল লোক। সৌদি আরব আর গুরগাঁওয়ের লোকদের মধ্য কোন পার্থক্য নেই। ফেসবুকে শুধু গুরগাঁওয়ের হিন্দুদের বিরুদ্ধে প্রচার হচ্ছে, সৌদি আরবের কথা কেউ বলছে না। পশ্চিমের অধিকাংশ দেশে শব্দদূষণের আশঙ্কায় শুধু মসজিদের ভেতরে কম শব্দে আজান দেওয়ার অনুমতি রয়েছে; অবশ্য মাইক ব্যবহার করে আজান দেওয়া যাবে কিনা এই বিষয়েও আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। তাই বহু ধর্ম, বর্ণ আর সংস্কৃতির দেশ আস্তে আস্তে কমছে, পশ্চিমের দেশগুলো ধর্মকে ভ্যাটিকান সিটিতে পাঠিয়েও ধর্মীয় বিভেদ বন্ধ করতে সমর্থ হচ্ছে না। ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির উর্বর ভূমি হচ্ছে ভারত উপমহাদেশ। ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাস, রাষ্ট্রীয় নীতিতে তার অনুপ্রবেশ হলে রাজনীতি ধর্মাশ্রিত হবে। ধর্ম রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকলে মানুষে মানুষে বিভেদ, বিভাজন কেয়ামতের আগ পর্যন্ত বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সমাজের একেবারে ভেতর থেকে উঠে আসা কট্টর ধর্মান্ধতা রোধ করার কোন আগ্রহ ভোটপ্রার্থী রাজনীতিতে বর্তমানে অনুপস্থিত। হিন্দুদের মধ্যে উগ্রপন্থার উত্থান ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার অপমৃত্যুর সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে।