রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে বহুদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। রাশিয়া মহড়ার নামে ইউক্রেনের সীমান্তে লাখখানেক সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে। ন্যাটোও পূর্ব ইউরোপে সেনা মোতায়েন করছে। ইউক্রেনও বসে নেই, তারাও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, গৃহিণীরা অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। আমেরিকা এবং ইউরোপের সমর্থনে ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর হুমকি দিচ্ছে। ইউক্রেনে কোন অভিযান চালালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্র হুঁশিয়ার করে দিচ্ছে। আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে রাশিয়া আমেরিকাকে বারবার সতর্ক করছে। তীব্র সামরিক উত্তেজনার মধ্যে রাশিয়াকে ভুল পথে চালানোর একটি গূঢ় পরিকল্পনা পশ্চিমা বিশ্বের থাকতে পারে; ইউক্রেন আক্রমণ করার জন্য রাশিয়াকে পশ্চিমা বিশ্ব প্রলুব্ধ করছে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল ১৫টি প্রজাতন্ত্রের সমন্বয়ে একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ। ১৯১৭ সনে লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র কায়েম হলে প্রতিবেশী আরও ১৪টি দেশকে নিয়ে ১৯২২ সনে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়। ১৫টি দেশ নিয়ে গঠিত সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি হিসেবে স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত ছিল। ১৯৯১ সনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়, ভাঙার আগে ইউক্রেনও সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। সমাজতন্ত্র বা কমিউনিস্টদের ঠেকানোর জন্য গড়ে উঠা আমেরিকা ও ইউরোপের সামরিক জোট ন্যাটোর প্রতিপক্ষ হিসেবে রাশিয়ার নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিলো ‘ওয়ারশো’ সামরিক জোট। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে ওয়ারশো জোটও ভেঙে যায়। ১৫টি রাজ্য আলাদা হওয়ার পরপরই ইউক্রেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পনেরটি প্রজাতন্ত্রের মধ্যে বাল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া, ও এস্টোনিয়া ২০০৪ সনে ন্যাটো জোট ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়। ইউক্রেন শুধু পশ্চিমাঘেঁষা নীতি অনুসরণ করছে না, ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য হতেও আগ্রহী। রাশিয়ার পাশের শক্তিশালী দেশ ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য থাকবে, সেখানে ন্যাটোর সেনা অবস্থান নেবে, ন্যাটোর সর্বাধুনিক অস্ত্র রাশিয়াকে টার্গেট করে বসানো হবে—এটা রাশিয়ার মেনে নেওয়ার কথা নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ১৯৬২ সনে কিউবায় রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি মেনে নেয়নি। রাশিয়া কিউবা থেকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র তুলে না নিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি অবশ্যই কিউবা আক্রমণ করার হুকুম দিতেন। চীন এবং রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক রাখার কারণে আজও কিউবা আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হওয়ায় রাশিয়া তার দুর্বল নেতৃত্বের কারণে বিশ্বনেতৃত্ব থেকে ছিটকে পড়ে যায়। রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ইউটার্ন রাজনীতি দেশটিকে অস্থির করে তোলে। ভিন্নমতাবলম্বী সাংসদদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য রাশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়েলৎসিনের নির্দেশে তখন পার্লামেন্টের ভেতর কামানের গোলা নিক্ষেপ করা হয়েছিলো। প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থাও টালমাটাল, সব দেশ নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে ছুটছে। এই সুযোগে আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোকে রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে থাকে।

ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়া ও ইউক্রেন দুটিই স্লাভিক দেশ, যাদের রয়েছে যৌথ জাতীয় ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। ২০১৪ সন পর্যন্ত ইউক্রেন সরকার রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, কিন্তু ২০১৪ সনে জনগণের বিক্ষোভে রুশপন্থী প্রেসিডেন্টের পতন হলে ইউক্রেন রাশিয়াকে ছেড়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়াস নেয়। তখন জাতিগত দাঙ্গায় ইউক্রেনের একটি অংশ ক্রিমিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করলে রাশিয়া সেনা পাঠিয়ে ক্রিমিয়াকে সহায়তা প্রদান করে। অবশ্য ক্রিমিয়া এক সময় রাশিয়ার ছিলো, ১৯৫৪ সনে নিকিতা ক্রুশ্চেভের আমলে ইউক্রেনকে ক্রিমিয়া উপহার দেওয়া হয়। এখনো রুশভাষী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বসবাস করেন পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস এলাকায়, তাদের উপর গণহত্যা চালানো হচ্ছে বলে রাশিয়া অভিযোগ করে যাচ্ছে। রুশভাষী জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার অজুহাতে পুতিন ইউক্রেনের ডনবাস দখল করে নিতে পারে। তুর্কিভাষী জাতিগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে তুরস্কও সাইপ্রাসের উত্তর অংশ ১৯৭৪ সনে দখল করে নিয়েছিলো। ১৯৭৫ সনে পর্তুগালের ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের ৯ দিনের মাথায় ইন্দোনেশিয়াও পূর্ব তিমুর দ্বীপটি দখল করে নিয়েছিলো।

ইউক্রেন আক্রমণ করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে শুধু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নয়, রাশিয়ার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যও বন্ধ করে দিতে পারে, জার্মানি রাশিয়া থেকে গ্যাস নেয়া বন্ধ করে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, রাশিয়ার মুদ্রা রুবলকে ডলার বা ইউরোতে পরিবর্তন করার সুযোগ রহিত করা হতে পারে, বৈশ্বিক অর্থ পরিশোধ পদ্ধতি সুইফট থেকে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে ইউরোপে ব্যবহৃত গ্যাসের ৩৫-৪০ শতাংশ রাশিয়া সরবরাহ করে থাকে, রাশিয়ার গ্যাস না নিলে ইউরোপও বিপদে পড়বে। বিপদ মোকাবিলায় ইউরোপের প্রতিটি দেশ লিকুইড গ্যাস সংগ্রহ করে জমা করছে, আমেরিকাও ইউরোপে তাদের গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউক্রেনের মধ্য দিয়ে রাশিয়া থেকে পাইপ দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গ্যাস নেওয়ার খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তেল-গ্যাস এবং অস্ত্র রাশিয়ার রপ্তানির অন্যতম প্রধান পণ্য। এই পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করতে আমেরিকা নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে। ইউক্রেন আক্রমণ করলে তাদের এই কর্মকাণ্ড আরও ত্বরান্বিত হবে। আমেরিকা কখনো রাশিয়া আক্রমণ করবে না, কারণ রাশিয়া আর ইরাক এক নয়। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করতেই থাকবে। এক্ষেত্রে তারা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোকে তেলের দাম এমনভাবে কমিয়ে দিতে প্ররোচিত করে যাতে রাশিয়া তেল বিক্রি করে সুবিধা করতে না পারে, যাতে তাদের অর্থনীতিতে ধস নামে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হয়, অথচ ১৯৪৫ সন থেকে ১৯৯১ সন পর্যন্ত শুধু সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি হিসেবে স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টক্কর দেওয়ার মতো আর কোন পরাশক্তি না থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই সারা বিশ্বে নিজেদের একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছিলো, বিনা বাধায় ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তান, সিরিয়া আক্রমণ করলো। পুতিন ক্ষমতায় এসে রাশিয়াকে আবার পুনরুজ্জীবিত করে তুলেছে—আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকার একচেটিয়া মাতব্বরিতে পুনরায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে থাকল। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সরানোর জন্য ন্যাটোর একচেটিয়া আক্রমণের মুখে রাশিয়া হঠাৎ পাল্টা বিমান হামলা করে সিরিয়ার প্রেসিডেন্টকে রক্ষা করলেন। এই প্রথম রাশিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকাকে যুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করলো। রাশিয়ার এমন আবির্ভাব ন্যাটো জোটের কাছে নতুন বার্তা দিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, কিছুদিন আগে আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানের মধ্যে বিতর্কিত অঞ্চল নিয়ে একটি ভয়ঙ্কর যুদ্ধ থামাতে শান্তিরক্ষী পাঠিয়েছে রাশিয়া। সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশ কাজাখস্তানে জনগণের বিক্ষোভে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে রাশিয়া নেতৃত্বাধীন জোটের প্যারাট্রুপার্স দল গিয়েছিলো। ন্যাটোতে যোগ দিতে চাওয়ায় রাশিয়া জর্জিয়ার দুটি অঞ্চল আবখাজিয়া ও দক্ষিণ ওশেতিয়া দখল করে নিয়েছিল। মনে হচ্ছে পুতিন নতুন সোভিয়েত ইউনিয়ন তৈরির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

রুশপন্থী ভিক্টর ইয়ানোকোভিচ যতদিন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ততদিন ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার কোন সমস্যার উদ্ভব হয়নি। ২০১৪ সনে ইয়ানোকোভিচ ক্ষমতা হারালে পশ্চিমাপন্থী পেত্র পোরোশেনকো ক্ষমতায় এসেই রাশিয়াকে উপেক্ষা করতে থাকেন এবং ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্যভুক্ত করার উদ্যোগ নেন; বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও একই নাতি অব্যাহত রেখেছেন। ২০১৮ সন থেকে ইউক্রেন ন্যাটোর অ্যাম্পিয়ারিং মেম্বার, সম্প্রতি ইউক্রেনকে পূর্ণ সদস্য করার সবুজ সঙ্কেতও দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় ইউক্রেনের চারিদিকে সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে রাশিয়া পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ বন্ধ করতে চাচ্ছে। ইউরোপীয় বলয় থেকে দূরে রাখার কৌশলের অংশ হিসাবে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়া চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রাখবে এবং ইউক্রেনে রুশপন্থী সরকারপ্রধান ক্ষমতায় এলে রাশিয়ার মাথাব্যথা আর থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে যত জড়িত হবে, রাশিয়া তত বেশি আগ্রাসী হবে। রাশিয়া যে কোনো মূল্যে তার সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তবে মুখোমুখি যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানে, পুতিন সাদ্দাম হোসেন নন।