আজ রবিবার, ২২ আগস্ট, ২০২১; দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:
দ্বিতীয় দফায় তালেবানি শাসন
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
তালিবানেরা বিজয়ী, আফগানিস্তানের ক্ষমতা এখন তাদের করায়ত্ত। ইতিহাসে আমরা পড়েছি, বখতিয়ার খিলজী ১২০৪ সনে নদীয়ার রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে বাংলা জয় করেন। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীও আফগানিস্তানের অধিবাসী ছিলেন। দ্বিপ্রহরে ভোজনরত লক্ষ্মণসেন আকস্মিক আক্রমণে হতভম্ব হয়ে রাজপ্রাসাদের পিছন দিয়ে খালি পায়ে পালিয়ে যান। অন্যদিকে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি একটি হেলিকপ্টারে অর্থ বোঝাই করে নিয়ে পালিয়ে গেছেন; হেলিকপ্টারে জায়গা না থাকায় কিছু অর্থ তাকে ফেলে দিতেও হয়েছে। লক্ষ্মণসেনের পালানোর প্রস্তুতি ছিলো না, কিন্তু আশরাফ ঘানি প্রস্তুতি নিয়েই পালিয়েছেন।
তালেবানদের কাবুল দখলের পর অনেকে ভয়ে আফগানিস্তান ছেড়ে পালাচ্ছেন। আমেরিকান নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার জন্য আমেরিকার সামরিক বিমান অবতরণ করার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিত কাবুলবাসীর হুড়োহুড়ি করে বিমানে উঠার যে দৃশ্য মিডিয়ায় দেখেছি তা রীতিমত ভয়ানক। মার্কিন বিমান ঘিরে শত শত মানুষকে প্রাণ বাঁচাতে ছুটোছুটি করতে দেখা গেছে। কাবুল বিমানবন্দরে শুধু পদদলিত হয়ে মানুষ মরেনি, মানুষ মরেছে মার্কিন সেনার গুলিতে এবং উড়ন্ত বিমান থেকে পড়ে। বিমানে উঠার হিড়িক থামাতে মার্কিন সেনাদের গুলি করতেও হয়েছে। বিমানের ভেতর জায়গা না পেয়ে চাকার উপরেই চড়ে বসেন কয়েকজন, রানওয়ে ছেড়ে বিমান আকাশে উঠতেই ছিটকে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন। অভিনেতা-অভিনেত্রী, কৌতুক অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা, গায়ক-গায়িকা এবং আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত নারীরা তালেবানদের ভয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পালিয়ে কাবুলে আশ্রয় নিয়েছিলো। আশরাফ ঘানি সরকারের সরকারি কর্মকর্তা এবং সৈন্যরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পালানোর জন্য বিমানবন্দরের দিকে ছুটে গেছে। তালেবানেরা প্রতিশোধ না নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্তে লোক জড় হওয়া থামছে না।
তালেবানদের ফেরত আসায় ওখানকার কিছু মানুষ এত আতঙ্কিত কেন? ১৯৯৬ সনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তালেবানেরা ক্ষমতায় এসেই তৎকালীন আফগান প্রেসিডেন্ট ড. নজিবউল্লাহকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিছুদিন আগে শিশু অপহরণের দায়ে দুই জনকে ব্রিজের সাথে লটকিয়ে প্রকাশ্যে ফাঁসি দিয়েছে। নক্সালদের মতো কিছুদিন যাবৎ তারা টারগেটেড লোকদের হত্যা করছে। প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা, পাথর মেরে ব্যভিচারের মৃত্যু নিশ্চিত করা, দোররা মেরে শাস্তি দেয়া, মাহরম ছাড়া কোন নারী ঘরের বাইরে এলে প্রকাশ্যে রাস্তায় বেত্রাঘাত করা—প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা ছিলো। ক্ষমতায় এসেই তালেবানেরা মেয়েদের স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দেয়, মেয়েদের চাকুরী করার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, মেয়েদের ঘরে আবদ্ধ থাকাটা সর্বোত্তম ধর্মীয় পন্থা বলে প্রচার করে, মেয়ে রোগীর পুরুষ চিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা নেয়া নিষিদ্ধ করে, নাচ-গান-নাটক-সিনেমা সকল ধরনের বিনোদনের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। দেশের সর্বত্র তালেবানদের নজরদারি ছিলো, তাদের নির্দেশের ব্যত্যয় হলেই রাস্তায় সন্তানের সম্মুখে মা’কে নাজেহাল করা হয়েছে। তৎকালীন তালেবানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী চোরদের হাত, পা কাটার জন্য শল্যচিকিৎসক পাঠাতে আন্তর্জাতিক রেডক্রসকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কখনো ইসলামপন্থী মানুষের বিরোধী নয়। কোন ধর্ম আমেরিকার শত্রু নয়, বরং ধর্মপ্রাণ লোকেরা ক্ষমতায় থাকলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিরাপদ মনে করে। চীনের উইঘুর মুসলমানদের পক্ষে আমেরিকা যত উচ্চবাচ্য করে, কোন মুসলিম দেশও তত করে না। প্রবল জাতীয়তাবাদী লিবিয়ার মুয়াম্মর গাদ্দাফী, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন বা সিরিয়ার বাশার-আল-আসাদ ছিলো আমেরিকার শত্রু, আমেরিকার কথা শুনতো না; তাই সাদ্দাম এবং গাদ্দাফীকে সরিয়ে অধিকতর কট্টর এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর হাতে শাসনক্ষমতা ছেড়ে দিতে আমেরিকা ইতস্তত করেনি। সিরিয়ায় সুন্নিদের সমর্থন দিয়ে প্রেসিডেন্ট বাশার-আল-আসাদকে সরানোই আমেরিকার মূল লক্ষ্য ছিলো। সৌদি আরব ধর্মের নামে যত অপরাধই করুক না কেন আমেরিকার চোখে তারা অপরাধী নয়; খাসোগির মতো খোলা মাঠে কাউকে করাত দিয়ে টুকরা টুকরা করলেও আমেরিকা মাথা ঘামাবে না। মাথা ঘামাবে তখন যখন তাদের স্বার্থে আঘাত লাগবে। এ কারণেই এখন অপরাধী হচ্ছে আমেরিকার কট্টর বিরোধী ইরান এবং ধর্মনিরপেক্ষ ফিলিস্তিন। মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড নির্বাচনে জয়লাভ করেও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি শুধু ইসরাইলবিরোধী ছিলো বলে। ২০০১ সনে যাত্রীবাহী বিমান দিয়ে টুইন টাওয়ারে হামলা না হলে আমেরিকা কখনোই তালেবান শাসনের বিরোধিতা করত না। কেন করবে? তালেবানেরা তো আমেরিকার সৃষ্টি, আমেরিকাই তালেবানদের ক্ষমতায় বসিয়েছিলো।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে আমেরিকা কোন যুদ্ধে জড়ায়নি, বরং বিভিন্ন দেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করার নীতি গ্রহণ করেছিলো। ২০২০ সনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলেই কাতারে তালিবানদের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ্বাস ছিলো, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনাদের দেশে ফেরত নেয়া হলে নির্বাচনে তার জনসমর্থন বাড়বে। তালেবানদের সাথে আমেরিকার যে শান্তিচুক্তি হয় সেই চুক্তির শর্তেই উল্লেখ রয়েছে, তালেবানেরা ক্ষমতায় আসবে এবং আসবে বলেই তালেবানদের কাছ থেকে আমেরিকা এই মর্মে নিশ্চয়তা নিয়েছে যে, তালেবানেরা যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের বিরুদ্ধে আল-কায়েদাসহ কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করতে দেবে না। আমেরিকান সৈন্য আফগানিস্তান ত্যাগ করার সাথে সাথে আফগান সরকারের যে বিপর্যয় হবে তা অনেক সামরিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু জো বাইডেনও সৈন্য প্রত্যাহারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির সমর্থন করে আফগানিস্তান থেকে সেনা উঠিয়ে নেন।
আমেরিকান সেনা আফগানিস্তান ত্যাগ করার সাথে সাথে আফগান সেনাদের মনোবল ভেঙে যায়; এক হাজার সেনা যুদ্ধ না করে তাজিকিস্তানে পালিয়ে যাওয়ার পর বাকি সেনাদের মনোবল আরও ভেঙে যায়। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হওয়ায় বিনা যুদ্ধে তালেবানেরা কাবুলে প্রবেশ করে। একাত্তরে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের আত্মসমর্পণ করার প্রধান কারণ ছিলো মনোবল ভেঙে যাওয়া এবং আত্মসমর্পণ না করলে বাঙ্গালী জনসাধারণ ও গেরিলাদের হাতে করুণ মৃত্যুর আশঙ্কা। যুক্তরাষ্ট্র সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়ার আগেই দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলো তালেবান যোদ্ধারা। পানিবিহীন মরুভূমি আর দুর্গম গুহা অঞ্চলে টিকে থাকার চরম কষ্টসহিষ্ণু আফগান জাতিকে টনে টনে বোমা মেরেও সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিমান হামলায় বেসামরিক নাগরিক হতাহতের ঘটনায় সাধারণ মানুষও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিরক্ত ছিলো।
আমেরিকা এখন মনে করে তালেবানদের ঠেকিয়ে রাখার মধ্যে তাদের কোন স্বার্থ নেই। আমেরিকা মনে করছে, তালেবানেরা আল-কায়দার মতো আমেরিকার বিরোধী হবে না। আমেরিকা তাদের অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র তালেবানদের জন্য রেখে গেছে কেন তাও স্পষ্ট হচ্ছে না। ইরানের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানকে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার কোন পরিকল্পনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে কি না তাও স্পষ্ট নয়। সরকার গঠনের পূর্বেই আমেরিকা তালেবানদের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, আর্থিক সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। তালেবানেরাও কাবুল বিমানবন্দরে আমেরিকান সৈন্যদের সহায়তায় আমেরিকান এবং আফগান নাগরিকদের বিমানে করে কাবুল ত্যাগে বাধা দেয়নি। ইতোমধ্যে তালেবানেরা আশরাফ ঘানির সরকারকে সহায়তাকারী সকলের প্রতি সাধারণ ক্ষমাও ঘোষণা করেছে। আগের আমল থেকে তালেবানদের দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে; তবে শরিয়া আইনের প্রয়োগে তালেবানেরা শিথিলতা দেখাবে বলে মনে হয় না; শরিয়া আইন প্রয়োগে কঠোর ও রক্ষণশীল হলে আফগান মেয়েদের শিক্ষা ও চলাফেরায় নমনীয় হওয়ার কোন সুযোগ থাকবে বলেও মনে হয় না। বিশ বছর আগের তালেবান আর বর্তমানের তালেবানের মধ্যেও একটা ইতিবাচক পার্থক্য সবাই আশা করছে। কাবুল দখল করার পর তালেবানেরা গতবারের মতো কোথাও উগ্রতা দেখায়নি, আগের তুলনায় তাদের অনেক সহনশীল মনে হয়েছে।
তালেবানদের কঠিন পরীক্ষাটি এখন সম্মুখে—আধুনিকতাকে গ্রহণ করলে ধর্মীয় নির্দেশনায় কিছুটা শিথিলতা আনতে হবে, আর যদি আগের মতো শরিয়া আইনের কঠোর প্রয়োগে আপোষহীন হয় তাহলে আবার আফগানিস্তান বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে যাবে।
লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী
পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ahmedzeauddin0@gmail.com