আজ সোমবার, ১৬ আগস্ট, ২০২১; দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:

যত দোষ নন্দ ঘোষ

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

সম্প্রতি প্রায় প্রতিদিন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় গ্রেফতারের সাথে মদের সম্পর্ক দেখানো হচ্ছে। এমন প্রদর্শনের তাৎপর্য হচ্ছে, মদ রাখা মারাত্মক অপরাধ, যারা রাখে তারা সমাজের চোখে অপাঙ্‌ক্তেয়। বঙ্গবন্ধুর আমলে মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো, জিয়াউর রহমানের আমলে সঙ্গত কারণেই তা আবার চালু করা হয়। মওদুদ সাহেবের বাসায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মদ পাওয়া গেলে মামলা হয়, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সেই মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। বিধিনিষেধ সাপেক্ষে বাংলাদেশে মদ উৎপাদন, বিপণন ও সেবন করা অপরাধ নয়।

বাংলাদেশে স্টারভুক্ত হোটেল ছাড়াও অনুমোদিত কিছু ক্লাব তাদের সদস্যদের কাছে লাইসেন্স থাকা সাপেক্ষে মদ বিক্রি করে থাকে। সদস্যদের জন্য প্রতিটি ক্লাবের নিজস্ব ড্রেস কোড রয়েছে। সম্ভবত মুজিব কোট পরে ‘ঢাকা ক্লাবে’ প্রবেশ করা যাবে না মর্মে ক্লাব কর্তৃপক্ষের একটি নির্দেশনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ একটি কলাম লিখেছিলেন। তার অভিযোগ ছিলো, যে ক্লাবে টনে টনে মদ খাওয়া হয় সেই ক্লাবে এত বিধিনিষেধ অগ্রহণযোগ্য। দেশের অধিকাংশ ক্লাব ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত। ১৯১১ সনে ‘ঢাকা ক্লাব’, ১৮৪৭ সনে ‘সিলেট স্টেশন ক্লাব’ এবং ১৮৭৮ সনে ‘চট্টগ্রাম ক্লাব’ প্রতিষ্ঠিত হয়; নারায়ণগঞ্জ ক্লাব প্রায় ১২৭ বছরের পুরোনো। দিনভর কাজ করার পর অবসরে চিত্তবিনোদনের প্রয়োজনে এই সকল ক্লাবের প্রতিষ্ঠা। এই সকল ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইংরেজরা ক্লাবের ধারেকাছেও বাঙ্গালীদের ঘেঁষতে দিত না; ক্লাবের দেয়ালে লেখা থাকত, ‘কুকুর এবং স্থানীয় লোকদের প্রবেশ নিষেধ’।

প্রাচীনকালে ওয়াইন ছিল সাধারণ পানীয়। অ্যালকোহল ব্যাকটেরিয়া হত্যা করে বিধায় বিদেশিরা আমাদের দেশের পানি না খেয়ে ওয়াইন বা বিয়ার খেয়ে থাকে। অনেকগুলো ওষুধেও অ্যালকোহল রয়েছে, অথচ এই অ্যালকোহলের জন্যই মদ নিষিদ্ধ। যুগে যুগে বিভিন্ন কৃষ্টির মানুষ তাদের নিজস্ব উৎসবগুলোতে মদ পান করে আসছে। পার্বত্য অঞ্চলে আলাদা কৃষ্টির মানুষগুলো আদি যুগ থেকেই নিজেদের তৈরি তাড়ি, বাংলা মদ, দোচোয়ানি, চোলাই মদ খেয়েই আনন্দ-উৎসব করে থাকে। আমাদের দেশে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অনেকে সস্তা দামের মদ খেয়ে অভ্যস্ত। বগুড়ায় থাকাকালীন আমার বাসার পাশেই মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের লাশ কাটার ঘরটি ছিলো। একদিন দেখলাম, লাশকাটার ডোম হাতুড়ি-বাটাল নিয়ে চিৎকার করছে, ‘আমি না খেয়ে মরা মানুষের মাথায় হাতুড়ি-বাটাল বসাব না’। পুলিশ তার গায়ে হাত বুলাচ্ছেন, কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় পুলিশ নিজের পকেট থেকে তাকে ২০০ টাকা দিয়ে মদ খেয়ে আসার অনুমতি দিতে বাধ্য হলেন।

১৯৩৮ সনে দর্শনায় প্রতিষ্ঠিত কেরু এ্যান্ড কোম্পানি উন্নতমানের মদ তৈরি করে থাকে। বিয়ার উৎপাদনের নিমিত্তে যমুনা গ্রুপ ২০০২ সনে গাজীপুরে একটি প্লান্ট স্থাপন করে। যমুনা গ্রুপ এই ক্ষেত্রে একচেটিয়া ব্যবসা করছে; ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে কোন সরকার নতুন কোন কোম্পানিকে বিয়ার উৎপাদনের অনুমতি দেওয়ার সাহস করছে না। তবে কোটি কোটি টাকার মদ আমদানি হচ্ছে। আমদানি হলেও বিপণন ও সেবনে নানাবিধ বিধিনিষেধ থাকায় বিদেশি পর্যটকদেরও মদ্যপানে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। পৃথিবীর বহু দেশের প্রধান আয়-খাত পর্যটন। কক্সবাজার বালুময় সমুদ্রসৈকত নিয়ে আমরা গর্ব করি, কিন্তু প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় পৃথিবীর দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকত উপভোগ করতে বিদেশি পর্যটকরা আমাদের দেশে আসে না। পর্যটকদের জন্য সহজলভ্য করা ছাড়াও যুবকদের গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, হিরোইন ইত্যাদি মাদক সেবন থেকে ফেরাতে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান একবার মদ আমদানির উপর বাজেটে কর-হার হ্রাস করার প্রস্তাব করেছিলেন; কিন্তু তীব্র প্রতিবাদের মুখে তিনি তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।

মদ খাওয়ার পর অতিরিক্ত নেশাগ্রস্ত হয়ে অনেক মাতলামি করেন; কিন্তু মদ খেয়ে মাতলামি করাটা অনেকটা ইচ্ছাকৃত। নারীদের নির্যাতিত হওয়ার পেছনে পুরুষদের মদের নেশাকে দায়ী করা হলেও তাও নেশাগ্রস্ত পুরুষের ইচ্ছাকৃত, নির্যাতনটা মদের নেশার কারণে নয়। মদ খেলে লিভার সিরোসিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে; তবে মদ না খেলেও লিভার সিরোসিস হতে পারে। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মদ ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ। তবে মদকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি কয়েক ধাপে হয়েছে। কোরআনে প্রথমে মদের অপকার এবং উপকার দুটোরই বর্ণনা দিয়ে অপকার যে উপকারের চেয়ে বেশী তা উল্লেখ করা হয়েছে; পরবর্তীতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, শেষ পর্যায়ে মদ খাওয়াকে শয়তানের উদ্ভাবিত মন্দ কাজ আখ্যায়িত করে তা পরিহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বেহেশতে পানকারীদের জন্যে ‘সুস্বাদু শরাবের নহর’ বইবে বলে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে। হিন্দুধর্ম মতে মদ ক্ষতিকারক। বৌদ্ধধর্মের পঞ্চনীতির একটি হচ্ছে, মদ, গাঁজা প্রভৃতি সেবন না করা। বিশ্বাসী খ্রিস্টানদের মধ্যে একটি প্রভাবশালী মত হচ্ছে, যিশু নিজেই ওয়াইন পান করেছিলেন।

ইসলাম ধর্মে মদ নিষিদ্ধ হলেও তুরস্ক, আলবেনিয়া, মালয়েশীয়া, ইন্দোনেশিয়া, দুবাই, জর্ডান, মরিসাস প্রভৃতি মুসলিম-অধ্যুষিত দেশে মদ সহজলভ্য। এটা সর্বজনবিদিত যে, পাকিস্তানের জনক মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বিলিয়ার্ড খেলতেন, চুরুট টানতেন, হুইস্কিসহ ইংরেজদের মত সকল কিছু উপভোগ করতেন। ১৯৫৬ সনে পাকিস্তানকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র করা হলেও মদ্যপান বৈধ ছিল। ইয়াহিয়া খানের মদে ডুবে থাকার চিত্র পাওয়া যায় পাকিস্তানের তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইটিতে। ইসলামিক দলগুলোর বিক্ষোভ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে ভুট্টো নিজে মদ্যপায়ী হয়েও ১৯৭৭ সনে পাকিস্তানে মুসলমানদের জন্য মদ নিষিদ্ধ করেন। নিষিদ্ধ হওয়াতে এখন সারা পাকিস্তানে চোরাচালানের মদে সয়লাব; বেশীরভাগ মদ ও মাদকের চোরাচালান আফগানিস্তানের মাধ্যমে পাকিস্তানে আসে, অনেক বিশ্লেষকের মতে তালিবানদের আয়ের প্রধান উৎস গাঁজা, হিরোইন ইত্যাদি মাদক ব্যবসা।

পাশ্চাত্যে মদ সহজলভ্য হলেও প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত কেউ মদ ক্রয় করতে পারে না, আমেরিকার রাষ্ট্রপতির অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকেও মদ খেয়ে শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, পাশ্চাত্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক কারো কাছে মদ বিক্রি করলে বিক্রেতাকেও মোটা অঙ্কের জরিমানার সম্মুখীন হতে হয়। ১৯২০ সন থেকে ১৯৩৩ সন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মদ তৈরি, বিপণন, আমদানি, পরিবহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। নিষিদ্ধ করার পর ফল হলো উল্টো—নিষিদ্ধকালীন শুধু মদ নয় মাদকের ব্যবহারও কয়েকগুণ বেড়ে যায় এবং এর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় অপরাধী চক্রের হাতে। মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পর স্বাস্থ্যের জন্য অধিকতর ক্ষতিকর নিকৃষ্ট ধরনের মদ উৎপাদন ও বিক্রি হতে লাগলো এবং মদ সেবনকারীর সংখ্যা বেড়ে গেল দশ গুণ। মদ নিষিদ্ধ করার পর আইন ভঙ্গের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, লক্ষ লক্ষ লোককে জরিমানা করা হয়, হাজার হাজার লোককে জেলে ঢুকানো হয়; কিন্তু মদের ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। রুজভেল্ট নির্বাচনী প্রচারণায় মদ পুনরায় বৈধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটে জিতে যান।

সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলোতে রাজনৈতিক রং লেগেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মদ বা অপরাধীদের ঘৃণা করার চেয়ে যারা অপরাধীদের স্রষ্টা তাদের দিকে সবাই আঙ্গুল তুলছেন। তবে এটা সত্য যে, ধর্মীয় কারণে মদ্যপায়ীর প্রতি সমাজের যতটুকু বিতৃষ্ণা ততটুকু বিতৃষ্ণা ঘুষখোর আর দুর্নীতিবাজদের উপর দেখা যায় না। পরিচিত ঘুষখোরের সাথে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই একই কাতারে নামাজ পড়ছি, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে পাশাপাশি চেয়ারে বসে মাংস চিবাচ্ছি, নীতি-নৈতিকতার গল্পগুজব করছি। মানুষের এমন দ্বিচারিতা পরিহার না হলে বাজেয়াপ্ত করা মদের প্রতি ক্ষোভ সৃষ্টি করে সমাজে স্থিরতা আনা যাবে বলে মনে হয় না। আমরা মদ স্পর্শ না করেও ঘুষ, দুর্নীতিতে ডুবে আছি; অন্যদিকে মদে ডুব দিয়েও আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ এবং মধুসূদন দত্ত ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য লিখেছেন। একটি সত্য ঘটনা বলে শেষ করছি: এরশাদ সাহেবের পতনের পর আমি রংপুরে এক রিক্সাচালককে এরশাদ সাহেবের বিপক্ষে কথা বলে বিপদে পড়েছিলাম; রিক্সাচালক আমাকে তার রিক্সা থেকে মাঝপথে নামিয়ে দেন। আমি তখন তাকে ঘায়েল করার জন্য বললাম, ‘এরশাদ সাহেবের বাসায় তো মদও পাওয়া গেছে’। রিক্সাচালকের দাড়ি-টুপি থাকায় আমার ধারণা ছিলো, তিনি এবার নরম হবেন; কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন, ‘রাজা-বাদশাদের এমন অভ্যাস থাকে’।

লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী

পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ahmedzeauddin0@gmail.com