আজ রবিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২১; দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:

ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিক অবস্থা

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ব্যাপারে অনেকে অভিমত ব্যক্ত করে বলতে চেয়েছেন যে, সব কিছু খোলা রেখে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা যুক্তিসঙ্গত নয়। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে করোনাসংক্রান্ত জাতীয় পরামর্শক কমিটির পরামর্শক্রমে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। করোনার প্রকোপ হ্রাস পেলে ইতঃপূর্বে কয়েকবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিলো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্লাস চালু করার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশও দেওয়া হয়েছিলো; কিন্তু স্বল্প সময়ের ব্যবধানে করোনার প্রকোপ পুনরায় বেড়ে গেলে সরকারকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়।

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ভয়াবহ সংক্রমণক্ষমতা বিশ্ববাসীকে অনেক বেশী আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। টিকা নেয়া ব্যক্তিদেরও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছাড়ছে না। কম বয়সীদের অধিক হারে সংক্রমণ করায় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ব্যাপারে সবাই আরও বেশী সতর্ক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে এখন আক্রান্তদের ১৪% শিশু। পাশ্চাত্যের অনেক দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হয়েছে; কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাপদ্ধতি ওখানে ভিন্ন, সরাসরি পাঠদানের পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষাপদ্ধতি ঐ সকল দেশে অধিকতর ফলপ্রসূ। স্কুলে সরাসরি শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়, সব ছাত্র সব দিন স্কুলে যায় না, ছাত্রদের বিভিন্ন গ্রুপে কয়েক শিফটে পড়ানো হয়। ঐ সকল দেশে লোকসংখ্যা কম, উন্নত প্রযুক্তি, প্রায় সবার ঘরে অনলাইন লেখাপড়ার সর্বশেষ প্রযুক্তির সংযুক্তি রয়েছে। ঐ সকল দেশে মুখস্থবিদ্যা কম, সবাইকে সুনির্দিষ্ট সমস্যা মেধা আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সমাধান করতে হয়। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাও দিচ্ছে ঘরে বসে, সবার পরীক্ষা মনিটর করা হচ্ছে দূরবর্তী একটি কেন্দ্র থেকে।

দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শুধু পড়াশুনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, শিক্ষার্থীরা হতাশাগ্রস্ত হয়েও পড়ছে। এই দীর্ঘ বিরতি শিশু শিক্ষার্থীদের উপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, এদের অনেকে স্কুলে পড়াশুনা করার কথাই ভুলে গেছে। এই শিশুরা মানসিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়ছে, কারণ স্কুলে গিয়ে যেভাবে বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করত, আনন্দে মেতে থাকতো তা বদ্ধ জীবনে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। স্কুল না থাকায় পরিবারকে সহায়তা করতে অনেক কিশোর, যুবক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছে; তাদের আবার স্কুলে ফেরত নেয়া সম্ভব নাও হতে পারে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন না থাকায় নাচ, গান, নাটক ইত্যাদিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের সৃজনশীল অনুশীলন নেই বললেই চলে।

ক্লাস বন্ধ থাকায় সরকার সংসদ টেলিভিশন, বেতার ও অনলাইনে ক্লাস নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে; তবে এই উদ্যোগে সব শিক্ষার্থী শরীক হতে পারছে না। শহরে অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস করতে পারলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা নানা সমস্যার কারণে অনলাইন ক্লাস করতে পারছে না। মফস্বলের অধিকাংশ শিক্ষক অনলাইন ক্লাস নেয়ার ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞও হলও তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছেন, সরকারি পোর্টাল ‘শিক্ষক বাতায়ন’-এর মাধ্যমে রেকর্ড করা বিষয়বস্তু ইউটিউবে দিয়ে তা শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। ইউটিউবের মাধ্যমে ক্লাস নেয়ার পদ্ধতিটি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বেশী উপযোগী; কারণ ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের সুবিধামত সময়ে রেকর্ডেড ক্লাসগুলো পাচ্ছে। তবে অনলাইন ও সংসদ টিভিতে ক্লাস চললেও উপযোগী মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, টেলিভিশন ইত্যাদি ডিভাইস ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় ৬৮% শিক্ষার্থীর কাছে সেই সেবা পৌঁছায়নি বলে নানা পর্যবেক্ষণে প্রতীয়মান হয়েছে।

করোনা মহামারিতে বৎসরাধিক সময় ধরে বিপর্যস্ত রয়েছে গোটা বিশ্ব। এই ভাইরাসের কারণে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘতম সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলো। অবশ্য এর কোন সহজ সমাধানও নেই; করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ডেল্টা মানবজাতিকে ক্রমান্বয়ে বিপর্যস্ত করে তুলছে। আবার ডেল্টার চেয়েও ভয়ংকর ভ্যারিয়েন্ট ‘ল্যামডা স্ট্রেইন’-এর উৎপত্তি হয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ পেরুতে। ইতোমধ্যে এই ভ্যারিয়েন্ট মালয়েশিয়াসহ প্রায় ৩০টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। পরবর্তীতে আরও শক্তিশালী ভ্যারিয়েন্টের উৎপত্তি হলে ভ্যাকসিনও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। আমাদের দেশে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে মাত্র ৫%–৬% লোককে; বাকিদের টিকা নিশ্চিত করতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে। টিকা যারা আবিষ্কার করেছে তারাও এখনো তাদের দেশের সবার টিকা নিশ্চিত করতে পারেনি। আমাদের সংগ্রহ অপর্যাপ্ত হওয়ায় টিকা গ্রহণেচ্ছুদের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করাও সহজ হচ্ছে না। ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, প্রবীণ ব্যক্তি, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, পোশাককর্মী, গাড়িচালক, খেটে খাওয়া শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী—এই সকল শ্রেণির সবাই দেশ ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার জন্য যারা সোচ্চার তারা মনে করেন, জীবিকার জন্য যখন সব খুলে দিতে হয় তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা অর্থহীন। কিন্তু অভিভাবকেরা যেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না সেখানে দুরন্তপনা শিক্ষার্থীদের দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানানো প্রায় অসম্ভব। যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পক্ষে তাদের মাস্ক পরাতে পুলিশ, র‍্যাব আর সেনাবাহিনী লাগছে, শিশুদের মুখে মাস্ক রাখার সশস্ত্র প্রহরী কই? আমাদের মনে রাখতে হবে, নৌকাডুবিতে সিরিয়ার ৫ বছর বয়সী আয়লান কুর্দির মৃত্যু শত সহস্র সিরিয়ানের মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশী স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল ছিলো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পর করোনায় একজন শিশুর মৃত্যু সবার নিকট অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার জন্য এখন যারা উচ্চকিত তারাও তখন হয়তো কোন দায় নেবেন না। পৃথিবীর কোন কোন দেশে করোনার প্রকোপের মাত্রা বিচার করে অল্প দিনের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হলেও সৌদি আরব, তুরস্ক, ইরাক, উত্তর কোরিয়া, সুদান, কম্বোডিয়া, মেক্সিকো, পানামা, বলিভিয়া, এল সালভাদর, নেপাল এবং বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশে একদিনের জন্যও খোলা হয়নি।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ভার্চুয়াল শিক্ষা কখনোই ক্লাসে শারীরিক উপস্থিতির মাধ্যমে প্রদেয় শিক্ষার বিকল্প নয়। লেখাপড়ায় মনোযোগ আনতে শিক্ষকদের সাথে ছাত্র-ছাত্রীদের আই কন্টাক্ট জরুরি। হাজার হাজার বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষকগণ আর্থিক অসচ্ছলতায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বেসরকারি স্কুল ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষকদের বাঁচাতে এবং ঝুঁকিতে থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ যাতে আরও বেশী অনিশ্চয়তায় ভরে না উঠে সেইজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যবস্থা করা জরুরি।

লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী

পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ahmedzeauddin0@gmail.com