আজ রবিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২১: দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:
মোদির বাংলাদেশ সফর
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরকে ঘিরে ডান এবং বাম উভয় মেরুর লোকজন প্রতিবাদ করেছেন। ১৭ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ‘মুজিব চিরন্তন’ প্রতিপাদ্যে ১০ দিনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে এসেছিলেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ, শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে, নেপালের প্রেসিডেন্ট বিদ্যা দেবী ভান্ডারী এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী শুভেচ্ছা বাণী পাঠিয়েছেন। ভারতে গরুর মাংস খাওয়ার অভিযোগে মুসলমান পিটিয়ে মারা, নাগরিকত্ব সংশোধন আইন প্রণয়ন, গুজরাটের দাঙ্গায় মুসলমান হত্যায় মোদির প্রশ্রয় থাকার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশে তার আগমন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছিলো হেফাজতে ইসলাম। অন্যদিকে সীমান্তে হত্যা, তিস্তা নদীর পানি বণ্টনসহ নানা ইস্যুতে ভারত বন্ধুসুলভ আচরণ না করায় কিছু বাম সংগঠনও মোদির আগমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মিছিল করেছে।
ভারতবিরোধিতার পেছনে বিভিন্ন মেরুকরণ কাজ করছে। পাকিস্তান আমলে জনমত গঠনে কিছু সংগঠনের প্রধান পুঁজি ছিলো ভারতবিরোধিতা। পাকিস্তান আমলে এই হাতিয়ার ব্যবহারে ওস্তাদ ছিলো মুসলিম লীগ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এখনো অনেকে মেনে নিতে পারছেন না, পাকিস্তান ভাঙার জন্য তারা ভারতকে দায়ী করে থাকেন। ১৯৬২ সনে ভারতের সাথে চীনের যুদ্ধ হয়েছে এবং একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে চীন পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহসহ সর্বাত্মক সহায়তা করেছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের কাছে তাই ভারতের চেয়ে চীন অনেক বেশী গ্রহণযোগ্য। যারা পাকিস্তান বা চীনপন্থী তারা স্বাভাবিক কারণেই ভারতবিরোধী। বর্তমান সরকারের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় যারা আওয়ামী লীগবিরোধী তারাও ভারতবিরোধী। এদেশের হিন্দুরা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে বিধায় কিছু লোক শুধু ভারতবিরোধী নয়, হিন্দুবিরোধীও। তবে যারা আজ মোদির বিরোধিতা করছেন তাদের অনেকে মোদির ক্ষমতায় আরোহণকে অভিনন্দিত করেছিলেন; তাদের ধারণা ছিলো, কংগ্রেসের বন্ধু আওয়ামী লীগকে মোদি পছন্দ করবেন না।
কিছু লোক ও সংগঠনের ভারতবিরোধিতার আরও কারণ আছে। কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ধর্মীয় বিভেদ। ভারত হিন্দু-অধ্যুষিত, আর বাংলাদেশ মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ। বাংলাদেশ ও ভারত সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ হলেও কিছু মানুষ শুধু ধর্মসাপেক্ষ নন, ধর্মান্ধও। কাশ্মীর প্রশ্নে বাংলাদেশের ওয়াজে অহর্নিশ ভারতের বিরুদ্ধে বলা হয়। মুসলিম মুজাহিদগণ ভারতের মুশরেক লিডারদেরকে বেঁধে শাম-এ নিয়ে যাবেন, হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে এমন ওয়াজ যখন করা হয় তখন শ্রোতারা স্বাভাবিকভাবেই হিন্দুদের প্রতি বিদ্বেষী হয়ে উঠেন। অন্যদিকে মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে রাজনীতি আর ধর্ম একাকার হয়ে গেছে; হিন্দুস্থানকে রামরাজ্য করার ঘোষণা বারবার আসছে। অবৈধ মুসলমানদের ভারত থেকে তাড়ানোর জন্য বিজেপি আইনও করেছে। আমোদজনক বিষয়টি হচ্ছে, প্রণীত আইনের কোন প্রয়োগ ভারতে নেই, ভবিষ্যতেও হয়তো বাস্তবায়ন করবে না, কিন্তু নির্বাচনের মাঠে অমিত শাহরা ভারত থেকে মুসলমান বিতাড়নের কথা বলতেই থাকবেন। সাতক্ষীরা ও গোপালগঞ্জে মোদির দুটি মন্দির পরিদর্শনের সাথেও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সংশ্লেষ রয়েছে বলে ইতোমধ্যে অভিযোগ উঠেছে।
গুজরাটে দাঙ্গার পর থেকেই মোদিকে কট্টর সাম্প্রদায়িক লোক হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। তিনি নির্বাচন এলে গেরুয়া পোশাক পরিধান করে থাকেন; ধর্ম ব্যবহার করে রাজনীতিতে জয়লাভে তার কোন লুকোচুরি নেই। কিন্তু আমাদের দেশে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, সংস্কারমুক্ত এমন একজন চিকিৎসকও নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মের অপব্যবহার করেছিলেন, যিনি আবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন। ২০০১ সনে জাতীয় নির্বাচনের আগে একুশে টেলিভিশন ও বাংলাদেশ টিভিতে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর উপস্থাপনায় ‘সাবাস বাংলাদেশ’ নামে ১১ পর্বের একটি অনুষ্ঠানে তিনি এক হাতে গীতা আর অন্য হাতে কোরআন দেখিয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষকে ঠিক করতে হবে তারা গীতা, নাকি কোরানের পক্ষে থাকবে; অর্থাৎ গীতার পক্ষ হচ্ছে আওয়ামী লীগ, আর কোরআনের পক্ষে থাকলে বিএনপি-কে ভোট দিতে হবে। এমন সাম্প্রদায়িক প্রচারণার বিরুদ্ধে আলেমসমাজ কিন্তু তখন মাঠে নামেননি।
২০১৫ সনে মোদির আমলেই ১১১টি ভারতের ছিটমহল বাংলাদেশের এবং বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারতের অংশ হয়। নরেন্দ্র মোদির আমলেই ভারতের বাজারে বাংলাদেশী সকল পণ্যের (সাফটা নেগেটিভ লিস্টের ২৫ ধরনের আইটেম ব্যতীত) শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশের সুযোগ হয়েছে। উন্নত ও ধনী দেশগুলো অগ্রিম অর্থ বিনিয়োগ করেও যেখানে চাহিদা অনুযায়ী করোনার টিকা পাচ্ছে না, সেখানে মোদি বাংলাদেশকে ৩২ লাখ কোভিড টিকা বিনা পয়সায় সরবরাহ করেছেন। এবার মোদি বাংলাদেশকে ১০৯টি এম্বুল্যান্সও দিয়েছেন। সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে বাংলাদেশীদের মৃত্যু শুধু মোদির আমলে নয়, কংগ্রেসের আমলেও হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশী লোকদের গুলি করে হত্যার এই অস্বাভাবিক পরিবেশ শুধু আওয়ামী লীগের আমলে নয়, সব সরকারের আমলেই দেখা গেছে। বিস্ময় জাগে তখন, যখন চোরাচালানের দায়ে বিএসএফের গুলিতে শুধু বাংলাদেশীরা মরে, কোন ভারতীয় নয়। তাহলে কি ভারতে কোন চোরাকারবারি নেই, বা তাদের লোকেরা কি সীমান্ত অতিক্রম করে না? চীনের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি ভারতের চেয়ে অনেক বেশী হলেও মোদিবিরোধী বাম সংঘটনগুলোকে কখনো চীনের বিরুদ্ধে একটি বিবৃতি দিতেও শোনা যায়নি।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে পঞ্চাশের অধিক অভিন্ন নদী রয়েছে সেগুলোতে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ পর্যাপ্ত না থাকায় উজানের ভারত বাঁধ দিয়ে পানি ধরে রাখে। পাকিস্তান আমলে ভারত সিন্ধু নদীতে বাঁধ দেওয়া ছাড়াও একান্ন সন থেকে গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ তৈরির সমীক্ষা শুরু করে, একষট্টি সনে বাঁধ নির্মাণ শুরু করে সত্তর সনে তা শেষ করে। পাকিস্তান সরকার সিন্ধু নদীর পানির সমস্যার সমাধান করলেও ফারাক্কা সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে বিষয়টি জাতিসংঘে উপস্থাপিত হলেও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করতে ভারত ও বাংলাদেশকে পরামর্শ দেয়। ফলে ফারাক্কা ইস্যুর আন্তর্জাতিকরণ প্রচেষ্টার পরিসমাপ্তি ঘটে ওখানেই। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে ভারতের কেন্দ্রীয় মোদি সরকার সম্মত হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজী হচ্ছে না। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মমতা ব্যানার্জি রাজী ছিলেন না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন বলে বঙ্গবন্ধুর আমলে ফারাক্কা সমস্যার সমাধান সহজ হয়েছিলো। মমতা ব্যানার্জি অনমনীয় থাকায় আওয়ামী লীগ সরকারের শত চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও তিস্তা নদীর পানির বণ্টন চুক্তি হচ্ছে না।
সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানের বিদেশ সফরে প্রতিবাদের ঘটনা নতুন না হলেও তা সফররত সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান এবং হোস্ট কান্ট্রির জন্য অস্বস্তিকর। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, গুজরাটের দাঙ্গার পর মোদি ২০১৫ সনে বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন কিন্তু প্রতিবাদ এমনভাবে হয়নি। কেন হয়নি তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু এবার বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মোদির আগমনকে প্রতিহত করার জোশ একটু বেশী মনে হচ্ছে। আমরা বিস্মিত হই তখন, যখন দেখি ইসলামপন্থীরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের বাংলাদেশ সফরের বিপক্ষে একটি কথাও বলছেন না। শ্রীলংকায় মুসলিম, খ্রিস্টানদের মধ্যে কেউ করোনায় মারা গেলে তাদের মৃতদেহ এক সময় পুড়িয়ে ফেলতে বাধ্য করা হতো, আর এখন করোনায় মরলে কবর হবে প্রত্যন্ত দ্বীপে। জননিরাপত্তার স্বার্থে শ্রীলংকায় পূর্ণাবয়ব বোরকা পরা নিষিদ্ধ করা হচ্ছে এবং হাজারখানেক মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। চীনের উইঘুর মুসলমানদের উপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ, কিন্তু বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা একেবারেই নীরব। দেশের অভ্যন্তরে ১৯৯২ ও ২০০১ সনে সারা দেশে হিন্দুদের উপর নির্যাতন, ২০১২ সনে রামুতে বৌদ্ধদের ওপর নৃশংস হামলা, ২০১৬ সনে নাসিরনগর, ২০১৭ সনে রংপুরের গঙ্গাচড়া, ২০১৯ সনে ভোলায় এবং ২০২১ সনে সিলেটের শাল্লায় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা হয়েছে, কিন্তু মোদিবিরোধী ইসলামপন্থী কোন সংগঠনকে এই সকল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করতে দেখা যায়নি। মোদি যদি ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সমর্থন দিয়ে থাকেন, বাংলাদেশেও তো মোদিবিরোধীরা বিভিন্ন দাঙ্গায় নীরবতা পালন করে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন—পার্থক্যটা কোথায়?
ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বললে কিছু লোক অবশ্যই বলবে, ‘নতজানু পররাষ্ট্রনীতি’ বা ‘ভারতের দালাল’। শেরে বাংলা ফজলুল হক যিনি লাহোরে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ করলেন তিনিই হয়ে গেলেন ভারতের দালাল। সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ১৯৪৬ সনে অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ায় পাকিস্তান হয়েছিলো; অথচ সেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে বলা হতো ‘ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুকুর’। মুক্তিযুদ্ধের পর এই অপরাজনীতি বন্ধ হওয়ার কথা ছিলো, মনে হচ্ছে এখন তা পাকিস্তান আমলের চেয়েও বেশী। মোদির পাঠানো করোনা-টিকা নিতে আপত্তি নেই, তার পাঠানো চাল, ডাল, পেঁয়াজ, থ্রিপিস, শাড়ী, গাড়ী, গরু নিতে বাধা নেই, রোগ হলে মোদির দেশে গিয়ে অকাতরে টাকা খরচ করতে কার্পণ্য নেই—শুধু মোদি খারাপ। তবে বঙ্গবন্ধুকে শুধু মোদি নন, ভারতের ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে ভালোবাসেন। কিন্তু বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার প্রতি কিছু লোকের এলার্জি আছে, আর এলার্জি আছে বলেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীকে ম্লান করার জন্য মোদিকে উছিলা করে এত বিক্ষোভ, এত আন্দোলন।
লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী
পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ahmedzeauddin0@gmail.com