রবিবার ২৮ মার্চ, ২০২১; দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:

ঝুমন দাসের বাক্‌স্বাধীনতা

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

সুনামগঞ্জের শাল্লার পাশের উপজেলা দিরাইয়ে ইসলামি জলসায় হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করে তার ঢাকা সফর ঠেকানোর ঘোষণা দেন; এর প্রতিক্রিয়ায় শাল্লার নওগাঁও গ্রামের ঝুমন দাস তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে প্রকৃতপক্ষে কী বলেছে তা কোথাও খুঁজে পেলাম না। দুইজনের লেখা থেকে যতটুকু জানতে পেরেছি তা হলো, ঝুমন দাস মাওলানা মামুনুল হককে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলা ছাড়াও লিখেছেন যে, ‘এই মামুনুল হকের মূল উদ্দেশ্য দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। কিছু দিন আগেও ভাস্কর্য এবং মূর্তি নিয়ে সে বিভিন্ন রকমের উস্কানিমূলক কথা বলেছেন…’ (বাকি অংশ নেই)। এমন লেখার জন্য নওগাঁর পাশের গ্রামের উগ্র কিছু মুসলমান নওগাঁওর ৮৮টি হিন্দু বাড়ি ভাঙচুর করেছে, মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করেছে এবং পারিবারিক মন্দিরগুলোর প্রতিমা ভেঙ্গেছে। পাশের গ্রামের লোকজন রাতে হিন্দু-অধ্যুষিত নওগাঁও গ্রামে আক্রমণ করতে এলে তাদের হাতে-পায়ে ধরে নিবৃত্ত করা সম্ভব হলেও হিন্দুরা বুঝতে পারে যে, মুসলমানদের আক্রমণ পুনরায় হবেই। উগ্র মুসলমানদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য নওগাঁও গ্রামের হিন্দুরা পোস্টদাতা ঝুমন দাসকে সেদিন রাতেই পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে পাশের গ্রামের মোড়ল, মাতব্বরদের তা অবহিত করে। এতসব করেও দাঙ্গাবাজদের থামানো যায়নি; পরদিন সকালে ঐ গ্রামের শত শত উগ্র মুসলমান দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একযোগে আক্রমণ চালায়। আক্রমণকারীদের বেশীরভাগ লুঙ্গি পরা কিশোর ও যুবক; এদের অধিকাংশ ধর্মের খুব বেশী কিছু জানে বলে মনে হয়নি; এমনকি তারা ঝুমন দাস কী লিখেছে তাও হয়তো জানতো না।

সুনামগঞ্জের শাল্লায় হিন্দুদের উপর হেফাজতি ইসলামিরা আক্রমণ করেনি বলে তারা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে। জলমহাল নিয়ে পূর্ব বিরোধের জের ধরে এই আক্রমণ বলে অনেকে মনে করছে; ঝুমন দাসের ফেসবুক স্ট্যাটাসকে এখানে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র। কিন্তু সাধারণ মানুষ উত্তেজিত হয়েছে ধর্মীয় ইস্যুতে, জলমহাল নিয়ে নয়। একজন ধর্মীয় নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করার জন্য, হয়তো সেই সমালোচনা কটূক্তিতে ভরা ছিলো, তাই বলে জোটবদ্ধ হয়ে নিরীহ ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপর বর্বরোচিত আক্রমণ শুধু উন্মাদের পক্ষেই সম্ভব। শাল্লার হামলা আবার প্রমাণ করে দিলো বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ হলেও এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠরা রেসিজমে বিশ্বাসী। ভারতের মুসলমানেরা শক্ত-সামর্থ্য হওয়ায় সেখানকার দাঙ্গা একতরফা হয় না, প্রতিরোধ হয়। কিন্তু বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় উন্মাদনায় নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হন এবং তাদের নীরবে তা সহ্য করতে হয়। বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন উছিলায় বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে হিন্দুদের উপর এত বেশী আক্রমণ হয়েছে যে, হিন্দুরা এখন ধর্মান্ধ মুসলমানদের আক্রমণের ভয়ে নিজেরাই হিন্দু পোস্টদাতাকে বিনা অপরাধে পুলিশে সোপর্দ করে দিচ্ছে।

হেফাজতে ইসলাম ও সমমনা সমর্থকেরা ২০১৩ সনে শাপলা চত্বরের বৃহত্তর সমাবেশ ছাড়াও রাজপথে ফ্রান্স এবং মোদিবিরোধী কর্মসূচী নিয়ে ব্যাপক শোডাউন করে তাদের শক্তিমত্তা দেখিয়েছে। বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বা ইসলামপন্থী দলগুলোর উত্থান ও শক্তি সঞ্চয়ের অন্যতম কারণ ভোটের রাজনীতি। সাধারণ শিক্ষা সম্প্রসারণে সরকারের সীমাবদ্ধতার সুযোগে দেশে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার হচ্ছে; ভোট এলে সব দলের প্রার্থী মসজিদ, মাদ্রাসায় অকাতরে দান করে থাকেন এবং মাদ্রাসার শিক্ষকদের সাথে প্রকাশ্যে বা গোপনে বৈঠক করেন। জামায়াতে ইসলামী নিষ্ক্রিয় থাকায় মাদ্রাসাকেন্দ্রিক আলেম-ওলামার ভোটকে এখন নির্বাচনে হারজিতের নির্ণায়ক মনে করা হয়। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক দলবহির্ভূত ইসলামপন্থীদের সাথে কোন সংঘাতে যেতে চাচ্ছে না বলে তারা এই সুযোগে বিভিন্ন ইস্যুতে রাস্তায় জড় হয়ে শক্তি প্রদর্শন করছে।

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ; অথচ মানুষে মানুষে কত ভেদাভেদ। মধ্যযুগে চণ্ডীদাস বলেছেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’; কিন্তু পৃথিবীর ৭৫০ কোটি মানুষের বেশীরভাগ তা বিশ্বাস করে না, অনেকের বিশ্বাস সবার উপরে ধর্ম সত্য; অথচ এই ধর্মের জন্যই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী লোক মারা গেছে। আদর্শের ভিন্নতার জন্য মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু মতের শ্রেষ্ঠত্ব জাহিরের অহমিকায় সৃষ্ট হিংসা, দ্বেষ মানবজাতিকে কলুষিত করে তুলছে। আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, সকল মানুষ তারই সৃষ্ট। কিন্তু তার প্রার্থনা করার ভিন্ন রীতির কারণে মানুষে মানুষে বিভেদ, মারামারি, কাটাকাটি। সব ধর্মের ধার্মিকেরা মনে করেন, নিজের মত ও পথের অনুসারী ছাড়া আর সবাই জাহান্নামী, নরকবাসী। প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীরাই দাবি করেন, শুধু তাদের ধর্মই সত্য। এই কারণে আমরা নিজেদের ‘মানুষ’ বলি না, বলি মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ; আমাদের অহংকার হচ্ছে মুসলমানিত্বের, হিন্দুত্বের, খ্রিস্টানত্বের বা বৌদ্ধত্বের। এক ধর্মের ধার্মিক অন্য ধর্মের আরেক ধার্মিককে মেরে বেহেস্তে যেতে চায়, স্বর্গে যাওয়া নিশ্চিত করে। বর্গিদের মতো জোটবদ্ধ হয়ে অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার তীব্র আনন্দানুভূতি শুধু ধর্মীয় ইস্যুতে লাভ করা সম্ভব। এমন আবেগে পুলকিত মানুষগুলোর কুসংস্কারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অধিক। এখনো ধর্মান্ধ লোকগুলো নৃত্য করতে করতে ভারতে অশীতিপর বৃদ্ধাদের ডাইনি আখ্যা দিয়ে পুড়িয়ে মারে, গরুর মাংস খাওয়ার জন্য পিটিয়ে হত্যা করে, এখনো বাংলাদেশের মানুষ চাঁদে সাঈদীকে দেখতে পাওয়ার গুজবে বিশ্বাস করে আত্মাহুতি দেয়।

শখ করে কেউ সংখ্যালঘু হয় না; সীমান্ত না থাকলে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘুর প্রশ্ন আসতো না। যে বাংলাদেশে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সেই মুসলমানই সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার, ভারত বা চীনে সংখ্যালঘু। রাজনীতিবিদ ছাড়াও ধান্ধাবাজেরা বলেন, বাংলাদেশ ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির’। এই কথাটি যদি আমাদের দেশের কোন হিন্দু, খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ বলতো তাহলে তার গুরুত্ব থাকতো। সংখ্যালঘুদের কাছ থেকে এই সার্টিফিকেট নেয়ার গরজও বোধ করে না। ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে, ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ’—এই বক্তব্যের বিরোধিতা করার সাহসও এদেশের সংখ্যালঘুদের নেই। ধর্মাবমাননার আড়ালে সংখ্যাগুরুদের উত্তেজিত করে ধান্ধাবাজদের স্বার্থসিদ্ধি হাসিলের এই অপকর্ম রোধ করা সম্ভব না হলে দেশের জনবৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। বাংলাদেশ খুব দ্রুত তার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র হারাচ্ছে, উগ্রতা দিন দিন বাড়ছে, ভোটের রাজনীতি অপশক্তিগুলোকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।

মানুষের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে আমরা যারা এতদিন কথা বলেছি, লেখক মুশতাক এবং কিশোরের পক্ষে দাঁড়িয়েছি তারা কিন্তু এখন ঝুমন দাসের গ্রেফতার নিয়ে একটি কথাও বলছি না। ঝুমন দাস একটি পোস্টে একজন ব্যক্তির দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন, কাউকে মারার হুমকি দেননি, ধর্মের অবমাননা হয় এমন কথাও বলেননি, তাহলে তাকে জেলহাজতে থাকতে হবে কেন? হাজতে থাকবে এজন্যই যে, উগ্র ধর্মান্ধের কারণে তার বাইরে থাকা নিরাপদ নয়। পুলিশ যেভাবে নমনীয় হয়ে উগ্র জনতাকে থামানোর চেষ্টা করেছে তাতে প্রতীয়মান হয়, ঝুমন দাসের জেলহাজতে থাকাই নিরাপদ। ভূতের মতো বাংলাদেশ পিছনের দিকে হাঁটছে; পেছনে হাঁটার এই প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে কলুষিত করে দিচ্ছে, দেশের ইমেজকে ম্লান করে দিচ্ছে।

সুনামগঞ্জের হিন্দুপল্লীতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের প্রধান আসামী হচ্ছে যুবলীগের সমর্থক শহীদুল ইসলাম স্বাধীন; তিনি আবার ওয়ার্ড মেম্বারও। আওয়ামী লীগ তাকে তাদের লোক বলে মানতে নারাজ; কিন্তু হিন্দুরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, আওয়ামী লীগ সরকারও সংখ্যালঘুদের নিরাপদ রাখতে সমর্থ হচ্ছে না। শাল্লার আক্রমণের জন্য বিএনপি যখন আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করছে, ঠিক তখনি ২০০১ সনে হিন্দুদের উপর নির্যাতনের জন্য আওয়ামী লীগ বিএনপি’কে দোষারোপ করছে। সাধারণ সম্পাদক আর মহাসচিবের এই কথামালার মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন প্রতিবেশী দুই পাঠানের একটি গল্প বলে লেখা শেষ করছি—দুই পাঠানের একজনের কাছে এক বাঙ্গালী বেড়াতে গেলে অপর পাঠান মেহমান বাঙ্গালীকে হত্যা করার হুমকি দেয়। বাঙ্গালী এই হুমকি পেয়ে তার হোস্ট পাঠানকে জানালে সে বলে, ‘ভয় পাবে না, তোমাকে হত্যা করলে আমিও তার কোন বাঙ্গালী মেহমানকে হত্যা করব’। শাল্লাসহ দেশের সর্বত্র সংখ্যালঘুদের নিপীড়নে সব দলের কট্টর ধর্মান্ধরা পাঠানদের মতো একযোগে একাত্মা।

লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী

পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ahmedzeauddin0@gmail.com