আজ রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১; দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:
হেফাজত, সঙ্গীতাঙ্গন, গ্রন্থাগার এবং আগুন
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
হেফাজতে ইসলামের সমর্থকরা হরতালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পরিষদ কার্যালয়, পৌরসভা কার্যালয়, পৌর মিলনায়তন, রেলস্টেশন ইত্যাদিতে আগুন দিয়েছে, ভাঙচুর করেছে—সরকারি সম্পত্তির এমন ধ্বংসযজ্ঞ বহু দেখেছি। হরতাল হলেই এমন ‘নাশকতা’ হবেই। আচ্ছা হোক, সরকারের সম্পত্তি ধ্বংস হলে সরকার জনগণের টাকায় আবার গড়ে নেবে। কিন্তু হেফাজতিরা জেলা আনন্দময়ী কালীবাড়ি, গণগ্রন্থাগার, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের মেলা, আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গনে আগুন দিলো কেন? কারণ এগুলো অনৈসলামিক এবং তাগুত। সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর নামে গড়ে উঠা সঙ্গীতাঙ্গনে নিশ্চয় হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র ছিলো। প্রায় ৫০ বছর পূর্বে আমার আব্বার বুকশেলফ থেকে নিয়ে ‘আব্বাস উদ্দীনের জীবনী’ পড়েছিলাম। তখনকার দিনে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আব্বাস উদ্দীনকে পাবনায় গান গাইতে আমন্ত্রণ জানানো হয়; কিন্তু গান গাওয়ার সময় গ্রামের কয়েকজন স্পষ্ট করে বলে দেন যে, গানের সাথে হারমোনিয়াম, তবলা চলবে না। যারা গায়ক তারা আবার বাদ্যযন্ত্র ছাড়া গান গাইতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। কোন যুক্তি দিয়েও যখন বাজনার ব্যাপারে তাদের সম্মতি আদায় করা যাচ্ছিলো না তখন আব্বাস উদ্দিন বললেন, ‘ভাইসাব, লবণ ছাড়া পান্না ভাত যেমন, হারমোনিয়াম, তবলা ছাড়া গানও তেমন’।
কিছুদিন আগে একটি ভিডিওতে কয়েকজন মাদ্রাসার ছাত্র ও তাদের শিক্ষকদের হারমোনিয়ামসহ কিছু বাদ্যযন্ত্র এক জায়গায় এনে আছাড় দিয়ে ভাঙার পর আগুন লাগাতে দেখা গেল। বাদ্যযন্ত্র পোড়ানোর বিপক্ষে একজন অস্ট্রেলিয়া থেকে লিখেছেন, ‘পৃথিবীতে যা কিছু সুন্দর—নাচ, গান, ছবি, ভাস্কর্য, সিনেমা সবই তো ধর্মে মানা। আধুনিক শিক্ষা গ্রহণেও ধর্মে মানা করা হয়; কারণ শিক্ষিত লোকের বোধ বিচারবুদ্ধি ধর্মান্ধদের চেয়ে বেশী, তাই শিক্ষিতদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। একই কারণে উত্তর কোরিয়ায় ইন্টারনেট বা বাইরের দুনিয়ার অন্য দেশের বই, উন্নত টেকনোলজি, সিনেমা নিষিদ্ধ; কারণ উত্তর কোরিয়ার মানুষ যদি কোন দিন জানতে পারে যে, বাইরের দুনিয়াটা অনেক রঙিন তখন তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর হয়ে যাবে’। বাংলাদেশ থেকে একজন লিখেছেন, ‘এগুলো দেখলে খুব হতাশ লাগে। ধর্মীয় উন্মাদনা মানুষগুলোর মৌলিক বোধশক্তি নষ্ট করে দিয়েছে’।
আমার বউ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে লিখেছে, ‘আজ একটা জিনিস দেখে খুব খারাপ লেগেছে। মানুষ কেন এত হিংস্র হয়ে উঠেছে জানি না, শালীনভাবে গান-বাজনা করা হারাম হবে কেন? ...যে হারমোনিয়াম, তবলা, ঢোল ভেঙে দিয়ে ওরা আনন্দ করছে সেটা আমাদের কাছে হারাম হলেও এই বাদ্যযন্ত্রগুলো হয়ত কারো সংসারের রুটি-রুজির উপকরণ ছিল, তারা হয়তো এই বাদ্যযন্ত্রগুলো অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করত। ...কাজী নজরুল ইসলামের সম্মুখে কেউ তাঁর গান গাইলে বোধশক্তিহীন নজরুলও আবেগী আচরণ করতেন। মানুষের জীবনে বিনোদনেরও দরকার আছে। আসলে পৃথিবীতে মানুষ হিংস্র হয়ে উঠেছে’। আমার স্ত্রী একজন ধার্মিক ব্যক্তি। সে প্রতি রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে, ফজরের নামাজ পড়ার পর কোরআন তেলাওয়াত ছাড়া সে জায়নামাজ ছাড়ে না। তাকে কয়েকবার বিদেশে নিয়ে গিয়েছিলাম, প্রতিবারই সে তার সাথে করে কোরআন শরীফ নিয়ে গেছে এবং বিদেশের মাটিতে প্রতিদিন কোরআন তেলাওয়াত করেছে। ধর্মের প্রতি তার আনুগত্য প্রশ্নাতীত। পুরুষের বিয়ের সংখ্যা ছাড়া তার সাথে আমার ধর্ম নিয়ে আর কোন বাকবিতণ্ডা হয় না। সামর্থ্য থাকার পরও যদি কোনো মুসলমান একাধিক বিয়ে না করে তাহলে সেই পুরুষ গুনাহগার হবে মর্মে সৌদি আরবের সিনিয়র মুফতি আব্দুল্লাহর বক্তব্যের পর যখন বউকে বললাম, ‘তুমি কি তোমার স্বামীকে গুনাহগার বানাবে?’ গান-বাজনা এবং বহুবিবাহ নিয়ে মুফতির এই ফতোয়া—ধর্মের এই দুটি বিষয়ে তার আপত্তি আছে।
গান-বাজনার বিরুদ্ধে যারা বলেন তাদের ধর্মীয় ব্যাখ্যা হচ্ছে, গান আল্লাহর পথ হতে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। কিন্তু আমাদের পরিবারের কোন সদস্যকে গান করা ও শোনার কারণে ধর্ম থেকে পথভ্রষ্ট হতে দেখিনি। আমার বাবা ১৯২০ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ফেনী থেকে এন্ট্রান্স পাস করে ১৯২৬ সনে হিন্দুদের দেওয়া জমিতে আমাদের এলাকায় তাঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের সাথে নিয়ে জিএমহাট মাইনর স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি চট্টগ্রামের একটি মসজিদে ইমামতিও করেছেন। কিন্তু তাকে আমি বাঁশি বাজাতে দেখেছি, গান গাইতে শুনেছি, তার নাতিন কমলাকে গান শিখাতে দেখেছি। আমার মা তাঁর ৮০ বছর বয়সেও চশমা ছাড়া পবিত্র কোরআন শরীফ নিয়মিত পড়তেন। তাঁকে হজ্বে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি হজ্বে না গিয়ে হজ্বের সমুদয় টাকা দিয়ে গরীবদের ঘর করে দিয়েছেন, নিঃস্ব মেয়ের বিয়ের খরচ যুগিয়েছেন। আমার বড় ভাই মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন খুবই ধার্মিক; তার নাম ছিলো সাহাব উদ্দিন আহমেদ, ধর্মীয় অনুভূতির কারণে তিনি নাম পরিবর্তন করে রেখেছেন মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন। তিনি গান গাইতেন বলেই তার শ্বশুর বাড়ীর লোকজন জামাই হিসেবে তাকে পছন্দ করেছিলেন। আমার ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ, ডা. জহির উদ্দিন আহমেদ, ড. মুনির উদ্দিন আহমেদ নিজেরা আজান দিয়ে জামাত করে নামাজ পড়েছেন, তিনজনই স্ত্রীসহ হজ করেছে; কিন্তু তারা নিয়মিত গান শুনেন। মেজো ভাই মহিউদ্দিন এক সময় তার বাসার লনে নিয়মিত গানের আসর বসাতেন। আমার ইমিডিয়েট বড় ভাই ড. মুনির উদ্দিন আহমেদ, আমার বোন গোলাফ রোজ বেগম টেমু এক সময় গান-বাজনা, নাটকে অংশগ্রহণ করতেন। কিন্তু এদের কারো ধর্ম পালনে গাফলতি হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে গান-বাজনা করা ও শোনা হারাম। গান-বাজনা, নাচ এই সবের সাথে যারা জড়িত আল্লাহ তাদেরকে বানর ও শূকরে পরিণত করে দিতে পারেন। শরিয়া কোর্টে গায়িকার সাক্ষ্যও নিষিদ্ধ। সহী বুখারি হাদিসে বাদ্যযন্ত্রকে হারাম বলা হয়েছে। আরও কতগুলো হাদিসে গান-বাজনাকে নাজায়েজ বলা হয়েছে। আবু বকর (রা.) গানবাদ্যকে শয়তানের বাঁশি বলে আখ্যায়িত করেছেন। গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে বিখ্যাত চার মাজহাবের চারজন ইমামই গান-বাদ্যকে হারাম বলে আখ্যায়িত করেছেন। শুধু তাই নয়, মুখ দিয়ে শিস দেওয়া ও হাততালি দেয়াও হারাম। যে হাদিসে বাদ্যযন্ত্র হারাম বলা হয়েছে সেই হাদিসে রেশমী কাপড়ও হারাম বলা হয়েছে। হাদিস অনুযায়ী গান-বাজনায় প্রাপ্ত মূল্যও হারাম। আবার গান-বাজনার পক্ষেও হাদিস রয়েছে, নবীজী নিজেই গান গাইতে বলেছেন। মুসলিম বিশ্বের ইসলামবিষয়ক সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত গ্র্যান্ড মুফতি শেখ জাদ আল হকের মতে, অনৈতিক ও গুনাহর সাথে যুক্ত না হলে সঙ্গীত শোনা, সঙ্গীতানুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা এবং বাদ্যযন্ত্র বৈধ। ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অব ফতোয়া অ্যান্ড রিসার্চ’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট এবং ‘ইন্টারন্যাশন্যাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্স’-এর এক সময়ের চেয়ারম্যান ডক্টর কারযাভী উল্লেখ করেছেন যে, ‘কাজী আবুবকর ইবনুল আরাবী বলেছেন যে, গান হারাম হওয়া পর্যায়ে একটি হাদিসও সহীহ নহে’।
পবিত্র কোরআনে গান-বাজনা সম্পর্কে সরাসরি কিছু বলা হয়নি, কোরআনে যা বলা হয়েছে তা হলো, ‘আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা সেগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আজাব’; সূরা: লুকমান। তাফসিরগণের ব্যাখ্যা হচ্ছে, ‘বেহুদা কথা’ বলতে এখানে গানের কথা বোঝানো হয়েছে। কিন্তু ‘বেহুদা কথা’র অর্থ বুঝতে কারো সমস্যা হওয়ার কথা নয়, তাহলে এই দুটি শব্দ দ্বারা গান-বাজনা কেন বোঝানো হচ্ছে তা স্পষ্ট নয়। সুরা বনি ইসরাঈলে আল্লাহ তায়ালা শয়তানকে সম্বোধন করে বলেছেন, ‘তোমার কণ্ঠ দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পারো প্ররোচিত করো’। তাফসিরগণের মতে শয়তানের ‘কণ্ঠ’ হচ্ছে ক্রীড়া ও সঙ্গীত বা গান-বাজনা। এই আয়াতটির অর্থও দুর্বোধ্য নয়, এই আয়াত দ্বারা মানুষকে পথভ্রষ্ট করার ব্যাপারে আল্লাহ শয়তানকে অনুমতি দিচ্ছেন, এখানে গান-বাজনার সংশ্লেষ কেন তাও আমাদের মতো সাধারণ লোকের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।
ইসলাম ধর্মে গান-বাজনা হারাম হওয়া সত্ত্বেও তা শোনে না এমন লোক খুব কম। ৫৬টি মুসলিম-অধ্যুষিত দেশের মধ্যে একটি দেশও নেই যেখানে গান-বাজনা নেই। এই দেশগুলোর মধ্যে অনেকগুলো দেশ আবার ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’, কোন কোন দেশে শরিয়া আইনও চালু আছে। অবশ্য সম্প্রতি আফগানিস্তান ১২ বছরের ঊর্ধ্ববয়সী মেয়েদের গান গাওয়া নিষিদ্ধ করেছে। ভিডিওতে হারমোনিয়াম, তবলা পোড়ানোর দৃশ্য দেখে আমার ফেইসবুক বন্ধু প্রাক্তন সচিব ভুইয়া শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘আফগানিস্তান থেকে আমরা খুব বেশী দূরে নই’। দূরে বা কাছে যেখানেই আমাদের অবস্থান হোক না কেন, অধিকাংশ আলেমের মতে গান নিষিদ্ধ; গানকে সিদ্ধ করার জন্য ধর্মবেত্তাদের ভিন্নতর ব্যাখ্যার কোন গুরুত্ব তাদের কাছে নেই। তাই আবারও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীতাঙ্গন পুড়বে, তাগুত শিক্ষার গ্রন্থাগার ভস্মীভূত হবে।
লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী
পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ahmedzeauddin0@gmail.com