আজ রবিবার, ২১ মার্চ, ২০২১; দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:
ট্রান্সজেন্ডারড তাসনুভা-নুসরাত
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
ট্রান্সজেন্ডারড তাসনুভা আনান শিশির ট্রান্সজেন্ডারড হিসেবে দেশে প্রথম টেলিভিশন বৈশাখী চ্যানেলে নারী দিবসে খবর পাঠ করেছেন। খুলনার বাগেরহাটের তাসনুভা নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে সমাজকর্ম বিভাগে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ থেকে বৃত্তি নিয়ে পাবলিক হেলথ বিষয়ে মাস্টার্স করছেন। এছাড়াও তিনি ডব্লিউএইচও থেকে টিডিআর ইন্টারন্যাশনাল স্কলারশিপ পেয়েছেন; অথচ একটা ছেলের শারীরিক গঠন নিয়ে মেয়েলি কণ্ঠের এই তাসনুভাকে এক সময় অনবরত হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে, অর্থের অভাবে বহুদিন না খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। আরেকজন ট্রান্সজেন্ডারড নারী নুসরাত জাহান মৌ নারী দিবসে প্রথম প্রচারিত ধারাবাহিক ‘চাপাবাজ’ নাটকের মূল নারী চরিত্রে অভিনয় করছেন। তাদের উভয়ই শৈশব ও কৈশোরে ভালোবাসা, আদর, স্নেহ না পেয়ে পরিবার ছেড়ে দূরে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। নুসরাত মৌ চতুর্থ শ্রেণির পর স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন; তাকে থাকতে হয়েছে উত্তরায় এক ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটিতে। স্কুলের সতীর্থরা তাকে নিয়ে টিজ করতো, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতো, বেঞ্চে বসতে দিত না। অন্যদিকে তাসনুভার ছেলেবেলা এত বিধ্বস্ত ছিলো যে, তিনি তার ঐ সময়টা এখন মুছে ফেলতে চান।
যাদের জেন্ডার আইডেন্টিটি অস্পষ্ট বা যারা ছেলে কিংবা মেয়ে তা স্পষ্ট নয় তারাই ট্রান্সজেন্ডার। এদের অনেক নাম আছে—হিজড়া, বৃহন্নলা, কিন্নরী, শিখণ্ডী। দেহের গঠনগত দিক বিচার করলে এদের দেহে নারী ও পুরুষের বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ থাকে। ক্রোমোজোম বা হরমোনে ত্রুটি অথবা মানসিক কারণে কারো লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণে জটিলতা দেখা দিলে বা দৈহিক লিঙ্গপরিচয়ের সঙ্গে আচরণগত মিল না থাকলে তাদের চিহ্নিত করা হয় হিজড়া হিসাবে। পুরুষ লিঙ্গের কারো আচরণ, স্বভাব, দৈহিক গঠন, কণ্ঠস্বর মেয়েদের মতো এবং মেয়ে লিঙ্গের কারো দৈহিক গঠন ও কণ্ঠস্বর পুরুষদের মতো হলে তারাই হিজড়া। অবশ্য কারো কারো লিঙ্গনির্ধারক অঙ্গও থাকে না। কারো কারো সেক্স অরগান থাকলেও তা যৌনকর্ম করার জন্য সমর্থ নয়; তবে প্রজননে সক্ষম হিজড়াও রয়েছে। আসলে প্রতিবন্ধী মানুষের মতো এটি একটি শারীরিক ত্রুটি। যারা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ নারী বা পুরুষে পরিণত হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন তাদের ট্রান্সজেণ্ডারড বা রূপান্তরকামী বলা হয়। বৃটিশেরা এদের অবাধ্য গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছিলো। লাঞ্ছনা, বঞ্চনা এবং নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝে সংগ্রাম করে বৃহন্নলারা আজও তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন।
বাংলাদেশের পরিবার ও সমাজে রূপান্তরিত নারী-পুরুষ বা হিজড়ারা অবহেলিত, অবাঞ্ছিত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত; এদের অর্থনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয় নেই। ফলে নির্ভার হয়ে বাঁচতে হিজড়ারা খুঁজে নেয় আলাদা সমাজ, তাদের বাধ্য হয়ে পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজস্ব সম্প্রদায়ভুক্ত হয়ে জীবনযাপন করতে হয়। অবহেলা ও লাঞ্ছনার মধ্যে এরা লেখাপড়া করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন; তাই এদের অধিকাংশ অশিক্ষিত; দুয়েকজন শত বাধাবিপত্তি ডিঙ্গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করলেও কর্মজগতে এদের সাদরে গ্রহণ করা হয় না। ফলে ভিক্ষাবৃত্তি বা জোর করে চাঁদা আদায় করাই এদের প্রধান পেশা। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা জীবনযাপনে অভ্যস্ত এদের অনেকে বেপরোয়া, ভিক্ষা না দিলে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল দিতে থাকেন। তাই এরা শুধু বিড়ম্বনাই নয়, এদের দেখলেই প্রায় সব লোক আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন; অথচ মোঘল আমলে রাজদরবার ও অন্দরমহল পাহারা দেওয়ার জন্য এদের আলাদা কদর ছিলো, জন্মগত বৃহন্নলা বা কৃত্রিমভাবে ‘খোজা’ করা লোকগুলোই ছিলো মোঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিশ্বস্ত কর্মচারী।
বাংলাদেশে হিজড়াদের ভোটাধিকার দেয়ার পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ২০১৩ সনে পাওয়া এই স্বীকৃতি অনুযায়ী তারা নারী বা পুরুষ নয়, বরং ‘হিজড়া’ হিসেবে পরিচিতি পাবেন। এই স্বীকৃতির পূর্বে নারী বা পুরুষের বাইরে আর কোন লিঙ্গের আইনি স্বীকৃতি ছিলো না এবং এতে তারা দেশের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও দিনাজপুরে তৃতীয় লিঙ্গের কিছু মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের আগেই হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পাকিস্তান স্বীকৃতি দিয়েছে ২০০৯ সনে; কিন্তু ওখানকার সমাজব্যবস্থা কোথাও কোথাও এত রক্ষণশীল যে, পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য পরিবারের সদস্যরাই হিজড়াদের পিটিয়ে মেরে ফেলে। বাংলাদেশের মানুষ এত হিংস্র নয়, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলা যুব মহিলালীগের আহ্বায়ক সাদিয়া আক্তার পিংকিকে ২০১৯ সনে ওখানকার জনগণ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত করেছে।
বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতির পর তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে এদের জন্য শিক্ষাবৃত্তির প্রবর্তন করা হয়েছে। পঞ্চাশোর্ধ্ব অক্ষম ও অসচ্ছল সকল হিজড়াকে মাসে ৬০০ টাকা করে অনুদান দেওয়া হচ্ছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে তৃতীয় লিঙ্গের লোকজনের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচীও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। হিজড়াদের অধিকাংশ নিরক্ষর বিধায় এদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সহজ নয়। এতদসত্ত্বেও বিভিন্ন এনজিও এবং পোশাক কারখানায় এদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো, কিন্তু জোর করে চাঁদা আদায়ের সুযোগ থাকায় এরা চাকুরীতে বেশী দিন থাকেননি। এছাড়া হিজড়া হিসেবে চাকুরী প্রদানেও নানা জটিলতা রয়েছে, চাকুরী পাওয়ার প্রত্যাশায় স্বাভাবিক মানুষও তৃতীয় লিঙ্গের দলভুক্ত হয়েছেন। চাকুরীর পূর্বে এরা ডাক্তারি পরীক্ষার সম্মুখীন হতে চান না।
ইহুদিরা হিজড়াদের ধর্মবহির্ভূত মানুষ বলে মনে করে; তবে হিজড়ারা রোজা রাখলে ইহুদি ধর্মমতে জান্নাতে তাদের জন্য উঁচু স্তম্ভ তৈরি করা হবে। খ্রিস্টানরা সব সময়ই হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ বলে অভিহিত করে আসছে। বাংলাদেশ হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু ইসলামে তৃতীয় লিঙ্গের কোন স্বীকৃতি নেই; হাদিস অনুযায়ী হিজড়াদের লিঙ্গের প্রাধান্যের ভিত্তিতে নারী বা পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে—পুরুষ হলে পুরুষের, নারী হলে নারীর ইসলামিক বিধান হিজড়াদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। হাদিসে হিজড়াদের নির্বাসনে পাঠাতে বলা হয়েছে। হাতে-পায়ে রং মাখানো নামাজী এক হিজড়াকে নবী করিম (স.) নির্বাসনে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তাই তৃতীয় লিঙ্গের পরিচয়ে হিজড়ারা উত্তরাধিকার সম্পত্তি পায় না। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ যেন মুসলিম শরিয়া আইন এবং সংবিধানের ভিত্তিতে মা-বাবার সম্পত্তির অংশ পান সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আইন মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে।
রূপান্তরকামী নারী-পুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও রক্তমাংসের মানুষ, তাদের হৃদয়েও ভালোবাসা আছে, তারাও আবেগে তাড়িত হয়, আনন্দে উদ্বেলিত হয়, শোকে কাতর হয়, তারাও খিদে লাগলে খায়, তৃষ্ণা পেলে পান করেন, তারাও কারো না কারো সন্তান। তবে সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত নয় এমন পেশা থেকে ওদের ফিরিয়ে আনা খুব সহজ কাজ নয়, কারণ তাদের মনোজগৎ তৈরি হয়েছে ভিন্নতর জৈবিক চাহিদা নিয়ে। তাই হিজড়া জনগোষ্ঠীর কেউ কেউ জোর করে চাঁদা আদায় করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় বেশিরভাগ হিজড়া তাদের বর্তমান পেশা ছাড়তে আগ্রহী নন। বর্তমান উপার্জন নিয়ে সন্তুষ্ট বিধায় হিজড়ারা নিজেরাই মূলধারার কর্মসংস্থানে ফিরতে চায় না। হিজড়াদের সমাজের মূলধারার রাখতে হলে প্রথমেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা ঠেকাতে হবে, শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের মধ্যে স্বাভাবিক জীবনধারার সম্মানবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। অন্যদিকে আমাদেরও বিশ্বাস করতে হবে যে, এরা সমাজ-বহির্ভূত ভিন গ্রহের এলিয়ন নয়। সামাজিক শিষ্টাচার রীতিনীতিতে হিজড়াদের অভ্যস্ত করে তোলা অপরিহার্য। সমাজজীবনের এই চ্যালেঞ্জসমূহ উতরানো সম্ভব হলে সুবিধাবঞ্চিত এই ভাসমান জনগোষ্ঠীকে মানবসমাজের মূলস্রোতে সম্পৃক্ত করা সহজতর হয়ে যাবে এবং তখন আর রূপান্তরকামী বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের আলাদা করে সম্মান দেখানোর দরকার হবে না, আর পাঁচজনকে যেভাবে দেখা হয় তাদেরও সেই দৃষ্টিতে দেখা হবে।
লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী
পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ahmedzeauddin0@gmail.com