আজ রবিবার, ১৪ মার্চ, ২০২১; দৈনিক সংবাদে আমার লেখা উপসম্পাদকীয়:

ডিজিটাল আইনের ভীতি

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে লেখক মুশতাক আহমেদের কারাগারে মৃত্যু নিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদ হচ্ছে, হওয়ার প্রয়োজনও ছিলো। গত বছর মে মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কথাবার্তা ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগে লেখক মুশতাক আহমেদ, কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। মামলার ধারাগুলো অজামিনযোগ্য হওয়ায় মুশতাক ও কিশোরের জামিন আবেদন ছয় বার নাকচ হয়। কিন্তু মুশতাকের মৃত্যুর পর এখন কিশোরেরও জামিন হয়েছে, সরকারও ডিজিটাল আইনটি পুনঃপর্যালোচনা করতে সম্মত হয়েছে। জামিন প্রত্যেক নাগরিকের মানবিক অধিকার এবং বিচারের আগে কাউকে দীর্ঘদিন বন্দী করে রাখা ন্যায়বিচারের পরিপন্থীও। কারণ আদালতের রায়ে সব আসামী শাস্তি পায় না।

সরকারের সমালোচনা করা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সারা পৃথিবীর মানুষ সোচ্চার। কিন্তু মানুষ কি সত্যই বাক্‌স্বাধীনতা চায়? কারণ যারা বাক্‌স্বাধীনতার জন্য সোচ্চার তারাও হয়তো কোন কোন ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সহ্য করতে পারেন না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত কোন পর্যালোচনা নিজের দলের বিরুদ্ধে হলে, নিজের আদর্শের বিপক্ষে গেলে যে সকল বক্তব্য দেখি তা অশ্লীল, অশ্রাব্য, ভীতিজনক; উদ্দেশ্য একটাই—মত, আদর্শ ও দলীয় অপকর্মের বিরুদ্ধে বলা স্তব্ধ করে দেওয়া। সংবেদনশীল কতগুলো বিষয়েও আমরা একরোখা। দেশের পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় দিবস ইত্যাদির লালিত পবিত্রতার বিপরীত বা ভিন্নতর কিছু পেলে অনেকে ক্ষেপে যান, দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হস্তক্ষেপ না করলে তো বিশ্ব ফুটবল খেলায় বিভিন্ন দেশের পতাকার প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু পাশ্চাত্যের কোন কোন দেশে রাষ্ট্রের এই সকল জাতীয় প্রতীকের বিরুদ্ধেও নাগরিকেরা তীব্রভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে থাকে। আমেরিকাসহ অনেক দেশে মেয়েদের পতাকার নক্সায় বক্ষবন্ধনী ও বিকিনি পরে অলিম্পিক মাঠে দৌড়াতে দেখা যায়; এটা তারা দেশপ্রেম হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। এটা আমাদের মতো দেশে কোন ভাবেই কেউ মেনে নেবে না। এই আমেরিকাতেই পতাকা ছিঁড়ে তাতে আগুন দেওয়ার অভিযোগে এক নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছিলো বহু বছর আগে; আদালতের রায়ে নাগরিকদের বলার ও মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়ে বলা হয়েছিলো যে, প্রত্যেক নাগরিক তার নিজের মালিকানাধীন পতাকা ছিঁড়ে, আগুন দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারবে, কিন্তু অন্যের পতাকা এনে এমন ক্ষোভ প্রকাশ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে। ধর্মের বিরুদ্ধে বলার স্বাধীনতা খর্ব করার জন্য ব্লাসফেমি আইন আছে বহু দেশে; এই আইনের অপব্যবহারে পাকিস্তানে বহু লোকের প্রাণ গেছে। ব্যক্তিগত শত্রুতার বশবর্তী হয়ে অনেকে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ধর্মাবমাননার অভিযোগ এনে থাকে। আনীত অভিযোগ আদালতে অসত্য প্রমাণিত হওয়ার পরও অভিযুক্তকে পাকিস্তানের ধর্মান্ধ লোকেরা মেরে ফেলেছে অথবা জেলে বন্দী অভিযুক্তকে আদালতের রায় হওয়ার আগেই জেলের পুলিশ হত্যা করেছে। তাই বাক্‌স্বাধীনতা যারা চায় তারাও কোথাও না কোথাও বাকশক্তি বন্ধ করার জন্য সোচ্চার। সরকারও একই কারণে তাদের বিরুদ্ধে বিরূপ সমালোচনা সহ্য করে না।

গণতন্ত্র মানুষকে কথা বলার অধিকার দিলেও পাওয়ার অধিকার দেয় না। তাই কথা বলার সেই অধিকারটুকু কেড়ে নেয়া হলে গণতন্ত্রে আর কিছু থাকে না। কবি, লেখকেরা অনেক সময় বাস্তবতার সাথে কল্পলোকের মাধুর্য মিশিয়ে একটি স্বতন্ত্র মায়ার জগৎ তৈরি করে থাকেন। তাই সব লেখা বাস্তবতা দিয়ে বিচার করে স্থূল অর্থে বিচার করা ঠিক নয়। একজন ব্যক্তির উলঙ্গ চিত্রায়ন আমাদের চোখে অশ্লীল মনে হলেও শিল্পীর চোখে হয়তো একটি শৈল্পিক ও শালীন চিত্র; কারণ উলঙ্গ চিত্র প্রকৃতির নীতিসিদ্ধ। কিন্তু সেই উলঙ্গ চিত্রে এক পায়ে একটি মোজা পরানোর সাথে সাথে তা হয়ে যাবে প্রকৃতিবিরুদ্ধ ও কুরুচিপূর্ণ। এই মোজা পরানটাই হচ্ছে খারাপ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাই অসৎ উদ্দেশ্যে সত্যের বিকৃতি না ঘটালে কোন লেখাই সমাজ, রাষ্ট্র বা ধর্মের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে না।

রাষ্ট্র ও সরকার এক নয়। সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা না গেলে সেই সরকার গণতান্ত্রিক সরকার হয় কী করে? সরকারের ভুল-ভ্রান্তি-ত্রুটি তুলে ধরার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ বিরোধী দলের থাকতে হবে।

পাবলিক ফিগার বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলে তাকে নিয়ে জনগণ বলবেই। সমালোচনা থেকে বাঁচতে হলে রাজনীতিতে আসা উচিত নয়। শুধু পাশ্চাত্যে কেন, প্রাচ্যেরও বহু দেশে পাবলিক ফিগারদের নিয়ে নানা ভঙ্গিতে কার্টুন আঁকতে দেখা যায়। কার্টুন একটি প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত শিল্প, এর মাধ্যমে সমাজ ও সরকারের অসঙ্গতিগুলো ব্যঙ্গাত্মক আঙ্গিকে প্রকাশ করা হয়। বেশীরভাগ মিডিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপক্ষে ছিলো, তার বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা অনেক প্রচার হয়েছে, তার বিভিন্ন ভঙ্গিমায় প্রচুর কার্টুন আঁকা হয়েছে। যাদের তিনি পছন্দ করেননি তাদের সাথে তিনিও কৌতুক করেছেন, তিনি তাদের ‘ফেইক নিউজ অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়ার কথা বলেছেন, জেলে নেননি।

এটাও সত্য যে, লেখা ও বলার অবাধ স্বাধীনতার যথেচ্ছ অপব্যবহারও হয়। মিথ্যা ও গুজব ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির বহু উদাহরণ বাংলাদেশে রয়েছে। ছেলেধরার গুজব ছড়ানোর জন্য বহু নিরীহ লোকের প্রাণ গেছে, মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে বহু জায়গায় দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে রামু, নাসিরনগর, রংপুর, ভোলায় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন করা হয়েছে, তাদের বাড়ি-ঘর লুট করা হয়েছে, তাদের সহায়-সম্পত্তিতে আগুন দেওয়া হয়েছে। ইনকিলাব পত্রিকায় মিথ্যা তথ্য প্রচার করায় ১৯৯২ সনে বাংলাদেশে হিন্দু সম্পত্তির উপর জঘন্য আক্রমণ হয়েছিলো। ফেইসবুকেও মুরতাদের কতল করার নামে অনেককে শপথ নিতে দেখা যায় এবং এমনতর উগ্রতা হলি আর্টিজানের মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের উদ্ভব ঘটায়। যে মিথ্যা বক্তব্য সমাজে হিংসা-বিদ্বেষের সৃষ্টি করে, মানুষে মানুষে রেষারেষির কারণ হয়, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাথে দাঙ্গা বাঁধায়, ব্যক্তির সম্মানহানি ঘটায় সেই বক্তব্য অবশ্যই আইনের আওতায় আসা উচিত; অসত্য তথ্য দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি বা সম্মানহানি করার অধিকার কারো থাকতে পারে না। সম্মানহানি হয়ে গেলে প্রতিবাদের বক্তব্য ছাপিয়ে তা উদ্ধার করা যায় না।

যিনি সরকারের জবাবদিহিতা আদায় করতে চান তার চারিত্রিক সততা থাকা অপরিহার্য। কোন বিরোধী দলই নিবর্তনমূলক আইন চায় না। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকতে দমনমূলক আইন পাস করে নিরাপদ থাকতে চায়; কিন্তু ক্ষমতা হারিয়ে আবার তাদের নিজেদের প্রণীত আইনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে। আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক প্রণীত ১৯৭৪ সনের বিশেষ ক্ষমতা আইনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে প্রত্যেকটি বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও দল বক্তব্য দিয়েছে, কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রণীত এই আইন বিএনপি বা জাতীয় পার্টির সরকার বাতিল করেনি। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে টকশোতে অহর্নিশ কথা বলা হচ্ছে, প্রিন্ট মিডিয়ায় লেখা হচ্ছে—এর বিরুদ্ধে সরকারের দৃশ্যত কোন দমননীতি দেখা যায় না। এটা সরকারের ভালো দিক। সরকারের সমালোচনা করা লেখা ছাপতে না দেয়ার চেয়ে প্রকাশিত লেখার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হলে জনসমর্থন পাওয়া যায়। অনেক মিডিয়া নিজে থেকেই সরকারের বিরুদ্ধে যায় না, কারণ সরকারের বিজ্ঞপ্তির জন্য ধর্ণা দিয়ে সরকারের বিপক্ষে খবর প্রকাশে লজ্জা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু পাঠকদের নিকট তাদের দায় আছে, আর এই দায় এড়ানোর জন্য সেলফ সেন্সরশীপের কথা বলে দায়মুক্ত থাকতে চায়।

সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করে যে অপরাধ করেছিলো পরবর্তীতে তার স্খালনে সম্পাদক শফিক রেহমান তাঁর গুণগান গেয়ে কয়েকটি নিবন্ধ লিখে ক্ষমা চেয়েছিলেন। টেলিভিশনের টকশোতে একটি নতুন তথ্য শুনলাম—নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত নূরজাহান বেগমের মাসিক পত্রিকার নাম ছিলো ‘বেগম’। ‘বেগম’ পত্রিকাটির প্রকাশনা কোন এক সময় বন্ধ ছিলো। ইত্তেফাক পত্রিকার সাথে বেগম পত্রিকার সুসম্পর্ক না থাকায় ইত্তেফাক খবর ছাপায় ‘নূরজাহানের মাসিক বন্ধ’। এই ব্যঙ্গাত্মক কথাটির মধ্যে শালীনতা নেই, আছে ব্যক্তিগত উপহাস। কিন্তু উপহাসেরও মাত্রা থাকা চাই। রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী দেখতেন বলে ইউরোপীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানে শিক্ষিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা ডাক্তার কাদম্বিনী গাঙ্গুলীকে ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকার সম্পাদক ‘বেশ্যা’ বলে ৬ মাস জেল খেটেছিলেন; এমন লেখকদের জেল জরুরি ও অপরিহার্য।

তবে ডিজিটাল আইনের প্রয়োগে সরকারকে আরও সহনশীল হতে হবে এবং এর অপব্যবহার রোধে আরও যত্নবান হতে হবে। কারণ লেখক মুশতাকের লেখায় দেশ ও সরকারের ভাবমূর্তি যতটুকু নষ্ট হয়েছে, তার চেয়ে বেশী ক্ষুণ্ণ হয়েছে বন্দী অবস্থায় জেলখানায় তার মৃত্যুতে।

লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী

পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ahmedzeauddin0@gmail.com