নাগোর্নো-কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানের পুরাতন দ্বন্দ্বই গত সেপ্টেম্বরের যুদ্ধে পর্যবসিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া প্রভৃতি দেশের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতি দুইবার ভেঙে গেলে তৃতীয়বারের যুদ্ধবিরতি মনিটরিং করতে রাশিয়া ইত্যবসরে বিরোধীয় অঞ্চলে শান্তিরক্ষী পাঠিয়েছে। যুদ্ধ আপাতত আর হবে বলে মনে হয় না, কারণ আজারবাইজান ইতোমধ্যে কারাবাখের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিয়েছে, অন্যদিকে ছয় সপ্তাহ যুদ্ধ করে নিজের সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে ধারণা পেয়ে গেছে আর্মেনিয়া। আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার সাথে রাশিয়ার একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে—১৯৯১ সনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত দুটি দেশই ছিলো সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রজাতন্ত্র। সোভিয়েত ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত থাকাকালীনও আর্মেনীয়-অধ্যুষিত নাগর্নো-কারাবাখ নিয়ে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার দ্বন্দ্ব ছিলো—দুইটি দেশই এই ভূখণ্ডটির দাবি করত। আজারবাইজানি ও আর্মেনীয় জাতির মধ্যে কখনো সদ্ভাব ছিলো না, এই দুই জাতি পরস্পরকে ঘৃণা করে। এর প্রধান কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান তুর্কি মুসলমান শাসক প্রায় ১৫ লক্ষ আর্মেনীয়কে আগুনে পুড়িয়ে, পানিতে ডুবিয়ে, বিষ প্রয়োগসহ বিভিন্ন নৃশংস পদ্ধতিতে আর্মেনীয়দের হত্যা হত্যা করে। তুর্কিদের এই গণহত্যা থেকে বাঁচতে গিয়ে তারা ইহুদিদের মতো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।
আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিন কম দায়ী নয়, তুরস্ককে প্রশ্রয় দেওয়ার প্রয়োজনে তিনি ১৯২১ সনে খ্রিস্টান-অধ্যুষিত নাগর্নো-কারাবাখ অঞ্চলটি শিয়া মুসলিম-অধ্যুষিত আজারবাইজানের কাছে হস্তান্তর করে দুই দেশের বিবাদের স্থায়ী রূপ দেন। হস্তান্তরের দুই বছরের মধ্যে নাগার্নো-কারাবাখ প্রদেশকে আজারবাইজান স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে; স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হলেও আর্মেনীয় খ্রিস্টানেরা মুসলিম-অধ্যুষিত আজারবাইজানের অধীনে থাকতে চায়নি। আস্তে আস্তে সশস্ত্র আর্মেনীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটতে থাকে। তারা স্বাধীন থাকতে চায়, অথবা আর্মেনিয়া রাষ্ট্রের সাথে একীভূত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। ১৯৮৮ সনে নাগোর্নো-কারাবাখের আঞ্চলিক পার্লামেন্ট আর্মেনিয়ার অংশ হিসাবে থাকার পক্ষে ভোট দেয়; কিন্তু মস্কো নাগোর্নো-কারাবাখের আর্মেনীয়দের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। ১৫টি রাজ্য নিয়ে গঠিত কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা তখন কোন রাজ্যের ছিলো না বিধায় নাগোর্নো-কারাবাখের আর্মেনীয় নৃগোষ্ঠী ও আর্মেনিয়া দেশ চুপচাপ ছিলো।
আজারবাইজান রাশিয়ার সমর্থন পেয়ে নাগর্নো-কারাবাখের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে অঞ্চলটিকে তাদের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে ফিরিয়ে নেয়; এতে আর্মেনীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নৃগোষ্ঠী আজারবাইজানের প্রতি আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো। এই আর্মেনীয় গোষ্ঠীকে সহায়তা দেয় পার্শ্ববর্তী দেশ আর্মেনিয়া।
১৯৯১ সনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে নাগার্নো-কারাবাখের আর্মেনীয় খ্রিস্টানেরা তাদের ৪৪০০ বর্গ মাইলের ছোট্ট ভূখণ্ডটির স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও আজ পর্যন্ত কোন দেশ তাদের স্বীকৃতি দেয়নি, এমনকি যাদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তারা স্বাধীনতা ঘোষণা দিতে সাহস করেছিলো সেই আর্মেনিয়াও তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। এই পরিস্থিতিতে আজারবাইজান ও আর্মেনীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে; এই যুদ্ধে আর্মেনীয়রা তাদের নাগার্নো-কারাবাখ আজারবাইজান থেকে দখলমুক্ত করতে সমর্থ হয় এবং আর্মেনিয়া প্রজাতন্ত্রের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তারা আলাদা প্রজাতন্ত্র হিসেবে এলাকাটি শাসন করতে থাকে। আজারবাইজানের পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে ১৯৯৪ সনে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বিচ্ছিন্নতাবাদী আর্মেনীয়রা যুদ্ধে ক্ষান্ত দেয়। পরবর্তীতে ছোটখাট সংঘর্ষ হলেও ব্যাপক যুদ্ধ আর বাঁধেনি। কিন্তু এই যুদ্ধে নাগোর্নো-কারাবাখ ছাড়াও আরও ৭টি আজারবাইজানি জেলা আর্মেনীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আজারবাইজান এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে শক্তি-সামর্থ্য বাড়াতে থাকে এবং নিজের সক্ষমতা নিয়ে আস্থা জন্মালে ২৬ বছর পর তারা গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে নাগর্নো-কারাবাখ আক্রমণ করে বসে। আক্রমণ করেই কয়েক দিনের মধ্যেই ইসরাইলের সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র এবং তুরস্কের অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ড্রোনের সহায়তায় হামলা চালিয়ে আজারবাইজান আর্মেনিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক স্থাপনা, অস্ত্রশস্ত্র এবং নাগার্নো-কারাবাখের আর্মেনীয়দের আস্তানা ধ্বংস করে দেয়। আর্মেনিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেলে আর্মেনিয়ান স্থলবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং ২৬ বছর পর আজারবাইজান পুনরায় নাগার্নো-কারাবাখের অধিকাংশ জায়গা দখল করে নিতে সমর্থ হয়।
রাশিয়ার মধ্যস্থতায় স্থাপিত শান্তিচুক্তি নিয়ে নাগর্নো-কারাবাখ ও আর্মেনিয়া প্রজাতন্ত্রের জনগণ সন্তুষ্ট নয়; তারা মনে করে তাদের দেশের অভ্যন্তরে আজারবাইজানের দখল রেখে এই শান্তিচুক্তি আর্মেনীয় জনগণ ও আর্মেনিয়া প্রজাতন্ত্রের জন্য অপমানজনক। আরও অধিক অপমানজনক হচ্ছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী আজারবাইজান যেসব অঞ্চল পুনরায় দখল করেছে সেসব অঞ্চল ছাড়াও আরও কিছু অঞ্চল তাদের ছেড়ে দিতে হবে। তাই নাগার্নো-কারাবাখ ও আর্মেনিয়ার আর্মেনীয়রা সহিংস হয়ে উঠেছে। সহিংস বিক্ষোভ থেকে আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর অফিস এবং পার্লামেন্টে ভাঙচুর করা হয়েছে, স্পিকারকে মারধর করার কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছে। আজারবাইজানের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ শুরু না করলে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের আহ্বান জানানো হয়েছে। অতি সম্প্রতি তাকে হত্যা করার চেষ্টাও করা হয়েছে। কিন্তু আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী বা নাগার্নো কারাবাখের আর্মেনীয় নেতা আবার যুদ্ধে জড়াবে বলে মনে হয় না। কারণ সামরিক শক্তি, জনসংখ্যা, দেশের আয়তন প্রভৃতি বিবেচনায় আর্মেনিয়ার চেয়ে আজারবাইজান ইত্যবসরে অনেক এগিয়ে গেছে। ইসরাইল, রাশিয়া ও তুরস্ক থেকে বিগত ২৬ বছরে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্র কিনে আঞ্চলিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আজারবাইজানের সৈন্যসংখ্যা এবং সামরিক বাজেট আর্মেনিয়ার দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। আজারবাইজান তেলসম্পদে সমৃদ্ধ, নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে প্রচুর রপ্তানি করতে পারে। অন্যদিকে আর্মেনিয়াকে তাদের তেল চাহিদার পুরোটাই আমদানি করে পূরণ করতে হয়। প্রতিবেশী দেশ তুরস্ক আজারবাইজানকে এই যুদ্ধে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে সহায়তা দিয়েছে। অন্যদিকে আর্মেনিয়ায় রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটি থাকলেও তাদের সাথে আজারবাইজানেরও নিবিড় সম্পর্ক। তাই রাশিয়া এই যুদ্ধে আর্মেনিয়াকে সাহায্য করতে আগ্রহী ছিলো না।
৪৪০০ বর্গ কিলোমিটারের নাগর্নো-কারাবাখ অঞ্চল খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী আর্মেনিয়ান এবং মুসলিম তুর্কিদের আবাসস্থল। তবে মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ আর্মেনীয় খ্রিষ্টান। অর্থনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্ব না থাকলেও সংস্কৃতি ও ধর্মীয় দিক বিবেচনায় এই এলাকাটি উভয় দেশের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাচীন খ্রিস্টীয় সংস্কৃতির ধারক হিসাবে আর্মেনীয়দের জন্য এই এলাকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি মুসলিম সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কারাবাখ আজেরীদের জন্য পবিত্র জন্মস্থান। এই অঞ্চলে প্রচুর খনিজ ঝরনা এবং দস্তা, কয়লা, সিসা, সোনা, মার্বেল এবং চুনাপাথরের মজুদ রয়েছে। নাগর্নো-কারাবাখে আর্মেনীয়দের ঘোষিত প্রজাতন্ত্রের রাজধানী হচ্ছে স্টেপানকোর্ট। পার্শ্ববর্তী আর্মেনিয়া প্রজাতন্ত্রের জনগণ এবং নাগার্নো-কারাবাখের জনগণ উভয়ই আর্মেনীয় জাতি। বাংলাদেশে মুঘল আমলে আর্মেনিয়ানরা বাংলাদেশে আসতো। বাংলাদেশে আগত আর্মেনীয়রা জোটবদ্ধ হয়ে যে জায়গায় থাকতো সেই জায়গার নাম হয়ে যায় আরমানিটোলা। আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরভানের একটি জেলার নাম ‘বাংলাদেশ’! বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন ও সম্মান জানিয়ে তাদের একটি জেলার নাম ‘বাংলাদেশ’ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে আজারবাইজান মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য ধর্মের চর্চায় কোন বাধা নেই, অবিশ্বাসীরাও এই দেশে খোলামেলা মতামত প্রকাশ করতে পারে। আজারবাইজান বহু আগে থেকেই ইসরায়েলের সঙ্গে জোরালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক টিকিয়ে রেখে চলেছে। আজারবাইজান ধর্মনিরপেক্ষ হলেও ৩০১ খ্রিস্টাব্দ থেকেই খ্রিস্ট ধর্ম আর্মেনিয়ায় রাষ্ট্রীয় ধর্ম।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব বিস্তারের তীব্র মোহ সাম্প্রতিককালে দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের এমন মনোভাব দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠার সাথে সাথে তুরস্কের সাংবাদিকেরা তাকে ‘নতুন সুলতান’ নামে অভিহিত করছেন। শক্তির অহংকার হলে প্রতিটি দেশ নিজের স্বার্থ রক্ষায় যে নীতি পালন করে সেই নীতি অন্য ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে না। এখানে ৯০% খ্রিস্টান আর্মেনীয়দের দাবি শক্তি দিয়ে দমন করলেও সাইপ্রাস প্রজাতন্ত্রে ৬০% গ্রিক সাইপ্রিয়টের আগ্রাসন থেকে ৩০% তুর্কি সাইপ্রিয়টকে রক্ষা করতে ১৯৭৪ সনে তুরস্ক সাইপ্রাস আক্রমণ করে সাইপ্রাসের উত্তর অংশ দখল করে সেখানে তুর্কি সাইপ্রিয়টদের জন্য একটি নতুন দেশের সূত্রপাত ঘটায়, যাকে তুরস্ক ছাড়া আর কোন দেশ আজ পর্যন্ত স্বীকৃতি দেয়নি। ২০১৬ সনে তুরস্ক তাদের বাহিনী সিরিয়ার অভ্যন্তরে পাঠিয়ে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করছে, কুর্দিদের আক্রমণ থেকে নিজেদের সীমান্ত অঞ্চল নিরাপদ রাখতে তুরস্ক সিরিয়ার বিরাট এলাকা দখল করে রেখে দিয়েছে। নিজের নিরাপত্তা বিধানের জন্য সিরিয়ার একটি অংশ দখল করে নেয়া প্রকৃতপক্ষে তুরস্কের আধিপত্য নীতিরই বহিঃপ্রকাশ। লিবিয়ার সিভিল ওয়ারেও তুরস্ক একটি পক্ষকে সরাসরি সমর্থন করে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের সাথে সুসম্পর্ক রাখার অভিপ্রায়ে রাশিয়ার পক্ষে ভূমিকা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে; আর্মেনিয়ায় রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটি থাকায় তুরস্কের ধারণা ছিলো, রাশিয়া সঙ্গত কারণেই এই যুদ্ধে আর্মেনিয়া প্রজাতন্ত্রকে একতরফা সহায়তা দেবে এবং এতে আজারবাইজান পরিশেষে রাশিয়া ত্যাগ করে তুরস্কের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। রাশিয়া সেই সুযোগ তুরস্ককে দেয়নি, শান্তিচুক্তির মধ্যস্থতা করে রাশিয়া তুরস্কের কূটকৌশল নস্যাৎ করে দিতে সক্ষম হয়েছে।