দেশের পুরোনো এবং ঐতিহ্যবাহী দৈনিক পত্রিকা সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান বাহাত্তর বছর বয়সে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ভাইরাসমুক্ত হলেও কোভিডপরবর্তী নানা শারীরিক জটিলতায় তিনি মারা যান। কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব খন্দকার মুনীরুজ্জামানের মৃত্যুতে মিডিয়াজগতে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বন্ধু ইউনুসের কাছে তার করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ পেয়ে বহুবার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু তার মোবাইলে সংযোগ স্থাপন করতে পারিনি। সংবাদের বার্তা সম্পাদক ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি কাজী রফিক ভাইয়ের ফেইসবুক স্ট্যাটাস থেকে প্রথম মুনির ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ পাই। করোনা থেকে আমাকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি নিজেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিরতরে চলে গেলেন, তার অনুপস্থিতিতে একটি শূন্যতা আমাদের মাঝে বিরাজ করবে। খন্দকার মুনীরুজ্জামান নটরডেম কলেজ ভর্তি হলেও রাজনীতি করার আগ্রহে পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং জগন্নাথ কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান খন্দকার মুনীরুজ্জামানের বড় ভাই খন্দকার রফিকুজ্জামানও দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক ছিলেন; ছোট ভাই খন্দকার খালেকুজ্জামান একজন প্রকৌশলী। তার স্ত্রী ডা. রোকেয়া খাতুন (রেখা) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ছিলেন। খন্দকার মুনীরুজ্জামানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি’র মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জাতীয় পার্টির জিএম কাদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হলেও এমএ পড়া তার হয়নি। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে তার রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টতা। ১৯৬২ সনে পাকিস্তানি শাসন, শোষণ ও শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে গড়ে উঠা লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হন। পরবর্তীতে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে পার্টির সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পরে পার্টির নির্দেশে শ্রমিক রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে তিনি পোস্তগোলা শ্রমিকদের প্রিয় নেতা হয়ে উঠেন, কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে পোস্তগোলা শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্দোলনে তাদের সংগঠিত করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ট্রেড ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য এবং ঢাকা নগর কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা নগর কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে আবদুল কাইয়ুম মুকুল এবং মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমও ছিলেন। ১৯৯৩ সন থেকে তিনি রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে সাংবাদিকতায় সক্রিয় হন। ১৯৭০ সন থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক একতায় সাংবাদিকতা শুরু করেন; পরে তিনি সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এ যোগ দেন; এক সময় সম্পাদক শফিক রেহমানের রাজনৈতিক আদর্শ পরিবর্তনের কারণে তিনি সাপ্তাহিক যায়যায়দিন ছেড়ে দিয়ে দৈনিক সংবাদে যোগ দেন। মৃত্যুকালে তিনি সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন।

তিন বৎসরাধিক কাল যাবৎ আমি সংবাদে প্রতি রবিবার উপসম্পাদকীয় লিখছি। খন্দকার মুনীরুজ্জামান হঠাৎ একদিন ফোন করে বলেন, ‘বিটু (আমার ডাকনাম) তুমি কাল থেকে আমার পত্রিকায় কলাম লেখা শুরু কর। রাজনৈতিক কলামের প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই, তুমি বরং সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং সমাজসংস্কার নিয়ে লিখতে পার’। আমাদের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক আমার ভাগিনা খদ্দর কাশেম কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য ছিলো বিধায় তার বদৌলতে দৈনিক সংবাদ পড়ছি সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। এই পত্রিকার উপসম্পাদকীয় আমার খুব প্রিয় ছিলো, পত্রিকা হাতে নিয়েই উপসম্পাদকীয় পড়তাম। এই সংবাদে উপসম্পাদকীয় লিখতেন আবু জাফর শামসুদ্দিন, জহুর হোসেন চৌধুরী, সন্তোষ গুপ্ত, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী—তাদের উপসম্পাদকীয়ের নাম ছিলো ‘বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা’, ‘দরবার-ই-জহুর’, ‘অনিরুদ্ধের কলাম’, ‘গাছপাথর’। বাম ধারার প্রায় সবাই এই পত্রিকা পড়তেন, এই পত্রিকা কখনো কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতার সাথে আপস করেনি। আগের সেই জৌলুস না থাকলেও দৈনিক সংবাদের আকাশচুম্বী ইমেজ কখনো নষ্ট হয়নি। আমার লেখা শুরু হওয়ার অনেকদিন পর খন্দকার মুনীরুজ্জামান আমাকে দেখিয়ে শফিকুল ইসলাম ইউনুসকে বলেন, ‘ইউনুস, বিটু তো আমার পত্রিকার জনপ্রিয় কলামিস্ট, চল তাকে উপলক্ষ করে একটি পার্টি করি’। তিনি প্রায়ই ইউনুসকে ফোন করে আমার লেখার প্রশংসা করতেন, আর আমাকে ফোন করে বলতেন, ‘তুমি লেখা বন্ধ করো না’। আমাকে নিয়ে তার একটি পরিকল্পনা ছিলো, কিন্তু তা কখনো প্রকাশ করেননি।

খন্দকার মুনীরুজ্জামানের সাথে পরিচয় কয়েক যুগ পূর্ব থেকে। ‘দৈনিক ঢাকা’ পত্রিকার সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ইউনুস আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সতীর্থ; বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুত্ব এখনো আগের মতোই দৃঢ়, প্রায় প্রতিদিন ফোনে কথা বলি। করোনার আগে প্রায় প্রতি সপ্তাহে একবার তার অফিসে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা আড্ডা দিয়ে পল্টন থেকে বাসে রাত দশটা বা এগারোটায় বাসায় চলে আসতাম। খন্দকার মুনীরুজ্জামান আমাদের চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ, আমি এবং ইউনুস দুইজনই তাকে সম্বোধন করতাম ‘মুনীর ভাই’ বলে। আমাদের আড্ডায় মুনির ভাই প্রায়ই থাকতেন; তার সাথে মাঝে মাঝে থাকতেন দৈনিক প্রথম আলোর সোহরাব হাসান। মুনির ভাই এবং সোহরাব হাসানকে আমি আমার মেজো ভাই সাবেক সচিব, মুক্তিযোদ্ধা ও কলাম লেখক মহিউদ্দিন আহমেদের বাসায়ও গুণীজনের আসরে দেখেছি। সাংবাদিক জগতের অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির সাথে ইউনুসের অফিসে পরিচয় হয়েছে, দেখা হয়েছে। রম্য কলাম লেখক হিলাল ফয়েজী এবং প্রেস ইনস্টিটিউটের বর্তমান মহাপরিচালক জাফর ওয়াজেদের সাথেও ইউনুসের ওখানে কয়েকদিন আড্ডা হয়েছে। এদের কাছ থেকে রাজনীতির ভেতরের খবর জানার আগ্রহ থাকতো আমার আর ইউনুসের। বুদ্ধিভিত্তিক আলোচনায় আমার অংশগ্রহণ ছিলো সামান্য। বীর মুক্তিযোদ্ধা মুনির ভাই এলে আমাদের সহজ-সরল সম্পর্কের কারণে আড্ডা আনন্দময় হয়ে উঠতো। ইউনুসের পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। তার পত্রিকায় লিখতেন জাতীয় অধ্যাপক কবির চৌধুরী, জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক মুনীরুজ্জামান, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপিকা রাজিয়া খান আমিন, কবি শামসুর রাহমান, হুমায়ূন আহমেদ, খন্দকার মুনীরুজ্জামান, মোস্তফা কামাল, সোহরাব হাসান, মাসুক চৌধুরী, আশীষ সৈকত, সাবান মাহমুদ প্রমুখ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ইউনুসের ‘দৈনিক ঢাকা’য় লিখেছেন। এমন গুণীজনদের স্মৃতিচারণা নিয়ে ‘দৈনিক ঢাকা’র স্মারকগ্রন্থ করার পরিকল্পনা ছিলো মুনির ভাই ও সোহরাব হাসানের।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে মুনির ভাইয়ের ক্ষুরধার লেখনী পাঠকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিছু সাংবাদিকের দ্বিচারিতা, ভণ্ডামি, কপটতা এবং ধান্দাবাজিকে তিনি ঘৃণা করতেন। বিস্মিত হই তখন যখন এই লোকগুলোই আবার টকশোতে নীতিকথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন। আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ তার বিভিন্ন কলামে সাংবাদিককে সাংসদের বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করেছেন, সংসদ যখন মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে অসমর্থ হয় তখন একমাত্র মিডিয়াই নিপীড়িত মানুষের মুখপাত্র হয়ে উঠে। মুনির ভাই বলতেন, ‘সাংবাদিকতার সর্বত্র এবং সবার কাছ থেকে নীতি-নৈতিকতা তোমরা প্রত্যাশা কর কেন? ধনী ব্যবসায়ীর বাসার দাওয়াত ও উপঢৌকনের লালসা ত্যাগ করার ক্ষমতা আমাদের অনেক সাংবাদিকের নেই’। খন্দকার মুনীরুজ্জামানের সততা, স্বচ্ছ নীতি-নৈতিকতা, স্পষ্টতর অভিব্যক্তি, জ্ঞানের বিদগ্ধ প্রকাশভঙ্গি, বন্ধুবাৎসল্য, নম্রতা, ভদ্রতা, পরিশীলিত কথাবার্তার পাশাপাশি কপট, ভণ্ড সাংবাদিকদের হলুদ সাংবাদিকতা সমাজকে হতাশ করে।

প্রগতিশীল, সংস্কারমুক্ত, নির্লোভ, সহজ, সরল ও স্পষ্টবাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব খন্দকার মুনীরুজ্জামান কখনো অতিরিক্ত পাওয়ার প্রত্যাশা করেননি, তাই তার মোসাহেবি বা চাটুকারিতা করার প্রয়োজন হয়নি। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী খন্দকার মুনীরুজ্জামান ছিলেন নির্ভীক ও আপসহীন সাংবাদিক। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন; আমৃত্যু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রগতিশীল চিন্তার বিকাশে অবিচল ছিলেন। তিনি ছিলেন আদর্শে অনড়; নীতিবান সাংবাদিক। সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’-এর আমি নিয়মিত পাঠক ছিলাম। আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদের লেখা ছাড়াও ঐ সময় যাদের লেখা আমাকে আকৃষ্ট করত তারা হচ্ছেন খন্দকার মুনীরুজ্জামান, বিভুরঞ্জন সরকার, সোহরাব হাসান, তসলিমা নাসরিন, শফিক রেহমান। মুনির ভাই দৈনিক সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হওয়ার পর তিনি আর খুব বেশি কলাম লেখেননি। একদিন আড্ডায় তাকে মাঝে মাঝে কলাম লিখতে বলার পর তার উত্তর ছিলো, ‘আমার লেখার সময় এখন তোমাদের কলাম পড়েই শেষ হয়’। সর্বশেষ দেখায় তাকে রাজনীতির প্রতি কিছুটা বীতশ্রদ্ধ মনে হয়েছে। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলো সেই বীর জাতিকে ধর্মান্ধ করে তুলতে, পশ্চাৎপদ চিন্তাভাবনায় আড়ষ্ট করতে প্রতিটি রাজনৈতিক দল কাজ করেছে, করছে; রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও লালনে ধর্মান্ধরা এত বেপরোয়া হয়ে উঠছে যে, আফগানিস্তানের মতো নব্বই হাজার মাদ্রাসার ছাত্ররাই অচিরে সমাজ ও রাষ্ট্র দখল করবে’।