ডোনাল্ড ট্রাম্প আর জো বাইডেনের মধ্যে কে আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন তা নিয়ে কারো মনে কোন সন্দেহ না থাকলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো আইনি লড়াইয়ের ধমক দিয়ে যাচ্ছেন। ডেমোক্রেটিক দলের জো বাইডেনের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রতারণার আশ্রয় নেয়ার অভিযোগ উত্থাপন করেছেন রিপাবলিক দলের ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৩৩ কোটি জনসংখ্যার ২৪ কোটি ভোটার; এর মধ্যে ১৬ কোটির বেশি আমেরিকান নাগরিক এবার ভোট দিয়েছেন; করোনা সঙ্কটের কারণ দেখিয়ে ১৬ কোটির মধ্যে প্রায় ১০ কোটি ভোটার পোস্টালের মাধ্যমে অগ্রিম ভোট দিয়েছেন। পোস্টাল ভোট বেশি পেয়েছে জো বাইডেন। এতে ক্ষেপে আছেন ট্রাম্প, তার মতে নির্বাচনের পর যে সকল পোস্টাল ভোট পৌঁছেছে সেগুলো অবৈধ। মিশিগান রাজ্যে মৃত ব্যক্তিদের নামে ভোট দেয়া, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষের কিছু ভোট জো বাইডেনের নামে গণনা করা, কম্পিউটার শনাক্ত করতে পারে না এমন শার্পি কলমের কালি দিয়ে শুধু রিপাবলিকান ভোটারদের ভোট দিতে বাধ্য করা, একটি রাজ্যে ভোট গণনার ফলাফল প্রকাশে কিছুক্ষণ বিরতির পর হঠাৎ জো বাইডেনের এক লক্ষ ভোট বেড়ে গেলেও ট্রাম্পের একটি ভোটও না বাড়া, উইসকনসিনে মোট ভোটারের চেয়ে ভোট বেশি কাস্ট হওয়া ইত্যাদি অভিযোগ উঠছে। তবে রেনান সেন্টার ফর জাস্টিস নামে একটি সংস্থা ২০১৭ সনের এক গবেষণায় দেখিয়েছে যে, আমেরিকার নির্বাচনে কারচুপির হার ০.০০০৯%-এরও কম।

আমেরিকায় ট্রাম্পের রিপাবলিক এবং জো বাইডেনের ডেমোক্রেট দলই পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। জো বাইডেন ৭ কোটির চেয়ে একটু বেশি ভোট পেলেও ট্রাম্পও প্রায় ৭ কোটি ভোট পেয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা দুই কক্ষবিশিষ্ট—নিম্নকক্ষকে বলে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ বা প্রতিনিধি পরিষদ, আর উচ্চকক্ষকে বলে সিনেট। আমেরিকার জনগণ তাদের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের প্রতিটি থেকে ২ জন করে ১০০ জন সিনেটর এবং জনসংখ্যা অনুপাতে বিভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন আসন সংখ্যায় মোট ৪৩৫ জন নিম্নকক্ষের প্রতিনিধি নির্বাচন করে থাকেন। যে রাজ্যে নিম্নকক্ষের যতটি প্রতিনিধি আসন তার সাথে সিনেটের দুটি আসন যোগ করলে যে সংখ্যা দাঁড়ায় তাই ঐ রাজ্যের ইলেকটোরাল বা নির্বাচক সংখ্যা; এরাই ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট করেন। প্রেসিডেন্টকে যারা ভোট দেবেন তারা কীভাবে নির্বাচিত হন? প্রেসিডেন্টের নির্বাচনের আগে দুই রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তাদের মনোনীত ইলেকটোরাল ভোটার বা নির্বাচকমণ্ডলীর যে তালিকা জমা দেওয়া হয় তাকে স্লেট বলে। মেইন ও নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্য ব্যতীত অন্য যে কোন অঙ্গরাজ্যে যে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জয়ী হন তার দলের স্লেটটিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচিত হয়ে যায়। কোন রাজ্যে জনগণের ভোট যে প্রার্থী বেশি পান তিনি ঐ রাজ্যের সবগুলো ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যান। এরা নির্বাচিত হওয়ার পর বেইমানি করে না; এই নির্বাচকেরা দলের বিশ্বস্ত এবং প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর অনুগত। আমাদের দেশ হলে পাকিস্তান আমলের বিডি মেম্বারদের মতো আমেরিকায় নির্বাচিত নির্বাচকদের ক্রয় করার তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত। টাকা পেলে দলের সাথে বেইমানি করার ইতিহাস পাকিস্তান আমল থেকেই দেখা গেছে বলেই বাংলাদেশে সাংসদদের দল পরিবর্তন আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

জনগণের ভোট বেশি পেলেও জো বাইডেন কিন্তু এখনো প্রেসিডেন্ট হননি, জানুয়ারির ১৪ তারিখে প্রেসিডেন্টের যে ভোট হবে সেখানে তাকে জিততে হবে। তবে জনগণের ভোট বেশি পেয়েও ইলেকটোরাল কলেজের ভোট কম পাওয়ার কারণে এ পর্যন্ত ৫ জন প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। ২০১৬ সনে হিলারি ক্লিনটন ৩০ লক্ষ ভোট বেশি পেয়েও নির্বাচকমণ্ডলীর ভোট পেয়েছিলেন মাত্র ২২৭টি, আর ডোনাল্ড ট্রাম্প ৩০ লক্ষ ভোট কম পেয়েও নির্বাচকদের ভোট পেয়েছিলেন ৩০৩টি। বাংলাদেশেও প্রায় অনুরূপ ঘটনা দেখা যায়; তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বাংলাদেশের ১৯৯১ সনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০.০১% ভোট পেয়ে সংসদের আসন পেয়েছিলো মাত্র ৮৮টি, আর বিএনপি ৩০.৮০% ভোট পেয়ে আসন পেয়েছিল ১৪০টি; ২০০১ সনের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ৪০.০২% ভোট পেয়ে আসন পেয়েছিলো মাত্র ৬২টি এবং বিএনপি ৪১.৪০% ভোট পেয়ে আসন পেয়েছিলো ২০০টি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শাসনামলে অনেক তুঘলকি কাণ্ড ঘটিয়েছেন; লাগামহীন বক্তব্যের জন্য তাকে নিয়মিত খবরে ব্যঙ্গ করা হয়েছে, ট্রাম্পের আচরণে আমেরিকার ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ায় ধীর, স্থির, অভিজাত শ্রেণির লোকেরা তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। অভিবাসীদের তিনি ক্ষেপিয়েছেন; মেক্সিকোর লোকের আগমন ঠেকাতে তিনি দেয়াল নির্মাণ করার জন্য অনবরত লড়াই করেছেন, তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদনকারী সাংবাদিকদের ‘ফেইক নিউজ অ্যাওয়ার্ড’ দিয়ে ক্ষেপিয়ে তুলেছেন। অভিবাসী পিতা-মাতার কাছ থেকে তাদের সন্তানদের আলাদা করেছেন, সাতটি মুসলিম দেশের লোকজন আমেরিকায় প্রবেশ বন্ধ করার আদেশ জারি করেছেন, বর্ণবাদী শব্দ ব্যবহার করে তার টুইট বার্তায় শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদকে ঢাকার চেষ্টা করেছেন, মুসলমানদের ভাবাবেগ উপেক্ষা করে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। রমণীদের সাথে যৌন সম্পর্ক থাকার অভিযোগ উঠতে থাকায় তার ইমেজ নষ্ট হয়েছে। বর্ণবাদকে সমর্থন করে, অভিবাসনের বিপক্ষে কথা বলে, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে তিনি অনেকের সমর্থন হারিয়েছেন। ট্রাম্পের একগুঁয়েমি ও অস্থির চিত্তের প্রকাশ ঘটে যখন তিনি তার কোন সহকর্মীকে সকালে নিয়োগ দিয়ে বিকেলে বাদ দিয়ে দিয়েছেন। তার বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, তার তরফ থেকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে করোনাভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। যারা ৪ বছর আগে তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন তাদের একটা অংশ ট্রাম্পের উদ্ভট আচরণে বিরক্ত হয়ে এবার তাকে ভোট দেননি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনেকগুলো সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে নতুন সিদ্ধান্ত দেবেন বলে জো বাইডেন ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন: প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আমেরিকা আবারো যোগ দেবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা হবে, যে সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের উপর যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা প্রত্যাহার করা হবে, অভিবাসী পিতা-মাতার সাথে থাকা অবৈধ শিশুদের নাগরিকত্ব দেয়া হবে। অন্যদিকে ট্রাম্পের অপরাধ, ট্রাম্প আমেরিকানদের মতের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন; আমেরিকানেরা চায় তাদের প্রেসিডেন্ট বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে কড়া এবং ভেতরের মানুষের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করুক। ট্রাম্প যা বিশ্বাস করতেন তাই বলতেন, কূটনীতির রাখঢাক ও প্রচ্ছন্ন ভাষা তার জানা ছিলো না। করোনার পূর্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি এনে তিনি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এর প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধে জয়লাভ করে দেশীয় শিল্পের সমৃদ্ধি আনতে সক্ষম হয়েছেন, বেকার সমস্যার সমাধান করেছেন, উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের হাঁকডাক তিনি যুদ্ধ না করেই থামিয়ে দিতে পেরেছিলেন, সিরিয়ায় পিছু হটে রাশিয়ার সাথে সংঘর্ষ এড়িয়েছেন। সকলের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে কিছু সৈন্য সরিয়ে নিয়েছেন, আফগানিস্তানে একটি সমঝোতা করার প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তার শাসনামলে আমেরিকা নতুন করে কোন যুদ্ধে জড়ায়নি। নির্বাচনের পর ট্রাম্পকে নিয়ে কৌতুকের শেষ নেই, সবাই ব্যঙ্গ করলেও কেউ জেলে যায়নি। কঠিন কথা সোজা ভাষায় বলার কারণে ট্রাম্পকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বর্ণবাদী ক্লাউন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্ণবাদী তো আমরাও; বর বা কনে নির্বাচনের প্রথম পছন্দ গায়ের ফর্সা রং।

জো বাইডেন এবং কামালা হ্যারিস দুইজনই নাকি ভারতীয়। ইংরেজ আমলে আসা জো বাইডেনের বংশের লোক নাকি এখনো ভারতে বসবাস করেন; অন্যদিকে কামালা হ্যারিসের মা উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ভারতের তামিলনাড়ু থেকে আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিলেন। তবে কামালা খ্রিস্টান এবং তার স্বামী ইহুদি। কামালার ইসরাইলপ্রীতি রয়েছে। জো বাইডেন বিজয়ী হওয়ার পর রাস্তায় রাস্তায় আমেরিকার জনগণের যে হর্ষধ্বনি তা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। অভিবাসী প্রত্যাশী মানুষ এবং অধিকাংশ মুসলমানও জো বাইডেনকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত। প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তি এক হলে পৃথিবী কিছুটা শান্তি পাবে। কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আমেরিকার ভদ্র ও বিনয়ী প্রেসিডেন্টগণই বিশ্বে অশান্তি সৃষ্টির ক্ষেত্রে নাটেরগুরু ছিলেন। যুদ্ধবাজ জর্জ বুশের পরাজয় এবং বারাক ওবামার জয় দেখে আমাদের মতো মুসলমানদের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠেছিলো, কিন্তু বারাক ওবামা কোথাও শান্তি আনেননি, তার আমলে লিবিয়া ও সিরিয়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিলো। তাই ট্রাম্প বিদায় নিলেই পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করবে তা কিন্তু নয়। তাই নির্বাচনে কে জিতলো তা মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে ট্রাম্প ও আমেরিকান জনগণের আচরণে বাঙালিরা আমোদ পেয়েছেন। ওখানকার দুই দলের মারামারি, ভোট কারচুপি, রাস্তায় বিক্ষোভ, মানি না, মানবো না স্লোগান, ভোট শেষ হওয়ার আগেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা দেওয়ার মধ্যে বাঙালিরা নিজেদের চেহারা ও চরিত্র খুঁজে পেয়েছেন।