আমেরিকায় জর্জ ফ্লয়েড নামের একজন ৪৬ বছর বয়স্ক নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার হাঁটু দিয়ে ৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড তার গলা চেপে ধরার কারণে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। ফ্লয়েড বারবারই বলছিলেন যে, তিনি নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না; কিন্তু পুলিশ তার কথায় কর্ণপাত করেননি। পুলিশের হাতে এমন মৃত্যু আগেও হয়েছে; ২০১৪ সনে অবৈধভাবে সিগারেট বিক্রির অভিযোগে এরিক গার্নার নামে আরেক কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে পুলিশ গ্রেফতার করে গলা চেপে ধরে, এরিকও ফ্লয়েডের মতো বারবার বলছিলো, ‘আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না’—তখনো পুলিশ তার কথার গুরুত্ব দেয়নি। আত্মরক্ষা ছাড়াও অন্য কারো মৃত্যু ও গুরুতর আহত হওয়া ঠেকাতে আমেরিকান পুলিশ শক্তি প্রয়োগ করতে পারে বিধায় সাধারণত এইসব হত্যার অভিযোগ আমলে নেয়া হয় না।

শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে আমেরিকায় ব্যাপক প্রতিবাদ, দাঙ্গা শুরু হয়। জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর জের ধরে গড়ে উঠা প্রতিবাদ সহিংসতায় রূপ নেয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শহরে কারফিউ জারি করা হয়েছিলো। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নয়—যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, কলম্বিয়াসহ অন্যান্য দেশেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিলো। যুক্তরাষ্ট্রে যে বিক্ষোভ হয়েছে তাতে শ্বেতাঙ্গরাও সামিল হয়েছেন; বাঙালিসহ অন্যান্য অভিবাসীকেও মিছিল, বিক্ষোভে দেখা গেছে। ফ্লয়েডের হত্যার প্রতিবাদ করে বিক্ষোভকারীদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছোট মেয়ে। জর্জ ডাবলিউ বুশ, বারাক ওবামাও এই হত্যার নিন্দা জানিয়েছেন। হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো জর্জ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদকারীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছেন। শ্বেতাঙ্গ পুলিশ যতক্ষণ ফ্লয়েডকে ঘাড়ে পা দিয়ে রেখেছিলো ততক্ষণ ধরে আমেরিকার ডেমোক্র্যাটিক দল মার্কিন কংগ্রেসে নীরবতা পালন করছে। কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ১৯৬৩ সনে বৈষম্যহীন আমেরিকা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন; কিন্তু গোটা আমেরিকা এখন বলছে, ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না’।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রায় সব শাসনব্যবস্থায় দাসপ্রথার প্রচলন ছিল। সমাজের শক্তিশালী শ্রেণি তাদের আরাম-আয়েস ও উৎপাদনসংশ্লিষ্ট যাবতীয় কাজ সম্পাদনে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলতর শ্রেণির লোককে দাসে রূপান্তর করত। এই অভিজাত শ্রেণির সাথে রাষ্ট্রও কায়িক শ্রমনির্ভর ও কষ্টকর বিপুল কর্মযজ্ঞ সমাধায় কর্মশক্তি সংগ্রহ করেছে দুর্ভিক্ষকবলিত দেশগুলো থেকে। ফারাওদের পিরামিড, চীনের মহাপ্রাচীর, আগ্রার তাজমহল হাজার হাজার দাস-দাসীর অমানুষিক পরিশ্রমে নির্মিত। শিল্পবিপ্লবের আগ পর্যন্ত ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোর অর্থনীতি ছিল দাসনির্ভর। ভারতবর্ষেও দাসপ্রথার প্রচলন ছিলো। চতুর্দশ শতাব্দীতে মরক্কোর পরিব্রাজক ইবনে বতুতা বাংলাদেশ ভ্রমণ করতে এসে এক সোনার দিনার দিয়ে আশুরা নামের এক সুন্দরী দাসী কিনেছিলেন। দাস কেনা-বেচা নির্ধারিত ফি দিয়ে আদালতে রেজিস্ট্রি করাতে হবে মর্মে ব্রিটিশ ভারতে ওয়ারেন হেস্টিংস নিয়ম করে দিয়েছিলেন। আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে বর্তমানে কালো লোকগুলো দেখা যায় তাদের পূর্বপুরুষদের আফ্রিকা থেকে আনা হয়েছিলো অনাবাদি জমি আবাদ করার জন্য। তখন বাজারে গবাদিপশুর মতো মানুষের বেচা-কেনা চলত এবং ক্রীত ব্যক্তি ক্রেতার ব্যক্তিগত সম্পত্তিরূপে গণ্য হতো। মানুষের এমন বেচা-কেনা তখন সামাজিকভাবে স্বীকৃত ও আইনিভাবে অনুমোদিত ছিলো। এই দাস-দাসী আবার হস্তান্তরযোগ্য ছিলো। শাসক, সমরনায়ক ও যাজকদের তুষ্ট রাখতে ক্রীতদাস, দাসীদের উপঢৌকন হিসেবেও দেওয়া হতো। আমাদের নবীজী (স.)-ও মিশরের তৎকালীন শাসক থেকে দুইজন দাসী উপঢৌকন হিসেবে পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে কপ্টিক খ্রিস্টান মারিয়া আল কিবতিয়ার ঘরে ইব্রাহিম ইবনে মুহাম্মদের জন্ম হয়। শুধু ইসলাম নয়, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্মেই দাসপ্রথার সমর্থন রয়েছে।

কৃষ্ণাঙ্গ নরওয়েল রবার্টসকে ১৯৬৭ সনে প্রথম বৃটেনের পুলিশ ফোর্সে নিয়োগ দেওয়া হয়। কালোদের রক্ত কেমন তা পরখ করার জন্য স্কুলজীবনে কয়েকজন সহপাঠী এই রবার্টসের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলো। ১৮৬৫ সনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথা বিলোপ করা হলেও কু ক্লাক্স ক্লান নামে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী দল তৈরি করে কৃষ্ণাঙ্গদের উপর হামলা, হত্যা শুরু হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য নিরসনে নিরলস সংগ্রাম করে গেছেন নেলসন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ শাসন শুরু হলে নিজ দেশে কালোদের আলাদা স্কুলে পড়তে হতো, পরিবহণে আলাদা সিট বা পৃথক কামরায় বসতে হতো, শ্বেতাঙ্গের ধারেকাছে কোন বসতি তৈরি করা যেত না, সব সময় পরিচয়পত্র সাথে বহন করতে হতো। সাদাদের কাছ থেকে কালোদের আলাদা করার রাষ্ট্রীয় আইনও ছিলো। শ্বেতাঙ্গরাই কেবল ঈশ্বরের মনোনীত সৌভাগ্যবান—এমন ধর্মীয় বিশ্বাস কালোদের দাসে পরিণত করতে সহায়তা করত। এই মানসিকতার মানুষগুলো এখনো দক্ষিণ আফ্রিকায় ওরানিয়া শহরে শুধু শ্বেতাঙ্গদের বসতি গড়ে তুলেছে, কোন কালো রঙের লোকদের ঢুকতে দেওয়া হয় না।

আমরা যারা ফ্লয়েডের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মায়াকান্না করছি তারা হয়তো জানি না যে, আমাদের দেশেও সম্প্রতি একজন সংখ্যালঘু পুলিশের নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেছেন। ফ্লয়েডের উপর শ্বেতাঙ্গ পুলিশের নির্যাতনে আমরা যারা আজ ক্ষুব্ধ হয়তো তাদের ঘরেই শিশু গৃহকর্মীকে প্রত্যুষে আজান দেওয়ার আগে ঘুম থেকে উঠতে হয় এবং রাতে ঘুমাতে যেতে হয় সবার এঁটো বাসন পরিষ্কার করার পর। যে বয়সে আমাদের সন্তানেরা স্কুলে যায়, বন্ধুদের সাথে খুনসুটি করে সেই বয়সে একটি গৃহকর্মী শিশুর সামান্য ভুলের জন্য তাদের খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়, মা মা করে কাঁদলে মুখ চাপা দিয়ে জোর করে কান্না থামিয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সংস্কৃতির লোকদের সাথে মেলামেশা করেও আমাদের দেশে জাতীয় দলের একজন ক্রিকেট খেলোয়াড় গৃহকর্মীকে নির্যাতন করতে বীরপুরুষ সাজে। আমরা যারা বংশের বড়াই করি তাদের শিক্ষা, আচার-আচরণ নিম্নমানের হলেও উচ্চশিক্ষিত, রুচিশীল ‘গোলাম’ বংশে সম্বন্ধ করি না। মেথর ও পরিচ্ছন্নতা-কর্মীদের মহাত্মা গান্ধী হরিজন নামে অভিহিত করলেও আমরা কেউ তাদের সাথে আত্মীয়তা করি না, তাদের নিয়ে একত্রে বসে খাই না। দাসদের সাথে অশোভনীয় আচরণের জন্য আমরা নিন্দা করি শ্বেতাঙ্গদের, অথচ আমাদের দেশে কর্মকর্তাদের অফিসের হালকা ব্যাগটি বহন করার জন্য একজন কর্মচারীর প্রয়োজন হয়।

সুলতানি এবং মুঘল আমলে বান্দীদের গায়ের রং বিচার করে কাজে নিয়োগ দেওয়া হতো—অপেক্ষাকৃত ফর্সা বান্দীদের উপপত্নী হিসেবে ব্যবহার করা হলেও কালো ত্বকের মেয়েদের দাসী হিসাবে নিয়োজিত করা হতো। প্রাচীন এই দাসপ্রথা পৃথিবীর নানা জাতির মধ্যে নানা পদ্ধতিতে প্রচলিত ছিল এবং তা আমাদের সমাজে এখনো ছদ্মবেশে বিরাজমান। ছেলের বিয়ে দিতে গেলে আমরা প্রায় সকলেই ফর্সা মেয়ে খুঁজি; ছেলের গায়ের রং কালো হলেও কনের দুধে-আলতা গায়ের রং চাই। তাই প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপন দেখে তা মেখে মেয়েরা ফর্সা হওয়ার মানসিক প্রশান্তি খোঁজে। একই কারণে মেয়েরা ফেসবুকে ছবি দেওয়ার আগে সফটওয়্যার দিয়ে ঘষেমেজে নিজেকে ফর্সা করে নেয়। ফর্সার কদর বেশি বলেই টেলিভিশনে যারা খবর পড়েন তাদের মধ্যেও অনেকে ফাউন্ডেশন মাখেন। দর্শক ফর্সা ত্বক চায় বলেই সম্ভবত নাটকে, সিনেমায় অভিনেতা, অভিনেত্রীদের ফাউন্ডেশন মেখে সঙ সাজানো হয়। ছেলেদের জন্যও আলাদা ফেয়ারনেস ক্রিম বিক্রি হচ্ছে। আমাদের সমাজে কালো মানে অসুন্দর, কুৎসিত। কালোদের ফর্সা করে তবেই বেহেস্তে নেয়া হবে—এমন বার্তার পর কেউ আর কালো থাকতে চায় না। ইসলাম ধর্মে যখন বলা হয় ‘জান্নাতে প্রবেশকারী প্রথম দলটি পূর্ণিমা চাঁদের মতো উজ্জ্বল আকৃতিতে প্রবেশ করবে’ তখন উজ্জ্বল হতে সবার বাসনা জাগে। গোলাপ আর আপেলের লাল রং মিশ্রিত সাদা বর্ণের গাল এবং প্রবাল ও পদ্মরাগের মত উজ্জ্বল গায়ের রং নিয়ে হুরদের মতো রূপবতী হতে সব মেয়েই চায়। জান্নাতি রমণীদের যে চার রঙে সৃষ্টি করা হয়েছে তার মধ্যে কালো নেই। বর্তমান সমাজে শুধু মেয়েদেরই বরপক্ষের অনেকগুলোর লোকের সম্মুখে গায়ের রঙের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। সৌন্দর্য যে শুধু গায়ের রঙের মধ্যে নিহিত নয় তা কালো ত্বকের বিশ্বসুন্দরীদের দেখেও বর্ণবাদী পুরুষদের হুঁশ হয় না।