করোনার দুর্বিষহ ও ভয়াবহ অবস্থায় পাশের বাসায় কান্নার শব্দ শুনলাম; একজন ধমক দিয়ে বলছে, ‘চুপ, শব্দ করে কাঁদবি না’। আমার বারান্দা থেকে তাদের রুম দেখা যায়, তাদের সবার কান্না মুহূর্তে থেমে যায়। একজন ফোনে নিকটতম আত্মীয়কে মৃত্যুসংবাদ দিলো। তারপর ঐ বাসায় আর একটি শব্দও শুনলাম না। এই রোগে মৃতদেহের শেষকৃত্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দেশের বিভিন্ন মিডিয়ায় এত ভয়াবহ ছবি দেখানো হচ্ছে যে, মানুষের মৃত্যুটাও যেন অপরাধ। কাফনের কাপড়ের চার কোণায় রশি বেঁধে কবরে মৃতদেহ নামানোর দৃশ্য জীবিতদের আতঙ্কিত করে। মৃত্যুর পর মরদেহ সৎকারের দায়িত্ব জীবিত মানুষের, মৃত মানুষ এর কিছুই জানতে পারে না, বুঝতেও পারে না; সত্য হচ্ছে, যেভাবেই কবরস্থ করা হোক না কেন মৃতের জন্য তা তাৎপর্যহীন। এতদসত্ত্বেও জীবিতরা এমন শবযাত্রায় ভয় পেয়ে মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগছে।

আমরা যারা নিয়মিত পত্রিকা পড়ি, খবর শুনি তারা একটু বেশি আতঙ্কগ্রস্ত। তাই লকডাউন উঠে গেলেও আমরা কিছু লোক বাইরে যাচ্ছি না, কাউকে বাসায় আসতেও দিচ্ছি না। পণ্যসামগ্রী কিনতেও ভয় পাচ্ছি, কারণ গৃহবন্দী অবস্থায়ও নাকি অনেকে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। আমাদের পোষা কুকুর সামায়্যেলকে গোসল করানোর সময় তার কানে সম্ভবত পানি ঢুকে গেছে, এটা প্রায়ই হয়। ডাক্তার বলেছেন, কটন বাড দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করে কয়েক ফোঁটা ব্যাকটিন ড্রপ দিতে হবে। কটন-বাড বাসায় নেই, বাজারে গিয়ে আনার ঝুঁকি নিইনি। বাধ্য হয়ে ন্যাকড়া পেঁচিয়ে কান পরিষ্কার করলাম। বউ বললো তার ফ্রিজে রাখা কাঁচা ও রান্না করা খাবার ঠান্ডা হচ্ছে না; আমার বউ, আমার বা মেয়ে ঐশীর কোন কারিগরি জ্ঞান নেই। আমরা খুব ভয়ে আছি, আমাদের পানি তোলার পাম্পটি যদি নষ্ট হয়ে যায় তখন পানি পাব কই। চিন্তা হয় যদি ঘরের কোথাও বৈদ্যুতিক সমস্যা হয় তখন কী করবো। নিত্যপ্রয়োজনীয় এই যন্ত্রপাতিগুলো সচল রাখা খুবই জরুরি হলেও তা সম্ভব নয়। কারণ বাইরের কাউকে ঘরে ঢুকানো নিরাপদ নয়। ঘরে বিদ্যুৎ না থাকা, টেলিভিশন নষ্ট হয়ে যাওয়া, ফ্রিজ বিকল হয়ে যাওয়া—এইগুলোর একটি হলেই করোনার ভয়ে আবদ্ধ জীবন অনেক বেশি দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।

মেয়ে ও তার মা অনলাইনে বাজার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফর্দ অনুযায়ী অর্ডার দিয়ে সরবরাহ প্রাপ্তির প্রত্যাশায় দিন গুনছিলো, ওখানেও বিরাট কিউ। এলাকার গলি বন্ধ থাকায় অনলাইন সরবরাহের গাড়ি মেইন রাস্তায় এসে কয়েকটি থলি নিয়ে আমাদের যেতে বললো। আমি আর মেয়ে ঐশী গিয়ে মেইন রাস্তা থেকে পণ্যগুলো বাসায় নিয়ে আসি। মাছ, মাংসসহ অনেকগুলো পণ্য সাবানের পানিতে অনেকক্ষণ ডুবিয়ে রেখে করোনামুক্ত করলাম। ধনিয়া পাতা সাবানের পানিতে ধোয়ার কারণে বউ রাগ, একদিনেই সব পচে যাবে। লন্ডন থেকে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের ছাত্র আমার নাতি নির্ঝর বললো, ‘করোনায় নয়, সাবান খেয়ে তোমরা অচিরেই মরবে’। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তো অ্যালকোহল-মিশ্রিত স্যানিটাইজার আর সাবান ছাড়া ভাইরাস মারার আর কোন বস্তুর কথা উল্লেখ করেনি। গোসল করে দুপুরে খাবার খেয়ে উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত সিনেমা দেখছিলাম, হঠাৎ মনে পড়লো, বাইরে থেকে এসে দরজার হাতল, পানির কল, ফ্রিজের হ্যান্ডল ধরেছি; তাই সিনেমা দেখা বন্ধ করে সাবানের পানি দিয়ে হাতের স্পর্শে দূষিত উক্ত বস্তুগুলো পরিষ্কার করলাম। এবার আর সিনেমা নয়, ঘুমানোর চেষ্টা করলাম; ঘুম আসবে আসবে এমন সময় খেয়াল হলো বাইরে থেকে এসে কলিংবেল ও বাথরুমের সুইচ ধরেছিলাম। আবার উঠলাম। এত সতর্কতার মধ্যেও ভাইরাস থেকে বাঁচবো তো? বয়স ষাটোর্ধ্ব, তাই ঝুঁকি বেশি। করোনার কোন ওষুধ নেই, কিন্তু চিকিৎসারও যে বেহাল দশা তাতে করোনায় ধরলে বাঁচার আশা নেই।

বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর অনেক কাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রতিদিন প্রচার হচ্ছে। দুঃখজনক হচ্ছে, কোন রোগেরই সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিদিনের বুলেটিনে বলা হয়, ‘শ্বাসকষ্ট হলে অবশ্যই আপনারা ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন’। ডাক্তার কই? হাসপাতাল কই? সরকারের দোষ দিয়ে লাভ নেই, ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এই সময় চটানো যাবে না, চটালে যতটুকু করছে তাও করবে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য এনায়েত হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সতীর্থ ছিলো। আগে সে কদাচিৎ ফোন রিসিভ করত, এখন প্রায় প্রতিদিন ফোন করে খোঁজ-খবর নেয়। তার শিশু নাতিনের তিন দিন যাবৎ জ্বর। শিশু বিধায় শ্বাসকষ্ট হচ্ছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। ডাক্তার ফোনে পরামর্শ দিয়েছেন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াতে। আমি বললাম, ‘খবরদার এমন কাজ করিস না, ডেঙ্গু হলে অ্যান্টিবায়োটিক তার জীবনের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যেতে পারে’। অগত্যা তাদের পারিবারিক ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নাতনিকে এপোলোর ডাক্তার চেম্বারে ঢুকতে যাওয়ার মুহূর্তে ডাক্তার ভূত দেখার মতো আতঙ্কিত স্বরে চিৎকার করে বললেন, ‘রোগী নিয়ে ভেতরে ঢুকবেন না, একজন এসে দূর থেকে রোগীর লক্ষণ বর্ণনা করুন’। ডাক্তারের পিপিই ও মাস্ক পরিহিত থাকা সত্ত্বেও এমন আচরণে এনায়েত বিস্মিত।

করোনার ভয়ঙ্কর রূপের বর্ণনা এত ব্যাপকভাবে প্রচার হয়েছে যে, শুধু চিকিৎসক নন, আপনজনেরাও করোনা রোগীকে ঘৃণা করা শুরু করেছে। ভয় এবং কুসংস্কার কীভাবে আমাদের গ্রাস করছে তার বোঝা যায় যখন জন্মদাতা মা-বাবা করোনায় আক্রান্ত সন্তানকে টাকা, পানি আর পাউরুটি দিয়ে রাতের অন্ধকারে বাঁশঝাড়ে ফেলে যান। এমন ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ার কারণে করোনা রোগী কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশন কক্ষ ছেড়ে পালাচ্ছে, খুব বিপদে না পড়লে অনেকে করোনা রোগ গোপনে হজম করছে। চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সাধারণ রোগী আর করোনা রোগীর বিভাজন করতে না পারায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে সব ধরনের রোগী এড়িয়ে চলছেন। হাসপাতালগুলোতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। কারণ প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ সবার রয়েছে। কুর্মিটোলা হাসপাতাল ও কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল করোনায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। কুর্মিটোলা হাসপাতালে বিছানা-চাদর ও বালিশবিহীন বেডে অযত্ন-অবহেলায় করোনা রোগে বাবার মৃত্যু নিয়ে নারায়ণগঞ্জের এক যুবক ফেইসবুকের মেসেঞ্জারে যে ভিডিও বার্তা বহুদিন আগে দিয়েছিলো তা চিকিৎসাসেবার অব্যবস্থাপনা পরিস্ফুট করে তোলে। আরেকটি ভিডিওতে দেখলাম, একই হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডের সব রোগী কয়েক দিন যাবৎ চিকিৎসা না পেয়ে দলবদ্ধ হয়ে সারা হাসপাতালে ডাক্তার খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

মহামারি করোনার দাপটে প্রসববেদনা উঠলেও ডাক্তার বলেন, করোনা টেস্ট করে রেজাল্ট নিয়ে আসুন। করোনা টেস্ট করে রেজাল্ট আনতে আনতে রাস্তায় ডেলিভারি করানো ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। আমার ভাইঝি লোরা পেটে tumor বা আলসারের ব্যথা নিরাময়ের জন্য উচ্চমাত্রার ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে যাচ্ছে, বহু ডাক্তারকে ফোন করা হয়েছে, সবার এক কথা, ঘরে থেকে ওষুধ খেতে থাকুন, এখন দেখা দেওয়া সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আমার ইমিডিয়েট বড় ভাই ড. মুনির উদ্দিন আহমেদ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবনের ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে পত্রিকায় বহু কলাম লিখেছেন। কিন্তু এখন ডাক্তার পাব কই, প্রেসক্রিপশন দেবে কে? ফেইসবুকের আনাড়ি বন্ধুদের প্রেসক্রিপশন দেখে আমরা অনেকে ওষুধ কিনে ঘরে জমা রাখছি। আমার আপন আরেক ভাই ডাক্তার জহির উদ্দিন আহমদের বয়স সত্তরোর্ধ্ব, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। আমরা কেউ রোগাক্রান্ত হলে তিনিও কোন সহায়তা করতে পারবেন বলে মনে হয় না। কারণ করোনায় আক্রান্ত ডাক্তারগণও যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছেন না। আমার বন্ধু কাইউমের বউয়ের ছোট ভাই ডা. মিজান উপজেলায় করোনার চিকিৎসা করতে গিয়ে নিজেই করোনায় আক্রান্ত; সেও ক্ষমতাবান একজনের সুপারিশের আগে ঢাকায় কোন ডাক্তার বা ল্যাবরেটরির সহায়তা পায়নি। তাই উচ্চ আদালতকে বলতে হয়েছে, হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা না পেয়ে কেউ মারা গেলে সেই মৃত্যুকে অবহেলাজনিত মৃত্যু হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

কেবল চিকিৎসকদের অপরাধী করাও যথার্থ বলে মনে হয় না; কারণ মৃত্যুর আশঙ্কা থাকলে যুক্তি, মানবিকতা ইত্যাদি কাজ করে না, আত্মরক্ষার আদিম সংস্কারই প্রবল হয়ে উঠে। আমরা শুধু অসচেতন নই, করোনার উপসর্গ গোপন করে চতুরতা দেখাতেও আমরা ওস্তাদ। করোনা নেই মর্মে ভুয়া ডাক্তারি সার্টিফিকেট নিয়ে চার বাঙালি নাকি জাপানে ধরা খেয়েছেন। অনেক চিকিৎসক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা করে যাচ্ছেন, তারা সমাজের সর্বস্তরে বাহবাও পাচ্ছেন; কিন্তু অনেক রোগীর চিকিৎসা না পাওয়াটা অধিকতর পীড়াদায়ক বিধায় জীবনপণ করে যারা সেবা দিচ্ছেন তাদের কাজ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে, আমরাও অসহায় বোধ করছি। নাঙ্গা তলোয়ার হাতে দৈত্যের তাড়া খেয়ে চৈত্র মাসে শক্ত মাটির ঢেলায় হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছি—ভয়ে ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠলে মা সুরা পড়ে বুকে ফুঁ দিয়ে বলতেন, ‘ভয় কিসের, এই তো আমি আছি’। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর এমন একটি আশ্বাসবাণী শুনলে ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করার সাহস পেতাম। বহুদিন গত হওয়ায় আধ্যাত্মিক, অলৌকিক কোন আরাধনা এখন আর সাহস যোগাচ্ছে না। বিজ্ঞানের সফলতা এখনো অদৃশ্য। বরফের নিচে প্রচুর ভাইরাস কোটি কোটি বছর ধরে ঘুমিয়ে আছে, বরফ গলতে থাকলে বরফাচ্ছাদিত ঐ সকল অজানা নতুন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আরও হতে পারে বলে অনেক বিজ্ঞানী আশঙ্কা করছেন। ভাইরাসের এমন প্রাদুর্ভাব হলে মেধাবীগণ শিক্ষার বিষয় ও পেশা বেছে নিতে গিয়ে এখন বোধ হয় চিকিৎসাসেবাকে আর অগ্রাধিকার দেবেন না। তবে বর্তমানে পছন্দসই আভিজাত্য ডাক্তারি পেশায় অভাব, অভিযোগের যুক্তি দিয়ে দায়িত্ব পালন থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার অত্যুগ্র বাসনা বাঙালি জাতির জন্য লজ্জার।