লকডাউন নেই, তবুও বের হচ্ছি না। আমি বের না হলে কী হবে, অনেকেই বের হচ্ছেন। আর যারা বের হচ্ছেন না তারা লকডাউন শিথিল করার জন্য সরকারকে দোষারোপ করছেন। শিথিল করার বহুবিধ কারণ আছে। কিন্তু যাদের নির্বিঘ্নে বাঁচার আগ্রহ তারা কোন কারণ লকডাউন শিথিল করার জন্য যথোপযুক্ত বলে মনে করেন না। কারো কাছে বাঁচার জন্য লকডাউন প্রয়োজন, কারো কাছে বাঁচার জন্য লকডাউন শিথিল বা তুলে দেওয়া আবশ্যক। সরকার লকডাউনের ক্ষেত্রে নমনীয়। নমনীয় না হয়ে উপায় নেই। ঘরে আবদ্ধ রেখে উপবাস রাখার অমানবিক কাজ সরকার করতে পারে না। সরকার করোনার শুরুতে লকডাউন ঘোষণা করে কর্মবিহীন লোকদের ত্রাণ বিতরণ করেছে, এখনো করছে; কিন্তু ত্রাণ দিয়ে অনির্দিষ্টকাল কোটি কোটি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। যতই ত্রাণ দেওয়া হোক না কেন নিঃস্বদের হাহাকার বন্ধ করা যাবে না। প্রথমদিকে তালিকা ছাড়াই কর্মহীনদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য খাবার বিতরণ করতে হয়েছে, এতে হয়তো অনেকে অনেক পেয়েছেন, অনেকে কিছুই পাননি। এমনও দেখা গেছে, মাথায় ত্রাণের সামগ্রী নিয়ে অবলীলায় বলে যাচ্ছে, ‘সরকার কিচ্ছু দিচ্ছে না, সব চোরদের পেটে যাচ্ছে’। আমাদের গ্রামে এক গরিবের চৌকির নিচে ১৫ কেজি খাবার তৈল আবিষ্কার করেছে ঔৎসুক্য আত্মীয়-স্বজন। সরকার ছাড়াও বিভিন্ন তরফ থেকে গরিবদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। এটাও সত্য যে, শুধু ত্রাণের উপর নির্ভর করে বাঁচা যায় না।

লকডাউনে অর্থনীতি স্থবির বা অচল হয়ে পড়ায় বিশ্বের অনেক দেশ লকডাউন শিথিল করা শুরু করেছে। বেকারত্ব দূর করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে এক্সিট কৌশল নির্ধারণে সব দেশ এখন থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইউরোপের দেশগুলো এরই মধ্যে লকডাউন তুলে নিতে শুরু করেছে। বিশ্ব অর্থনীতির ঘূর্ণায়মান চাকা থেকে যাতে ছিটকে না পড়ে সেজন্য রাশিয়া লকডাউন শিথিল করে দিয়েছে, অথচ রাশিয়ায় করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুসংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশের মতো দুরবস্থা না হলেও বেশিরভাগ রুশ নাগরিকের হাতে কোনো সঞ্চয় নেই। কানাডা কিন্তু লকডাউন করেনি, কেবল প্রধানমন্ত্রী জনগণকে বাসায় থাকতে অনুরোধ করেছেন। অনুরোধ করে প্রধানমন্ত্রী সরকারের দায়-দায়িত্বের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকেননি। করোনা সংকটকালে বাড়ি ভাড়া থেকে শুরু করে পরিবারের স্বাস্থ্য, চাকরি, সঞ্চয়, সন্তানদের লেখাপড়াসহ জনগণের সব খরচের দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করেছে। ওষুধ, প্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয়ের দোকানগুলো খোলা থাকা সত্ত্বেও কানাডা সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি নাগরিকের বাসায় এক মাসের যাবতীয় সব ধরনের খাবার, পানি, মেডিসিন, মাস্ক পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এরপরও যার যখন যা লাগবে তা সরকারকে অবহিত করা মাত্র তা নাগরিকদের পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এই খাবার আমাদের গরিব, নিঃস্ব, নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তের খাবার নয়, রীতিমত লোভনীয় খাবার। সরকার সব চাকুরিজীবীর অ্যাকাউন্টে মাসিক বেতনের টাকা পৌঁছে দিয়েছে, যারা ভাড়া বাসায় থাকেন তাদের সেই ভাড়াও সরকার বহন করেছে, যারা সরকারের নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মানবে তাদের এককালীন অতিরিক্ত অর্থ পুরস্কার দেয়ারও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। রমজান মাসে কানাডায় বসবাসরত মুসলমানদের ঘরে ঘরে ইফতার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও করোনা সংকটে বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবনে দেশের কর্মী ও ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় সরাসরি ২৭ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার দেবে সরকার; পাশাপাশি, ব্যবসা খাতে তারল্য আনতে ৫৫ বিলিয়ন ডলার ও গৃহস্থালী খাতে করছাড়েরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সচল করতে লকডাউন তুলে দেওয়ার বিকল্প আর কোন পথ নেই। উৎপাদন না করে আমদানি করে চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রেও হাট-বাজার, অফিস-আদালত খোলা রাখা ছাড়া গত্যন্তর নেই। আমদানি করার জন্য কানাডা, জার্মানি প্রভৃতি দেশের মতো অফুরন্ত বৈদেশিক মুদ্রাও আমাদের নেই। আমাদের মজুত ৩৩ বিলিয়নের রিজার্ভ যে অতি নগণ্য তা প্রমাণিত হয় করোনা মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোর বরাদ্দের পরিমাণ দেখলে। আমাদের রপ্তানি বন্ধ, প্রবাসী বাংলাদেশীদের চাকরি অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের অর্থনীতি স্থবির; স্বাভাবিকভাবেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাবে। ইউরোপ, কানাডা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাঙালিদের না তাড়ালেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তাড়ানোর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। মাত্র ৪ কোটি লোকের দেশ কানাডার করোনা-উত্তর অর্থনীতি পুনরায় সচল করতে যত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে তা ১৭ কোটি লোকের দেশ বাংলাদেশ কল্পনাও করতে পারে না। দেশের অধিকাংশ এলাকা বরফাচ্ছন্ন হলেও কানাডা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। আমাদের দেশে যদি ৫ কোটি লোকও হতো তাহলেও ২ কোটি লোককে বিভিন্ন দেশে চাকরি ও অভিবাসনের পাঠালে সমস্যা হতো না।

আমাদের লকডাউন শিথিল হলেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নাগরিকদের সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে চলাফেরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সবাইকে সরকারের তরফ থেকে বারবার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন সান্ধ্য আইন জারি করে, ধমক দিয়ে, আইনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে মানুষগুলোকে ঘরে কর্মহীন অলস নিশ্চেষ্ট জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তৈরি করা হলে শুধু খাদ্যাভাব নয়, ভবিষ্যতেও জাতি বিকলাঙ্গ হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। উৎপাদন এবং ভোগ অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। উৎপাদন না হলে মানুষ খাবার, বস্ত্র, ওষুধ ইত্যাদি পাবে কোথায়? উৎপাদিত পণ্য মানুষ না কিনলে, ভোগ না করলে উৎপাদকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, উৎপাদিত পণ্য বিক্রি না হলে কেউ ফের আর উৎপাদনে যাবে না। উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য পরিবহণ ব্যবস্থা চালু থাকতে হবে, বিক্রেতাদের দোকানপাট খোলা রাখতে হবে, দোকানপাটে ক্রেতার আগমন সহজ না করে ক্রেতাবিহীন দোকান খোলা রেখে লাভ হবে না। দোকানের পণ্য বিক্রি হলেই উৎপাদিত দ্রব্যের চাহিদা বাড়বে, বাজারে পণ্যের চাহিদা থাকলেই কেবল উৎপাদক আরও উৎপাদনে উৎসাহী হবে। অর্থনীতি সচল না হলে বিনিয়োগ হবে না, ব্যাংকের ব্যবসায় স্থবিরতা আসবে; আমানতের সুদ দিতে হবে অথচ লগ্নিকৃত অর্থ থেকে গ্রাহকদের কোন বেনিফিট না আসায় লোনের কিস্তি পরিশোধ হবে না, প্রকল্প সিক হবে, সুদাসল মওকুফের দাবী উঠতে থাকবে।উৎপাদন, বিপণন, ভোগ প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক নিয়মে বাধাহীন লোক চলাচলে রিক্সা, ভ্যান, ট্রেন, বাস যোগ হবে।

পোশাক কারখানা বা দোকান খোলার অনুমতি দেয়ায় সরকারের কড়া সমালোচনা করা হচ্ছে। কিন্তু এর আগেও কি লোকজনদের ঘরে রাখা সম্ভব হয়েছিলো? আমরা সবাই জানি, অধিকাংশ বাঙ্গালী কখনো নিয়ম-নীতি মেনে চলতে অভ্যস্ত নয়। দূরপাল্লার পরিবহণ বাস, ট্রেন বন্ধ থাকার পরও গ্রামে পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদ করার জন্য যেভাবে পায়ে হেঁটে লোকজনের ঢাকা ছাড়ার দৃশ্য দেখেছি তা একাত্তরে পঁচিশে মার্চের পর এই প্রথম দেখা গেল। ঈদের আগে ফুটপাতের দোকানগুলোতে লোকজনের ভিড় আমরা দেখেছি; শিশুদের কোলে নিয়ে মা’রা যেভাবে ঈদের বাজার করেছেন তা ছিলো উপভোগ্য। কারো কোন চিন্তা ছিলো না, অতি ছোঁয়াচে করোনা নামে কোন একটি রোগে মানুষ মারা যাচ্ছে এই ভাবনা কারো চেহারায় পরিলক্ষিত হয়নি। মিডিয়ার ক্যামেরার সম্মুখে সবার এক উত্তর, ‘বহুদিন পর জরুরি কাজে বের হতে বাধ্য হয়েছি’। কথাটি মিথ্যে নয়, দেশে জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে প্রতিটি পরিবার থেকে মাসে একজন করে বের হলেও রাস্তায় ভিড় জমে যাবে। লোকে লোকারণ্য বলেই লকডাউন কাজ করে না, লিবিয়ায় ২৬ জনকে গুলি খেয়ে মরতে হয়।

লকডাউনে থাকা দেশগুলো অর্থনীতিকে সচল করতে অস্থির হয়ে উঠেছে; শিথিলতার কারণে করোনাভাইরাস আবার ভয়াবহ রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বকে সতর্ক করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অশনিসঙ্কেতে কেউ কান দিচ্ছে না। দেশের মানুষকে রক্ষা করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাখাও অত্যন্ত জরুরি। একদিকে করোনাভাইরাসের নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষের রুটি-রুজির প্রশ্ন, অভুক্ত লোককে খাবার দেওয়ার সামর্থ্য—সরকারকে এই দুই বিকল্পের একটিকে বেছে নিতে হবে বা উভয়ের মধ্যে সমন্বয় করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। অচল অর্থনীতি শীঘ্র সচল করা না গেলে বিশ্বের কমপক্ষে তিন কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে মর্মে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা আভাস দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস হচ্ছে, স্থবির অর্থনীতির কারণে বিশ্বের প্রবৃদ্ধি তিন শতাংশ হ্রাস পাবে। প্রতিষেধক আবিষ্কারের কাছাকাছি পৌঁছার কথা প্রায় প্রতিদিনই শুনি, কিন্তু একটু পরেই তা নিরাশার মধ্যে ডুবে যায়। আজ পর্যন্ত জলবসন্ত, ক্যান্সার, এইডস ইত্যাদির কোন প্রতিষেধক বা ওষুধ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। করোনার প্রতিরোধে সারা পৃথিবীর একযোগে যেভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তাতে অচিরেই হয়তো ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু আবিষ্কার হলেও আমাদের মতো সাধারণ মানুষের নাগালে তা আসতে সময় নেবে কয়েক বছর। করোনা অনেকদিন থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। বহুদিন ক্যান্সারে ভোগে মৃত্যুর পূর্বে জাহানারা ইমাম ‘ক্যান্সারের সাথে বসবাস’ নামে একটি বই লিখে গেছেন; আমাদেরও বোধ হয় করোনার সাথে বসবাস করতে হবে। আমরা প্রতিদিন আগুন জ্বালাই, আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে সেই আগুনে শুধু পতঙ্গই ঝাঁপ দেয়; মানুষ পতঙ্গের চেয়ে বুদ্ধিমান, তাই লকডাউন না থাকলেও আমাদের নিজের থেকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।