বেশি দিনের আগের কথা নয়—আমাদের বাল্যকালেও লোকজন হজে যাওয়ার সময় মিছিল করে হজযাত্রীদের বিদায় জানাতাম, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন থেকে মাফ চেয়ে হজযাত্রী যখন বিদায় নিতো তখন অনেকের চোখের পানি আপনাআপনি গড়িয়ে পড়তো। আমার বড় ভাইয়েরা যখন ঢাকায় আসতেন বাড়ির সকলে রাস্তায় এসে বিদায় জানাতো, যতক্ষণ তারা অদৃশ্য না হতেন ততক্ষণ সবাই একদৃষ্টে তাদের গমনপথে তাকিয়ে থাকতেন, আমার মা অনেকটা চিৎকার করেই কাঁদতেন। এখন একজন স্বামী স্ত্রীকে বলে, ‘দরজা দাও, আমি আমেরিকা যাচ্ছি।’ আগে না বলার জন্য বউও আর অভিমান করে না। পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতির কারণে সারা বিশ্ব আজ মানুষের হাতে মুঠোয়। এমন একটি পরিব্যাপ্ত সমাজে সমগ্র মানবজাতি একটি বিশ্বপল্লীতে বসবাস করার সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে। বিজ্ঞানের কোন আবিষ্কার কোন একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না বলে বিশ্বায়নের কল্যাণে পণ্য, পরিষেবা, পুঁজি, প্রযুক্তি, তথ্য-উপাত্ত সহজ প্রক্রিয়ায় এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাচ্ছে। মানুষ আর দেশের নৈকট্য বেড়েছে ইন্টারনেট আর মোবাইলের ব্যাপক ব্যবহারে।

বিশ্বায়নের ভালো-মন্দ দুটো দিকই আছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে এখন মন্দ দিকটিই সবার নজরে এসেছে। ১৯২৯ সালে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক মহামন্দার ধাক্কা সামলাতে বিশ্বকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। ১৯২৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হঠাৎ শেয়ারবাজারে ধস নামলে তার বিরূপ প্রভাবে সারা বিশ্বে শেয়ারবাজারে ধস নামে। শেয়ার মার্কেটের বিরূপ প্রতিক্রিয়া আস্তে আস্তে অর্থনীতির বিভিন্ন সেক্টরে পড়তে থাকে। মহামন্দা সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে বহু দেশে গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটে, একনায়ক ও স্বৈরাচারের উদ্ভব হয়। এখন করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ববাণিজ্যে কিছুটা স্থবিরতা এলেও বিশ্বে তেমন আরেকটি মহামন্দার আশঙ্কা এখনো কেউ করছে না। তবে করোনাভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল।

চীনের পর দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান ও ইতালিতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, জিম, সুইমিং পুল, রিসোর্ট, গণজমায়েত সব বন্ধ করে দিয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হতে সবাইকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইতালির ফুটবল ক্লাবগুলোর খেলার তারিখ বারবার পেছানো হচ্ছে। ইতালি জনতার সমাবেশকে এত নিরুৎসাহিত করছে যে, দেশের এক কোটি ষাট লক্ষ লোককে কোয়ারেন্টাইনে বসবাস করতে বাধ্য করা হয়েছে—যারা কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম ভাঙছে তাদের তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে খোলা রাখা হলেও খাবার গ্রহণে একজন আরেকজন থেকে এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখছে। অস্ট্রেলিয়ায় এই রোগের বিস্তার না ঘটলেও সেখানে মাস্ক ও স্যানিটাইজারের ক্রাইসিস দেখা দিয়েছে। এই ভাইরাসের সাথে সম্পর্কহীন টয়লেট পেপার ক্রয়ের ধুম পড়ার কারণ অস্ট্রেলিয়ার কোনো মনোবিজ্ঞানীও আবিষ্কার করতে পারছেন না। করোনাভাইরাসের কারণে বিমানে প্রতিদিন যাত্রীসংখ্যা কমছে, বিমানসংস্থাগুলো তাদের ফ্লাইট কোন কোন রুটে বন্ধ করে দিচ্ছে বা ফ্লাইটের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে বিভিন্ন দেশের পর্যটনশিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। জনসমাগম পরিহার করার অপরিহার্যতায় বিনোদন ও ক্রীড়াঙ্গনেও করোনাভাইরাসের প্রভাব ব্যাপক—বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইভেন্টগুলো স্থগিত বা বাতিল করা হচ্ছে, ভেন্যু পরিবর্তন করা হচ্ছে। মানুষের আচার-আচরণেও এই ভাইরাসের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়; হ্যান্ডশেক বা কোলাকুলির পরিবর্তে এখন কনুই আর পা দিয়ে সম্ভাষণ করছে, কুশল বিনিময় করছে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের তিনজন রোগী সম্প্রতি শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে দুইজন কিছুদিন পূর্বে ইতালি থেকে এসেছেন। এতদিন পর্যন্ত একটি গুজব ফেসবুকে প্রচারিত হচ্ছিল যে, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী থাকলেও বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চের আগে তা প্রকাশ করা হবে না। ইতোমধ্যে সরকার বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের মূল উৎসব স্থগিত করেছে। জনসমাগম এলাকা এড়িয়ে চলার নির্দেশনা থাকলেও ইতালির মতো বাঙালিদের ঘরে বন্দী করে রাখা যাবে না, তাদের কোয়ারেন্টাইন করা অসম্ভব। যতই উন্নতি হোক, এখনো প্রচুর লোককে ভিক্ষা করে, রিকশা-ভ্যান চালিয়ে, ফুটপাতে ব্যবসা করে রোজগার করতে হয়। একদিন রোজগার না হলে পরের দিন উপোস করতে হয়। করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য অন্য ব্যক্তি থেকে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের দেশে চলাফেরা করা অসম্ভব ও অবাস্তব; কারণ একটি ছোট্ট ভূখণ্ডে এত লোকের বসবাস সম্ভবত পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই। ফুটপাতের ভিড় মাছের বাজারের চেয়েও বেশি। হাঁটতে হাঁটতে অনেকে অনেকের গায়ের উপর থুতু ফেলছে, হাঁচি বা কাশি দিচ্ছে, সর্দি ঝাড়ছে।

রোগী চিহ্নিত হওয়ার সাথে সাথে আমাদের শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। রফতানিনির্ভর গার্মেন্টস খাতে বিভিন্ন জিনিসপত্র আমদানি বন্ধ। গার্মেন্টস শিল্পে ব্যবহৃত সুই-সুতা, কাপড়, পলি, জিপার, লেস, হ্যাঙ্গার, বোতাম, রং, যন্ত্রাংশ—সব কিছুই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ওভেন পোশাকের ২০-৩০ শতাংশ দেশীয় বাজারে উৎপাদন হয়, বাকি ৭০-৮০ শতাংশই চীন থেকে আসে। একদিকে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কারিগরের অভাবে নতুন শিল্প গড়ে উঠছে না, অন্যদিকে কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন সংকট বাড়ছে। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে রফতানি খাতেও সংকট দেখা দেবে। বহুদিন যাবৎ কোন ক্রেতা বাংলাদেশে আসছে না। আমেরিকা, ইউরোপেও করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এতদিন যাবৎ চীনে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ছিলো বলে আমরা চীনকে এড়িয়ে চলেছি; এখন বাংলাদেশে এই রোগের বিস্তৃতি ঘটলে চীন আমাদের পরিহার করবে। এই রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপক হলে বাংলাদেশ মারাত্মকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও পূর্বাভাস করেছে। জ্বালানি তেলের দাম কমে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ব্যাহত হবে, আমাদের দেশের শ্রমিকরা কাজ হারাবে, শ্রমিকদের রেমিট্যান্স কমে যাবে।

ধর্ম পরিপালনেও করোনাভাইরাস প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। ইতালির মসজিদে নামাজ আদায় বন্ধ রাখা হয়েছে, সৌদি আরব বিদেশিদের জন্য ওমরাহ করার সুবিধা স্থগিত করেছে। আসন্ন হজে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে কিনা তা নির্ভর করছে তখনকার পরিস্থিতির ওপর। তবে বাংলাদেশের ওয়াজকারীরা নিশ্চিত যে, কোনো ঈমানদার মুসলমান করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। মুসলিম রমণী আয়েশা চীনের বৌদ্ধদের দ্বারা ধর্ষিত হওয়ার সাথে সাথে চীনের উহানে করোনাভাইরাস আল্লাহর সৈনিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মর্মে ইতালির এক সাচ্চা মুসলিম স্বপ্নে দেখে তা আমাদের দেশের মুফতি কাজী ইব্রাহীমকে জানিয়েছেন। ইব্রাহীম সাহেব হাদিস-কোরআন পর্যালোচনা করে তার সাথে স্বপ্নের মিল খুঁজে পেয়েছেন। চীনে শুধু একজন মুসলিম মেয়ে ধর্ষণের কারণে করোনাকে আল্লাহ চীনে পাঠিয়েছেন, অন্যদিকে আমাদের দেশে মক্তব, মসজিদ, মাদ্রাসার ইমাম ও শিক্ষকেরা যেভাবে বলাৎকার আর ধর্ষণের মহোৎসবে মেতে উঠেছেন তাতেও কিন্তু আল্লাহর প্রেরিত করোনা-সৈনিকেরা বাংলাদেশে কোন লোক মারবে না, কারণ এখন বাংলাদেশে এত বেশি ওয়াজ-মাহফিল হচ্ছে যে, তা দেখে করোনা-সেনারা সন্তুষ্ট। ইরানে নাকি ইসলামকে বিকৃত করা হয়েছে, তাই করোনা-সেনারা ইরানে আক্রমণ করেছে। অন্যান্য মুসলিম দেশেও নাফরমান মুসলিমদের ধরা হবে, আমেরিকা, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে করোনা-সেনার আক্রমণে একশ’ কোটির বেশি লোক মারা পড়বে। স্বপ্ন দেখা থেমেছে ভারতে গিয়ে—করোনার আরও আপগ্রেডেড ভার্সন পরিশেষে ভারত আক্রমণ করবে, এই আক্রমণে কোন হিন্দু মরবে না—মরবে বজরং, শিবসেনা প্রভৃতি উগ্র জাতীয়তাবাদী সদস্যরা। ইহুদিদের আক্রমণ করার দায়িত্ব করোনাকে দেওয়া হয়নি, এই দায়িত্ব পালন করবেন ঈসা (আ.)। আপাতত ইহুদিরা বেঁচে গেল। করোনা থেকে মুক্ত থাকতে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার পরামর্শের সাথে ওয়াজকারীরা নামাজের ওজুর মিল খুঁজে পেয়েছেন; সম্প্রতি একটি দোয়া ফেসবুকের সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাংলাদেশে যারা স্বপ্ন আর ওয়াজের বয়ানে আস্থা রাখতে চান তারা ছাড়া বাকিদের সচেতন হতে হবে। বিভিন্ন মিডিয়ায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা এ ভাইরাসের আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকতে এবং আক্রান্ত হলে করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছেন, তা শুনুন এবং পালন করুন। আতঙ্কিত হবেন না; কারণ ঈমানদার, বেইমান, কাফের, মুশরিক, নাসারা নির্বিশেষে যারাই আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের একশ’ জনের মধ্যে আটানব্বই জনই সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন।