বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ফেসবুকে শত শত হাজার হাজার লেখা দেখে মুজিববর্ষ নিয়ে একটি কলাম লেখার ইচ্ছে হলো। জ্ঞান-গরিমা অনুযায়ী একেকজন একেকভাবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে আমার মেজোভাই মহিউদ্দিন আহমেদের সম্পৃক্ততা থাকায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমাদের পরিবারের সব সদস্যের একটি আলাদা অনুভূতি রয়েছে, আলাদা শ্রদ্ধা রয়েছে। ২৫ মার্চ গভীর রাতে গ্রেফতার হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে বাঙালির কোনো স্বচ্ছ ধারণা ছিল না। স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে সরাসরি বাংলাদেশে পদার্পণ না করে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে ৮ জানুয়ারি অবতরণ করেন। এই লন্ডন হিথ্রো বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে রিসিভ করেন আমার মেজোভাই। যে লোকটির দীর্ঘ ৯ মাস সঠিক হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না, যাকে ফাঁসি দেওয়ার সব ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করে আনা হয়েছিল, যাকে এক নজর দেখার জন্য সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সব মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল—তাকে প্রথম দেখার সৌভাগ্য পেয়েছিলেন আমার এই ভাই। বঙ্গবন্ধুর বুকে মাথা রেখে তিনিই প্রথম কাঁদার সুযোগ পেয়েছিলেন। আমার ভাই একাত্তর সালে পাকিস্তান দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব পদে কর্মরত থাকাকালীন হাজার হাজার বাঙালির সমাবেশে ট্রাফলগার স্কোয়ারে নির্মিত মুক্তমঞ্চে দাঁড়িয়ে ১ আগস্ট বাংলাদেশ সরকারের আনুগত্য স্বীকার করেন। ইউরোপে পাকিস্তান সরকারের বাঙালি কূটনৈতিকদের মধ্যে মহিউদ্দিন আহমেদ প্রথম ব্যক্তি, যিনি বাংলাদেশ সরকারের আনুগত্য স্বীকার করেন। সতেরো তারিখে বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী পালিত হলো, এই বছরটি বঙ্গবন্ধুর জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের ভয়ে আতঙ্ক না থাকলে বাঙালি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করত শতসহস্র গুণ বেশি আনন্দ ও উৎসাহ নিয়ে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা খুবই কম। পাকিস্তান আমলে আমার স্কুলজীবনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহর জন্য কিছু দিন ‘মাদারে মিল্লাত ফাতেমা জিন্নাহ’ স্লোগান দিয়েছি, মিছিল করেছি। লেখাপড়া না করে মিছিল, মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকায় আমার বাবা রেগে গিয়ে বলেছিলেন, ‘গান্ধীর মতো রাজনীতিবিদও তার অনুসারী দ্বারা খুন হয়েছিলেন, রাজনীতি নিয়ে বেশি মাতামাতি করবি না।’ আব্বার এই কথায় গান্ধীর মৃত্যু সম্পর্কে জানতে পেরেছিলাম। স্কুলজীবনে আর কখনও রাজনীতি নিয়ে মাতামাতি করিনি। কিন্তু ঊনসত্তরের গণআন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন বঙ্গবন্ধু আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবার নিকট সম্যকভাবে পরিচিত হয়ে উঠেন। বাহাত্তর সনে এক জনসভায় শেখ কামাল বক্তৃতা করবেন বলে প্রচার করায় আমি আমার বাড়ি থেকে তিন মাইল দূরে মুন্সীরহাট নামে একটি বাজারে উপস্থিত হই; কিন্তু অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারী ঘোষণা করলেন যে, শেখ কামাল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় সভায় আসতে পারবেন না। এটা যে একটি পরিকল্পিত ধোঁকা তা বহুদিন পর বুঝতে পেরেছিলাম। রাজনীতির ধোঁকা যতই দেখি ততই আব্বার কথা মনে পড়ে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তৈরি এবং বর্তমানে পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটিতে বাহাত্তরের শেষ দিকে বা তিয়াত্তর সনে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা শোনার জন্য সাত মাইল দৌড়ে বাড়ি থেকে ফেনী এসেছিলাম। দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোরদের তিনি ওই বক্তৃতায় জিহ্বা কেটে দেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। পনেরো আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য আমরা প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, কিন্তু সকালে রেডিওতে তার মৃত্যুসংবাদ শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলাম। গুলিবিদ্ধ শেখ ফজলুল হক মনিকে দেখার প্রত্যাশা নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দৌড়ে গিয়েছিলাম, ভাগ্য খারাপ মর্গে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

বঙ্গবন্ধুর যে বিষয়টি আমাদের আকৃষ্ট করে তা হচ্ছে তার সহজ-সরল সাধারণ জীবনযাপন। প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও তার জীবনাচারে কোন পরিবর্তন আসেনি; রাতদিন অসহায়, নিঃস্ব, গরিবদের কথা ভাবতেন। যেকোনো দুর্যোগে তিনি মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করতেন। সত্তরের সাইক্লোনে ১০ লাখ লোক মারা যায়, তিনি তখন দক্ষিণ বাংলার দুর্গম এলাকায় ছুটে গিয়েছিলেন। সাইক্লোনে ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালির জন্য সারা পৃথিবী যে সাহায্য দিয়েছিল তা বিমান থেকে নামানো হয় করাচিতে—এই সাহায্য পশ্চিম পাকিস্তানে নেয়ার তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

তার অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সব সময় তিনি সংখ্যালঘুদের আস্থা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি সর্বদা দাঙ্গাপীড়িত মানুষদের রক্ষা করতে ছুটে গেছেন। ১৯৫০ এবং ১৯৬৪ সনে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিমূলক যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানো হয় তাতে দাঙ্গাপীড়িত সংখ্যালঘুদের বাঁচাতে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে সর্বত্র শূন্যতা বিরাজ করছিল, সীমিত সম্পদ দিয়ে কোনভাবেই অফুরন্ত অভাব পূরণ সম্ভব হচ্ছিল না। রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত, ভঙ্গুর অর্থনীতি, আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা নেই—শূন্য রিজার্ভ, রপ্তানি নেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যের অনেকগুলো দেশ তখনও বাংলাদেশকে স্বীকার করছে না, বিপুল খাদ্যঘাটতি—চারিদিকে শুধু অভাব আর অভাব। অভাব বেশি থাকায় সীমিত সম্পদ নিয়ে দুর্নীতির মাত্রা বেড়ে যায়। জাপান থেকে শার্টের জন্য পপলিনের যে কাপড় আসতো তা থেকে আমাদের গ্রামের জন্য বরাদ্দ ছিল দুটি, দুটি শার্টের কাপড় নিয়ে মেম্বার সাহেবেরা বিপদে পড়ে যেতেন, কাকে দেবেন তা নির্ধারণ করা সম্ভব হতো না বলে তা নিজেই রেখে দিতেন। এমন আর্থিক দুরবস্থায় শুরু হয় মাথা কাটার রাজনীতি, চারিদিকে শুধু নাশকতা। ঘরে-বাইরে দুর্জন মোকাবিলা করে অভাবী মানুষদের জন্য কাজ করা কঠিন হয়ে উঠে। চুয়াত্তরে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ছাত্র থাকাকালীন দুর্ভিক্ষকবলিত মানুষদের যেভাবে রক্ষা করেছিলেন সেভাবে চুয়াত্তর সনের দুর্ভিক্ষে বুভুক্ষুদের রক্ষা করতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটকৌশল তাকে দুরবস্থায় ফেলে দেয়; পিএল ৪৮০-এর আওতায় বাংলাদেশের জন্য প্রেরিত চাল-গম সমুদ্রের মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে নেয়া হয়। কিউবার কাছে চটের বস্তা বিক্রি করার অপরাধে বাংলাদেশের ওপর এমন আক্রোশমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। এ অবস্থায় তাৎক্ষণিক খাদ্য সংগ্রহ করা সম্ভব না হওয়ায় দুর্ভিক্ষ প্রলম্বিত হয়। কিন্তু এই দেশটিকে সোনার বাংলা করার তার গভীর বাসনা ছিল।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের ৭৫০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা। বিশ্বের অর্থনীতিতে নানা দুর্যোগ থাকা সত্ত্বেও বিগত ১০ বছর ধরে আমাদের গড়পড়তা প্রবৃদ্ধি সাড়ে ছয়ের বেশি। ২০০০ সনে যে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮.৯% সেই দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২০.৫ শতাংশে। দেশে শিক্ষার হার বেড়ে হয়েছে ৭৩.৯ শতাংশ এবং গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে ৭২.৩ শতাংশ; দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা ব্যতীত অন্য কোনো দেশের শিক্ষার হার ও গড় আয়ু বাংলাদেশের চেয়ে কম। শিশুমৃত্যুর হার বিবেচনায়ও শ্রীলঙ্কা ব্যতীত অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুহার কম। বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো উন্নয়নের অগ্রগতি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ এখন খাদ্য উৎপাদনে স্বাবলম্বী, বিশ্বে মিঠে পানির মাছ ও সবজি উৎপাদনে যথাক্রমে তৃতীয় ও পঞ্চম স্থানের অধিকারী। এছাড়া অন্যান্য খাতেও প্রভূত উন্নতি হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি দুর্নীতির কিছু চিত্র যেভাবে প্রকাশিত হচ্ছে তা দ্বারা আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থাদি প্রচারে আওয়ামী লীগের অতিকথনে অভিযুক্ত নেতারা কেন নিশ্চুপ থাকেন তা সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়।

বঙ্গবন্ধুভক্ত নব্বই বছর বয়সী কুড়িগ্রামের আবদুস সোবহানের মুজিববর্ষ সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য তিনি প্রতিদিন দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করেন। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার হওয়ার সংবাদ শুনে তিনি এক বছর রোজা রাখার নিয়ত করেন এবং এক বছরের রোজা শেষ হওয়ার পূর্বেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর লড়াকু মনোভাব এবং দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে তার কণ্টকাকীর্ণ সংগ্রামী জীবন আবদুস সোবহানকে মুগ্ধ করত। নিজের জন্য না ভেবে বঙ্গবন্ধু যেভাবে দেশের মানুষকে মুক্ত করার জন্য পাকিস্তানিদের নির্যাতন সহ্য করতেন তাতে বঙ্গবন্ধুর প্রতি আবদুস সোবহানের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা গভীর থেকে গভীরতর হয়েছিল। আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে খুন করা হলে তিনি রেডিওতে সংবাদ শুনে অসুস্থ হয়ে পড়েন। নদীর ভাঙনে বাড়িঘর সব হারিয়ে বর্তমানে প্রায় নিঃস্ব, তবুও তিনি প্রতি বছর বঙ্গবন্ধুর জন্য একবার মিলাদের আয়োজন করে থাকেন। আবদুস সোবহানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বা শেখ হাসিনার কখনও দেখা হয়নি, না দেখেও তিনি যেভাবে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে যাচ্ছেন তার জন্য মুজিববর্ষ ঘোষণার প্রয়োজন হয়নি। আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী খোন্দকার হাবিবুর রহমান বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর থেকে এখন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নামে এক শরিক কোরবানি দিয়ে থাকে। বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করার জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রেমিকদের মুজিববর্ষ লাগে না। মুজিববর্ষে অনেক কৃত্রিম মুজিবভক্তের সৃষ্টি হতে পারে, এরা বঙ্গবন্ধুকেও ডোবাবে, শেখ হাসিনাকেও অজনপ্রিয় করে ছাড়বে।

নির্লোভ, নিরহংকারী, জনদরদী, কষ্টসহিষ্ণু এই লোকটির বাঁচার অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছিল বিশ্বাসঘাতক কিছু দুর্বৃত্ত। স্বাভাবিক মৃত্যু হলে বঙ্গবন্ধু হয়তো শতায়ু হতেন, বাঙালি জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে তার জীবনকালে জন্মশতবার্ষিকী আনন্দসহকারে পালন করতে পারতেন। আত্মত্যাগী ও আদর্শবাদী বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে তা যদি জাতীয় জীবনে কাজে লাগানো যায়, তা হবে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা ও স্মরণ করার শ্রেষ্ঠ উপায়। তাই মুজিববর্ষ হবে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অর্পিত দায়িত্ব সুচারুভাবে পালনে কর্মময় জীবনের একটি বিশেষ আনন্দময় বছর।