ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধন আইন অনুযায়ী আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে আসা অমুসলিম শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। মুসলিম শরণার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক এই আইন সারা দেশে ব্যাপক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। সম্প্রতি এ আইনের বিরুদ্ধে লাগাতার বিক্ষোভ-আন্দোলন শুরু হয় দিল্লির শাহীনবাগে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে হত্যা ও ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগী রাজাকারদের বিচারের দাবিতে ঢাকার শাহবাগে যেভাবে জনতা এক একজন করে জড় হয়ে লাগাতার আন্দোলন গড়ে তুলেছিল ঠিক সেইভাবে তিন মাস পূর্বে কিছু মুসলিম নারী ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে শাহীনবাগে জড় হতে থাকেন। ১৪৪ ধারা জারি করে, সান্ধ্য আইন প্রয়োগ করেও যখন আন্দোলন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি তখন কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থক উগ্র হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদীরা রাস্তায় নেমে পুলিশের সমর্থনে আন্দোলনকারীদের নির্মমভাবে পেটাতে থাকে। পারস্পরিক দাঙ্গায় পিটিয়ে, পুলিশের গুলিতে ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ জন লোক মৃত্যুবরণ করেছেন। একজন গোয়েন্দা পুলিশও মারা গেছেন। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন শুধু অবৈধ মুসলমানদের বিরুদ্ধে হওয়ায় রাস্তায় আন্দোলনকারীদের বেশিরভাগ মুসলমান। মোদি সরকারের অভিমত হচ্ছে, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ—এই তিনটি পার্শ্ববর্তী দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান হওয়ায় ধর্মীয় কারণে এ দেশগুলোতে মুসলমানদের নির্যাতিত হওয়ার কোন কারণ নেই; তাই ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে এই দেশগুলো থেকে মুসলমানদের দেশত্যাগের যুক্তিসঙ্গত কারণও থাকতে পারে না—যে সব মুসলমান এ তিনটি দেশ থেকে ভারতে গেছে তারা মূলত কাজের সন্ধানে ভারতে অবৈধভাবে বসবাস করছে, এদের বৈধ করার দায়িত্ব ভারত সরকার নেবে না। ভারত সরকারের বিবৃতি অনুযায়ী প্রায় দুই কোটি বাংলাদেশি ভারতে অবৈধভাবে বসবাস করছে। সরকারের এমন মতের বিপক্ষের অভিমত হচ্ছে, ভারত এমন কোন সমৃদ্ধশালী ও উন্নত দেশ নয় যেখানে কাজের সন্ধানে মানুষ যাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হবে। তবে শুধু এ দেশগুলোর মানুষ নয়, ভারতের লোকেরাও ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি দিচ্ছে।

পুলিশের সহায়তায় সরকার সমর্থকগোষ্ঠীর সংঘবদ্ধ আক্রমণ, নির্যাতন, হত্যা, লুণ্ঠন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, অনেকে এ সংঘর্ষকে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নামে অভিহিত করেছে। আমাদের মতো অনুন্নত দেশে সরকার সমর্থকরা যখন বিরোধী পক্ষকে আক্রমণ করে তখন পুলিশ দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। ভারতেও তাই হচ্ছে। ১৯৪৬ ও ১৯৪৭ সনে অনেক পুলিশকে দাঙ্গা-উপদ্রুত এলাকায় হাসি-ঠাট্টায় মশগুল থাকতে দেখা গেছে, পুলিশদের এমন নির্মোহ ভাব দেখে জওহরলাল নেহেরু পুলিশের হাত থেকে লাঠি নিয়ে দাঙ্গাবাজদের পিটিয়েছেন। তবে এটা সত্য যে, ধর্মের নামে যখন মানুষ হত্যা করা হয় তখন হত্যাকারীর জোশ পুলিশের পক্ষে দমানোও কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের সংবিধান ‘ইসলাম’-কে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি দিলেও বর্তমান সরকার ধর্মনিরপেক্ষ আচরণ করছে, কোন উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সরকারের সমর্থন পায় না। তবে আওয়ামী লীগে যে প্রচুর হিন্দুবিদ্বেষী লোক রয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় আমাদের গ্রামের শেখ রাসেল স্মৃতি সংসদের সভাপতির ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে; তিনি লিখেছেন, ‘আগে ধর্ম, পরে দল’। এ একটি বাক্য অনেক আওয়ামী লীগারের চরিত্র ফুটিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। অন্যদিকে বিএনপি অনেকটা পাকিস্তান আমলের মুসলিম লীগের নীতি-আদর্শ পালন করে বলে মনে হয়। পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতাকর্মীরা রাতে জুয়ার আসরে মদ-মেয়ে নিয়ে মৌজ করে দিনে টুপি মাথায় নিয়ে মসজিদে নামাজ পড়তে যেত এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠায় জান-কোরবান ছিল। জাতীয় পার্টি সংবিধানে শুধু ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে ক্ষান্ত হয়নি, এই দলের সরকার রাস্তাঘাটের দেয়াল এমনকি ভিন্নধর্মাবলম্বীকেও মুসলিম স্থাপত্যের অনুসরণে তাদের বাড়ির দেয়াল নির্মাণে বাধ্য করেছিল। পাকিস্তানে ব্লাসফেমি আইনে অভিযুক্ত অধিকাংশের প্রাণ গেছে পুলিশের হাতে, ব্লাসফেমি আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে কথা বলায় পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসিরকে হত্যা করে তারই দেহরক্ষী; হত্যাকারীকে আদালতে আনা-নেয়ার সময় তার মাথায় পুষ্পবৃষ্টি হয়েছে। আফগানিস্তানের তালেবানেরা শরিয়া আইন প্রবর্তন ও পরিপালনে এককাট্টা—অন্য ধর্মাবলম্বীরা তাদের কাছে শুধু আমানত। অন্যদিকে বিজেপি সরকারের সমর্থক দল বজরং, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, শিবসেনা ইত্যাদি রাজনৈতিক দলগুলো ভারতকে রামরাজ্য করার অভিসন্ধি নিয়ে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। এরাই বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দিয়েছে, এরাই এখন দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের পেটাচ্ছে, মসজিদে হনুমানের ছবি সংবলিত পতাকা উড়াচ্ছে, আগুন দিচ্ছে।

উপাসনালয় ধ্বংস করে, আগুন দিয়ে অথবা ভিন্নধর্মাবলম্বীদের বিতাড়ন করে বর্তমান জগতে নিজ ধর্মের বিস্তার ঘটানো সম্ভব বলে মনে হয় না। ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধরা বিতাড়িত হওয়ার কারণে বৌদ্ধধর্ম এখন প্রাচ্যের অনেকগুলো দেশে বিরাজমান। বাহুবল ছাড়াও সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের আদর্শে ইসলামের প্রচার ও প্রসার হলেও এখন উগ্রপন্থিদের দাপটে সারা বিশ্বে ইসলাম মানেই আতঙ্ক, ভীতিজনক। বাবরের মতো এমন একজন নিরীহ সম্রাটের পক্ষে মন্দির ভেঙে মসজিদ করার কথা নয়; আওরঙ্গজেব হলে তবুও বিশ্বাস করা যেত। সব মুসলিম রাজা-বাদশাহ যদি মন্দিরের জায়গায় মসজিদ করত তাহলে ভারতবর্ষে একটি প্রাচীন মন্দিরও থাকার কথা নয়। ভারতের ২২ কোটি মুসলমানকে ধর্মান্তরিত করা বা বিতাড়ন করাও সম্ভব নয়। ইহুদি ছাড়া সম্ভবত আর কোন ধর্মই বিশ্বাস করে না যে, তাদের শুধু একটি পবিত্র ভূমি রয়েছে যেখানকার নাগরিক তাবৎ দুনিয়ার ইহুদি; এমনকি পৃথিবীর যেকোনো স্থানে তাদের কবর দেওয়া হোক না কেন তারা মাটির নিচে গড়াতে গড়াতে ইসরাইল এসে পৌঁছে। হিন্দুদেরও এমন একটি ধর্মীয় নীতি-আদর্শ আছে বলে আমার জানা নেই। আসলে উগ্র ধর্মান্ধরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংখ্যালঘুদের অত্যাচার করে অন্য দেশে তাদের স্বধর্মের সংখ্যালঘুদের বিপদে ফেলে দেয়। প্রায় প্রতিটি দেশে ধর্ম বিচারে সংখ্যাগরিষ্ঠরা নিজ দেশে নিজের ধর্ম প্রতিষ্ঠায় এককাট্টা হলেও অন্য দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রত্যাশা করে থাকে। ভারতের উগ্র হিন্দুরা ভারতকে রামরাজ্য বানাতে চাইলেও পার্শ্ববর্তী পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ হোক—এ প্রত্যাশা করে। বাংলাদেশের ধর্মান্ধরাও নিজ দেশে শরিয়াহ আইনের প্রবর্তন চাইলেও ভারত রামরাজ্য হোক তা চায় না। বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে হিন্দু-বৌদ্ধদের ওপর সংঘটিত দাঙ্গায় অনেক বাঙালি মুসলমানকে নিশ্চুপ থাকতে দেখা গেলেও দিল্লির দাঙ্গায় মুসলমানদের ওপর পরিচালিত অত্যাচার, নির্যাতনের কাহিনী প্রচারে তাদের বেশ সক্রিয় মনে হয়েছে। এই ভণ্ডামি সব ধর্মাবলম্বীর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।

সম্প্রদায়প্রীতি তখনই ধ্বংসাত্মক হয় যখন তা অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষের সৃষ্টি করে। যারা ধর্মের ধারও ধারে না তারাও নির্বাচন এলে ধর্ম ছাড়া কথা বলে না। দিল্লির এই দাঙ্গার কিছুদিন পূর্বে দিল্লির বিধানসভার নির্বাচন সম্পন্ন হয়। নির্বাচনের পূর্বে বিজেপি ধর্মান্ধ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে যথারীতি দিল্লিতে নাগরিকপঞ্জি (NRC) করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল। শাহীনবাগে গণজমায়েতের উদাহরণ ও বিবরণ দিয়ে বিজেপি দিল্লির বিধানসভার নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরুদের উত্তেজিত করে ভোটের ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কাজ হয়নি, ৭০টি আসনের মধ্যে মাত্র ৭টি আসন বিজেপি পায়। নিজেদের ধর্মপ্রাণ ঘোষণা করে বিপক্ষ দলের লোকদের বিধর্মী বা বিপক্ষ লোকদের হাতে ধর্ম নিরাপদ নয় মর্মে প্রচার করার সংস্কৃতি আমাদের দেশেও নির্বাচনকালীন পরিলক্ষিত হয়। নির্বাচনে আমাদের দেশে আরেকটি ট্রাম্পকার্ড হচ্ছে, ভারতের কাছে বাংলাদেশ বিক্রি করে দেওয়া হবে মর্মে জিগির তোলা। এটা ১৯৪৭ সন থেকেই শুরু হয়েছে—সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা কাউকে এই অপবাদ থেকে মুসলিম লীগ বাদ দেয়নি। ভারতের নির্বাচন এলেও বিজেপি অবৈধ মুসলমান তাড়ানোর জজবা তোলে এবং এতে ধর্মান্ধ হিন্দুরা খুশি হয়।

সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে দূষিত সমাজেও প্রচুর লোক আছেন যারা দাঙ্গার সময় হিন্দু চিনে না, মুসলমান চিনে না, বৌদ্ধ চিনে না, খ্রিস্টান চিনে না—চিনে শুধু মানুষ। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী যখন আওয়ামী লীগে যোগ দেন তখন একটি কথা বাতাসে ভেসে বেড়িয়েছে যে, সরকার আর সমাজের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার, বিবৃতি দেওয়ার লোকও দিন দিন কমে যাচ্ছে। ১৯৪৬ এবং ১৯৪৭ সনেও আমার বাবা তার বন্ধু-বান্ধব নিয়ে হিন্দুদের পাহারা দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। এমন অবস্থা সম্প্রতি দিল্লিতে পরিলক্ষিত হয়েছে। হিন্দুরা হাতে হাত ধরে বেড়া তৈরি করে মুসলমানদের জুমার নামাজ পড়তে সাহস জুগিয়েছেন। গোলযোগের আশঙ্কা দেখে একই পাড়ার একই গলিতে আজিজিয়া মসজিদ রক্ষায় নেমে এসেছেন হিন্দুরা, আর হিন্দুদের হনুমান মন্দির রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন মুসলমান। এক মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় সাবিত্রী নামে এক হিন্দু মেয়ের বিয়ে দাঙ্গার জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, ওই এলাকার মুসলমানরা সংঘবদ্ধ হয়ে নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে সাবিত্রীর বিয়ের ব্যবস্থা করে। মুসলিম মহিলারা যে নীরব আন্দোলনের সূচনা করে তাতে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন বয়সের লোকজন শাহীনবাগে এসে সংহতি প্রকাশ করেছে, গান গেয়েছে, কবিতা আবৃত্তি করেছে। শাহিনবাগে মুসলিম-অমুসলিম সকলের সহাবস্থান আন্দোলনকে বেগবান করেছে, আন্দোলনের শক্তিকে সুদৃঢ় করেছে। পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জি তো অবিরত মোদি সরকারের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বলে যাচ্ছেন। দিল্লির সহিংস ঘটনার প্রতিবাদে কংগ্রেস ও পশ্চিমবঙ্গের ১৭টি বাম দল এক বিরাট মিছিল বের করেছে। একই বিষয় নিয়ে সংসদে সরকারি পক্ষ ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ছাড়াও ধাক্কাধাক্কি হয়েছে। দিল্লির হাইকোর্টের বিচারক মুরলিধর মধ্যরাতে তার নিজ গৃহে আদালত বসিয়ে বিজেপি’র যে সব নেতা ঘৃণা ছড়াচ্ছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। উন্মত্ত সন্ত্রাসী হিন্দুদের সহিংস কর্মকাণ্ড থেকে এক মুসলিম পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে এক সাহসী হিন্দু যুবক মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন।

শুধু ভারত কেন, অবৈধ লোকদের কোন দেশই পছন্দ করে না; মুসলিম দেশ মালয়েশিয়া কতবার আমাদের দেশের শ্রমিকদের অবৈধ বলে মালয়েশিয়া থেকে বের করে দিয়েছে। অবৈধ বাঙালির অবস্থান থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মুসলিম দেশ তো বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। পৃথিবীর সব দেশই বিনা ভিসায় অবস্থানকারীদের জোর করে বের করে দেয়, মুসলিম দেশগুলোরও এক্ষেত্রে কোন মুসলিমপ্রীতি নেই। সম্ভবত একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেউ একবার প্রবেশ করতে পারলে অপরাধ না করা পর্যন্ত তাকে বের করে দেওয়া হয় না। ভারতও তাই করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তো বলেই চলেছেন যে, প্রতিটি অবৈধ লোককে খুঁজে খুঁজে বের করা হবে এবং ভারত থেকে বিতাড়ন করা হবে। শুধু ধর্মান্ধ হিন্দুরা নয়, বেকার যুবকেরাও এই নীতিতে বিজেপির সমর্থক; বেকার যুবকদের বোঝানো হচ্ছে যে, এই অবৈধ লোকগুলোকে বিতাড়ন করা সম্ভব হলে তারা চাকরি পাবে। তবে ভারতের কথিত অবৈধ মুসলমানেরা সত্যি সত্যি পার্শ্ববর্তী মুসলিম দেশগুলো থেকে গিয়েছে কিনা, গেলেও কত বছর পূর্বে গিয়েছিল তার সঠিক তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। সরকারের কথা অনুযায়ী এদের নাগরিকত্ব প্রমাণের কোন কাগজপত্র নেই, এদের অধিকাংশ বস্তিতে বসবাস করেন এবং কয়েকটি বস্তির নামকরণ করা হয়েছে বাংলাদেশের নামে। এদের নিশ্চয়ই ভোটারও করা হয় না, যেমন বাংলাদেশের জেনেভা ক্যাম্প বস্তিতে বিহারীদের ভোটার করা হয় না। নরেন্দ্র মোদির নাগরিকত্ব প্রমাণের কাগজপত্র চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে শুভঙ্কর সরকার আবেদন করেন, তাকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, মোদি জন্মসূত্রে ভারতের নাগরিক বিধায় তার নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য কোন কাগজপত্রের প্রয়োজন নেই। মোদি সরকার যাদের অবৈধ বলছেন তাদেরও অনেকে জন্মগ্রহণ করেছেন ভারতের মাটিতে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নাগরিক হওয়ার জন্য মুখের কথায় জন্মসূত্র প্রমাণিত হলে অন্যদের বেলায় দলিলপত্র লাগার কথা নয়।

মুজিব জন্মশতবর্ষ উদ্যাপনে নরেন্দ্র মোদিকে বহু পূর্বে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে এবং তিনি তা গ্রহণও করেছেন। মুজিব জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন হলে মোদির দাওয়াত ফেরত নেয়ার বিষয়টি শিষ্টাচারবহির্ভূত হবে। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর যখন আক্রমণ হয়েছে তখন কিন্তু ভারতের লোকেরা বলে ওঠেনি যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতে যেতে পারবে না। চীনের উইঘুর মুসলমানদের ওপর নির্যাতন হলেও পাকিস্তান কিন্তু সেই নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেনি, কারণ চীনের বন্ধুত্ব পাকিস্তানের কাছে মুখ্য। মোদির বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বিএনপিও খুশি হয়েছিল। রাজনীতি আর কূটনীতি এক কথা নয়, পৃথিবীতে অনুসৃত কূটনৈতিক রীতিনীতির অনুসরণ করতে গিয়ে শত্রুর সঙ্গেও কখনও কখনও মুখে হাসি রেখে কথা বলতে হয়, ছবি তুলতে হয়। কূটনীতি বড় নিষ্ঠুর, ইয়েমেনে বোমা মেরে মুসলিম হত্যা করে মুসলমানদের চিরশত্রু ইসরাইলকে বুকে টেনে নিচ্ছে সৌদি আরব। তাই মোদির আসা নিয়ে যারা বিরোধিতা করছেন তারা আবেগতাড়িত। তবে হিন্দু হোক বা মুসলিম হোক—ধর্মীয় উগ্রতাকে রুখতে না পারলে মানবজাতির জন্য বিপদ। হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, মসজিদ ভাঙে ধার্মিকেরা, মন্দিরও ভাঙে ধার্মিকেরাই—তারপরও তারা ধার্মিক, কোন অধার্মিক মসজিদ, মন্দির কোনটাই ভাঙতে যায় না। তাই পৃথিবীর সর্বত্র মানবতার বিরুদ্ধে অত্যাচার, নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে হবে, তবে তা ধর্মের নিরিখে নয়।