নরসিংদী জেলার যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়া ও তার স্বামী সুমনকে মাদকব্যবসা, পাঁচতারা হোটেলে তরুণীদের দিয়ে দেহব্যবসা করানো, অবৈধ অস্ত্র, বৈদেশিক মুদ্রা ও মদের বোতল রাখার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। উল্লেখিত কাজগুলো শুধু পাপিয়া করছে না, অনেকেই করছে। দেহব্যবসা বাংলাদেশে অবৈধ নয়—এর জন্য শুধু অনুমোদন প্রয়োজন। কিছু বিকারগ্রস্ত
লোক অনুমোদিত সেক্সওয়ার্কারদের তাদের আস্তানা থেকে পিটিয়ে উচ্ছেদ করায় এখন এদের অনেকে না খেয়ে মরছেন, অনেকে বিভিন্ন হোটেলে পাপিয়াদের সহায়তায় দেহ বিক্রি করে জীবনধারণ করছেন। অনুমোদন নিয়ে অস্ত্র রাখছে বহু ব্যক্তি। পৃথিবীর বহু দেশে অস্ত্র রাখার জন্য লাইসেন্সেরও প্রয়োজন হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অস্ত্র সংগ্রহ করা এত সহজ যে, প্রায় প্রতিদিন ওখানে মাথা পাগলা কিছু লোক গুলি করে নিরপরাধ কিছু লোককে মেরে ফেলে। ওখানকার অস্ত্র ব্যবসায়ীরা এত শক্তিশালী যে, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে নিরপরাধ লোক মারা গেলেও সরকার অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কোন পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এছাড়া ওখানকার লোক নিজের কাছে অস্ত্র রাখার পক্ষপাতী। পাপিয়ার রাখা অস্ত্রের লাইসেন্স আছে, কি নেই তা পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়নি। তার হাতে একটি বিরাট লাঠি দেখেছি, লাঠি ক্ষমতার প্রতীক। এই লাঠি নাকি অবাধ্য মেয়েদের শায়েস্তা করতে কাজে লাগাত। পাপিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, তিনি একটি পাঁচতারা হোটেলের একটি বার বুক করতেন এবং সেখানে শুধু তার লোক আনন্দ, বিনোদন করত। এমন বুকিং পৃথিবীর বহু ধনী লোক করে থাকেন—মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাজকুমার পাশ্চাত্যের নামীদামি হোটেল পুরোটাই ভাড়া নিয়ে নেন, শত শত কক্ষ খালি থাকলেও ঐ হোটেলে আর কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। সৌদি আরবের এক রাজকুমার চল্লিশ হাজার ডলার দিয়ে ফ্রান্স থেকে একটি ছোট সুগন্ধির শিশি কিনে পত্রিকার হেডলাইনে এসেছিলেন। বিল গেটসও খরচ করেন, তিনি তার সন্তানের বিয়েতে সত্তর মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিলেন; এই অর্থ খরচ করে তার উপলব্ধি হলো যে, তার অর্থের উপর পৃথিবীর নিঃস্ব শিশুদেরও অধিকার রয়েছে। এই উপলব্ধি থেকে নিয়ে তিনি সমপরিমাণ অর্থ সত্তর মিলিয়ন ডলার বিশ্বের নিঃস্ব শিশুদের জন্য ইউনিসেফ-কে দান করেন। এই তথ্যটি আমি পেয়েছি আমার মেজ ভাই জনাব মহিউদ্দিন আহমেদের কলাম থেকে। অন্যদিকে জুয়া খেলায় উপার্জিত আওয়ামী লীগের একটি ওয়ার্ডের নেতার বাসায় কোটি কোটি টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। জুয়া খেলাও বেশিরভাগ দেশে আইনসিদ্ধ। পৃথিবীতে যাদের টাকা আছে তারা জীবনকে উপভোগ করার জন্য টাকা খরচ করতে দ্বিধা করে না। জাপানের কিছু লোক নিজস্ব বিমানে প্রতিদিন মালয়েশিয়া আসে লন টেনিস ও জুয়া খেলার জন্য, সারাদিন খেলে বিকালে আবার জাপানে ফেরত যায়। আমাদের দেশের আদালত অতি সম্প্রতি জুয়া খেলা বেআইনী বলে ঘোষণা করেছে।
পাপিয়ার বিপদ হচ্ছে, তিনি আমাদের মতো সাধারণ লোক নন, তিনি একজন রাজনৈতিক নেতা, একটি জেলার মহিলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি রাজনীতির এই পদটিকে পুঁজি করে অপরাধগুলো করেছেন। আমাদের সমাজে কিছু বিকৃত রুচির লোক আছেন যারা সৌন্দর্যের পূজারি নন, পদ ও মান-মর্যাদার পূজারি; পাপিয়া দেখতে সুন্দরী বলে মনে হয়নি, কিন্তু পদমর্যাদায় তার একটি চাহিদা রয়েছে। কিছু লোক অঢেল টাকা খরচ করে নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা বা খ্যাতিমান নারীদের সঙ্গ পছন্দ করেন। মডেল ক্রিস্টিন কিলারের শয্যাসঙ্গী হওয়ার কারণে ব্রিটিশ যুদ্ধমন্ত্রী জন প্রফুমোকে পদত্যাগ করতে হয়েছিলো। ক্রিস্টিন কিলার একই সময় সোভিয়েত এক গুপ্তচরের সাথেও প্রেমলীলায় মত্ত ছিলেন, ফলে ক্রিস্টিনের বিরুদ্ধে ব্রিটেন থেকে তথ্য পাচারের অভিযোগও উত্থাপিত হতে থাকে। আদালতে ক্রিস্টিন স্বীকার করেন যে, অর্থের বিনিময়ে তিনি প্রফুমোর শয্যাসঙ্গী হয়েছিলেন এবং প্রফুমো থেকে প্রাপ্ত অর্থের কিছু অংশ স্টিফেন ওয়ার্ডও পেয়েছেন। নারী সরবরাহের অভিযোগে জর্জরিত অস্থিবিশেষজ্ঞ ও নৃত্যশিল্পী স্টিফেন ওয়ার্ডকেও শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী হতে হয়েছিলো। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানও এই মডেল ক্রিস্টিন কিলারের সাথে সুইমিং পুলে সাঁতার কেটে সংবাদের শিরোনামে উঠে এসেছিলেন। গায়িকা নুরজাহানের সাথেও আইয়ুব খানের একটি সম্পর্ক ছিলো বলে অনুমান করা হয়। তবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে নুরজাহানের দহরম মহরম নিয়ে অনেক মুখরোচক কাহিনী রয়েছে; নুরজাহানের একটি গানের বিনিময়ে ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান বিক্রি করে দিতেও সম্মত ছিলেন বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিলো। হাফ ডজন স্বামীপরিত্যক্তা, লাবণ্যহীন, মধ্যবয়স্কা নুরজাহানের সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য ইয়াহিয়া খান উতলা হয়ে পড়েছিলেন। একাত্তরের যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট চেয়ারে বসেই সারাদিন মদে বুঁদ হয়ে থাকতেন। অন্যদিকে নারীসঙ্গ নিয়ে পাঁচশত রমণীর একটি দীর্ঘ তালিকাও এই কমিশন তৈরি করেছিলো, যাদের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছেন, জেনারেল কুইন নামে খ্যাত আকলিমা আক্তার, গায়িকা নুরজাহান, তৎকালীন পাকিস্তানের ইনস্পেক্টর জেনারেল অব পুলিশের পত্নী বেগম শামীম, অভিনেত্রী শবনম, সাগুফতা। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উপর প্রভাব খাটানোর ক্ষেত্রে আকলিমা ছিলেন সর্বসেরা, এই বিশেষ ক্ষমতার জন্য তাকে ‘জেনারেল কুইন’ নামে ডাকা হতো। এই আকলিমা আক্তারই নুরজাহানকে ইয়াহিয়া খানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। জিনাত মোশাররফের সাথে চৌদ্দ বছরের সম্পর্ক থাকার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে জিনাতের স্বামীকে লজ্জায় ফেললেও প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ কিন্তু লজ্জা পাননি। ক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করে ক্ষমতাবান ও সম্পদশালী হওয়ার বাসনার অবসায়ন সহজ নয় এবং ক্ষমতার অনুগ্রহ লাভে লালায়িত লোকদের কাবু করতে পাপিয়াদের অবলম্বিত কাজটিও নতুন নয়।
পাপিয়ার সাথে আওয়ামী লীগের অনেক কেন্দ্রীয় নেতার ছবি রয়েছে এবং ছবি থাকাটা স্বাভাবিকও। একজন জেলা পর্যায়ের নেতার সাথে কেন্দ্রীয় নেতাদের সুসম্পর্ক থাকাটাই অধিকতর গ্রহণযোগ্য। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে ঘেঁষার কোন উপায় থাকে না। কিছু লোক এই নেতাদের ঢাকা শহর ও ঢাকা শহরের বাইরে সর্বত্র ঢেকে রাখে, ঢাকা বাইরে নেতাদের আগমনেও স্থানীয় নেতা বা কর্মীরা ভিড়তে পারে না। স্থানীয় পর্যায়ে গেলেও কেন্দ্রীয় নেতাদের আচরণ আমলাদের চেয়েও খারাপ, রাজা-মহারাজার হাবভাব নিয়ে চলাফেরা করেন। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে কেন্দ্রীয় নেতার আগমনে ফটো সেশনে অংশগ্রহণ করা ছাড়া স্থানীয় নেতা-কর্মীদের আর কোন ভূমিকা থাকে না। স্থানীয় পর্যায়ে গিয়েও কেন্দ্রীয় নেতারা সফরসঙ্গী ঢাকার নেতা বা স্থানীয় পর্যায়ের দুয়েকজন নেতার সাথে সর্বদা হাসি, ঠাট্টায় মশগুল থাকেন, স্থানীয় সাধারণ নেতা-কর্মীর সাথে পরিচিত হওয়ার কোন তাগিদই অনুভব করেন না। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় নেতার সাথে একটি ছবি তোলে পরিবার ও সমাজে তার গুরুত্ব বাড়ানোর আগ্রহ থাকাটা কর্মীর অপরাধ নয়। তবে ফেসবুকে নেতার সাথে ছবি দিয়ে কর্মীরা যেভাবে নেতাদের গুণকীর্তন করে থাকে তাতে মনে হয় রাজনীতি ধর্মীয় গুরুতত্ত্ববাদে পর্যবসিত হয়েছে। পীর আর মুরিদের এমন সম্পর্ক না ভাঙ্গলে রাজনীতি কলুষিত হতেই থাকবে। অবশ্য কর্মীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, দলীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় নেতারাও ছবি তোলার সময় ঠেলাঠেলি করেন। বঙ্গবন্ধু এবং জিয়াউর রহমানের মাজারে মোনাজাতের সময় কেন্দ্রীয় নেতাদের ধাক্কাধাক্কিতে মোনাজাতের হাত ছুটে যায়।
বঙ্গবন্ধুর মতো আজকালকার কোন নেতা গ্রামের দশজন কর্মীর নাম একনাগাড়ে বলতে পারবেন বলে মনে হয় না, কারণ নেতাদের মোবাইলে হয়তো কর্মীর চেয়ে বান্ধবীদের নামের তালিকা বেশী।
আওয়ামী লীগ বেঁচে আছে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা আর নৌকার বদৌলতে, এই দলের কোন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আছে বলে সাধারণ জনগণের কাছে দৃশ্যমান নয়। স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ—এসব সংগঠনের নেতাদের কার্যক্রম ঢাকাকেন্দ্রিক। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বা সাংগঠনিক সম্পাদকেরা কি কখনো গ্রামে গ্রামে গিয়ে সাধারণ কর্মীদের সাথে বসে চিড়া-মুড়ি খেয়েছেন? অথবা নির্দিষ্ট এলাকার কর্মীদের ঢাকায় ডেকে এনে একটা দিন পিকনিকের মতো হৈহুল্লোড় করেছেন? করেননি, করার জ্ঞান বা মানসিকতা কোনটাই নেই। তাই এই দলের সাধারণ সম্পাদককে বলতে শোনা যায়, ‘পাপিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে’। আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন তিনি ছাত্রলীগের নেতা, পরবর্তীতে আমরা তার লেখা বহু কলাম পত্রিকায় পড়েছি। তাই তার জ্ঞান-গরিমা নিয়ে আমাদের কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু পাপিয়াকে গ্রেফতার করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কেন লাগবে তা সাধারণ জনগণের বোধগম্য নয়। এছাড়াও দলের কোন নেতাকে গ্রেফতার করার আগে কেন্দ্রীয় নেতারা অন্ধকারে কেন থাকেন তাও বোধগম্য নয়। তাৎক্ষণিক উত্তেজনাবশে অপরাধ করে গ্রেফতার হলে কেন্দ্রীয় নেতাদের জানার উপায় থাকে না, কিন্তু যে নেতা দিনের পর দিন অপরাধ করে করে অভ্যস্ত তার সম্পর্কে কিছু না জানাটা কেন্দ্রীয় নেতাদের অপরাধ। কেন সম্রাটকে গ্রেফতার হতে হলো, কেন পাপিয়ার জন্য আওয়ামী লীগ বদনামের ভাগীদার হচ্ছে? এদের কি প্রাথমিক পর্যায়ে থামানো যেত না? সংশ্লিষ্ট সংগঠনের
সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বা সাংগঠনিক নেতাদের কাজটা কী? পুলিশের মতো অপরাধ ও অপরাধী খোঁজা তো কেন্দ্রীয় নেতার কাজ নয়। প্রকাশ্যে আসার আগেই নেতা-কর্মী সম্পর্কে জানতে হবে, গোপনে পরিশুদ্ধ করতে হবে। রাজনীতি থেকে নেতাদের বুজুর্গ ভাব না গেলে, অসুস্থ রাজনীতি বন্ধ না হলে সম্রাট আর পাপিয়াকে গ্রেফতার করে এদের জন্ম রোধ করা যাবে না। সময়মতো অপরাধ রোধ করা সম্ভব হলে সম্রাট আওয়ামী লীগের জন্য সম্পদ হতে পারতো।
মুখরোচক অপকর্মের অবতারণা করে আওয়ামী লীগ তাদের গভীর সংকট মোকাবিলা করে থাকে মর্মে
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বক্তব্য অপরাধী ধরায় আওয়ামী লীগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। একজন পাপিয়া যদি আওয়ামী লীগের সংকট তিরোহিত করতে পারে তাহলে এদের লালন-পালন করে বলি দেওয়ার খেলা অনন্তকাল চলতে থাকবে।
ভাগ্য ভালো যে, পাপিয়ার অপরাধ নিয়ে বিএনপি আওয়ামী লীগকে এখনো সরাসরি আক্রমণ করেনি, বুদ্ধিমানের কাজ। কিছু কিছু কাজে দল বা আদর্শ বিচার্য নয়। ভারতকে গালাগাল দিয়ে বিএনপি এবং জামায়াতের লোক কিন্তু চিকিৎসার জন্য ভারত যাওয়া বন্ধ করেনি, এদের ব্যবসায়ীরা কিন্তু ভারতের সাথে আমদানি-রপ্তানির ইতি টানেনি, ভারতকে গালাগাল করেই এই দুই দলের কর্মী, সমর্থকেরা ভারতের সাথে চোরাচালান চালিয়ে যাচ্ছে। যৌনকর্মেও স্থান, জাত, ধর্ম মানে না, মধ্যপ্রাচ্যের যুবরাজেরা বোম্বের নায়িকা আর ইহুদি-নাসারা সুন্দরী রমণীদের শয্যাসঙ্গী হতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে একটুও কার্পণ্য করেন না। তাই পাপিয়ার সাথে কোন্ দলের কোন্ নেতার অন্তরঙ্গ ছবি আছে এখনো তা কেউ জানে না। এছাড়া সব রাজনৈতিক দলেই পাপিয়ারা আছেন। তাই এসব ব্যাপারে চুপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
পাপিয়াকে গ্রেফতারের পরপর তার স্বামীর কুকীর্তির তালিকা পত্রিকায় একের পর এক প্রকাশিত হচ্ছে। সাংবাদিকদের মতো পুলিশও কাউকে গ্রেফতার করে তার অতীত অপরাধের ফিরিস্তি প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু এদের অপরাধ প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত হলে অপরাধের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হতো। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ তার শাসনের প্রথমদিকে কিছু আর্মি জেনারেলকে অপরাধ করার সুযোগ করে দিয়ে তার অপরাধের খতিয়ান নথিভুক্ত করে রাখতেন, কেউ মাথাচাড়া দিলে ডেকে এনে তার অপরাধের খতিয়ান পড়তে দিতেন। পাপিয়া বা সম্রাটেরা এমন কোন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নন, তাদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলেই তারা অপরাধগুলো করার সাহস পেয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাজে সব লোকের সব কাজ গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের সমাজে ঘুষ খাওয়া যায়, দুর্নীতি করা যায়, কাজে ফাঁকি দেওয়া যায়, মিথ্যে বলা যায়, কিন্তু ড্রিঙ্ক করা অপরাধ, সম্মতি থাকলেও অন্য প্রাপ্তবয়স্কা নারীর সাথে যৌনকর্ম করা যায় না। ড্রিঙ্ক করা বা যৌনকর্মের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হলে অনেক লোক লজ্জায় আত্মহত্যার কথা ভাবতে থাকে। এই সুযোগটি নিয়ে পাপিয়ারা রোজগার করার মওকা পেয়ে যায়, ব্ল্যাকমেইল করে সম্পদ হাতিয়ে নেয়। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, যে সব দেশে প্রাপ্তবয়স্ক নরনারীর সম্মতিতে যৌনকর্ম স্বীকৃত সেইসব দেশেও রাজনীতিবিদদের বিবাহবহির্ভূত যৌনকর্মকে সমাজ মেনে নেয় না। মনিকা লিউনস্কির সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের পরকীয়া প্রেম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ মেনে নেয়নি; বউ হিলারি ক্লিনটনের সমর্থন থাকায় বিল ক্লিনটনকে সাহসের সাথে এই পরকীয়া প্রেমের মোকাবিলা করতে পেরেছিলেন। তবে এমন একটি প্রেম-পীরিতির ঘটনা স্বীকার করে কীভাবে তার মেয়ের সম্মুখে দাঁড়াবেন সেই লজ্জায় বিল ক্লিনটনও ম্রিয়মাণ ছিলেন। আমাদের সমাজে অনেকে ঘুষ খেয়ে, দুর্নীতি করে প্রচুর ধন, সম্পদের মালিক হয়ে দুহাতে যাকাত দেন, মসজিদ গড়ে তোলেন, এতিমখানায় মিলাদের আয়োজন করেন, মাদ্রাসার পৃষ্ঠপোষক বনে যান—কেউ এসব দান, অনুদান নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। এরা কি পাপিয়ার চেয়ে ভালো? এদের রোজগার কি পাপিয়ার রোজগারের চেয়ে উত্তম? অনেক ঘুষখোরও পাপিয়ার সমালোচনা করে, দায়িত্বে ফাঁকি দেওয়া লোকগুলোও পাপিয়াকে ছি ছি করে। আমরা অনেকে সৎ নই, কোন না কোনভাবে অপরাধ করে যাচ্ছি, কিন্তু অন্যের অপরাধের যখন সমালোচনা করি তখন নিজের অপরাধের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করে নিরপরাধী সাজি।