দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আজকের (রোববার, 29 ডিসেম্বর ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।
ভারতের সাম্প্রদায়িক পদক্ষেপ
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল তাদের লোকসভা ও রাজ্যসভায় পাস হওয়ার পর প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরও হয়ে গেছে। ১৯৫৫ সনে প্রণীত নাগরিকত্ব আইন এ পর্যন্ত সাতবার সংশোধন করা হলো। সর্বশেষ সংশোধনীতে আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে নিপীড়িত হয়ে ভারতে আসতে বাধ্য হয়েছে এমন সংখ্যালঘু হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী অবৈধ অভিবাসীদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর মতে, মুসলিম-অধ্যুষিত এ তিনটি দেশ ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ হওয়ায় হিন্দুসহ ভিন্নধর্মাবলম্বী সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের কারণে এ সম্প্রদায়ের লোকগুলোকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ইসলামিক রাষ্ট্রে মুসলমানদের নিপীড়িত হওয়ার কোন কারণ না থাকায় তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচিত হয়নি। তার মতে, যে সব মুসলমান ভারতে অবৈধভাবে বসবাস করছে তারা ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে আসেনি, এসেছে চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের খোঁজে; ব্যবসা-বাণিজ্যের নিমিত্তে আসা অবৈধ লোকদের বৈধ করার দায় ও দায়িত্ব ভারত সরকারের নয় বলেও অমিত শাহ উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতকে ভাগ করে কংগ্রেস যে ভুল করেছিল সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে তাদের দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে এ আইন প্রণয়ন করতে হয়েছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ভারতে গিয়ে বসবাস করার জন্য এ আইন দ্বারা মোদি সরকার হিন্দুদের প্রলুব্ধ করছে, কিন্তু আশঙ্কাটি সঠিক নয়। কারণ এখন ইচ্ছে করলেও এ তিন দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক ভারতে পাড়ি দিয়ে ভারতের নাগরিকত্ব পাবে না। ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪ সনের আগে উক্ত ছয় সম্প্রদায়ের লোক ভারতে প্রবেশ করে থাকলেই শুধু ভারতের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবে। আইনের মাধ্যমে মোদি সরকার বোঝাতে চাচ্ছে যে, ইসরাইল যেমন ইহুদিদের জন্য, ঠিক তেমনি ভারত হিন্দুদের জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
নাগরিকত্ব দিতে গিয়ে ভারত যেসব বক্তব্য দিয়েছে তা আপত্তিজনক। কারণ যাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হচ্ছে তারা নাকি উক্ত তিনটি দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের হাতে নির্যাতনের শিকার। তাই এ আইনটি আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জন্য অপমানজনকও। এই আইন প্রণয়ন করতে গিয়ে অমিত শাহ উল্লেখ করেছেন যে, এ তিনটি দেশ সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন করে থাকে এবং নিপীড়ন, নির্যাতনের জন্যই সংখ্যালঘুরা নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করে একটি ভিন্ন রাজ্য ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু তার বক্তব্য সম্পূর্ণ সত্য বলে মনে হয় না।
ভারত যদি নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের প্রতি এত দরদি হতো তাহলে তারা অন্যান্য প্রতিবেশী দেশে নিপীড়িত লোকদের কথাও ভাবত। পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, চীনেও সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন, নির্যাতন হয়েছে, হচ্ছে। হিন্দু ও মুসলিম রোহিঙ্গারা মায়ানমার সেনাদের অমানুষিক নির্যাতনে বাংলাদেশ আর ভারতে আশ্রয় নিলেও তাদের ভারতের নাগরিক করা তো দূরের কথা আশ্রয় দিতেও মোদি সরকার সম্মত নয়। তামিল টাইগারদের নিশ্চিহ্ন করার সময় শ্রীলঙ্কা থেকে বিতাড়িত তামিল উদ্বাস্তুুদের ভারতে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হলেও তাদের নাগরিকত্ব প্রদানের কথা নাগরিক সংশোধনী আইনে নেই। পাকিস্তানে আহমেদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়েছে এবং তারা পাকিস্তানে নির্যাতিত সম্প্রদায়—এ নির্যাতিত সম্প্রদায়কে আশ্রয় বা নাগরিকত্ব দেওয়ার কথাও সংশোধনী আইনে নেই। নেপাল এবং ভুটানের সংখ্যালঘুদের ব্যাপারেও এই আইনে কিছু বলা হয়নি। তিব্বতের বৌদ্ধ উদ্বাস্তু নিয়ে কোন কথাই এ আইনে নেই।
যে ছয়টি ধর্মের মানুষকে ভারতের নাগরিকত্ব লাভে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সেই ছয়টি ধর্মের মধ্যে চারটি ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে ভারতে। ভারত বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টানদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি কেন বিবেচনা করলো তাও স্পষ্ট নয়; কারণ ভারত বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান অধ্যুষিত দেশ নয়। বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টানেরা কোন ইসলামিক রাষ্ট্রে নির্যাতিত হলে সহজেই তারা যে কোন বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান অধ্যুষিত দেশে আশ্রয় নেয়ার সুযোগ পাবে। এই দরদটা মুসলমানদেরসহ দেখানো হলে আন্দোলন, বিক্ষোভ কিছু হতো বলে মনে হয় না। অন্য ধর্মাবলম্বী জৈন, পারসি, শিখদের ধর্মীয় পরিচয়ে আলাদা কোন দেশ না থাকায় তাদের প্রতিও ভারতের দরদ অকৃত্রিম বলে মনে হয় না; কারণ ভারতে সংখ্যালঘুরা যে খুব নিরাপদে আছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি ভারতে হলেও অশোকের পরে ভারতবর্ষের অধিকাংশ শাসকরাই হিন্দুত্বকে আনুকূল্য দেখানোর পাশাপাশি বৌদ্ধদের প্রতি ছিলেন বৈরী—আর এ কারণেই ভারতবর্ষে বৌদ্ধদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। পাকিস্তান আর আফগানিস্তানে বৌদ্ধধর্ম ষষ্ঠ শতকে শ্বেতাঙ্গ হুনদের দখল অভিযানে নির্মূল হয়ে যায়। এছাড়াও সেন আমল, তুর্কী শাসনামল ও পরবর্তীতে সুলতানী আমলে এ দেশে বৌদ্ধদের বিনাশপর্ব চলতে থাকে। এভাবে একসময় পুরো ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্ত হয়ে পড়ে। এমনকি হিন্দুদের অন্ত্যজ শ্রেণীও ভারতে মাঝে মাঝে নিগৃহীত হয়ে থাকে। অবহেলিত মেথরদের মহাত্মা গান্ধী ‘হরিজন’ বলে ভারতীয় সমাজের মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। কামার, কুমার, চামার, তাঁতি, কৃষক প্রভৃতি পেশাজীবীদের ইংরেজেরা ‘তফসিলি জাতি’ অভিধায় রক্ষা করতে চেয়েছিল। শূদ্ররা বেদ পড়ার অধিকারী ছিল না। ভারতের নির্যাতিত ও পিছিয়ে পড়া অস্পৃশ্য জাতিগোষ্ঠীরা সাধারণভাবে ‘দলিত’ নামে পরিচিত; দলিতরা নানা দিক দিয়ে ভারতে উচ্চবর্ণের মানুষের শোষণ, অত্যাচার ও বৈষম্যের শিকার।
আসামে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস হলো। কিন্তু এ দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী প্রতিপন্ন হচ্ছে। আসামে সম্পাদিত নাগরিক নিবন্ধনে লাখ লাখ হিন্দুকে নাগরিক হিসেবে স্বীকার করা হয়নি, অথচ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে তাদেরই আবার নাগরিক করা হচ্ছে। অদ্ভুত সরকারের অদ্ভুত নীতি—এক নীতিতে হিন্দুদের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করা হয়, আবার অন্য নীতিতে তাদেরই নাগরিক হিসেবে বরণ করা হয়। আসামের নাগরিক নিবন্ধনে লাখ লাখ হিন্দু বাদ যাবে এমন চিন্তা মোদি সরকারের কল্পনাও ছিল না। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে হিন্দুরা না থাকলে ভোটের সংখ্যা কমে যায় বলে নাগরিক নিবন্ধন আইনে বাদ দিয়ে নাগরিক সংশোধনী আইনে তাদের বৈধ করা হচ্ছে। কিন্তু আসামের নিবন্ধন বা তালিকাবহির্ভূত বাঙালি মুসলমানের কোন গতি হচ্ছে না। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল মন্ত্রিসভায় অনুমোদন ও লোকসভায় উত্থাপনের পর থেকেই বিভিন্ন তরফ থেকে সমালোচনা শুরু হয়। কারণ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য এই যে, সংবিধান অনুযায়ী ভারত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, সেখানে বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষজনকে বিশেষ সুবিধাদান ধর্মভিত্তিক বিভাজনকে উৎসাহ দেয় এবং তা সংবিধানের উদ্দেশ্য পরিপন্থি। এ আইন মুসলিমদের প্রতি শুধু বৈষম্যমূলক নয়, সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থিও।
আমি মনে করি মোদি সরকারের এই প্রণয়নের আইনগত অধিকার রয়েছে। গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দল নিজেদের উদ্দেশ্য-আদর্শ, মিশন-ভিশন নিয়ে ইস্তেহার প্রকাশ ও প্রচার করে থাকে এবং এই ইস্তেহারের ভিত্তিতে ভোটারেরা ভোট দিয়ে থাকেন। বিজেপি তার ২০১৪ সনের নির্বাচনী ইস্তেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ভারত নিপীড়িত হিন্দুদের জন্য প্রাকৃতিক আবাসস্থল হবে এবং তাদের ভারতে আশ্রয় নেয়ার জন্য স্বাগত জানানো হবে। লোকসভা নির্বাচনের আগে দলীয় ইশতেহারে কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার, রামমন্দির নির্মাণ, এনআরসি করা এবং জাতীয় নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বর্তমান শাসক দল। গণতন্ত্রের লীলাখেলা বিস্ময়কর। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতন্ত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকে না বিধায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে যে কোন আইন প্রণয়ন বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোন সমস্যা হয় না। ভারতীয় জনতা পার্টির দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যখন তারা বাস্তবায়ন শুরু করছে তক্ষুণি শুরু হয়েছে আন্দোলন, বিক্ষোভ। ভারতীয় জনতা পার্টির ইস্তেহারের পক্ষে জনগণ ভোট দেওয়ার পর গণতান্ত্রিক নিয়মকানুন পরিপালনপূর্বক মোদি সরকার এ আইন প্রণয়ন করেছে—লোকসভায় বিলের পক্ষে ভোট পড়েছে ৩১১টি এবং বিপক্ষে ভোট পড়েছে মাত্র ৮০টি। উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় পক্ষে ও বিপক্ষে ভোট পড়েছে যথাক্রমে ১১৭টি ও ৯২টি। দেখা যাচ্ছে, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের পক্ষে, এনআরসি করা ও নাগরিক সংশোধনী আইনের সমর্থক। আমরা গণতন্ত্র মানি, আবার গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও করি। ইস্তেহারে ঘোষিত নীতি বাস্তবায়ন না করলেও সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। গণতন্ত্রের এ ত্রুটি থেকে মুক্তির কোন পথ আছে বলে মনে হয় না। গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে সংখ্যালঘুরা যাতে বিপদগ্রস্ত না হয় সেজন্য সংখ্যাগরিষ্ঠদের বিবেচনা ও মর্জির ওপর নির্ভর করতে হয়—ভিন্ন কোন পথ গণতন্ত্রে বাতলানো আছে বলে মনে হয় না। ক্ষমতাসীনদের ভুল সিদ্ধান্তে জনগণ বীতশ্রদ্ধ হলে পরবর্তী নির্বাচনে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ধর্মের জাদুমন্ত্রে জনতা সব ভুলকে অনেক সময় বিবেচনায় নেয় না।
ভারতে মুসলমানেরা সংখ্যালঘু হলেও বাংলাদেশের হিন্দুদের মতো নিরীহ ও নিশ্চুপ হয়ে শুধু মার খায় না, মার দেয়ও। ২০ কোটি মুসলমানের প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ হজম করতে ভারত সরকারকে গলদঘর্ম হতে হয়। নাগরিক সংশোধিত আইনে অবৈধ মুসলমানদের নাগরিকত্ব লাভের কোন সুযোগ না থাকায় ভারতীয় মুসলমানেরা ক্ষুব্ধ। এছাড়াও মুসলমানদের বাদ দিয়ে অন্য হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন, পার্সি, শিখ—এ ছয়টি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নাগরিক হওয়ার সুযোগ দেয়ায় ভারতের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে এবং ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সব নাগরিকের প্রতি সমান আচরণের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন হয়েছে। সরকারের ধর্মভিত্তিক স্বজনপ্রীতি ভারতের প্রগতিশীল লোকদের মনেও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এ আইন পাস হওয়ার পর তাই ভারতের অনেকগুলো রাজ্যে হিন্দু, মুসলমানের যৌথ উদ্যোগে সহিংস আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং বামধারার রাজনৈতিক দলগুলো এ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে। ভারতে এখন অর্ধেক লোক যুবক এবং এরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ করে মিটিং পয়েন্ট নির্ধারণ করছে, রাস্তায় একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ মিছিল করছে। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রেখেও যুবকদের আন্দোলনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা সম্ভব হচ্ছে না, সরকার সান্ধ্য আইন জারি করতে বাধ্য হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে স্লোগান উঠেছে, ‘হিন্দু মুসলমান ভাই ভাই, একসঙ্গে থাকতে চাই’। এ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের কারণে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ এবং ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির মেয়ে কংগ্রেস নেত্রী শর্মিষ্ঠা মুখার্জিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও আন্দোলন এত তীব্র হয়ে উঠেছে যে, পুলিশ গুলি করে লোক মেরেও আন্দোলন দমাতে পারছে না। কমপক্ষে সাতজন মুখ্যমন্ত্রী এ আন্দোলনে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছেন।
আসামের অসমিয়াদের আন্দোলন, বিক্ষোভ ভিন্নতর; তারা অবৈধ হিন্দুদেরও নাগরিকত্ব প্রদানের বিরুদ্ধে। তাদের ধারণা, অবৈধ বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়া হলে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে এবং তাদের ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বাঙালি হিন্দু, মুসলমানদের তাড়ানোর জন্যই বহু বছর পূর্বে অসমীয়রা গড়ে তুলেছিল জঙ্গিগোষ্ঠী ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম বা উলফা। অন্যদিকে নাগরিকত্ব সংশোধিত আইনে অবৈধ হিন্দুদের আসামে নাগরিকত্ব প্রদানে একটি জটিলতার উদ্ভব হবে। কারণ এ হিন্দুরা কিছুদিন আগে নাগরিক নিবন্ধনে বাদ পড়েছিল—বাদ পড়া হিন্দুরা তালিকাভুক্ত হওয়ার আবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, তারা ভারতের স্থায়ী বাসিন্দা, পার্শ্ববর্তী কোন দেশ থেকে তাদের আগমন ঘটেনি। কিন্তু দলিলপত্র ঠিকমতো দাখিল করা সম্ভব না হওয়ায় তাদের তালিকাভুক্ত হওয়া সহজ হবে না। তালিকাবহির্ভূত এ হিন্দুরা এখন নাগরিক হওয়ার জন্য নতুন নাগরিকত্ব সংশোধিত আইনে আবেদন করবে। এখন তাদের এ মর্মে স্ববিরোধী বক্তব্য দিতে হবে যে, তাদের আদি দেশ আফগানিস্তান, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ এবং ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে তারা তাদের জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়েছে।
নাগরিকত্ব সংশোধিত আইনের বিরুদ্ধে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন পেশ করা হয়েছে। এ আইনে কোন ভারতীয় মুসলমান নাগরিকের স্বার্থহানির সম্ভাবনা না থাকায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাবে বলে মনে হয় না এবং অবৈধ মুসলিম নাগরিক নিয়ে তাদের ইতিবাচক বিবেচনা প্রত্যাশা করাও যায় না। তবে সংবিধানে বর্ণিত সমতা বিধানের নীতি এই সংশোধনীর কারণে ক্ষুণ্ণ হয়েছে কিনা—তা আদালত বিবেচনা করতে পারে। মুসলমানদের সবাই যে বিক্ষোভ করছে তাও কিন্তু নয়। কারণ ভারতের ২০ কোটি বৈধ মুসলিম নাগরিকের বিরুদ্ধে এ আইনে কিছু বলা হয়নি। দিল্লির জামা মসজিদের শাহি ইমাম সইদ আহমেদ বুখারির অভিমত হচ্ছে, এ আইন নিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের বিক্ষুব্ধ হওয়ার কোন কারণ নেই, কারণ এ আইন ভারতের নাগরিকদের বিরুদ্ধে কিছু বলেনি। তবে আসামের মতো সারা ভারতে এনআরসি বা নাগরিকদের তালিকা তৈরি করা হলে অনেক মুসলমান অবৈধ হয়ে যেতে পারে; এক্ষেত্রে অমুসলিমরা নতুন আইনে নাগরিক হওয়ার সুযোগ পেলেও অবৈধ মুসলমানরা সে সুযোগ পাবে না।
[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com