দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আজকের (রোববার, 22 ডিসেম্বর ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনে ধর্ম
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
আইনি জটিলতা ছাড়াও সামাজিক সংস্কার ও ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতার জন্য মানুষ জীবনকালে বা মরণোত্তর অঙ্গদানে আগ্রহী হয় না। কোরআন-হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় আমাদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জীবিতকালে বা মরণোত্তর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিতগণসহ পৃথিবীর বহু খ্যাতিমান আলেমের মতে, কিছু শর্তসাপেক্ষে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানে ইসলাম ধর্মে কোন বাধা নেই। ইসলাম ধর্মতত্ত্বের প্রফেসর সাইম ইয়েপ্রেমের মতে, অঙ্গ প্রদানে ইসলাম ধর্মের কোথাও নিষেধাজ্ঞা না থাকায় অঙ্গদান অনুমোদনযোগ্য। তার মতো অনেক ইসলামি ধর্মতত্ত্বের এমন ফতোয়ার কারণে সৌদি আরবসহ বহু ইসলামি দেশেই অঙ্গদান অনুমোদিত ও তা দীর্ঘদিন থেকেই বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০০৮ সনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ইসলামবিশারদগণ অঙ্গদানের ব্যাপারে ইতিবাচক মতৈক্যে পৌঁছান। এমন মতৈক্য থাকা সত্ত্বেও মুসলিম-প্রধান দেশগুলোতে জীবিতকালে বা মরণোত্তর অঙ্গদানে মুসলমানদের মধ্যে অনীহা লক্ষ্য করা যায়। কোন কোন অঙ্গদান সব ধর্মের জীবিত মানুষের জন্য ভীতিজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ; মরণের পর ভীতি ও ঝুঁকি তিরোহিত হলেও মরণোত্তর অঙ্গদানে মুসলমানের অঙ্গদানে অনীহা দেখা যায় এবং এর প্রধান কারণ কিছু আলেমের অঙ্গ প্রদানের ক্ষেত্রে বিরুদ্ধাচারণ। মালিকানাবহির্ভূত বস্তু ক্রয়-বিক্রয় বা দান করা হারাম বিধায় সৃষ্টিকর্তার মালিকানাধীন মানবের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান বা ক্রয়-বিক্রয় করা, মরণোত্তর দানের অসিয়ত করা তাদের মতে হারাম ও নিষিদ্ধ; তবে তারাই আবার বলেন যে, বুকের দুধ যেহেতু একজন মা অন্য মা’য়ের সন্তানকে খাওয়ানোর ক্ষেত্রে কোন ধর্মীয় বিধি-নিষেধ নেই সেহেতু দুধের মতো প্রবাহিত রক্ত দান ও ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে।
অন্যদিকে প্লাস্টিক সার্জারির কথা আমরা প্রায় সবাই জানি—কাটা ঠোঁট, কাটা তালু, অতিরিক্ত আঙ্গুল, অন্যান্য জন্মগত ত্রুটি, এসিডদগ্ধ মুখমণ্ডল ও চামড়া প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে ঠিক করার ব্যবস্থা বহুকাল পূর্ব থেকেই অবলম্বিত হচ্ছে এবং এ সার্জারি ইসলাম ধর্মে অনুমোদিত। কিন্তু সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য বোঁচা নাক, অনুন্নত স্তন ইত্যাদি অঙ্গের সার্জারি করাকে বলে কসমেটিক সার্জারি এবং এই সার্জারির অনুমোদন ইসলামে নেই। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে উত্তম অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছি’—সুরা ত্বিন, আয়াত ৪। তাই শুধু সৌন্দর্য সৃষ্টির জন্য সৃষ্টিকর্তার দেওয়া দেহগত আকার-আকৃতিতে পরিবর্তন আনা যাবে না। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতাত্ত্বিক মুহাম্মদ ঘালির মতে মানবদেহকে মৃত্যুর পরেও রক্ষা করা উচিত। তার মতে মৃত ব্যক্তির পক্ষে বাধা দেওয়া সম্ভব নয় বিধায় মৃত্যুর পর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে বের করা জায়েজ নয়। এ মতের পক্ষের ধর্মতত্ত্ববিদেরা বুখারি শরিফের একটি হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান বা বিক্রির ব্যাপারে ইসলাম ধর্মের নিষেধাজ্ঞাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন; এই হাদিসে নবী করিম (সা.) চুল দান ও গ্রহণকারী নারীদের অভিসম্পাত করেছেন। চুল দান করলে দানকারিণীর শারীরিক কোন ক্ষতি না হওয়া সত্ত্বেও এর উপর ধর্মে নিষেধাজ্ঞা থাকায় অঙ্গদান বা ক্রয়-বিক্রয় অবশ্যই হারাম বলে তারা সিদ্ধান্ত টেনেছেন।
তবে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য চুলের আদান-প্রদান আর জীবনরক্ষাকারী অঙ্গের আদান-প্রদান এক নিক্তিতে পরিমাপ করা যুক্তিসঙ্গত নয় বলেই সম্ভবত অন্য আলেমেরা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানে শরিয়তে কোন বাধা দেখেননি। পোস্টমর্টেম করার ক্ষেত্রেও আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মানুষ ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বিধায় জীবিত এবং মৃত উভয় অবস্থায় মর্যাদাবান ও সম্মানীয়—তাই মরদেহ কাটাছেঁড়া করা নাজায়েজ ও হারাম বলে অনেক আলেম মতামত ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তারাই আবার ভিন্ন মত দিয়ে বলেছেন, আদালতের প্রয়োজনে পোস্টমর্টেম করা যাবে। রক্তদানের ক্ষেত্রেও পোস্টমর্টেমের মতো ফতোয়া দেওয়া হয়েছে; রক্ত দেহ থেকে বেরুনোর সঙ্গে সঙ্গে অপবিত্র হয়ে যায় বিধায় তা দান করা নাজায়েজ, তবে রোগীর জীবন বাঁচানোর বিকল্প কোন ব্যবস্থা না থাকলে ডাক্তারের পরামর্শমতো রক্ত দেওয়া জায়েজ বলে একই ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যুর পর মানুষের পুনরুত্থান ও পরকালীন জীবন আছে। ওয়াজে আলেমেরা প্রায় উল্লেখ করে থাকেন যে, স্বীয় কাজের জন্য শরীরের প্রতিটি অঙ্গের আলাদা আলাদাভাবে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা হবে; তাই দুই ভিন্ন দেহের একই অঙ্গের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা একটু জটিল হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়াও চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির কারণে এখন একটি দেহের ৫০টি অঙ্গ অন্য দেহে স্থানান্তর ও প্রতিস্থাপন সম্ভব। এক্ষেত্রে একটি দেহ থেকে ৫০টি অঙ্গ নেয়া হলে কবর দেওয়ার জন্য দেহের অবশিষ্ট কোন অংশ থাকার সম্ভাবনা নেই। এছাড়া অনেকেই গোটা দেহ দান করছেন—উভয় ক্ষেত্রে মৃতদেহ কবর দেওয়া না হলে কবরের আজাব বা সওয়াল-জবাব নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। তবে সব মুসলমান যে পৃথিবীতে কবর পাচ্ছেন তা কিন্তু নয়, বহু লোকের সলিলসমাধি হয়ে থাকে; বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে কত মুসলমান যে সাগরের পানিতে ডুবে মরেছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। লাদেনের মরদেহ সাগরের পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অনেকের ধারণা। বিমান বিধ্বংস হলে মানুষের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। মরার পর অনেকের দেহ ছাইভস্ম হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশে চোখের কর্নিয়া ও কিডনি প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। সামাজিক সংস্কার ও ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং দেহ দানের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ইসলাম মানবতাবাদে বিশ্বাসী, তাই চিকিৎসার সূত্রে অনেক আলেম মানব-অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পক্ষে ফতোয়া দিয়েছেন। এখন দরকার সামাজিক সচেতনতা। সন্ধানীর প্রচারণায় এখন আর রক্ত কিনতে হয় না, এক গ্রুপের রক্ত দিয়ে ব্লাড-ব্যাংক থেকে মানুষ প্রয়োজনে অন্য গ্রুপের রক্ত সংগ্রহ করছে। এই প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে আয়োজিত বিভিন্ন মেলা বা অনুষ্ঠানে অসংখ্য লোককে মরণোত্তর চক্ষুদানে নাম লেখাতেও দেখা যায়। আমাদের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক, সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, অভিনেত্রী সারা যাকের, সুবর্ণা মুস্তাফা প্রমুখ মরণোত্তর কর্নিয়া দানে সন্ধানীর সঙ্গে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছেন। এভাবে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো গেলে অধিক হারে তরুণ-তরুণীরা অপরাপর
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানেও অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ হবে। মৃত্যুর পর অকেজো দেহটি পচে মাটিতে মিশে যাবে, নতুবা পুড়ে ভস্ম হবে—এতে কোন মানবকল্যাণ নেই; এই কথাটি যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধিতে আসবে তত শিগগিরই রোগাক্রান্ত মানুষগুলো বাঁচার অবলম্বন খুঁজে পাবে। এইভাবে একজন আদর্শিক মানুষ জীবিতকাল ও জীবনের অবসানে মানবকল্যাণ করে যেতে পারবেন। যে সমাজে ফাঁসির আসামি ছাড়া আর কোথাও কর্নিয়া পাওয়া যেত না সেই সমাজে ‘Life to a dead eye’—এই একটি স্লোগান দিয়ে ৭০ বছর পূর্বে ডা. হাডসন সিলভা শ্রীলঙ্কায় একটি সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে পেরেছিলেন, তার আন্দোলনের কারণেই চক্ষুদান করাটা এখন শ্রীলঙ্কায় সমাজের গৌরবময় রীতিতে পরিণত হয়েছে। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এখন শ্রীলঙ্কায় চক্ষুদান করে যাচ্ছেন, অনেকে জীবিত অবস্থায় দুটির মধ্যে একটি চক্ষু অন্ধদের দান করতে এগিয়ে এসেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সবচেয়ে বেশি কর্নিয়া সরবরাহ করে শ্রীলঙ্কা। এক সময় শ্রীলঙ্কা থেকে আমরাও কর্নিয়া এনে মৃত চোখে সংযোজন করেছি। তবে শ্রীলঙ্কা থেকে সবচেয়ে বেশি কর্নিয়া আমদানি করে ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তান।
মৃতদেহের ত্বক, সুস্থ হার্ট, লিভার বা কিডনি দিয়ে অন্য যে কোনো মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। একজন মানুষের অঙ্গ নিয়ে অন্য মানুষের দেহে প্রতিস্থাপনকে অনেক আলেম নাজায়েজ ও হারাম বলে উল্লেখ করলেও তারাই আবার জড়বস্তুর মাধ্যমে তৈরি কৃত্রিম দাঁত, শ্রবণযন্ত্র, কৃত্রিম হাত, কৃত্রিম পায়ের ব্যবহার জায়েজ বলে মতামত দিয়েছেন; এমনকি তারা মানবদেহে অন্য প্রাণীর অঙ্গ সংযোজন নিয়েও ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন।
দেড় হাজার বছর পূর্বেও মানবদেহে কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজনের প্রমাণ পাওয়া যায়। দক্ষিণ অস্ট্রিয়ার হেমাবার্গে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের সময় ১৫০০ বছরের পুরোনো যে কঙ্কালটির সন্ধান মেলে সেই কঙ্কালটির বাঁ-পায়ের পাতায় ও গোড়ালিতে কাঠের তৈরি কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজিত দেখতে পাওয়া যায়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে হাত, পা হারানো বাঙালিদের অঙ্গ সংযোজনের ব্যবস্থা করেছিল ভারত। প্রযুক্তিগত বিবেচনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে থাকায় এখনও অধিকাংশ কৃত্রিম হাত ও পা আমরা বিদেশ থেকেই আমদানি করে থাকি। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানে এখনও মানুষ অনাগ্রহী বিধায় অঙ্গগ্রহীতার দেহকোষ থেকেই কৃত্রিম অঙ্গ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এই সকল অঙ্গগ্রহীতার দেহ থেকে কোষ নিয়ে পরীক্ষাগারেই তৈরি করা হয় বিধায় এগুলো প্রতিস্থাপনের পর সাধারণত বিদ্রোহ করে না, ওষুধ প্রয়োগ করা হলে দেহের অরিজিনাল অঙ্গসমূহের মতো কৃত্রিম অঙ্গও সমভাবে রেসপন্স করে থাকে। লিভারের সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে দ্রুত বেড়ে যাওয়া; তাই উল্লিখিত অঙ্গগুলোর মধ্যে কৃত্রিম লিভার তৈরির কাজটি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। মানুষের একটি পূর্ণাঙ্গ মস্তক তৈরি ও প্রতিস্থাপনের প্রচেষ্টাও চলছে। টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে তৈরি কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহারের সুযোগ এখন পাচ্ছে শুধু সম্পদশালী ব্যক্তিরা; এ সব অঙ্গ ব্যবহারের সুযোগ যেদিন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসবে সেই দিন চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বিপ্লব ঘটবে, অঙ্গের জন্য তখন আর অন্যের করুণা ভিক্ষা করতে হবে না, ধর্মের প্রতিবন্ধকতাও দূর হবে।
[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com