২০১৪ সনে প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণাসহ বিভিন্ন জনসভায় জনগণকে এমন ধারণা দিতে থাকে যে, ভারতে বিপুলসংখ্যক অবৈধ মুসলিম অভিবাসী বাস করছে। ১৯৪৭ সনে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হওয়ার পর পাকিস্তানের হিন্দুরা ভারতে এবং ভারতের মুসলমানেরা পাকিস্তানে পাড়ি দেয়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনে এক কোটি বাঙালি ভারতে আশ্রয় নেয়। মানসিক স্বস্তি না থাকায় পরবর্তীতেও কিছু হিন্দু ভারতে পাড়ি দিয়েছে এবং সহাবস্থান সৌহার্দ্যপূর্ণ করা না গেলে ভবিষ্যতেও পাড়ি দেবে। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার কারণে হিন্দুদের মানসিক অস্বস্তি বেড়েছে বলে অনেকের ধারণা। কাজের সন্ধানে বাংলাদেশের মুসলমান ভারতে পাড়ি দিচ্ছে বলেও বিজেপি অভিযোগ করে যাচ্ছে। কোন বাঙালি মুসলমান ইতোপূর্বে কাজের সন্ধানে ভারতে গিয়েছে কিনা জানা নেই, তবে এখন যে যাচ্ছে না তা নিশ্চিত। কারণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন আর ভারত থেকে পিছিয়ে নেই—ভারতের পঞ্চাশ ভাগ লোক খোলা স্থানে মলত্যাগ করলেও বাংলাদেশে এমন অবস্থা তিরোহিত হয়েছে অনেক বছর আগে; বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেশি, গড়পড়তা আয়ু বেশি, পরিবার পরিকল্পনায় অগ্রগামী, দারিদ্র্যের হার কম, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী বিস্তৃততর, মাথাপিছু আয় ও মুদ্রার মান প্রায় সমান। এ অবস্থায় বাঙালি মুসলমান ভারতে কাজের সন্ধানে যাওয়ার যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। তবে বাঙালি মুসলমানেরা নৌকায় করে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি নিয়েও অধিকতর সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে কাজের সন্ধানে দেশত্যাগ করছে।

হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে রামরাজ্য বানানোর স্লোগান দিয়ে অন্য দেশগুলো থেকে হিন্দুদের ভারতে টেনে এনে ভারতের রাজনীতিতে লাভ হলেও ভারতের অর্থনীতির জন্য চাপ সৃষ্টি করবে। ইসরাইল অবশ্য এই কাজটি করছে অনেক পূর্ব থেকেই; পৃথিবীর যেকোনো দেশেই বসবাস হোক না কেন ইহুদিরা জানে তাদের স্বদেশ ইসরাইল, ইসরাইলকে পৃথিবীর সকল ইহুদিদের জন্য উন্মুক্ত করে রাখা হয়েছে। হিন্দু-অধ্যুষিত মাত্র দুইটি দেশ—ভারত ও নেপাল। মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মতো অনেকগুলো দেশ হিন্দুদের নেই। ভারতবর্ষ ভেঙে হয়েছে ভারত আর পাকিস্তান, পাকিস্তান ভেঙে হয়েছে পাকিস্তান আর বাংলাদেশ—তাই একজন বাংলাদেশি বা পাকিস্তানির এবং তার আত্মীয়-স্বজনের ভারতে থাকা কিংবা একজন ভারতীয়র বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তানে থাকা অবাস্তব কিছু না। মানবতাবিরোধী ধর্ম মানুষদের কীভাবে বিচ্ছিন্ন করেছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় সীমান্তে দুই দেশের লোকদের মিলনমেলায়। বিভক্ত আত্মীয়-স্বজন বা আপনজনদের একটু হাতের স্পর্শ পাওয়ার জন্য, একটু কথা শোনার নিমিত্তে সীমান্তের দুই পাশের লোকদের আকুতি, ব্যাকুলতা মর্মস্পর্শী আবহের সৃষ্টি করে।

পৃথিবীর প্রায় সব দেশে বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক অনুন্নত দেশে সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। খাবারের চেয়ে জীবনের নিরাপত্তা অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিধায় সংখ্যালঘুরা শুধু ধর্মের নৈকট্যের অনুসন্ধানে সীমান্ত অতিক্রম করে থাকে। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের অনেককে ধর্মও নিরাপত্তা দিতে পারেনি; বাংলাদেশে আটকে পড়া বিহারি মুসলিমেরা মুসলমানের দেশ পাকিস্তানে এসে কি কখনো ভেবেছিলো তাদের রাষ্ট্রবিহীন উদ্বাস্তু হয়ে জীবন কাটাতে হবে? বিহার তো ভারতের অংশ, তারা কেন পাকিস্তানি বা বাংলাদেশি হবে? এভাবে নিরাপদ দেশ খুঁজতে গিয়ে কত সহস্র লোক সহায়-সম্পদ সব হারিয়ে দেশান্তর হয়েছে তার সঠিক হিসাব কেউ দিতে পারবে না। অনেকে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি তারা ভারতবর্ষের কোন অংশে বসবাস করে নিরাপদ থাকবে। এই লীলাখেলা জনতার নয়, রাজনীতিবিদের। ধর্মের ভিত্তিতে তাই কোন ভাগই মানবকল্যাণ বয়ে আনেনি। তাই কে ভারতীয়, কে পাকিস্তানি আর কে বাংলাদেশি তার উৎস খোঁজা অর্থহীন। এ সমস্যাকে পুঁজি করে কিছু রাজনীতিবিদ ক্ষমতায় যাওয়ার যে সহজ পথ খুঁজে পাবে তা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা ইব্রাহিম খাঁসহ অনেকে বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু ধর্মের প্রভাব ছিল অপ্রতিরোধ্য—তাই ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ-বিভাজন কখনোই শেষ হয় না, গরু খাওয়ার জন্য হিন্দুর হাতে মুসলমান মরে, নবীজীকে হেয় করার মিথ্যে অপবাদে মুসলমানদের হাতে হিন্দু কতল হয়।

অধিকাংশ দেশে সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করার জন্য বিভিন্ন দল বা গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে। রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতে যেমন শিবসেনা, বজরং, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ রয়েছে, তেমন সংঘ-গোষ্ঠী উন্নত-অনুন্নত অধিকাংশ দেশে রয়েছে। এসব গোষ্ঠী বর্ণ আর ধর্মকেন্দ্রিক। ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্য থেকে সরে যাচ্ছে বলে আমরা সবাই ভারতকে দোষারোপ করছি—অথচ আমরাও সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখিনি। বাংলাদেশে ব্লাসফেমি আইন না থাকলেও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার কারণে এখানে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার বাহানায় বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের অনেকে আইনের ধার ধারে না—ফেসবুকে আমাদের নবী করিম (স.) সম্পর্কে কোন ভিন্নধর্মাবলম্বীর বিরূপ কিছু লেখা দেখলেই আইনানুগ ব্যবস্থা না নিয়ে সত্যাসত্য যাচাই না করেই সংখ্যালঘুদের ঘাড় মটকাচ্ছে, বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির ও দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা আহমদ শফী বলেছেন, ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধিত আইন মূলত মুসলমানদের একঘরে করে ভারতকে হিন্দুকরণ করার ঘৃণ্য প্রয়াস। এ প্রসঙ্গে তিনি সাম্প্রতিককালে মুসলমানদের আক্রমণ থেকে হিন্দুদের মন্দির রক্ষায় হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্রদের মানবপ্রাচীর তৈরি করার ঘটনাটি বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন। মানবপ্রাচীর তৈরি করে মাদ্রাসার ছাত্ররা একটি মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও এতে প্রমাণিত হয় যে, হিন্দুদের উপাসনালয় নিরাপদ নয়, পাহারা দিয়ে রক্ষা করতে হয়। অন্যদিকে নদীর তীরে অবৈধভাবে স্থাপিত মসজিদ-মাদ্রাসা উচ্ছেদ করতে সরকারকেও তিনবার ভাবতে হয়।

পাকিস্তানে হিন্দুর সংখ্যা খুবই কম। পাকিস্তানে সংখ্যালঘুরা অহরহ সামাজিক ও ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন প্রণয়নের কারণে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন; অথচ পাকিস্তানও একটি ইসলামিক রাষ্ট্র। ইসলামী প্রজাতন্ত্রী পাকিস্তানে বিরাজমান ব্লাসফেমি আইনে কত আহমেদিয়া এবং খ্রিস্টানের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে তার ইয়ত্তা নেই। ব্লাসফেমি আইনে একবার কোন সংখ্যালঘু কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দ্বারা অভিযুক্ত হলে তার আর রক্ষা নেই; আদালত থেকে মুক্তি পেলেও কট্টর পাকিস্তানি মুসলিম থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন উপায় থাকে না। ব্লাসফেমি আইনে অভিযুক্ত অনেকের বিচার হওয়ার আগেই জেলখানায় পুলিশ মেরে ফেলে। ব্লাসফেমি আইনের অপব্যবহার নিয়ে কথা বলার কারণে পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসিরকে তারই দেহরক্ষী গুলি করে হত্যা করেছে। ব্লাসফেমি আইনটি ব্যক্তিগত শত্রুতায় কাজে লাগানোর সুযোগ থাকে বলে সংখ্যালঘুরা কট্টর মুসলমানদের হাতে নৃশংসভাবে মৃত্যুবরণ করে থাকেন।

আফগানিস্তানে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা মাত্র শূন্য দশমিক তিন শতাংশ। ইসলামী প্রজাতন্ত্রী আফগানিস্তানে তালেবানেরা বিমানবিধ্বংসী কামান, ট্যাঙ্কবিধ্বংসী মাইন ও বিধ্বংসী বিস্ফোরক ব্যবহার করে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮২০০ ফুট উপরে ষষ্ঠ শতাব্দীতে তৈরি ১৮০ ফুট ও ১২০ ফুট উচ্চতার দুইটি বুদ্ধমূর্তি ২০০১ সালে ধ্বংস করে দেয়। জাপানের বৌদ্ধরা অফুরন্ত অর্থের বিনিময়ে মূর্তি দুইটি তাদের দেশে নিতে চাইলেও মূর্তি বিক্রি ও সংরক্ষণ ইসলাম ধর্মবিরোধী বিধায় আর্থিক অনটনেও তালেবানেরা মূর্তি দুইটি ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকেনি। ইউনেস্কো মূর্তিগুলোকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেও রক্ষা করতে পারেনি। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবসহ অনেক মুসলমান নৃপতিও এই মূর্তিগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এই মূর্তি দুইটির আদলে আবার মূর্তিই গড়া হচ্ছে নতুন উদ্যমে নতুন আবহে নিরাপদ আশ্রয়ে।

আফগানিস্তানে নিগৃহীত বৌদ্ধদের স্বধর্মীয় লোকেরা আবার মায়ানমারে সংখ্যালঘু রাখাইনদের নাগরিক হিসেবে মানতে চায় না, বৌদ্ধ সেনাদের নৃশংস নির্যাতনে প্রায় দশ লক্ষ রাখাইন বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। ইরাকের ক্ষুদ্র কুর্দি নৃ-ধর্মীয় গোষ্ঠী ইয়াজিদিরা আইএসের নৃশংসতার অন্যতম টার্গেট ছিল। এদের ধরে ধরে সুন্নি আইএস শুধু হত্যা করেনি, নারীদের যৌনদাসী বানিয়ে জোর করে ভোগ করেছে। হিটলার সংখ্যালঘু ইহুদিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্মূলের ব্যবস্থা নিয়েছিলো। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে হাজারা শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন প্রায়ই সুন্নি মুসলিম চরমপন্থিদের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু হন। আমেরিকায় সংখ্যালঘু অশ্বেতাঙ্গদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কুখ্যাত শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী গোষ্ঠী কু ক্লাক্স ক্লান। লেবাননে গণতন্ত্র টিকে আছে কোটার ভিত্তিতে। সরকারের সর্বোচ্চ পদগুলো আনুপাতিক হারে কিছু নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর লোকদের প্রতিনিধির জন্য নির্ধারিত। লেবাননের রাষ্ট্রপতি হবেন একজন ম্যারোনীয় খ্রিস্টান, প্রধানমন্ত্রী হবেন সুন্নি মুসলমান এবং স্পিকার হবেন শিয়া মুসলমান। ১৮টি ধর্মীয় গোষ্ঠী থাকলেও লেবাননের প্রধান তিনটি ধর্মীয় গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে সরকারের উচ্চ পদগুলো এভাবে ভাগ করে নিয়েছে, সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠী নিয়ে কারো কোন মাথাব্যথা নেই।

বিশ্বের এমন একটি দেশও নেই যেই দেশে শুধু একটি ধর্ম বা এক তরিকার লোক বাস করে। দুইটি ভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে যে বিভেদ তার চেয়ে অধিক বিভেদ একই ধর্মের দুই তরিকার মধ্যে। তাই একটি দেশের নাগরিকত্ব নির্ধারণে ধর্মবিশ্বাসকে শর্ত হিসেবে বেছে নেয়া সভ্যতা ও মানবতাবিরোধী। রাষ্ট্রীয় নীতিতে ধর্মীয় বিবেচনার বাড়তি গুরুত্ব দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ধর্মান্ধদের উৎসাহিত করবে। ভারত ও নেপালে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে তারা সংখ্যালঘু; ঠিক তেমনি আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ভারত ও নেপালে তারা সংখ্যালঘু। বিশ্ব পরিসরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সংখ্যালঘুরা জোটবদ্ধ হয় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে—জোটবদ্ধ হয়ে ভোট দেয় একটি মার্কায়, সমর্থন করে একটি দলকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষগুলোর অবিবেচক ও বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাবের জন্যই প্রায় প্রতিটি দেশে সংখ্যালঘুদের এ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অকারণে আপনা-আপনি গড়ে ওঠে। প্রতিটি দেশে সংখ্যালঘুদের করুণা করা হয়; এই করুণাও নিপীড়নের লক্ষণ। ইদানীং ধর্মের নামে হিংসা-প্রতিহিংসা বেড়ে গেছে এবং মানবসমাজে ধর্মের ব্যাপক প্রভাবের কারণে সংখ্যালঘুরা হচ্ছে নিগৃহীত।