দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আজকের (রোববার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।
সড়ক দুর্ঘটনা ও নতুন আইন
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
বাস ধাক্কায় দু’জন স্কুলশিক্ষার্থী মারা যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারা ঢাকা শহরে ছাত্র বিক্ষোভ শুরু হলে সড়ককে নিরাপদ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাসহ এতদ্বিষয়ে বিদ্যমান আইনকে যুগোপযোগী করার প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সংসদে পাস হয়। সম্প্রতি এ আইনটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হলে পরিবহন শ্রমিকেরা সারা দেশে বাস, ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দেয়। ঢাকা শহরে বাসের রেষারেষি চালকদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। প্রতিটি বাসের গায়ে শত শত ঘষা, মনে হয় কয়েকশ’ বছরের পুরনো গাড়ি। বাস স্টপেজেও একটি গাড়ি পুরো রাস্তা জুড়ে এমনভাবে কোনাকোনি রাখা হয় যাতে অন্য আর কোন গাড়ি তার সম্মুখে যেতে না পারে। তবে একটু সুযোগ পেলে হঠাৎ পেছনের বাস দ্রুতগতিতে এসে সামনের বাসটির গা ঘেঁষে এমনভাবে দাঁড়ায় যাতে আগে আসা বাসে কোন যাত্রী উঠতে না পারে; এতে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী হতাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাসগুলোর এমন রেষারেষি বন্ধে কোন ট্রাফিক পুলিশ কোন দিন কোন বাস ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করেছে বলে আমার নজরে পড়েনি। এছাড়াও পেছনে আরেকটি বাস দেখা গেলে সামনের বাসটি স্টপেজে না থেমে রাস্তার মধ্যখানে যাত্রীকে চলতি অবস্থায় বাস থেকে নামতে বাধ্য করে; চলতি গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে অনেকের হাত-পা ভাঙে, অনেকে পেছনের চাকার নিচে পিষ্ট হন। মহাসড়কেও বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতা মাঝে মাঝে এত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে যে, যাত্রীদের অনেকে দোয়া-দরুদ পড়তে থাকেন। একবার চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে দুই বাসের এমন রেষারেষিতে আমি আমাদের বাসের চালককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ড্রাইভার সাহেব, আপনারা তো জাতভাই, তবুও একজন আরেকজনের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করছেন কেন?’ সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভারের উত্তর, ‘আমরা তো অশিক্ষিত, তাই বাসে বাসে ধাক্কাধাক্কি করি, আপনারা শিক্ষিত লোকেরা সংসদ, মসজিদ ইত্যাদিতে মারামারি করেন কেন?’ বুঝতে পারলাম, গাড়িচালকেরাও আমাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে থাকে; কারণ তখন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপির সংসদ সদস্যরা ফাইলপত্র ছিঁড়ে স্পিকারের দিকে তেড়ে গিয়েছিলেন এবং বায়তুল মোকাররম মসজিদে দুই পীরের শিষ্যদের মধ্যে মারামারি হয়েছিল।
জরাজীর্ণ বাস-ট্রাকের বেপরোয়া গতি দেখলে মনে হয় না বাংলাদেশে কোন ট্রাফিক আইন আছে। কিন্তু আমরা সবাই জানি, সড়কে শৃঙ্খলা বিধানে দেশে পর্যাপ্ত আইন ও বিধি-বিধান রয়েছে; বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ সম্ভব হচ্ছে না বলেই সড়কে এমন বিশৃঙ্খলা বিরাজমান। সম্প্রতি যে আইন করা হয়েছে তাতে নতুন কিছু ক্ষেত্র ছাড়া শাস্তির মাত্রা কঠোর করা হয়েছে মাত্র। কিন্তু এই আইন প্রয়োগে সমস্যা দেখা দিয়েছে—এখনও বিধি প্রণয়ন করা হয়নি, ব্যাপকভাবে জরিমানা ও মামলা করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ‘পজ’ মেশিনে নতুন আইনের উপযোগী সফটওয়্যার হালনাগাদ করা হয়নি, নতুন আইন সম্পর্কে ট্রাফিক পুলিশ, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সম্যকভাবে ওয়াকিবহাল ও সচেতন করা হয়নি। এক বছর আগে পাস করা আইন বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষ কেন এখনও প্রস্তুত হয়নি তা কারও কথায় স্পষ্ট হচ্ছে না।
এটা তো গেল সরকারের তরফে গাফলতি; এ আইন বাস্তবায়নে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের কাছ থেকেও নতুন আইন সংশোধনের দাবি উত্থাপিত হয়েছে। শ্রমিকদের দাবি হচ্ছে, কোন অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার জন্য নতুন সড়ক আইনে তাদেরকে ‘ঘাতক’ নামে অভিহিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে কোন চালক যদি দুর্ঘটনার মাধ্যমে কোন ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটায় তাহলে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান নতুন আইনে রাখা হয়েছে। তবে ইচ্ছাকৃত না হয়ে শুধু বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে কেউ গুরুতর আহত বা কারো প্রাণহানি হলে অপরাধীকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান করা হয়েছে। আগে এই অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল তিন বছরের কারাদণ্ড। এক্ষেত্রে তদন্ত কর্তৃপক্ষ ও তার প্রক্রিয়া নিয়ে ড্রাইভারদের ভিন্নমত রয়েছে, কারণ ফাঁসি থেকে জেল-জরিমানা বা জেল-জরিমানা থেকে ফাঁসির ধারা পরিবর্তনে যে ঘুষের আধিপত্য থাকবে না তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। আমাদের দেশে কোন নির্দোষ ব্যক্তি একবার আইনের প্যাঁচে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোপানলে পড়ে গেলে তা থেকে মুক্তি পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, মানসম্মান-সম্পদ সব নিঃশেষ হয়ে যায়। তাই তারা নিরপেক্ষতার স্বার্থে পুলিশ ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে মামলার তদন্ত করার দাবি করেছে।
দুর্ঘটনা না ঘটিয়েও ড্রাইভারেরা প্রতিনিয়ত ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে থাকে; এই লঙ্ঘনের জন্য নতুন আইনে প্রতিটি ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে নির্ধারিত ১২ পয়েন্ট কর্তন হতে থাকবে এবং কর্তন হতে হতে এক সময় ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। পয়েন্ট কর্তনের এই নিয়ম পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে রয়েছে, এই নিয়ম আমাদের দেশে ড্রাইভারদের ট্রাফিক আইন মানতে বাধ্য করবে। এছাড়া লেন ভঙ্গ ও হেলমেট ব্যবহার না করলে অনধিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা হবে। মদপান করে বা নেশাজাতীয় দ্রব্য খেয়ে গাড়ি চালালে, সহকারীকে দিয়ে গাড়ি চালালে, উল্টো দিকে গাড়ি চালালে, নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য স্থানে গাড়ি থামিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে, চালক ছাড়া মোটরসাইকেলে একজনের বেশি সহযাত্রী উঠালে, মোটরসাইকেলের চালক ও সহযাত্রীর হেলমেট না থাকলে, ছাদে যাত্রী বা পণ্য বহন করা হলে, সড়ক বা ফুটপাতে গাড়ি সারানোর নামে যানবাহন রেখে পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে, ফুটপাতের ওপর দিয়ে কোন মোটরযান চলাচল করলে, সিটবেল্ট না বাঁধলে নতুন আইনে জেল-জরিমানার বিধান রেখে শাস্তির মাত্রা আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। নতুন আইনের ভয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ীর ফিটনেস সনদ সংগ্রহের হিড়িক পড়ে গেছে। বিআরটিএ অফিসে শুধু দালালের কথা শুনি, অন্যদিকে বিআরটিএ বলে, ‘দালালদের আমরা চিনি না’। কোন অফিসে অবৈধ কাজের অরাজকতা না থাকলে দালালের সৃষ্টি হতে পারে না।
শাস্তির বিধান কার্যকর করার বিপক্ষে ড্রাইভারদের কিছু যুক্তিও প্রণিধানযোগ্য। সড়ক ও মহাসড়কে এখনও কম গতির গাড়ি সিএনজি, নসিমন, টমটম, ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে এবং এগুলোর চলার কোন আলাদা লেন নেই, পথচারী যত্রতত্র রাস্তা পার হচ্ছে, পথচারী মোবাইলে কথা বলতে বলতে বেখেয়ালে রাস্তার মধ্যখানে হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায়, রিকশাগুলো হঠাৎ গতিপথ পরিবর্তন করে, রাস্তার মধ্যখানে গর্ত বা উঁচু গতিরোধক থাকে—এগুলোও দুর্ঘটনার কারণ। কোন কারণে রাস্তায় একবার গর্ত করা হলে তা আর মেরামত হয় না। শুধু একটি গর্ত মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, হঠাৎ নজরে আসা গর্ত এড়াতে গিয়ে পাশের আরেকটি গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ হয় অথবা পাশে দাঁড়ানো মানুষটিকে চাপা দিতে হয়। যেখানে-সেখানে যাত্রী উঠানো-নামানো হলে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে—অথচ ঢাকায় ফার্মগেট, বনানী, হাতিরঝিল এবং আরও কয়েকটি জায়গা ছাড়া কোথাও বাস বে নেই। বাস বে না থাকায় যাত্রীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাসে উঠানামা করে; কিন্তু বাসের জন্য রাস্তায় দাঁড়ানোও নতুন আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ট্রাফিক পুলিশের নজরে না পড়লে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ঘটনা মনিটরিং করার আধুনিক কোন ব্যবস্থা নেই এবং এই ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ। এখনও হাত নাড়াচাড়া করে গাড়ির চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নতুন আইনে গণপরিবহনে কন্ডাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গেলেও লাইসেন্স লাগবে, নতুবা জেল-জরিমানা হবে। কিন্তু চালকের সহকারীর লাইসেন্স দেওয়ার বিধান এখনও বিআরটিএ প্রণয়ন করেনি। গাড়ি চালানোর সময় চালক মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে প্রচুর জরিমানার ব্যবস্থা করা হয়েছে, কিন্তু উবার বা পাঠাও যারা চালান তাদের সঙ্গে গ্রাহকের চুক্তি হয় মোবাইলের মাধ্যমে, এদের কোথাও গাড়ি দাঁড় করিয়েও গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নেই, কারণ যত্রতত্র গাড়ি থামালেও জরিমানা করা হবে। এসব সমস্যার সমাধান না করে সব দুর্ঘটনা ও ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জন্য ড্রাইভারদের একতরফা দায়ী করলে তারা সব দায় নেবে কেন?
সড়ক দুর্ঘটনার জন্য পথচারীও অনেকাংশে দায়ী। এই আইনে তাই পথচারীদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। সড়ক, মহাসড়কে জেব্রা ক্রসিং, ওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস ব্যবহার না করে যত্রতত্র রাস্তা পার হলে পথচারীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ ফুটপাত খুচরা ব্যবসায়ী ও পার্শ্ববর্তী দোকানদারের দখলে থাকে। এই ফুটপাত থেকে ব্যবসায়ীদের তুলে দেওয়া হলে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বেড়ে যাবে এবং আরেকটি সামাজিক সমস্যার উদ্ভব হবে। অন্যদিকে অধিকাংশ ফুটওভার ব্রিজ চলাচলের জন্য অনুপযুক্ত—ময়লা-আবর্জনা ছাড়াও ছিনতাইয়ের ভয়ে পথচারী ফুটওভার ব্রিজ এড়িয়ে চলে। অন্যদিকে প্রবীণ ও অসুস্থ লোকদের পক্ষে ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করাও সম্ভব নয়, এস্কেলেটর সব ব্রিজে নেই। উন্নত দেশগুলোতে ফুটওভার ব্রিজ খুব বেশি ব্যবহৃত হয় বলে মনে হয় না। শক্ত, সামর্থ্য লোকদের জন্য ফুটওভার ব্রিজের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা গেলেও প্রবীণ ও অসুস্থদের রাস্তা পারাপারের ভিন্নতর ব্যবস্থা না করে আইনের প্রয়োগ সমীচীন হবে না।
আইন কঠোর হলেই যে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আমরা দেখেছি, আইন যত কঠোর হয় ঘুষের মাত্রা তত বাড়ে। বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশ রেকারের জন্যও ঘুষ আদায় করে—আগে রেকার ছিল না বলে এ টাকা দিতে হতো না। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় দেখা গেছে, পুলিশসহ প্রভাবশালী লোকেরাই আইন ভাঙেন বেশি। অন্যদিকে ফুটপাতের ব্যবসা এবং কম গতির যানবাহন তুলে দেওয়া যে কোন গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়াও ভূখণ্ড বিবেচনায় দেশে লোকসংখ্যা এত বেশি যে, কোনভাবেই কোন সরকারের পক্ষে এত লোকের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। জনগণ ও যানবাহনের অবাধ চলাচল থাকলে সেনানিবাসেও ট্রাফিক আইন বলবৎ করা সম্ভব হতো না। তাই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে প্রণীত নতুন আইনের সংযোজন, বিয়োজন করার বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করা যেতে পারে।
[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com