দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আজকের (রোববার, ০১ ডিসেম্বর ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।

জন্মদিন উদযাপনে ‘জলতরঙ্গ’

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

এ ভারতবর্ষে গান আর সুর নিয়ে যার জন্ম হয়েছিল ১৯ নভেম্বরে সেই সলিল চৌধুরীর জন্মদিবস পালনের মহান ব্রত নিয়ে ‘জলতরঙ্গ’ পাবলিক লাইব্রেরির শওকত ওসমান হলে ২২ নভেম্বর এক মনোজ্ঞ সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে (তার জন্ম সাল নিয়ে একেকজন একেক সাল উল্লেখ করেছেন)। সুরস্রষ্টা সলিল চৌধুরীর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান সবার জন্য উন্মুক্ত হলেও আমরা অনেকে ‘জলতরঙ্গ’র সভাপতির বিশেষ আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। ‘জলতরঙ্গ’র সভাপতি মাসুদা খান ইতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সতীর্থ ছিল। একই ভেন্যুতে আগেও এ সঙ্গীতগোষ্ঠীর গান শুনেছি। এ গোষ্ঠীর গান শোনার ক্ষেত্রে সতীর্থদের প্রধান আকর্ষণ মাসুদা খান ইতি; একটি জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চে সতীর্থের গান শুনে হাততালি দেওয়ার মধ্যে একটি আলাদা আনন্দ আছে। ‘জলতরঙ্গ’ প্রায় প্রতি মাসে গানের অনুষ্ঠান করে থাকে। ষাট ও সত্তর দশকে বাংলাদেশের ছায়াছবিতে গাওয়া জনপ্রিয় গানগুলো নিয়েও ‘জলতরঙ্গ’ একটি গানের আসর করেছিল। সলিল চৌধুরীর রচিত ও সুরারোপিত গান, তার কবিতা এবং তার জীবনের কিছু অংশের শৈল্পিক উপস্থাপনার মাধ্যমে ‘জলতরঙ্গ’ শ্রোতা ও দর্শকদের বিমোহিত করেছে। ২০১৪ সালে ছায়ানটে একটি মনোজ্ঞ গীতিআলেখ্য পরিবেশনার মাধ্যমে জলতরঙ্গের জন্ম। মাসুদা খান ইতির বক্তব্য অনুযায়ী হিংসা, বিদ্বেষ, দলাদলি সব কিছুকে পরাভূত করে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘জলতরঙ্গ’ কাজ করে যাচ্ছে।

সলিল চৌধুরীর সৃষ্টি দ্বারা সাজানো এ গানের অনুষ্ঠান দেখার আগে আমার ধারণা ছিল না যে, কালজয়ী অনেকগুলো গানের তিনি রচয়িতা ও সুরকার। আমার মেজ ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ ভারতে বেড়াতে গিয়ে আমাদের সব ভাইদের জন্য সলিল চৌধুরীর কয়েকটি গানের ক্যাসেট এনে দিয়েছিলেন, বহু বছর আগে পাওয়া এ ক্যাসেট থেকেই সলিল চৌধুরীর সঙ্গে প্রথম পরিচয়। আমার আব্বার কলেরগানে সলিল চৌধুরীর কোন গান শুনেছি বলে মনে পড়ে না। কুকুরের ছবি সংবলিত হিজ মাস্টার্স ভয়েসের যে ১২৫টির মতো রেকর্ড আব্বার কাছে ছিল তার অধিকাংশ রেকর্ডেই ছিল বড়– দাসের জীবনী নিয়ে নাটক, লতা মঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি, ফিরোজা বেগম, আব্বাস উদ্দিনের গান। তবে আমরা সাধারণ শ্রোতারা কখনও গানের রচয়িতা বা সুরকার নিয়ে মাথা ঘামাই না, আমরা মনে করি পুরো গানের জন্য কৃতিত্ব শুধু গায়ক, গায়িকার। কিন্তু যিনি গানটি লিখেন এবং সুর দেন তার কৃতিত্ব তো গায়ক-গায়িকার চেয়ে অনেক বেশি। তাই আব্বার সংগৃহীত রেকর্ডে সলিল চৌধুরী ছিলেন কিনা তা এখন আর মনে করতে পারছি না। আমি সঙ্গীতজ্ঞ নই, শুধু শ্রোতা; তবে ভালো শ্রোতাও নই। কথার চেয়ে সুর আমার নিকট আকর্ষণীয়। সুরের মূর্ছনায় গানের কথা প্রায়ই আমার কানে বাজে না। এ দুর্বলতার জন্য কোন গানের কয়েকটি চরণও ঠিকমতো মনে রাখতে পারি না। কিন্তু সলিল চৌধুরীর গান আমি রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো নিবিষ্ট মনে শুনি। জলতরঙ্গের এ অনুষ্ঠানে নিমগ্ন হয়ে গান শুনতে শুনতে মনে হলো—অসাধারণ গান রচনায়, সহজাত সুর সংযোজনায় সলিল চৌধুরী ছিলেন একক ও ব্যতিক্রমধর্মী। উপমহাদেশের কিংবদন্তি সঙ্গীতজ্ঞ সলিল চৌধুরীকে নিয়ে ব্যতিক্রমী ও আকর্ষণীয় এবারের আয়োজনে হল ভর্তি ছিল, এত বিরাট হলে বসার চেয়ার খালি না থাকায় অনেকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গান শুনেছেন।

সলিল চৌধুরী মূলত ছিলেন গীতিকার ও সুরকার। এছাড়াও তিনি বাংলা, হিন্দি ও মালয়ালাম ছায়াছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। সলিল চৌধুরীর হাতে আমাদের গোটা সভ্যতার সুর রয়েছে বলে তার গানের এক ভক্ত নারী উল্লেখ করেছিলেন। সলিল চৌধুরীর গান অনেকেই গেয়েছেন, কিন্তু লতা মঙ্গেশকর আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় যে সুর বেজে উঠেছে তা অনন্য। ‘না যেয়ো না রজনী এখনও বাকি’—লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠে এ গানটি বহুবার শুনেছি, এ কলাম লিখতে গিয়ে জানলাম গানটি লিখেছেন সলিল চৌধুরী এবং সুরও দিয়েছেন তিনি। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতাটিতে সুরারোপ করে হেমন্তের গলায় তুলে দেন সলিল চৌধুরী। তার করা সুরে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গলায় শুনেছি ‘আয় বৃষ্টি ঝেঁপে’ কিংবা ‘উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রা’। তার লেখা ও সুর করা এমন আরও অনেক কালজয়ী গান আমরা মান্না দে, আশা ভোঁসলে, কিশোর কুমার, শ্যামল মিত্র, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, হৈমন্তী শুক্লা, অনুপ ঘোষাল, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ঊষা মঙ্গেশকর, ঊষা উত্থুপ, সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস, সাগর সেন এবং কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শুনেছি। তার আরও কিছু জনপ্রিয় গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ধিতাং ধিতাং বোলে, দুরন্ত ঘূর্ণির এই লেগেছে পাক, আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা, সুরের এই ঝরঝর ঝর্ণায়, পথ হারাব বলে এবার পথে নেমেছি, উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রা, সাত ভাই চম্পা জাগো রে জাগো রে, পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি, বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, ও মোর ময়না গো, ও বাঁশি কেন গায় আমারে কাঁদায়, আহা ঐ আঁকাবাঁকা যে পথ যায় ইত্যাদি। এ গানগুলো মধ্যে অনেকগুলো পরিবেশিত হয়েছে ‘জলতরঙ্গ’র অনুষ্ঠানে।

ভাব বোধগম্য হলেও তার রচিত প্রতিটি গানে শব্দ ব্যবহার ও বাক্যবিন্যাসে কোন শিথিলতা নেই; মান্না দের কণ্ঠে সলিল চৌধুরীর লেখা ও সুরে গাওয়া ‘এই দুনিয়ায় ভাই সবই হয়’ গানটিতে ঠোঁট মেলাতে গিয়ে বিখ্যাত অভিনেতা ছবি বিশ্বাস মান্না দে’কে একবার বলে উঠেন, ‘এমন শক্ত করে গান গাইলে কেন? আর একটু সহজ করে গাইতে পারলে না? লিপ দিতে বড্ড সমস্যা’। সলিল চৌধুরী গানের সুর ও উপস্থাপনা নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। কোন গান কাকে দিয়ে গাওয়ানো হলে সর্বোত্তম হবে সে বিষয়েও তিনি সজাগ ছিলেন। শুধু শব্দ ও বাক্যবিন্যাসে নয়, সুরের জটিল বিন্যাসও তার গানগুলোকে সবার থেকে আলাদা করেছে। তাই তো হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘যাদের সুরে আমি গান গেয়েছি, তাদের মধ্যে আমার গলাটাকে সব থেকে সার্থকভাবে ব্যবহার করেছে সলিল।’ সলিল চৌধুরী সম্পর্কে মান্না দে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের পরে এমন সঙ্গীতস্রষ্টা আর আসেননি। তার সৃষ্ট সুরসম্ভার বাংলা সঙ্গীতের এক চিরকালীন অমূল্য সম্পদ।

ব্যক্তিগত জীবনে সলিল চৌধুরী ছিলেন কমিউনিস্ট; তাই তার গানের শুরুই হয়েছিল গণসঙ্গীত দিয়ে। কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘে’ যোগ দিয়ে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার বিরাট স্বপ্ন নিয়ে তিনি একের পর এক গণসঙ্গীত রচনা করে তাতে সুর দিয়েছেন। গণসঙ্গীতের মধ্য দিয়ে তিনি শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন। কমিউনিস্টদের ইংরেজ অথবা দেশীয় কোন শাসকই সহ্য করতে পারেনি; এজন্য হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও তার রচিত ও সুরারোপিত গণসঙ্গীত গাইতে প্রথমদিকে সম্মত হননি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আশঙ্কা ছিল, রাজনৈতিক গান গ্রামোফোন কোম্পানি রেকর্ডিং করতে রাজি হবে না। গণসঙ্গীত গাওয়ার ক্ষেত্রে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের এ অস্বীকৃতির কারণেই আমরা বিশ বছর বয়সী সলিল চৌধুরীর লেখা ও সুরে হেমন্তের গলায় ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোনো’—এ কালজয়ী গানটি পেয়েছিলাম। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ওই দিনই এ গানকে রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলার সেরা কাব্যগীতি বলে অভিহিত করেছিলেন। শুধু গণসঙ্গীত নয়, তার সাধারণ গানগুলো গাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছিল—রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েও শান্তিনিকেতন কর্তৃপক্ষের বিরোধিতার কারণে এক সময়ে সলিল চৌধুরীর গান গাইতে পারেননি।

সুরস্রষ্টা সলিল চৌধুরী বহুবিধ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন—তিনি বাঁশি, পিয়ানো, এসরাজ, সেতার ইত্যাদি বাজাতে জানতেন। এক সময় তিনি বোম্বে পাড়ি দিয়ে সিনেমাজগতে ঢুকে সঙ্গীত পরিচালক হলেন। সলিল চৌধুরীর ‘রিকশাওয়ালা’ গল্প অবলম্বনে তৈরি ‘দো বিঘা জমিন’র সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বও সলিল চৌধুরীকে পালন করতে হয়েছে। তার লেখা গল্প ‘পরখ’ নিয়ে যে চলচ্চিত্র হয় তাতে সলিল চৌধুরীর সুরে লতা মঙ্গেশকরের গলায় ‘ও সাজনা বরখা বাহার আয়ি’ আজও জনপ্রিয়। বাংলা ও হিন্দি গানে অসংখ্য নতুন সুর সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি উচ্চ থেকে আরও উচ্চতর অবস্থানে পৌঁছেছেন। তার এ প্রতিভা পরবর্তী প্রজন্মের সুরকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও শ্রোতাদের অনুপ্রাণিত করেছে। বিপুলসংখ্যক শ্রোতা আবিষ্ট হয়েছে তার গানের সুরমূর্ছনায়। জটিল সূক্ষ্ম কারুকার্যময় সুরের এমন বিমোহিত ভাবধারা সে যুগের মতো আজও আবেশিত করে চলেছে সঙ্গীতামোদীদের। সলিল চৌধুরী শুধু প্রতিভাকে পুঁজি করে এ সফলতা অর্জন করেননি, তার এ সফলতার পেছনে ছিল কঠোর অধ্যবসায় আর নিরলস অনুশীলন। পুলিশের হুলিয়া মাঝে মাঝে তাকে নিভৃত ও নির্জনে সরিয়ে দিয়েছে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত গানের জগতে তিনি যে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তাতে মনে হয় বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল তার গানের সুর বাজতে থাকবে। তার জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত জলতরঙ্গের সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার মর্মবাণীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে আমরাও সলিল চৌধুরীকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করছি।

(গত রোববারের কলামে পিয়াজের চাহিদা ও উৎপাদনে যে উপাত্ত দিয়েছি তা ‘লক্ষ টন’ হবে)

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com