দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার আজকের (রোববার, ২৪ নভেম্বর ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।
পিয়াজের ঝাঁজ
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
প্রতি কেজি পিয়াজের দাম উঠেছিল ২৫০ টাকা। ভারত পিয়াজ রফতানি বন্ধ করার পর দিন থেকে দাম বৃদ্ধি পেতে থাকে। মায়ানমার থেকে পিয়াজ আমদানি হচ্ছে শুনে ব্যবসায়ীরা মধ্যখানে পিয়াজের দাম ১০০ বা ১১০ টাকায় স্থিতিশীল রেখেছিল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে ব্যবসায়ীরা সজাগ হয়ে গেল, তারা জানলো ঘূর্ণিঝড়ের ভয়ে দুয়েক দিন জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকবে এবং ঘূর্ণিঝড়ে পিয়াজ ক্ষেত নষ্ট হবে—ব্যবসায়ীদের আর চিন্তা করতে হলো না, সঙ্গে সঙ্গে দ্বিগুণ তিনগুণ দাম বাড়িয়ে দিল। তারা আরও দেখলো, মায়ানমার থেকে আনা পিয়াজের বেশিরভাগ পচে গেছে, যে পরিমাণ পিয়াজের জন্য এলসি খোলা হয়েছে তার এক-চতুর্থাংশও আমদানি হয়নি, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পিয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখী; এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা ভাবলো, এতগুলো সুযোগ হাতছাড়া করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
পিয়াজ নিয়ে ফেসবুকে প্রচুর রসিকতা করা হয়েছে। পিয়াজ নিয়ে তৈরি গানগুলোর কথা শুনলে না হেসে পারা যায় না। কেউ নাকের কাছে পিয়াজ ঝুলিয়ে মাঝে মাঝে গন্ধ নিয়ে তরকারি খেয়েছে, কেউ কড়াইয়ের মধ্যে পিয়াজ দিয়েই সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিয়েছে, কেউ পিয়াজ দিয়ে মূল্যবান পোশাক তৈরি করে ভার্চুয়াল বন্ধুর জন্মদিনে উপহার দিয়েছে, কেউ কেউ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ফরমালিন দিয়ে পিয়াজের সঞ্চয় করেছে। একটি কম বয়সী মেয়ে চশমা পরে ঘরের গৃহিণী সেজে সিন্দুক থেকে মহামূল্যবান গহনা বের করে নিজেকে সম্পদশালী ধনী হিসেবে প্রমাণ দিতে চাইল, দেখলাম গহনার বাক্সে পিয়াজ দিয়ে বানানো গলার হার। মহামূল্যবান পিয়াজের হার নিয়ে গৃহিণী গর্ব নিয়ে নিজের আভিজাত্য জাহির করেছেন, মনে হয়েছে এমন মূল্যবান হার আর কারও নেই। বাস্তব জীবনেও পিয়াজ নিয়ে রসিকতা হয়েছে কুমিল্লায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে, এক যুবক তার বন্ধুর বিয়েতে পাঁচ কেজি পিয়াজ উপহার দিয়ে মিডিয়ায় হৈ চৈ ফেলে দিয়েছে। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সাত দিন কেউ পিয়াজ কিনবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; এতে কিছুটা কাজ হয়েছে বলেও মনে হয়েছে। মিডিয়ায় বিক্রেতারা বলছিল যে, তারা পিয়াজ নিয়ে বসে আছে, কিন্তু কোন ক্রেতা নেই। অবশ্য অনেকে আগের তুলনায় পিয়াজ কম কিনছেন, পাকঘরেও হিসাব করে পিয়াজের ব্যবহার হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের প্রশাসনিক তৎপরতা ও বিমানে পিয়াজ আসার সংবাদে বাজারে পিয়াজের দাম দ্রুত কমে যাচ্ছে। এই ক্রাইসিসে অনেকে আবার নানাবিধ গুণের কথা বলে পিয়াজ ব্যবহারে সবাইকে উদ্বুদ্ধও করছে। ফেসবুকে একটি ছবি দেখে আমি যারপরনাই খুশি হয়েছি; এক পথশিশু কয়েক কেজি’র পিয়াজ ভর্তি একটি পলিথিন ব্যাগ হাতে নিয়ে খুশিতে লাফাচ্ছিল। প্লাস্টিকের বোতল না কুড়িয়ে পথশিশুরা এখন আড়তের আশেপাশে বাড়তি মূল্যের পিয়াজ কুড়িয়ে লাভবান হচ্ছে। এ শিশুরা চাচ্ছে পিয়াজের ক্রাইসিস প্রলম্বিত হোক।
পিয়াজের দাম বাড়াতে ফেসবুকের অনেকে বিভিন্ন দেশে পিয়াজের দামও জেনে নিয়েছে। একজন ভিডিও করে দেখিয়েছে যে, জার্মানিতে পাঁচ কেজি পিয়াজের দাম বাংলাদেশি টাকায় ১০০ টাকা হলেও এখন সেল-এ ৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পিয়াজের দাম বাড়তি হলেও বাংলাদেশে দাম বেড়েছে লাফ দিয়ে। মিসর, তুরস্ক, মায়ানমার, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, আফগানিস্তান, ইউক্রেন, ভারত, চীন প্রভৃতি দেশে পিয়াজ উৎপাদিত হয়। সবচেয়ে বেশি পিয়াজ উৎপাদিত হয় চীন ও ভারতে। বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে উৎপাদিত পিয়াজের ৩০ শতাংশ নষ্ট হওয়ায় ভারতেও পিয়াজের দাম দ্বিগুণ তিনগুণ বেড়ে হয়েছিল প্রতি কেজি ১০০ রুপি। ভারতের নির্বাচনী প্রচারে পিয়াজের গুরুত্ব অপরিসীম। পিয়াজের দাম বাড়লে ভোক্তারা বিদ্রোহ করে, আবার দাম কমলে কৃষকের ভোট পাওয়া যায় না। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মহারাষ্ট্রের বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারণায় যাতে বিরোধী দল পিয়াজ ইস্যু আনতে না পারে সেজন্য ভারত তড়িঘড়ি করে পিয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয় এবং রফতানি বন্ধ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা করার একটা মওকা পেয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারে যে, ভারত ব্যতীত অন্য দেশ থেকে পিয়াজ আমদানি করাটা একদিকে সময়সাপেক্ষ অন্যদিকে দীর্ঘপথে পচে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়াও ভারত থেকে আমদানি খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ভারত রফতানি বন্ধ করায় বাধ্য হয়ে রোহিঙ্গা নির্যাতনকারী মায়ানমারের কাছে পিয়াজের জন্য আমাদের ধরনা দিতে হলো। ভাগ্য খারাপ, মায়ানমারের পিয়াজ পচে যাওয়ায় ইতোমধ্যে ১৫ টন পিয়াজ নদীতে ফেলে দিতে হয়েছে। মজুদদারেরা দাম চড়া রাখার জন্য পিয়াজ পচলেও বাজারে আনছে না বলে অনেকের ধারণা। এক সময় শুনতাম, বিশ্বে খাদ্যঘাটতি সৃষ্টি করে রাজনীতির গুটি চালানোর সুবিধার্থে আমেরিকা উদ্বৃত্ত ধান, চাল সাগরে ফেলে দিত। পিয়াজ পচলেও ব্যবসায়ীদের কোন লোকসান নেই, লোকসান খরিদদারের; পচা পিয়াজের ক্ষতি পোষাতে ভালো পিয়াজের দাম বাড়িয়ে দেয় আড়তদারেরা।
পিয়াজের দাম বাড়ার আরও কারণ রয়েছে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সঙ্গতি না থাকলে যে কোন জবরদস্তি হিতে বিপরীত হয়। বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি না করায় এবং মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার অপরাধে আড়াই হাজার ব্যবসায়ীকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। এ জেল-জরিমানায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হওয়ায় কারণে অনেকে এলসি খুলেও পিয়াজ আমদানি করেননি। আরেকটি কারণ হচ্ছে, ভারত যে কোন সময় রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারে বিবেচনায় অন্য দেশ থেকে পিয়াজ আমদানিতে ব্যবসায়ীরা গড়িমসি করেছেন। কারণ ভারত রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিয়াজের দাম কমে যাবে—দাম কমে গেলে মায়ানমার, মিসর, তুরস্ক থেকে বেশি দামে আনা পিয়াজ নিয়ে বিরাট লোকসানের সম্মুখীন হতে হবে ব্যবসায়ীদের। ২০১৭ সনে ভারত ব্যতীত অপরাপর দেশ থেকে পিয়াজ আমদানি করে অনেক ব্যবসায়ী ফতুর হয়ে গেছেন। এই বিষয়টি বিবেচনা করে বড় আমদানির উদ্যোগ ও ঝুঁকি নেয়নি ব্যবসায়ীরা। সরকারের তরফ থেকে টিসিবির মাধ্যমে কম মূল্যে পিয়াজ সরবরাহের উদ্যোগ বাজারে পিয়াজের দর কমাতে সফল হয়নি। কারণ চাহিদার তুলনায় এই পিয়াজের পরিমাণ এত অল্প যে, লাইনে দাঁড়ানো কিছু লোককে দেওয়ার পরই ট্রাকের পিয়াজ শেষ হয়ে যায়; অথচ পিয়াজের ট্রাক আসার আগেই অসংখ্য লোককে কাজ-কর্ম, অফিস-আদালত বাদ দিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। প্রকৃতপক্ষে চাহিদা আর সরবরাহে সঙ্গতি না থাকলে জোর করে বাজারমূল্য কমিয়ে রাখা যায় না। মায়ানমারেও দাম বেড়ে প্রতি টন পিয়াজের দাম হয়েছিল এক হাজার ডলার বা প্রতি কেজির দর প্রায় ৮০ টাকা। ভারত রফতানি বন্ধ না করলে তাদের দেশেও প্রতি কেজির দাম ১৫০ বা ২০০ রুপি হয়ে যেত।
আমাদের দেশেও পিয়াজ উৎপাদন হয়। বছরে আমাদের চাহিদা ২৮ টনের (কারও কারও মতে ২৪ টন) বিপরীতে আমরা উৎপাদন করি ২২-২৩ টন। দেশে উৎপাদিত এ পিয়াজের ৩০ শতাংশ নষ্ট হয় অব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সংকটের কারণে। তাই ঘাটতি থাকে ১০ টনের মতো। সেই কারণে সারা বছরেই আমাদের উৎপাদিত পিয়াজের পাশাপাশি ভারতের পিয়াজ বাজারে দেখা যায়। আমরা ধান, পাট, সবজি, মাছ ইত্যাদি উৎপাদনে অনেক সাফল্য অর্জন করেছি। এবার তো ধান উৎপাদন এত বেশি হয়েছে যে, কৃষকেরা ধানের ন্যায্য মূল্যই পায়নি; সরকার বাধ্য হয়ে চাল রফতানির ঘোষণা দিয়েছিল। প্রচুর মজুদ থাকা সত্ত্বেও এখন চালের দামও বেড়ে যাচ্ছে। ন্যায্য দর না পেয়ে বহু কৃষক আলু, বেগুন, দুধ রাস্তায় ফেলে প্রতিবাদ করেছে। পণ্যের জোগানের তুলনায় চাহিদা কম থাকা, সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থাদি গড়ে না উঠা এবং বিপণনের সুব্যবস্থা না থাকায় অনেক উৎপাদিত পণ্য নিয়ে মাঝে মাঝে কৃষকদের এমন সমস্যায় পড়তে হয়। তবে দেশে মজুত পর্যাপ্ত থাকলে অশিক্ষায় কিছু মানুষ গুজবে বিশ্বাস করে প্রয়োজনাতিরিক্ত পণ্য করে থাকে; সম্প্রতি গুজবে বেশি দামে অনেক লবণ বিক্রি হয়েছে। ঘরে মজুদ করার ব্যাপারেও ধর্মে নিষেধ করা হয়েছে—মজুদদারের বিরুদ্ধে হাদিসে বলা হয়েছে—‘যে সব লোক আন্দাজ-অনুমান করে খাদ্যদ্রব্য কিনত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে তাদের শাস্তি দেওয়া হতো, যাতে তারা সেগুলো নিজেদের স্থানে নিয়ে যাবার পরই বিক্রি করে (গুদামজাত না করে)’—সহীহ বোখারি শরিফ-৯৯৫। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে এখন সব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।
১৭ কোটি মানুষের জন্য এত অল্প জমি সব ফসল উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত নয়। এ অল্প জমিতে কৃষক কোন ফসল করে লাভবান হবে তা নির্ধারণ করা সহজসাধ্য নয়। ধান করলে পাট উৎপাদন করা সম্ভব হয় না, মরিচ উৎপাদন করলে পিয়াজের উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। আমাদের কৃষক হাড়ভাঙা পরিশ্রমে অভ্যস্ত; অঢেল জমি থাকলে সব ফসলই করা সম্ভব হতো। অধিক জনসংখ্যার কারণে আমাদের কোন অর্জনই টেকসই হয় না। অবশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেই আমাদের ভালনারেবিলিটি বেড়ে যায়। যে ধান-চালে আমরা এক বছর স্বয়ংসম্পূর্ণ, সেই ধান-চাল পরের বছর কিনতে হয় লাখ লাখ টন। এ কথা সত্য যে, একটি দেশের পক্ষে সব প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব নয়। তাই বলে সব কিছু অর্জন করেও শুধু অধিক লোকসংখ্যার কারণে ভঙ্গুরতার মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া বা জীবন-মরণ সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলা দেয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
আমাদের দেশে মসজিদ, মন্দির, স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয় খুব দ্রুতগতিতে বাড়ছে—এখানে সৎ পথে চলার শিক্ষা দেওয়া হয়, ভালোমন্দ চেনার জ্ঞান দেওয়া হয়, ঘুষ-দুর্নীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়, বেহেস্তে যাওয়ার পথ বাতলানো হয়, ওজনে কম দিতে নিষেধ করা হয়, দোজখের আগুনের ভয় দেখানো হয়। আমাদের ইসলাম ধর্মে ব্যবসাকে হালাল করা হয়েছে; ব্যবসা কীভাবে সততার সঙ্গে পরিচালিত হবে তাও বাতলিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতি শুক্রবারে ইমাম সাহেব মুসল্লিদের হাদিস-কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে ধোঁকাবাজ, মতলববাজ, অতিরিক্ত মুনাফাখোর সম্পর্কে সতর্ক করছেন। এখন আগের চেয়ে শুক্রবারে মুসল্লিদের সংখ্যা অনেক বেশি, মসজিদে জায়গা হয় না বলে রাজপথ বন্ধ করে নামাজের কাতার করতে হয়। এগুলো শুভ লক্ষণ— ধার্মিক মানে সততায় উজ্জীবিত মানুষ। কিন্তু বাস্তবে তার কোন প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অফিস-আদালত সর্বত্র ঘুষ-দুর্নীতি, ব্যবসায় মজুদ গড়ে অতিরিক্ত মুনাফা। আমাদের পবিত্র রমজান মাসেও এ ব্যবসায়ীরা রোজদারীদের প্রতি সামান্যতম দয়া দেখায় না, এমনভাবে দাম বাড়াতে থাকে যাতে রোজদারিদের নাভিশ্বাস উঠে। এ লোকগুলোই সুযোগ বুঝে লবণের দাম বাড়ায়, কাঁচামরিচের দাম বাড়ায়, আদার দাম বাড়ায়, বাড়ায় পিয়াজের দাম। এদের অনেকেই অতিরিক্ত মুনাফা পকেটে নিয়েই মসজিদে ঢুকে আল্লাহ তালার কাছে নিজের গুনাহের মাফ চেয়ে মুনাজাত করে থাকে। ঘুষ পকেটে নিয়েও মানুষ মসজিদ, মন্দিরে প্রার্থনা করতে যায়। এরা ঘুষের টাকা দিয়ে জমি কিনে, বাপের জমি বিক্রি করে হজে যায়। নিশ্চয় আমাদের শিক্ষায় কোন গলদ আছে, গলদ না থাকলে মানুষ এভাবে মুহূর্তে নিজেকে পরিবর্তন করে দ্বিচারিতায় নিমগ্ন হতে পারে না।
ইমাম সাহেবেরা খুতবায় বা ওয়াজে শুধু দোজখের আগুনের ভয় দেখান নতুবা বেহেস্তে হুরের লোভ দেখান; ধর্মে যে পিয়াজ খাওয়া নিষেধ করেছে এই বয়ানটি করতে আমি কখনো শুনিনি। টাঁকশালে আমার এককালের এক ঘনিষ্ঠ সহকর্মী জহুরুল ইসলাম নসু ফেসবুকে একটি হাদিস উদ্ধৃত করে পিয়াজ খেতে নিষেধ করেছেন—‘যে ব্যক্তি রসুন বা পিয়াজ খায় সে যেন আমাদের থেকে দূরে থাকে অথবা সে যেন আমাদের মসজিদ থেকে দূরে থাকে আর নিজ ঘরে বসে থাকে’—বুখারি, হাদিস : ৫০৫৮। এ হাদিস পোস্ট দেওয়ার পর অনেকে মন্তব্য করেছেন, হাদিসে কাঁচা পিয়াজ খেতে নিষেধ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ হাদিসে কাঁচা বা সিদ্ধ কিছু উল্লেখ করা হয়নি; এর আগের হাদিসে অবশ্য কাঁচা রসুন খেয়ে মসজিদের যেতে নিষেধ করা হয়েছে। কাঁচা রসুন বা কাঁচা পিয়াজও তো আমরা কম খাই না। আমরা তো গরুর গোস্তের সঙ্গে কাঁচা পিয়াজ খেতে অভ্যস্ত, এখন আবার হার্টের রোগ প্রতিরোধক হিসেবে অনেকে কাঁচা রসুনও খাচ্ছেন। শুধু রান্নার অনুষঙ্গ নয়, কাঁচা খেতেও পেয়াজ বেশ সুস্বাদু। পাকিস্তানের পাঠানেরা নাকি রুটির সঙ্গে কাঁচা পিয়াজ খেতে বেশি পছন্দ করে। অন্যদিকে কাঁচা পিয়াজ ছাড়া ভর্তা, আচার বা সালাদ হবে কী করে? পুষ্টিবিদদের মতে পিয়াজের সব গুণ পেতে হলে কাঁচা পেয়াজ খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাঁচা পিয়াজ সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। সর্দি-কাশিতে কাঁচা পিয়াজ নাকি বেশ উপকারী। ধর্মীয় কারণে আমাদের এলাকার হিন্দুদেরও এক সময় পিয়াজ খেতে দেখিনি, সনাতন হিন্দুদের অনেকে এখনও পিয়াজ খায় না। অনেকে আমরা স্বার্থ ছাড়া ধর্ম মানি না, ধর্ম মেনে কাঁচা রসুন আর পিয়াজ খাওয়া বন্ধ করা হলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এছাড়াও স্বাদ বা উপকারিতার কথা চিন্তা করে আমরা যে পিয়াজ খাই তা কিন্তু নয়, পূর্বপুরুষ থেকে খেতে খেতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি বলেই আমরা পিয়াজ খাচ্ছি। এখন পৃথিবীর অধিকাংশ লোক চিনি ছাড়া চা পান করে—এক সময় তা কল্পনাও করা যেত না।
[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com