দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আজকের (রোববার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।

দুঃখ প্রকাশ ও বক্তব্য প্রত্যাহার

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’—এই স্লোগানটি বুকে ও পিঠে লিখে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যিনি জীবন্ত পোস্টার হয়ে উঠেছিলেন সেই নূর হোসেনকে ইয়াবাখোর, ফেনসিডিলখোর আখ্যা দিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা বিপদে পড়েছেন। মশিউর রহমান রাঙ্গা ভাবতেও পারেনি যে, তার বক্তব্যের এমন তুমুল প্রতিবাদ হবে। নূর হোসেনের মায়ের দাবি মেনে নিয়ে মশিউর রহমান রাঙ্গা প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে এবং নূর হোসেনের পরিবারের সদস্যদের কাছে লিখিতভাবে তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও নিষ্কৃতি মিলেনি। জাতীয় সংসদে এ বিষয়ক আলোচনায় তাকে সংসদে দাঁড়িয়ে পুনরায় ক্ষমা চাওয়ার আবশ্যকতার কথা উল্লেখ করে অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যদের বিবৃতির পর রাঙ্গা সংসদেও ক্ষমা চেয়েছেন। নূর হোসেন মশিউর রহমান রাঙ্গার মতো কোন দলের রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, ছিলেন আওয়ামী লীগের একজন কর্মী। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে ক্ষমতাসীন জাতীয় পার্টির এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ অবরোধ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী নূর হোসেনের বুকে-পিঠে সাদা কালিতে লেখা ছিল—‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। খালি গায়ে পোস্টারের মতো কিছু লিখে প্রতিবাদের এমন রূপ ইতোপূর্বে দেখা যায়নি; তাই সবার নজর ছিল নূর হোসেনের দিকে। প্রতিবাদের মিছিলটি ঢাকা জিপিওর সামনে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি এলে পুলিশের গুলিতে নূর হোসেন নিহত হন।

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ভুল বা অপরাধ সাধারণ জনগণের ভুল বা অপরাধের নিক্তিতে মাপা হয় না। যৌন অনাচার পাশ্চাত্যে ধর্তব্যের মধ্যে ধরা না হলেও কোন সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের এমন আচরণ জনগণ ক্ষমা করে না। পাবলিক ফিগার না হলেও আমাদের দেশে প্রায় সবাই সবার ব্যক্তিগত জীবনাচরণ নিয়ে আলোচনা করে তৃপ্ত হয়। নূর হোসেন মশিউর রহমান রাঙ্গার মতো কোন পাবলিক ফিগার নন। তাই তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সত্যাসত্য যা ইচ্ছে তাই বলা ভব্যতাবহির্ভূত। নূর হোসেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জাতীয় পার্টির ক্ষমতায় থাকাকালীন পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেছেন, এ মৃত্যুর পেছনে নূর হোসেনের ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান জড়িত ছিল না। একজন শহীদ সম্পর্কে লাগামহীন কথাবার্তা বলা রাঙ্গার উচিত হয়নি। নূর হোসেনকে যখন গুলি করা হয় তখন ‘ইয়াবা’ নামে কোন মাদকের নাম আমরা শুনিনি। আমাদের দেশে ইয়াবা এসেছে নূর হোসেনের মৃত্যুর অনেক পরে। এছাড়াও ইয়াবা যখন প্রথম আসে তখন তা সংগ্রহ করা নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। নূর হোসেন ছিলেন পরিবহন শ্রমিক। তাই নূর হোসেনকে ‘ইয়াবাখোর’ বলে মিথ্যা কলঙ্কারোপ করা হয়েছে। এছাড়াও প্রচলিত রীতি অনুযায়ী মৃত ব্যক্তি নিয়ে কুৎসা রটনা অনুচিত; কারণ নূর হোসেনের পক্ষে রাঙ্গার কথার উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।

রাজনৈতিক ব্যক্তিরা রাজনীতির মাঠে বিভিন্ন রাজনীতিবিদদের নিয়ে অনর্গল কথা বলে থাকেন, আজকাল রাজনীতিবিদদের কথা মানুষ বিশ্বাস করে না বলে জনগণ এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে তা বের করে দেয়। এরশাদ সাহেব তো সকালের সিদ্ধান্ত বদলাতে বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন না। শাহ আজিজুর রহমান তো বলেই গেছেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। যাদের কথার রেশ থেকে যায় তাদের কথা নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনারও প্রয়োজন নেই। এক দলের নেতা আরেক দলের নেতাকে নিয়ে যা ইচ্ছে তা বলুক, আমাদের তাতে কিচ্ছু যায় আসে না, কিন্তু নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগী নূর হোসেন সম্পর্কে এমন অসত্য বক্তব্য কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

অষ্টম শ্রেণি পাস, ২৫ বছরের টগবগে যুবক নূর হোসেন ছিল একজন শ্রমিক। বুকে-পিঠে লেখা থাকার জন্য নূর হোসেন পুলিশের গুলির টার্গেট হতে পারে মর্মে শেখ হাসিনা মিছিল থেকে ডেকে তাকে সতর্ক করেছিলেন; নূর হোসেনের উত্তর ছিল, ‘আপা আপনি আমাকে দোয়া করুন, আমি গণতন্ত্র রক্ষায় আমার জীবন দিতে প্রস্তুত’।

এরশাদ সাহেব পরবর্তীতে নূর হোসেনের মৃত্যু নিয়ে উল্লেখ করেন যে, ‘নূর হোসেনকে পরিকল্পনা করে সরকারের তরফ থেকে গুলি করা হয়নি, নূর হোসেনকে গুলি করে সরকার নিজের পতন নিজে ডেকে আনতে পারে না’। এরশাদ সাহেব নূর হোসেনের পিতা, মাতার সঙ্গে দেখা করে সমবেদনাও জানিয়েছেন। শেখ হাসিনা তাদের পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার ব্যবস্থা করে দিলেও তারা মশিউর রহমান রাঙ্গার মতো ক্ষমতাবান ও সম্পদশালী নন। এছাড়া রাজনীতির মাঠে তার পরিবারের কেউ রাঙ্গার প্রতিপক্ষও নন। তাই মৃত নূর হোসেন সম্পর্কে কটূক্তি করে গরিব, দুঃখী পরিবারের জীবিত সদস্যদের মনে আঘাত দেওয়া বালকসুলভ কাজ হয়েছে। দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষের হৃদয়ে নূর হোসেনের আত্মত্যাগের মহিমান্বিত আসন গ্রথিত, মশিউর রহমান রাঙ্গার কথায় তা টলবে না, মলিনও হবে না। নূর হোসেনদের গুলি করে মারা যায় না, নূর হোসেনদের ক্ষয় নেই, মৃত্যু নেই, এরা জাতির দুঃসময়ে ফিনিক্স পাখির মতো বারবার জেগে উঠে। তবে এদের মৃতদেহকে অশুভ শক্তি ভয় করে। আত্মত্যাগী এই লোকগুলোকে তাই সান্ধ্য আইন জারি করে সবার অগোচরে নির্জনে কবর দেওয়া হয়। নূর হোসেনকেও বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে পুলিশ ভ্যানে করে নিয়ে রাতের আঁধারে সবার অগোচরে জুরাইনে কবর দেওয়া হয়েছে।

কবি শামসুর রাহমান নূর হোসেনকে নিয়ে যে তিনটি কবিতা লিখেছেন তার একটির মধ্যে উল্লেখ করেছেন, ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’। নূর হোসেনের বেবিট্যাক্সিচালক বাবা মজিবুর রহমান ও তার মা মরিয়ম বিবি বাঙালি জাতির নিকট থেকে যে শ্রদ্ধা, সম্মান পেয়েছেন তা অনেক জাঁদরেল রাজনৈতিক নেতাও পেয়েছেন বলে মনে হয় না। গণতন্ত্রের জন্য জীবনদানকারী নূর হোসেনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ। সংসদে রাঙ্গাকে অনেকে ‘অর্বাচীন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। অর্বাচীন বলেই জাতীয় পার্টিও রাঙ্গার বক্তব্যের দায়িত্ব নিতে অসম্মতি জানিয়েছে। রাঙ্গার এমন বক্তব্যে জাতীয় পার্টি বলেছে, ‘আমরা দুঃখিত ও লজ্জিত’।

আমার কাছে অদ্ভুত মনে হয় যখন একটি দলের মহাসচিব বক্তব্য দেওয়ার পর তার দল তা মানে না। এমনতর হলে তিনি তার দলের মহাসচিব থাকেন কী করে? হঠাৎ হট হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সাজার কোন মানে হয় না; ট্রাম্প কিন্তু ঠাণ্ডা মাথায় পাগলামি করে থাকেন। পাগলকে মানসিক রোগী বলা হলে তাদের আত্মসম্মানে লাগে, তারা ক্ষেপে যায়। বাংলাদেশে ১৬ শতাংশ বা দুই কোটির বেশি লোক মানসিক রোগী, এই রোগীদেরও বিশ্বাস করানো যাবে না যে, নূর হোসেন মাদকাসক্ত ছিলেন।

অকুতোভয় যুবক নূর হোসেন ছিল বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। নূর হোসেন মৃত হলেও তার ত্যাজ-এ এখনও অপরাধীরা ভস্মীভূত হয়। নূর হোসেন প্রতিবাদের মূর্ত প্রতীক, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিপর্যয় হলেই বুকে-পিঠে লেখা নূর হোসেনের ছবি গণতন্ত্রকামীদের নিকট মূর্ত হয়ে উঠে। আমাদের শহীদ মিনারও প্রতিবাদের পীঠস্থান। লাঞ্ছিত, বঞ্চিত ব্যক্তিও শহীদ মিনারে গিয়ে প্রতিবাদের ভাষা ও সাহস খুঁজে পায়। তাই ফ্রেমে বাঁধা নূর হোসেনের ছবিও স্বৈরাচারদের ভীত করে। এরশাদ সাহেবের পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আমার মেজ ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপপ্রধান স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পান। বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাদের নোয়াখালীর এমপি সদস্য জিয়াউল হক জিয়া নিউইয়র্কে মেজ ভাইয়ের অফিসে গিয়ে নূর হোসেনের বুকে-পিঠে লেখা ছবিটি টাঙানো অবস্থায় দেখতে পান। আরেকটি ঐতিহাসিক ছবিও ছিল— অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের পাশে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া একই সময় একই ভঙ্গিতে ঘোমটা দিচ্ছিলেন। নূর হোসেনের ছবি টাঙানো দেখে জিয়াউল হক জিয়ার মাথায় রক্ত উঠে যায়, দেশে এসে নালিশ করার পর মেজ ভাইকে বিএনপি সরকার চাকরিচ্যুত করে। নূর হোসেনের ছবি বিএনপি’কেও আতঙ্কিত করে; কারণ মৃতদেহের লেখা সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে তোলা গেলেও ফ্রেমে বাঁধা ছবি থেকে তো বুকে-পিঠে খোদিত লেখাটি তোলা যায় না। জাতীয় পার্টি মহাজোটে আওয়ামী লীগের সঙ্গে একীভূত হয়ে কিছুদিন আগেও সরকার পরিচালনা করেছে, ভাগাভাগির সেই মন্ত্রিসভায় মশিউর রহমান রাঙ্গাও ছিলেন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, নূর হোসেনের আত্মত্যাগের কারণেই খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী। মহাজোটের আমলে নূর হোসেনের বিরুদ্ধে এমন অবমাননাকর বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়, গণতন্ত্রে কারও আস্থা নেই।

বাংলাদেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই নূর হোসেনের নাম জানে। নূর হোসেনকে যেখানে গুলি করা হয়েছে সেই জিরো পয়েন্ট হয়েছে আজ ‘নূর হোসেন চত্বর’, আর ১০ নভেম্বর হচ্ছে ‘শহীদ নূর হোসেন দিবস’। নূর হোসেনেরা কখনও সচিব, মন্ত্রী, চিফ হুইপ হয় না, এরা অন্যদের চিফ হুইপ করার জন্য জীবন বিলিয়ে দেয়। বর্তমান সংসদ গড়ে উঠার পেছনেও নূর হোসেনের অবদান রয়েছে।

যাদের আত্মত্যাগে অর্জিত সংসদে দাঁড়িয়ে সংসদ সদস্যরা বক্তব্য দিচ্ছেন তাদেরও অপমান করলেন বিরোধীদলীয় এই চিফ হুইপ। কথাবার্তায় সংযত হলে জনরোষে পড়ে নিজের অবস্থান থেকে পশ্চাদপসরণপূর্বক দুঃখ প্রকাশ করার প্রয়োজন হতো না, বলা কথা প্রত্যাহার বা ফিরিয়ে নেয়ার লজ্জায় পড়তে হতো না। রাঙ্গা তো রাজনীতিতে কিছুটা পরিপক্ব, অনেক দিন থেকেই রাজনীতি করছেন—মৃত নূর হোসেনের সঙ্গে রাগারাগি করে মনের খেদ মেটানোর মতো বোকামি করার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখছি না। জাতীয় পার্টির ক্ষমতায় থাকাকালীন পুলিশের গুলিতে মরেছে বলেই তো নূর হোসেন আজ জাতির কাছে স্মরণীয়, বরণীয়; তিনি তো রাঙ্গা সাহেবের প্রতিযোগী নন যে তাকে ঈর্ষা করতে হবে, বক্তব্য দিয়ে হেয় করতে হবে।

জাতীয় পার্টিও ‘গণতন্ত্র দিবস’ হিসেবে এই দিনটি পালন করে এবং এরশাদ সাহেব ১৯৯৬ সনে নূর হোসেনের মৃত্যুর জন্য জাতীয় সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। নূর হোসেনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার নামে স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করা হয়েছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন ‘শহীদ নূর হোসেন দিবস’টির অকুতোভয় যোদ্ধা নূর হোসেনকে নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্মরণ করে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেখানে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ভাস্কর্য রয়েছে তাদের পাশে স্থান পেয়েছে বুকে-পিঠে সেই অমর বাণী সংবলিত শহীদ নূর হোসেনের ভাস্কর্য। জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত, জনতার কাছে নন্দিত নূর হোসেনের সাহসী আত্মদানের ঘটনাকে এভাবে অবমাননা করার পর মশিউর রহমান রাঙ্গা সম্পর্কে জনগণের মনে যে বিরূপ ধারণার জন্ম হয়েছে তা শিগগিরই মুছবে বলে মনে হয় না।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com