দৈনিক সংবাদের প্রকাশিত আজকের (রোববার, ১০ নভেম্বর ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।
অনুভূতির খেসারত
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর প্রবল অনুভূতিসম্পন্ন কিছু মুসলমানের অকস্মাৎ পরিচালিত অত্যাচার, নির্যাতন থামছে না। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) সম্পর্কে ফেসবুকে কটু কথা বলার অভিযোগে অতি সম্প্রতি ভোলায় হাজার হাজার মুসলিম জনতা হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করে তাদের মারধর করেছে, বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে। যিনি এমন একটি দাঙ্গায় ভিকটিম হয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো পক্ষে এর বীভৎস ও ভয়ঙ্কর রূপ বর্ণনা করা সম্ভব নয়। বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর পক্ষে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফেরত এসে এ দেশকে পুনরায় নিজের দেশ ভাবতে কষ্ট হওয়ার কথা। বিনা বাধায় ঘরবাড়ি পিটিয়ে, আগুন লাগিয়ে দস্যুর মতো হৈ হৈ রৈ রৈ রবে উল্লাস করা লোকগুলোর কাছে ভিন্নধর্মাবলম্বী মানুষগুলো তখন শিশুর মতো অসহায় হয়ে পড়ে। জোটবদ্ধ ক্রোধান্ধ মানুষগুলোর সামনে তারা তখন তাদের ঈশ্বরকে ডাকতেও ভুলে যায়। লাঠি হাতে উন্মত্ত ধর্মান্ধ প্রতিটি লোক তখন সাক্ষাৎ যম। তখন এই ধর্মান্ধ লোকগুলো হিন্দু কতল করে সরাসরি বেহেশতে যাওয়ার সুখ-কল্পনায় মশগুল। মানুষ হত্যা করে বেহেশতে যাওয়ার এমন বাসনা কবে কখন মানবহৃদয়ে প্রোথিত হলো তা গবেষণার বিষয়। তবে ধর্ম আসার আগেও মানুষ মানুষকে হত্যা করেছে, এখনো করছে। স্বার্থের দ্বন্দ্বে ভাই ভাইকে, পিতা ছেলেকে, স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে। শুধু ক্ষমতার জন্য আওরঙ্গজেব তার ভাইদের হত্যা করেছে, পিতাকে বন্দী করেছে। কিন্তু ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট না থাকা সত্ত্বেও শুধু ধর্মের কারণে মানুষ হত্যা— ভাবলেই শিহরিত হতে হয়। ভারতেও মাঝে মাঝে ধর্মের কারণে মুসলমান নিধন হয়। শুধু গরুর মাংসের উছিলা ধরে কয়েক দিন আগে উগ্র ও ধর্মান্ধ হিন্দুরা মুসলমান নিধন করেছে। ধর্মের বাহানায় ভিন্নধর্মাবলম্বীকে নির্বিচারে হত্যা করার নজির ভূরিভূরি; ধর্মের কারণে পৃথিবীতে যত লোক খুন হয়েছে অন্য কোন একক কারণে তত লোক মরেনি। হিন্দু, মুসলমানের দাঙ্গায় বাড়িঘর আক্রমণে যে একটি অসহনীয় আতঙ্কের সৃষ্টি হয় তার ভয়াবহতা অন্য কোন আতঙ্কের সাথে তুলনীয় নয়।
ভোলার বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের একজন হিন্দু যুবকের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে নবী করিম (স.) সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যের পোস্ট করেছিল এক মুসলিম যুবক। হিন্দু ছেলেটি তার ফেসবুক আইডি হ্যাক হওয়ার পর তার আইডিতে আজেবাজে লেখা দেখতে পায়; যা সে পোস্ট করেনি। তখন সে এর ভয়াবহ অবস্থা কল্পনা করে মুক্তি পাওয়ার আশা নিয়ে বন্ধুদের কাছে ছুটে যায়, বন্ধুরা সমস্যার সমাধান করতে না পারার কারণে সে থানায় গিয়ে পুলিশের সাহায্য প্রার্থনা করে, থানায় অবস্থানকালীন আইডি হ্যাকার মুসলমান ছেলেটি হিন্দু ছেলেটিকে ফোন করে দুই হাজার টাকা দাবি করে। এই ফোনের সূত্র ধরে আধুনিক কলাকৌশল প্রয়োগ করে হ্যাকার মুসলমান ছেলেটিকে পুলিশ গ্রেফতার করে এবং উন্মত্ত জনতা থেকে বাঁচানোর জন্য শুভকে থানায় আটক করে রাখা হয়। সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার করা সত্ত্বেও ভোলার তৌহিদি মুসলিম জনতা নবী করিম (স.)-এর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনার বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হতে থাকে। অতীতের এসব ঘটনার অভিজ্ঞতায় পুলিশ প্রশাসন ভোলায় সজাগ হয়ে উঠে; নবীজীর বিরুদ্ধে মুসলমান ছেলের দ্বারা কুৎসা রটনা যেন হিন্দুদের ওপর না গড়ায় সেজন্য পুলিশ প্রশাসন কর্তৃক ঘটনার আগের দিন ভোলায় নেতৃস্থানীয় আলেম ও মুসল্লিদের সাথে বৈঠক করে সত্যিকার ঘটনা অবহিত করা হয়। আলেমরা কথা দিয়েছিলেন, মিটিং হলেও কোন অঘটন ঘটবে না। কিন্তু ধর্মের জেহাদি জোশ থামানো কঠিন।
তৌহিদি জনতার আক্রমণের ভিডিওটি আমি দেখেছি—ভিডিওতে দেখলাম, যাদের পোশাক-পরিচ্ছদ ও সুন্নতি চেহারায় তৌহিদি জনতা বলে মনে হয়েছে তাদের কারো হাতে লাঠি ছিল না, তারা পুলিশদের আক্রমণও করেননি, বরং আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা করেছেন। যাদের পোশাক-পরিচ্ছদ ও লেবাসে তৌহিদি মুসলমান মনে হয়নি তাদের চোখে-মুখে আক্রোশ ছিল গগনচুম্বী, তারা আলেমদের ব্যূহ ভেদ করে দোতলায় উঠে যায়, নিচ থেকে কিছু লোক লাঠি নিক্ষেপ করে ঐ যুবকদের হাতে লাঠি তুলে দেয় এবং লাঠিয়ালেরা পুলিশদের খুঁজে বের করার জন্য সবগুলো রুমের দরজা ভাঙ্গতে থাকে। কয়েকটি দরজা ভাঙার পর পুলিশ একটি রুম থেকে বের হয়ে গুলি করলে চারজন তৌহিদি মুসলমান মারা যান। একজন পুলিশের বাহু থেকে অবিরত রক্ত ঝরতেও দেখলাম, তাকেও জনতার তরফ থেকে গুলি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে নিহত চার জন তৌহিদি জনতার মধ্যে দুইজনের মাথা থেঁতলানো ছিল; জনতার দাবি মেনে নিয়ে এদের কারো ময়নাতদন্ত না করেই কবরস্থ করা হয়। এখন উক্ত দুইজন কীভাবে নিহত হলেন তা আর বের করার কোন উপায় থাকলো না। যারা দোতলায় গিয়ে দরজা ভেঙে পুলিশের খোঁজ করেছে তাদের কেউই জানে না ফেসবুকে নবীজীর বিরুদ্ধে কী কুৎসা রটনা করা হয়েছে। এ ধরনের কিছু যুবক সব সম্প্রদায়েই রয়েছে, এদের অনেককে ধর্ম পালন করতে দেখা যায় না, কিন্তু ধর্মের বিপক্ষে কেউ কিছু বলেছে শুনলেই মালকোঁচা মেরে লাঠি হাতে শত্রুনিধনে ছুটে যায়। এরা কট্টর, উগ্র, ধর্ম সম্পর্কে এদের খুব বেশি লেখাপড়া নেই। মারদাঙ্গা টাইপের এই লোকগুলো সমাজে কিছু লোকের কাছে খুব প্রিয়, স্বার্থ উদ্ধারে এদের যে কোন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লাগানো যায়। ভোলায় আলেমরা থেমে গেলেও কিছু যুবককে কোনভাবেই থামানো সম্ভব হয়নি।
২০১২ সনে রামুতেও উত্তম বড়ুয়া নামের এক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী তরুণের নামে একটা ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করায় মুসলিম তৌহিদি জনতা বৌদ্ধপল্লীতে অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ করে ঊনিশটি বৌদ্ধমন্দির ধ্বংস করে। পরে উত্তম বড়ুয়া নামের কোন লোকের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরেও ঠিক একই প্রক্রিয়ায় রসরাজের নামে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে ইসলাম ধর্মকে নিয়ে কটূক্তি করায় স্থানীয় জনতা তাকে পিটিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়, জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসার পর জানা গেল রসরাজ ফেসবুক চালাতে জানে না। স্থানীয় মুসলমান রসরাজকে পিটিয়ে শান্ত থাকেনি, হিন্দুদের বাড়িঘর, দোকানপাটে লুটপাট, ভাঙচুর এবং মন্দিরে অগ্নিসংযোগও করছে। পরের বছর একই ঘটনা ঘটল রংপুরের গঙ্গাচড়ায়—হিন্দু তরুণের ফেসবুকে থেকে নবীকে অবমাননার অভিযোগ; হিন্দুদের বাড়িঘরে আবার ভাঙচুর, আবার অগ্নিসংযোগ। নাসিরনগরের রসরাজ বা রংপুরের টিটু রায় যদি অপরাধীও হয় তাদের গ্রেফতার করার পর সাধারণ নিরপরাধ হিন্দুদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের কোন কারণ থাকতে পারে না। অসত্য, বিকৃত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্যের মাধ্যমে কারো চরিত্রহনন ও কলঙ্কলেপন, ধর্মের অপব্যাখ্যা ও ধর্মানুভূতিতে আঘাত এবং গুজব রটিয়ে সমাজ বা রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা ও হাঙ্গামা-দাঙ্গা সৃষ্টি করা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ। কোন সুস্থ মস্তিষ্ক ও বিবেকবোধসম্পন্ন মানুষ এমন সমাজ ও রাষ্ট্রবিধ্বংসী কাজ করতে পারে না।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়; সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এলাকাগুলো নিয়ে পাকিস্তান এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে হয় ভারত। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে এই বিভক্তি হিন্দু মুসলমানকে আলাদা আলাদা ভূখণ্ডে আবদ্ধ করতে সমর্থ হয়নি; অসংখ্য হিন্দু মুসলমান তাদের নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করে নবগঠিত ধর্মীয় রাষ্ট্রে হিজরত করার পরও অগণিত হিন্দুকে পাকিস্তানে এবং অনেক মুসলমানকে হিন্দুস্তানে থেকে যেতে হয়েছে। নিজের মাতৃভূমিতে এই থেকে যাওয়াটাই যেন এখন সংখ্যালঘুদের অপরাধ।
বাস্তুচ্যুত করে সব মুসলমানকে পাকিস্তানে এবং সব হিন্দুকে হিন্দুস্তানে অভিবাসন করা অবাস্তব বিবেচনা করে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ধর্মের ভিত্তিতে এই বিভক্তি মেনে নিতে পারেননি। তিনি তার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে ‘India Wins Freedom’ বা ‘ভারত স্বাধীন হলো’ নামে একটি বই লিখেছেন, এ বইয়ের কিছু পৃষ্ঠা তার ইচ্ছে অনুযায়ী তার মৃত্যুর ৩০ বছর পর প্রকাশ করা হয়। তিনি আক্ষেপ করে উল্লেখ করেছিলেন যে, কংগ্রেসের সভাপতির পদ জওহরলাল নেহরুকে না দিয়ে যদি তিনি ধরে রাখতেন তাহলে ভারতবর্ষ এভাবে ধর্মভিত্তিক ভাগ হতো না। কারণ পাকিস্তানকে হিন্দুশূন্য করা বা ভারতকে মুসলমানশূন্য করা কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বিভক্তকারীরা জেনেশুনে এমন অবস্থার সৃষ্টি করে গেছেন বলেই আজ বাংলাদেশে ফেসবুক এবং ভারতে হোয়াটসঅ্যাপ পোস্টকে কেন্দ্র করে সহিংসতা এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
জাতিতে জাতিতে, সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে বিদ্বেষ সৃষ্টির প্রধান কারণ নিজের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে অন্য ধর্মের অসারতা প্রতিপন্ন করা এবং রাজনীতির অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে ধর্মের ব্যবহার। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর বসবাসে গড়ে ওঠা একটি দেশে বিপরীতধর্মী ধর্মগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে দেশ শাসন করা কঠিন। ধর্মে থাকুক বা না থাকুক, ভারতীয় সমাজে গরু দেবতা হিসেবে পূজনীয়। এখন এ গরু পৃথিবীর অধিকাংশ লোক ভক্ষণ করে থাকে; দেবতা রূপ গরুকে খাওয়ার জন্য যখন কেউ ভক্তের সম্মুখে জবাই করে তখন হিন্দুদের অনুভূতিতে লাগার কথা। গরুকে দেবতাজ্ঞানে ভক্তি-শ্রদ্ধা করার বিপক্ষে অসংখ্য যুক্তি দাঁড় করানো সম্ভব। প্রতিটি ধর্মে এমন অনেক বিষয় আছে যা যুক্তিনির্ভর নয়; ধর্ম অনেকটা বিশ্বাসনির্ভর। হিন্দুরা অসংখ্য দেবদেবীর মূর্তি গড়ে তাদের অবনত মস্তকে প্রণাম ও পূজা করে থাকে। আমাদের ইসলাম ধর্ম মূর্তিপূজাবিরোধী, আমাদের দেশে ওয়াজ নসিহতে অহরহ মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে বলা হয়—এক্ষেত্রেও তো হিন্দুদের অনুভূতিতে লাগার কথা। হিন্দুদের অনুভূতিতে লাগলেও আলেমদের কিছু করার নেই, কারণ ইসলামের প্রতিষ্ঠা হয়েছে মূর্তিপূজা ধ্বংস করে, মূর্তিপূজার অনুমোদন ইসলাম দিতে পারে না। অন্যদিকে গান, বাজনা, ঢোল, বাদ্য সবই ইসলামে নাজায়েজ—হিন্দুদের পূজা-পার্বণে এসবের উপস্থিতিও মুসলমানের অনুভূতিতে আঘাত করার কথা; কিন্তু এগুলো এ দেশের মুসলমানেরা সহ্য করছে। সহ্য করার আরেকটি কারণ মুসলমানরাও গান-বাজনা করে থাকে। পাশ্চাত্যের অনেক দেশে আজানের আওয়াজ মসজিদের বাইরে প্রচার নিষেধ, কারণ ওই সব দেশে শব্দদূষণকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আজানের উৎপত্তি হয়েছে নামাজে মুসলমানদের আহ্বান জানানোর জন্য। তাই আজানের আওয়াজ মসজিদের বাইরে যেতে বাধা দেয়াতে মুসলমানের অনুভূতিতে আঘাত লাগার কথা। কিন্তু এতে পাশ্চাত্যের মুসলমানদের অনুভূতিতে লাগে না; আজানের মাহাত্ম্য রক্ষায় ওখানকার মুসলমানেরা মারদাঙ্গা হয় না। কারণ তারা জানে, ওখানে মুসলমানেরা বাংলাদেশের হিন্দুদের মতো সংখ্যালঘু, মারদাঙ্গা হলে মার খেতে হবে। আজানের আওয়াজ শব্দদূষণ করে—এমন একটি কথা আমাদের দেশে বলা হলে তৌহিদি মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতি ভূমিকম্পের মতো কম্পন সৃষ্টি করত। তাই রুদ্রমূর্তি ধারণের যত অনুভূতি সব সংখ্যাগরিষ্ঠের, কোন দেশেই সংখ্যালঘুদের কোন ধর্মীয় অনুভূতি নেই; বাংলাদেশে হিন্দুরা একতরফা মার খায়, ভারতে খায় মুসলমান। অনুভূতিতে আঘাত লাগার কারণে একদিকে ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করা হয়, অন্যদিকে হত্যাকারীকে নিরস্ত্র করতে গেলেও আবার ধর্মীয় অনুভূতি সংবেদনশীল হয়ে উঠে। অমৃতসরের ‘স্বর্ণমন্দিরে’ সশস্ত্র অভিযানের আদেশ দেওয়ার কারণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে মৃত্যুবরণ করতে হয়; কারণ এ অভিযানে প্রধানমন্ত্রীর প্রহরী শিখের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছিল।
‘লর্ড মাউন্টবেটন’ সিনেমায় দেখা যায়, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিষ্ক্রিয় ও নির্লিপ্ত হয়ে দাঙ্গার পাশে দাঁড়িয়ে খোশগল্প করছে, পাশে হিন্দু মুসলমানকে, মুসলমান হিন্দুকে পিটিয়ে মেরে ফেলছে, জবাই করছে; এ অবস্থায় জওহরলাল নেহরু পুলিশ থেকে লাঠি নিয়ে দাঙ্গা প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন। মনে হচ্ছে, শেখ হাসিনাকেও এমন লাঠি নিয়ে নামতে হবে। হাসিনা নামলে শুধু দাঙ্গা থামবে না, দাঙ্গাবাজদের মন-মানসিকতায় ইতিবাচক পরিবর্তনও আসতে পারে। কারণ দাঙ্গাবাজদের মধ্যে আওয়ামী লীগের লোকও রয়েছে।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ ও ভারতে যে কয়টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রে ইন্ধন জুগিয়েছে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার ক্ষেত্রে এই মাধ্যমগুলোর ভূমিকার জন্য ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইউটিউবকে দায়ী করে এগুলো বন্ধ করে দেওয়ার যুক্তি ইদানীং অনেকে তুলে ধরছেন। কিন্তু এ মাধ্যমগুলোই এখন তথ্য সরবরাহ, জ্ঞানবিকাশ ও সমৃদ্ধকরণের অন্যতম উৎস। এছাড়াও এ মাধ্যমগুলোর মাধ্যমেই প্রতিটি অ্যাকাউন্টধারী নিজের মতপ্রকাশে স্বাধীনতা ভোগ করছে। তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় কিছু মানুষ আবেগের বশবর্তী হয়ে অনুভূতির তাড়নায় মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে অন্যের জীবনের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফেসবুকে যে কেউ নামে-বেনামে যত ইচ্ছে তত অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে। কয়েক দিন পূর্বে আমার নামে একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে আমার ফেসবুক বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধু হওয়ার বাসনা ব্যক্ত করে রিকুয়েস্ট পাঠানো হয়, কয়েকজন তার রিকুয়েস্ট গ্রহণও করে। আমার কয়েকজন বন্ধু আমার আসন্ন বিপদ নিয়ে আমাকে সতর্ক করতে থাকে। কিন্তু বিষয়টি আমি খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করিনি, হুঁশ হয়েছে ভোলার ঘটনার পর। কারণ আমার নামে অ্যাকাউন্ট খোলার কিছুদিন আগে কারবালার যুদ্ধ নিয়ে কলাম লিখে আমি কিছু লোকের বিরাগভাজন হয়েছিলাম; তারা সম্ভবত ভোলার হিন্দু ছেলেটির মতো আমাকে বিপদে ফেলার ফন্দি আঁটছিল। এমন ভুয়া আইডি বন্ধ করতে কমপক্ষে একশ’ অ্যাকাউন্টধারীকে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে হয়। কিন্তু আমার বন্ধুদের অনেকেই অভিযোগ কীভাবে করতে হয় তাও জানে না, আমিও জানি না। তাই আমাদের মতো অজ্ঞ লোকদের জনতার পিটুনি থেকে বাঁচার একটিই পথ—ফেসবুকের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া।
[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com