দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার আজকের (২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯) কলাম। উপসম্পাদকীয়:
তাজিয়া মিছিলে পদদলন
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
পর্ব-২
ইসলামের পঞ্চম খলিফা মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে কিছু মুসলমানদের অভিযোগ হচ্ছে, তিনি তার পুত্র ইয়াজিদকে খলিফা নির্বাচন করে রাজতন্ত্রের সূচনা করেন। কিন্তু তাদের অভিযোগ পুরাপুরি সত্য বলে মনে হয় না। কারণ তখনকার দিনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে কেউ খলিফা হননি, সমাজের প্রভাবশালী ও বিশিষ্টজনদের সমর্থনের ভিত্তিতে খলিফা হয়েছেন। সেই বিবেচনায় মুয়াবিয়া খলিফা নির্বাচনে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি কিছুটা হলেও পরিপালন করেছেন। জীবনসায়াহ্নে বিশিষ্ট সাহাবি হজরত মুগিরা ইবনে শুবা (রা.)-এর পরামর্শে হজরত মুয়াবিয়া (রা.) তার জীবদ্দশায় একজন খলিফা নিযুক্ত করে যাবার বাসনা ব্যক্ত করে সব গভর্নর বা আমিরের কাছে পত্র প্রেরণ করেন এবং পত্রে এ মর্মে অনুরোধ করেন যে, তার মৃত্যুর পর কাকে খলিফা করা শ্রেয় হবে সে ব্যাপারে যেন তারা তাদের অভিমত ব্যক্ত করেন। কুফা, বসরা, সিরিয়া, মিসরসহ বেশিরভাগ আমির ইয়াজিদের পক্ষে রায় দেন। মক্কা ও মদিনার আলাদা গুরুত্ব বিবেচনা করে মুয়াবিয়া (রা.) স্বয়ং এই দুই স্থানে উপস্থিত হয়ে সেখানকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.) এ মর্মে মুয়াবিয়াকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, সব লোক স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নিলে তাদের কোনো আপত্তি থাকবে না। তবে আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের (রা.) এবং হোসাইন ইবনে আলী (রা.) ইয়াজিদের ক্ষমতারোহণের বিরোধিতা করেন। মুয়াবিয়ার (রা.) মৃত্যুর পর ইয়াজিদ ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নতুন খলিফার প্রতি মক্কা ও মদিনার বিশিষ্টজনদের আনুগত্য প্রকাশের আহ্বান জানান। হজরত আবু বকর (রা.)-এর পুত্র আবদুর রহমান ও হজরত ওমর (রা.)-এর পুত্র আবদুল্লাহ ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মেনে নেন। রাজতন্ত্র তো এখনও অধিকাংশ দেশে দেখা যায়, রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র তো এখনও প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। দ্বিতীয়ত, হযরত আলীর (রা.) মৃত্যুর পর ইমাম হাসান (রা.) বা ইমাম হোসাইন (রা.) খেলাফতের সত্যিকার দাবিদার বলে যারা বলেন তারাও তো রাজতন্ত্রই কায়েমের পক্ষেই বলেন। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, রাসুল (সা.)-এর কাছে হজরত মুয়াবিয়া (রা.) এতই নির্ভরযোগ্য ছিলেন যে, তিনি তাকে ওহি লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। রাসুল (সা.) থেকে তার সূত্রে ১৬৩টি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। মুয়াবিয়াকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে এবং তাকে পথপ্রদর্শক হিসেবে কবুল করতে রাসুল (সা.) আল্লাহর কাছে প্রার্থনাও করেছিলেন (তিরমিজি, হা. ৩৮৪২)। মুয়াবিয়া যে আমির হবেন তা রাসুল (সা.) একবার উল্লেখও করেছিলেন (মুসনাদে আহমাদ হা. ১৬৯৩৩)। মুয়াবিয়ার ন্যায়পরায়ণতা ও দক্ষতার জন্য হজরত ওমর (রা.) তাকে দামেস্কের আমির নিযুক্ত করেছিলেন; অন্যদিকে হজরত ওসমান (রা.) করেছিলেন সিরিয়ার আমির। তার দীর্ঘ ২৫ বছর খেলাফতের দায়িত্ব পালনে ৬৫ লাখ বর্গমাইল বিস্তৃত অঞ্চল ইসলামের পতাকাতলে চলে আসে।
ইয়াজিদের নিষ্ঠুরতা নিয়েও আলেম ও পণ্ডিতদের মধ্যে মতদ্বৈধতা রয়েছে। কারও কারও বক্তব্য হচ্ছে, ইয়াজিদকে যেভাবে নিষ্ঠুর, মদ্যপ, চরিত্রহীন, মুনাফেক, দুশ্চরিত্র, কাফের হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে তিনি তেমন খারাপ লোক ছিলেন না। ক্ষমতার লোভে ইয়াজিদ যুদ্ধ করলেও ইমাম হোসাইনকে হত্যা ও তার মাথা কর্তন করে থালায় রেখে যেভাবে লাঠি দিয়ে খেলা করা হয়েছে তার জন্য কুফার গভর্নর ওবাইদুল্লাহ যিয়াদ দায়ী। হোসাইন (রা.)-এর খণ্ডিত মস্তক ইয়াজিদের কাছে নয়, কুফার গভর্নর ওবায়দুল্লাহুর কাছে নেয়া হয়েছিল। ইয়াজিদ এত নিষ্ঠুর হলে কারবালা যুদ্ধে বন্দী ১২ জনের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে ইয়াজিদ তাদের সসম্মানে মদিনায় পাঠিয়ে দিতেন না। ইমাম হোসাইনের বন্দী বোন হজরত জয়নাব (রা.) দরবারে দাঁড়িয়ে ইয়াজিদকে ভর্ৎসনা করলেও ইয়াজিদ ছিলেন নিশ্চুপ। অনেকে বলেন, ইমাম হোসাইনের মৃত্যুতে ইয়াজিদ জনরোষের ভয়ে ছিলেন বলে বন্দীদের হত্যার ঝুঁকি নেননি। কিন্তু ইয়াজিদকে যেভাবে নিষ্ঠুর করে চিত্রায়িত করা হয়েছে তা সত্য হলে ইমাম হোসেনের বোনসহ বাকি বন্দীদের হত্যা করতে তার হৃদয় কাঁপার কথা নয় অথবা যুদ্ধে বিজয়ী ইয়াজিদের সম্ভাব্য জনরোষ জেগে উঠার আশঙ্কায় ভয় পাওয়ার কথাও নয়।
মহানবী (সা.)-এর চাচা হামজা (রা.)-এর লাশ চিরে কলিজা বের করে চিবিয়েছিল উমাইয়া দলপতি আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা। আবু সুফিয়ান ছিলেন মুয়াবিয়ার বাবা এবং হিন্দা ছিলেন মুয়াবিয়ার মা। আবার এরা দুজনই ছিলেন আমাদের নবী করিম (সা.)-এর শ্বশুর-শাশুড়ি। মুয়াবিয়ার বোন উম্মে হাবিবার (রা.) সঙ্গে মহানবীর বিবাহ সম্পাদিত হলে উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায়। তাই ইয়াজিদও মহানবী (সা.)-এর ঘনিষ্ঠতম আত্মীয়। আবু সুফিয়ান ও হিন্দা পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও হিন্দার দৌহিত্র ইয়াজিদকে বেশিরভাগ মুসলমান হিন্দার কারণেও ঘৃণা করেন। ইয়াজিদের সাড়ে তিন বছরের রাজত্বকালে প্রথম বছর কারবালার যুদ্ধ হয়, দ্বিতীয় বছর তিনি মদিনা এবং তৃতীয় বছর মক্কা আক্রমণ করেন। আনুগত্য স্বীকারে বাধ্য করতে মক্কা ও মদিনায় হামলা চালানোর সময় হাজার হাজার সাহাবিকে হত্যা এবং নারীদের ওপর গণধর্ষণ করার অভিযোগে অভিযুক্ত ইয়াজিদ। তবে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে সাহাবি হত্যার অভিযোগ তৎকালীন অবস্থা বিচারে গুরুতর বলে মনে হয় না। কারণ হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তার জামাতা আলী (রা.)-এর সংঘটিত উষ্ট্রযুদ্ধেও ১০ হাজার সাহাবির মৃত্যু হয়েছিল। সাহাবিরা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিক হিসেবে যুদ্ধ করেন তখন তাদের মৃত্যু অস্বাভাবিক নয়; অন্যদিকে যুদ্ধের সময় স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সর্বত্র মেয়েরা ধর্ষিত হয়েছে, এ জন্য শুধু মুয়াবিয়া বা ইয়াজিদকে দায়ী করা যথার্থ নয়।
অনেক মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকের মতে হোসাইনকে (রা.) ইয়াজিদ নিজ হাতে হত্যা করেননি, বরং ইমাম হোসাইনের মৃত্যুসংবাদ শুনে আফসোস করেছিলেন। শুধু ড. জাকির নায়েক নন, ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালীও ইয়াজিদকে সহি আকিদার একজন খাঁটি মুসলমান বলেছেন। মদ পান করা, বানর নিয়ে খেলা করা এবং আরও যে সমস্ত পাপ কাজের অপবাদ ইয়াজিদের প্রতি দেওয়া হয় তা সহিহ সূত্রে প্রমাণিত নয় বলে অনেক লেখক উল্লেখ করেছেন। অন্য আলেমেরা আবার এসব যুক্তি মানতে রাজি নন; তারা পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন যে, ইমাম হোসাইনের প্রতি ইয়াজিদ দরদি হলে হত্যাকারীদের তিনি বিচার করেননি কেন? ইমাম হোসাইনের প্রতি দরদ থাকলেও ক্ষমতা লাভের যুদ্ধে যারা বিজয় এনে দিয়েছেন তাদের বিচার করা ইয়াজিদের কাছে কখনও মুখ্য হিসেবে বিবেচিত হয়নি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, নবীর (সা.)-এর নাতি ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করার জন্য তখনকার সময়ের কোন মুফতি, ইমাম, সাহাবি, ইসলামিক পণ্ডিত ইয়াজিদকে মুরতাদ বা কাফির ঘোষণা করেছেন বলে জানা যায় না, বরং কয়েকশ’ বছর ধরে ইয়াজিদের বংশধরেরা রাজত্ব করে ইসলামের যে বিস্তৃতি ঘটিয়েছিল তার জন্য মুসলিম ইতিহাস পড়ে মুসলমানেরা তখনো অহংকার করেছেন। তবে এখন অনেক আলেম ইয়াজিদকে কাফের বলছেন।
অনেকে আবার কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসাইন এবং ইয়াজিদের মধ্যে কোন যুদ্ধের ঘটনা স্বীকার করেন না। তাদের মতে, কারবালা যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনার সবটাই লেখা হয়েছে ইমাম তাবারি কর্তৃক এবং তা কারবালা যুদ্ধের ২২০ বছর পর। ইমাম তাবারির ১৩ খণ্ডের ইতিহাস এবং ৩০ খণ্ডের কোরআনের ব্যাখ্যা রয়েছে। তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে মুসলমানদের ইতিহাস রচনা করেছিলেন; যাদের কথার ওপর ভিত্তি করে তিনি কারবালা যুদ্ধের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন তারাও ওই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন না, তারাও বিষয়টি শুনেছেন তাদের পূর্ববর্তী ছয় বা সাত পুরুষ আগের কারও কাছ থেকে। কারবালার যুদ্ধের লিখিত নথিপত্র বলতে কিছুই ছিল না। তিনি তার বইতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি তার রাজকীয় নিয়োগ-কর্তাদের আদেশ এবং পারসিক পুরোহিতমণ্ডলীর উপদেশ অনুযায়ী বই লিখেছেন এবং ইমাম হোসাইনের হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের বংশধরদের কাছ থেকে শুনে কারবালার কাহিনী বর্ণনা করেছেন।
৯০০ খ্রিস্টাব্দে ইমাম তাবারি কারবালার যুদ্ধের ইতিহাস লেখেন; আগেই উল্লেখ করেছি যে, তার লেখার পক্ষে কোনো প্রমাণ বা নথিপত্র নেই। সমর্থিত বা প্রত্যায়িত ছাড়া তথ্যের সন্নিবেশনে যে ইতিহাস প্রাথমিক পর্যায়ে রচিত হয়েছিল তা পরবর্তী পর্যায়ে ধর্মীয় অনুভূতির সংমিশ্রণে আরও বিকৃত হয়েছে। কুফাবাসীরা ইমাম হোসাইনকে (রা.) খলিফা বানানোর অঙ্গীকার করে অঙ্গীকার সম্বলিত একাধিক পত্র তার কাছে প্রেরণ করেছিল; কারও মতে এ পত্রের সংখ্যা দেড়শ, আবার কারও কারও মতে হাজার হাজার। তাবারির বর্ণনানুযায়ী কুফাবাসীদের সত্যিকার মনোভাব জানার অভিপ্রায়ে ইমাম হোসাইন (রা.) তার চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকিলকে কুফায় প্রেরণ করেন। তিনি যখন মুসলিম বিন আকিলের নেতিবাচক চিঠি পেলেন তখন খেলাফতের দাবি ছেড়ে দিয়ে ইয়াজিদের সৈনিকদের কাছে তিনটি প্রস্তাব পেশ করেন: সিরিয়ায় গিয়ে তাকে ইয়াজিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হোক, অথবা তাকে মুসলিম রাজ্যের কোন সীমান্তের দিকে যেতে দেওয়া হোক, অথবা তাকে মদিনায় ফেরত যেতে দেওয়া হোক। ইমাম হোসাইন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে জিহাদে অবতীর্ণ হয়ে হঠাৎ বিস্তৃত পৃথিবীর যে কোন দিকে তাকে চলে যেতে বাধা না দেওয়ার প্রস্তাব ইমাম হোসেনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে হয় না। কারণ তার সাহায্যে আল্লাহর নির্দেশনায় আগত পাখি, ফেরেস্তা, জ্বীন তাকে বিজয় এনে দেওয়ার আশ্বাস দিলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। আল্লাহর সহায়তায় তার সুনিশ্চিত বিজয়ের প্রস্তাব গ্রহণ না করে, ইয়াজিদের সেনাপতির কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ বেমানান। অন্যদিকে ইতিহাসে কারবালার যুদ্ধ চলাকালীন উভয় পক্ষের কথোপকথন যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কোন যোদ্ধার পক্ষেও পুনরায় বর্ণনা করা সম্ভব ছিল না। অধিকন্তু যাত্রা বা সিনেমায় দ্বন্দ্বে লিপ্ত দুই পক্ষের চিৎকার করে কথার বলার রেওয়াজ থাকলেও সত্যিকার রণক্ষেত্রে বিবাদমান দুপক্ষের কথা বলার সুযোগ থাকে না। ইমাম হোসাইন তার দুধের শিশু আলী আসগর এবং নিজে স্বয়ং তীরাঘাতে রক্তাক্ত হলেও তিনি এক ফোঁটা রক্তও মাটিতে পড়তে দেননি, সব রক্ত আকাশে ছুড়ে মারেন যা পরবর্তী তিন দিন বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে, তখন সবাই ধরে নিয়েছিল কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে। ইমাম তাবারি ব্যতীত সমসাময়িক অন্য কোন দেশের ইতিহাসে এই কাহিনীর উল্লেখ নেই। ৬৮০ সনে সংঘটিত কারবালার ঘটনা সত্য হলে ৭০০ সনে ইমাম হোসাইনের পুত্র ইমাম জয়নুল আবেদিন ‘মুনাজাত-ই-জয়নুল আবেদিন’ এবং ‘সহীফা সাজ্জাদিয়া’ নামে যে দুটি বই লেখেন তাতে কারবালার ঘটনার উল্লেখ থাকার কথা, কিন্তু সামান্যতম ইঙ্গিত উক্ত দুটি বইতে নেই, বরং বই দুটিতে নাকি ইয়াজিদের প্রশংসা করা হয়েছে। ৭৫৮ সনে লিখিত ইমাম মালিকের ‘মুওয়াত্তা’ বইতেও কারবালার কোন উল্লেখ নেই। ৮৬০ সনে হাদিসের বইগুলো লেখা শুরু হয়, কারবালার কাহিনী হাদিসের জন্য প্রাসঙ্গিক না হলেও হাদিসের লেখকগণ কারবালার কাহিনী নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করেননি।
ধর্মের অনেক স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে ইসলামিক আলেমেরা আলাপ করা থেকে বিরত থাকেন, অন্যরা আলাপ করলে রুষ্ট হন।
এদের পরামর্শ হচ্ছে, ইয়াজিদের প্রশংসা করারও প্রয়োজন নেই, দুর্নাম করারও দরকার নেই—আল্লাহ যা ভালো বুঝবেন তাই করবেন। অন্যদিকে খারেজিদের মতো অনেক গোঁড়া ধার্মিক ধর্মের ব্যাপারে এমন সমঝোতায় বিশ্বাসী নন, তারা কোন আপসনীতি মানেন না। খারেজিরা আলী (রা.) বা মুয়াবিয়া (রা.) কাউকেই মুসলমান বলে মনে করতেন না। মুসলমান মনে করতেন না বলেই তারা দুজনকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন; আলীকে হত্যা করতে পারলেও মুয়াবিয়াকে হত্যা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। বর্তমানেও এমন কট্টর মুসলমান আছেন যারা কোন আপস মানেন না। ইয়াজিদকে রহমতুল্লাহ ও আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্ত মুসলমান বলার কারণে ডা. জাকির নায়েককে ‘জোকার’ আর ‘কাফির’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে। যারা ধার্মিক হওয়ার ভান করেন তারা ধর্ম পরিপালনের চেয়ে ধর্মের প্রতিষ্ঠায় সর্বদা ব্যতিব্যস্ত থাকেন, তারা তাদের অন্ধ বিশ্বাসের বিপক্ষে কোন যুক্তিসঙ্গত সমালোচনাকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হিসেবে গণ্য করেন। এ কারণে অনেক কুসংস্কার অপনোদনে কেউ যুক্তিসঙ্গত আলোচনা করতে আগ্রহী হয় না, কেউ আগ্রহী হলে তাকে নাস্তিক বলে অভিহিত করা হয়।
[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com